1:34 am, Sunday, 24 May 2026

গাজা যুদ্ধকালীন ইসরায়েলকে যেভাবে অস্ত্র জুগিয়েছে ৫১টি দেশ

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি গণহত্যামূলক যুদ্ধের নিন্দা জানাতে ২০২৪ সালের জানুয়ারির শুরুর দিকের এক শীতের দিনে নেদারল্যান্ডসের হেগের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) বাইরে কিছু বিক্ষোভকারী জড়ো হয়েছিলেন। সেই সময় যুদ্ধের বয়স ছিল প্রায় ১০০ দিন। সেখান থেকে ৩ হাজার কিলোমিটারেরও (১ হাজার ৮৬৪ মাইল) বেশি দূরে গাজার কিছু ফিলিস্তিনি ইউটিউবে সরাসরি সম্প্রচারিত আদালতের কার্যক্রেমে নজর রাখছিলেন। তবে বেশিরভাগ মানুষই তখন ইসরায়েলের টানা বোমাবর্ষণের মুখে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত ছিলেন।

গণহত্যা অপরাধ প্রতিরোধ ও শাস্তি সংক্রান্ত কনভেনশনের প্রায় আট দশকের ইতিহাসে মাত্র কয়েকটি মামলাই ওই আদালত পর্যন্ত পৌঁছেছে। সেদিন বিশ্বের সর্বোচ্চ আদালতের কাছে গাজায় ইসরায়েলি হামলাকে একটি গণহত্যার—অর্থাৎ জাতিগত, বংশগত, ধর্মীয় বা গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ কিংবা আংশিকভাবে ধ্বংস করার শামিল কি না, তা বিবেচনার আবেদন জানিয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা।

আদালত কক্ষের ভেতরে, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রতিনিধিত্বকারী আইরিশ আইনজীবী ব্লিন নি ঘরালাইঘ বক্তব্য দেওয়া শুরু করেন। বিচারকদের তিনি বলেন, গাজায় সামরিক অভিযান চলাকালীন ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের ‌‌‘‘অমানবিক, গণহত্যামূলক বক্তব্য’’ থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ফিলিস্তিনি জনগণের পাশে দাঁড়াতে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে।

তিনি বলেন, ইতিহাসে এটিই প্রথম গণহত্যা, যেখানে এর শিকার ব্যক্তিরা নিজেরাই সরাসরি নিজেদের ধ্বংসের দৃশ্য সম্প্রচার করছেন এই আশায় যে, বিশ্ব হয়তো কিছু একটা করবে। যদিও এখন পর্যন্ত সে আশা বৃথাই রয়ে গেছে।

নি ঘরালাইঘ আদালতকে সেদিন বলেছিলেন, প্রতিদিন গড়ে ২৪৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত হচ্ছেন; যার মধ্যে ৪৮ জন মা। অর্থাৎ প্রতি ঘণ্টায় দুজন মা ইসরায়েলি হামলায় প্রাণ হারাচ্ছেন। একই সঙ্গে প্রতিদিন ১১৭ জনের বেশি শিশু মারা যাচ্ছে; যা প্রতি ঘণ্টায় পাঁচজন।

তিনি এই ধ্বংসযজ্ঞ থেকে চিকিৎসাকর্মী ও ত্রাণসহায়তাকারীদের মধ্যে তৈরি হওয়া নতুন সংক্ষিপ্ত কিছু শব্দের উল্লেখ করেন। সেগুলো ডব্লিউসিএনএসএফ— এর অর্থ আহত শিশু; যার কোনও জীবিত পরিবার নেই। ততদিনে ৭ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছিলেন।

নি ঘরালাইঘ বলেন, এসব তথ্য ‘‘গণহত্যার পক্ষের’’। এর চেয়ে স্পষ্ট বা জোরালো কোনও প্রমাণ উপস্থাপন করা যায় না।

একই বছরের ২৬ জানুয়ারি, আইসিজে রায় দেয়, গাজায় গণহত্যার একটি বাস্তব ঝুঁকি রয়েছে এবং সাময়িক পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেয় আন্তর্জাতিক এই বিচার আদালত। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আদালত গণহত্যা কনভেনশনের পক্ষভুক্ত ১৫৩টি দেশের সবকটিকে তাদের দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়, তা হলো গণহত্যা প্রতিরোধে পদক্ষেপ নেওয়া।

কিন্তু পরবর্তী ২২ মাস ধরে হত্যাকাণ্ড চলতেই থাকে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে যখন একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি অর্জিত হয়, ততদিনে ৭০ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত এবং ১ লাখ ৭১ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন।

এই পুরো সময়জুড়ে ইসরায়েলে অস্ত্রের সরবরাহ অব্যাহত ছিল।

• অস্ত্র রপ্তানি
কাতার-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার মাসব্যাপী এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গাজায় গণহত্যার বাস্তব ঝুঁকি রয়েছে বলে আইসিজের সতর্কবার্তার পরও অন্তত ৫১টি দেশ ও স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল থেকে উৎপাদিত সামরিক সরঞ্জাম ইসরায়েলে প্রবেশ অব্যাহত ছিল।

২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যকার ইসরায়েলি কর কর্তৃপক্ষের (আইটিএ) আমদানি তথ্যের বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে এবং শুল্ক রেকর্ড ও তথ্য অধিকার আইনের আবেদনের সহায়তায়, এই অনুসন্ধান ইউরোপ, এশিয়া, উত্তর আমেরিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর সাথে যুক্ত সামরিক সরবরাহ শৃঙ্খলের খোঁজ পেয়েছে আল-জাজিরা। সেখানে উল্লেখ করা এসব দেশই গণহত্যা কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী।

কিছু ক্ষেত্রে সামরিক সরঞ্জামগুলো এমন সব দেশ থেকে এসেছে যারা আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা জারি বা দেশটিতে অস্ত্র সরবরাহ আংশিকভাবে স্থগিত করেছিল। প্রকৃতপক্ষে, আইটিএর তথ্য অনুযায়ী, আইসিজের রায়ের পর অস্ত্র আমদানি আরও বৃদ্ধি পায়; যার মধ্যে বড় অংশই ছিল গোলাবারুদ শ্রেণির অস্ত্র।

ইসরায়েলে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহে শীর্ষ পাঁচটি উৎস দেশ শনাক্ত করেছে আল-জাজিরা। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, রোমানিয়া, তাইওয়ান এবং চেক প্রজাতন্ত্র—সবকটি দেশই যুদ্ধের সময় ইসরায়েলে চালানের পরিমাণ বৃদ্ধির রেকর্ড গড়েছে।

এই অনুসন্ধানের অন্তর্ভুক্ত অনেক দেশ ইসরায়েলে অস্ত্র রপ্তানির পরিসংখ্যান প্রকাশ না করলেও আইটিএর তথ্যে দেখা যায়, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে সামরিক সরঞ্জামবাহী ২ হাজার ৬০৩টি চালান ইসরায়েলে প্রবেশ করেছে; যার মধ্যে গোলাবারুদ, বিস্ফোরক যুদ্ধাস্ত্র, অস্ত্রের অংশ এবং সাঁজোয়া যানের যন্ত্রাংশ হিসেবে চিহ্নিত আমদানি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

আইটিএ বলেছে, মোট আমদানির মূল্য ছিল ৩ দশমিক ২২ বিলিয়ন ইসরায়েলি শেকেল (৮৮৫.৬ মিলিয়ন ডলার), যার মধ্যে ৯১ শতাংশ মূল্য রেকর্ড করা হয়েছে আইসিজের রায়ের পর।

তুলনামূলকভাবে ২০২৩ সালের অক্টোবরের আগের ২০ মাসে ইসরায়েলে সামরিক সরঞ্জাম আমদানি ছিল মোট ১.৪১ বিলিয়ন শেকেল (৩৮৮.১ মিলিয়ন ডলার)। এই তথ্যে গাজায় সামরিক অভিযান বজায় রাখতে ইসরায়েলের বিদেশি অস্ত্র সরবরাহের ওপর নিজের নির্ভরতা বাড়ানোর ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

এমনকি ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর সর্বশেষ যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও অস্ত্রের প্রবাহ থামেনি। আইটিএর তথ্য অনুযায়ী, ওই বছরের শেষ দুই মাসে ইসরায়েল অতিরিক্ত ৩২৪.৯ মিলিয়ন শেকেল (৮৯.৪ মিলিয়ন ডলার) মূল্যের সামরিক সরঞ্জাম আমদানি করেছে।

• গণহত্যা প্রতিরোধের দায়
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইসিজের রায়ের পরও যেসব দেশের সরকার ইসরায়েলকে অস্ত্র দেওয়া অব্যাহত রেখেছে, তারা গণহত্যায় সহযোগিতার জন্য দায়ী হতে পারে।

লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক স্টিফেন হামফ্রেস আল-জাজিরাকে বলেন, রায়ের আগেই প্রচুর প্রমাণ ছিল যে ইসরায়েলকে অস্ত্র সরবরাহকারী দেশগুলো যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধসহ আন্তর্জাতিক অপরাধে জড়িত থাকতে পারে।

ইউনিভার্সিটি অব দ্য ওয়েস্ট অব ইংল্যান্ডের ফৌজদারি আইনের অধ্যাপক গেরহার্ড কেম্প বলেন, গাজা এখনও একটি চলমান গণহত্যামূলক অভিযানের বিষয়বস্তু হয়ে রয়েছে।

চলতি সামরিক অভিযান, বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা এবং এমন জীবনযাত্রা চাপিয়ে দেওয়া; যা কোনও গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ কিংবা আংশিকভাবে ধ্বংস করতে পারে—সেসবের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, সবচেয়ে সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতিতেও এটি পরিবর্তন হয়নি।

গণহত্যা কনভেনশনের আওতায়, রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্ব কেবল গণহত্যার শাস্তি দেওয়া নয়, বরং এটি প্রতিরোধ করাও। কেম্প বলেন, এই বাধ্যবাধকতা আদালতের চূড়ান্ত রায়ের মাধ্যমে নয়, বরং মারাত্মক ঝুঁকির কথা জানার পর থেকেই কার্যকর হয়।

তিনি বলেন, কিছু রাষ্ট্রের গণহত্যা প্রতিরোধের দায়িত্ব সম্পর্কে অত্যন্ত সংকীর্ণ ধারণা রয়েছে এবং তারা গাজায় গণহত্যা হচ্ছে কি না সে বিষয়ে আদালতের বিচারিক সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করছে। কিন্তু আইসিজের এমন এক সিদ্ধান্ত নিতে সম্ভবত বেশ কয়েক বছর সময় লাগবে। সবচেয়ে ভালো দৃষ্টিভঙ্গি হলো অভ্যন্তরীণ আইনি বাধ্যবাধকতা… এবং আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতা ও বিদ্যমান প্রমাণের ভিত্তিতে সক্রিয় হওয়া আইনি হাতিয়ারগুলোর দিকে নজর দেওয়া।

তিনি অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড সংক্রান্ত জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের ফলাফলের দিকে ইঙ্গিত করেন; যা ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, ইসরায়েল গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালিয়েছে।

কমিশনের এই সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করে কেম্প বলেন, রাষ্ট্রগুলো এমন আচরণ প্রতিরোধ নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য; যা গণহত্যার শামিল হতে পারে… যার মধ্যে এমন অস্ত্র হস্তান্তরও রয়েছে; যা ইসরায়েল গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড চালাতে ব্যবহার করেছে বা ব্যবহার করার সম্ভাবনা রয়েছে।

তিনি বলেন, এই প্রতিবেদনটি জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক ছিল না। তবে এটি বিদ্যমান আইনি বাধ্যবাধকতার বিষয়ে কর্তৃত্বপূর্ণ। আমি মনে করি রাষ্ট্রগুলোর জন্য কমিশনের ফলাফল ও সব সুপারিশ কার্যকর করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে, বিশেষ করে ইসরায়েলে অস্ত্র সরবরাহের ক্ষেত্রে।

আইনজীবীরা বলেছেন, গণহত্যা কনভেনশনের বাইরেও অস্ত্র বাণিজ্য চুক্তির অনুচ্ছেদ ৬ অনুযায়ী, এমন কোনও হস্তান্তর অনুমোদন করা নিষিদ্ধ; যেখানে অস্ত্রগুলো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটাতে ব্যবহার হওয়ার স্পষ্ট ঝুঁকি রয়েছে।

ইতোমধ্যে অস্ত্র সরবরাহকারী দেশগুলোকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ আইনি বাধ্যবাধকতার মুখোমুখিও হতে হচ্ছে। কেম্প বলেন, এর মধ্যে যুক্তরাজ্য এবং অন্যান্য রাষ্ট্রের আইনও রয়েছে। আইনে আন্তর্জাতিক অপরাধে জড়িত থাকার সম্ভাব্য বা বাস্তব ঝুঁকিতে থাকা রাষ্ট্রগুলোতে অস্ত্র রপ্তানির ক্ষেত্রে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বনের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

• ইসরায়েলি আমদানির তথ্য বিশ্লেষণ
আইটিএ সর্বসাধারণের জন্য আট সংখ্যার শুল্ক কোডে আমদানির একটি উন্মুক্ত ডাটাবেজ প্রকাশ করেছে।

এসব কোড ওয়ার্ল্ড কাস্টমস অর্গানাইজেশনের হারমোনাইজড সিস্টেম (এইচএস) অনুযায়ী গঠিত। প্রথম ছয়টি সংখ্যা আন্তর্জাতিকভাবে প্রণীত পণ্য শ্রেণির সাথে মিলে যায়। অন্যদিকে দেশগুলোকে সংখ্যা যোগ করে আরও বিস্তারিত জাতীয় পরিসংখ্যান প্রদানের অনুমতি দেওয়া হয়। ইসরায়েলের ক্ষেত্রে এটি প্রায়ই আট সংখ্যার কোড হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে বৈশ্বিক ছয়টি সংখ্যা এবং জাতীয় বিবরণের জন্য অতিরিক্ত দুটি সংখ্যা।

আল-জাজিরা ২০২২ এবং ২০২৫ সালের মাঝে ইসরায়েলি আমদানিকে অন্তর্ভুক্ত করে ৬৫ লাখেরও বেশি স্বতন্ত্র শুল্ক তথ্য বিশ্লেষণ করেছে। এই অনুসন্ধানে এমন আমদানির ওপর নজর দেওয়া হয়েছে, যেখানে শুল্ক কোড ‌‌‘‘৯৩’’ দিয়ে শুরু হয়; যা অস্ত্র এবং বুলেট সম্পর্কিত রপ্তানি কাভার করে। পাশাপাশি কোড ৮৭১০০০০০, যা ট্যাংক এবং অন্যান্য সাঁজোয়া যুদ্ধযান এবং সেগুলোর যন্ত্রাংশ কাভার করে।

• ইসরায়েলের শুল্ক কোডবুকে যা আছে
• বিস্ফোরক যুদ্ধাস্ত্র, যেমন— বোমা, গ্রেনেড, টর্পেডো, মাইন, মিসাইল এবং অনুরূপ যুদ্ধাস্ত্র এবং যন্ত্রাংশ। এটি কার্তুজ, কিছু ধরনের গোলাবারুদ ও প্রজেক্টাইল এবং যন্ত্রাংশকেও চিহ্নিত করে; যার মধ্যে রয়েছে শট এবং কার্তুজ ওয়াড (৯৩০৬৯০৯০)।
• বুলেট হিসেবে চিহ্নিত আইটেম (৯৩০৬৯এমডিইডব্লিউ)
• সামরিক অস্ত্রের যন্ত্রাংশ এবং আনুষাঙ্গিক, যার মধ্যে রিভলভার এবং পিস্তল তৈরির উপকরণ অন্তর্ভুক্ত (৯৩০৫১০০০)
• শটগান এবং রাইফেল (৯৩০৫২০০০)
• সামরিক অস্ত্রের যন্ত্রাংশ এবং অন্যান্য সরঞ্জাম (৯৩০৫৯১০০)
• অন্যান্য ধরনের যন্ত্রাংশ এবং উপকরণ (৯৩০৫৯৯০০)
• রকেট লাঞ্চার, ফ্লেমথ্রোয়ার, গ্রেনেড লাঞ্চার, টর্পেডো টিউব এবং অনুরূপ প্রজেক্টর (৯৩০১২০০০)
• ট্যাংক এবং অন্যান্য সাঁজোয়া যুদ্ধযান, মোটরচালিত, অস্ত্রযুক্ত হোক বা না হোক, এবং যন্ত্রাংশ (৮৭১০০০০০)

• তথ্য যা দেখায় এবং যা দেখায় না
এই ডেটাসেটটি যুদ্ধের সময় ইসরায়েলের অস্ত্র-সম্পর্কিত আমদানির একটি অস্বাভাবিক বিশদ চিত্র তুলে ধরলেও এটি মোট অস্ত্র হস্তান্তরের আংশিক পরিসংখ্যান মাত্র।

শুল্ক রেকর্ডগুলোতে অস্ত্রের সুনির্দিষ্ট প্রকৃতি, চূড়ান্ত প্রাপক বা প্রেরিত অস্ত্র ও অস্ত্রের সরঞ্জামের শেষ ব্যবহারকারীর বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কোনও তথ্য উল্লেখ করা হয় নাই। তবে তথ্যে আমদানিকৃত পণ্যের জন্য একটি ‘‘উৎস দেশ’’ রেকর্ড করা হয়েছে। এর মানে এই নয় যে, আমদানি করা যুদ্ধাস্ত্র সরাসরি সেই দেশ থেকেই ইসরায়েলে রপ্তানি করা হয়েছিল। এর পরিবর্তে সেগুলো তৃতীয় দেশের মাধ্যমেও পাঠানো হয়ে থাকতে পারে।

অনেক আন্তর্জাতিক অস্ত্র সরবরাহ চেইনে সামরিক উপকরণগুলো চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছানোর আগে বৃহত্তর অস্ত্র ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় বা নির্মাতাদের মাঝে স্থানান্তরিত হয়।

অস্ত্র বিশেষজ্ঞরা আল-জাজিরাকে বলেছেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার রপ্তানি অনুমোদনের আগে সামরিক সরঞ্জামের উদ্দেশ্যমূলক শেষ ব্যবহারকারী মূল্যায়ন করে। তবে আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইনের মাধ্যমে স্থানান্তরিত হওয়ার পর সেসব সরঞ্জাম শেষ পর্যন্ত কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে তা নির্ধারণ করতে বিদেশি চালানের পরবর্তী যাচাইকরণ পদ্ধতিগতভাবে পরিচালনা করে না।

এসব কোডের অধীনে রেকর্ডকৃত সমস্ত পণ্যই ইসরায়েলি আমদানি ব্যবস্থায় সামরিক সম্পর্কিত হিসেবে তালিকাভূক্ত করা হয়। অস্ত্র বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু ক্ষেত্রে সামরিক সরঞ্জাম প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হতে পারে। এই তথ্যে প্রতিটি চালানের প্রবেশের স্থানও রেকর্ড করা হয়েছে; যার মধ্যে বেন গুরিয়ন বিমানবন্দর, হাইফা ও আশদোদ বন্দর এবং জর্ডান নদী পারাপার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

আল-জাজিরার বিশ্লেষণে, ইসরায়েলকে বিনামূল্যে সরবরাহ করা অস্ত্র, সামরিক বিমানের যন্ত্রাংশ এবং কৌশলগত যোগাযোগ বা রাডার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। আল-জাজিরার পরামর্শ নেওয়া অস্ত্র বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এসব অস্ত্র প্রায়ই বিস্তৃত শুল্ক শিরোনামের অধীনে রেকর্ড করা হয়; যা কিছু ক্ষেত্রে সামরিক রপ্তানির মধ্যে বেসামরিক পণ্যও অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। যেমন, বাণিজ্যিক বিমান চালনায় ব্যবহৃত বিমানের যন্ত্রাংশ—যার ফলে এই ধরনের চালান সামরিক প্রকৃতির ছিল কি না তা নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

সেই কারণে আল-জাজিরা এমন শুল্ক কোডগুলোকে বাদ দিয়েছে, যেখানে পণ্যের সামরিক প্রকৃতি যথাযথভাবে নিশ্চিত হতে পারেনি।

• এইচএস কোড ৯৩-এর অর্থ কী?
ইসরায়েলি আমদানির ডেটাসেটে সুনির্দিষ্ট মডেল বা শেষ ব্যবহারকারী নির্দিষ্ট করা না থাকায় আল-জাজিরা স্বতন্ত্র নথিপত্র খোঁজার চেষ্টা করেছিল পরীক্ষা করার জন্য। যাতে ‘‘৯৩’’ দিয়ে শুরু হওয়া এইচএস কোডের অধীনে রেকর্ড করা সব চালান নামধারী প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলোর মধ্যে চলাচলকারী শনাক্তযোগ্য অস্ত্রের উপাদানের সাথে মিলে যায় কি না।

আল-জাজিরা ২০৪টি অস্ত্র-সম্পর্কিত চালানের ভারতীয় শুল্ক রপ্তানি নথি পেয়েছে; যা ২০২৪ সালে ইসরায়েলে পাঠানো হয়েছিল ৯৩০৬৯০০০ শ্রেণিভুক্ত কোডের অধীনে।

এইচএস কোড ৯৩০৬ বলতে বোঝায় ‘‘বোমা, গ্রেনেড, টর্পেডো, মাইন, মিসাইল এবং অনুরূপ যুদ্ধাস্ত্র, এবং সেগুলোর যন্ত্রাংশ’’। ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের শুল্ক বই অনুযায়ী, ভারতীয় উপশ্রেণি ৯৩০৬৯০০০ ‘‘বোমা, গ্রেনেড’’ হিসেবে চিহ্নিত।

নথিতে দেখা যায়, ভারতীয় সংস্থাগুলো ইসরায়েলি অস্ত্র প্রস্তুতকারকদের কাছে অস্ত্রের উপাদান রপ্তানি করছে; যার মধ্যে রাফায়েল অ্যাডভান্সড ডিফেন্স সিস্টেমস, আইএমআই সিস্টেমস লিমিটেড এবং এমসিটি মেটেরিয়ালস রয়েছে।

একাধিক চালানের মাধ্যমে কল্যাণী রাফায়েল অ্যাডভান্সড সিস্টেমস প্রাইভেট লিমিটেড (কেআরএএস)—যা ভারতের কল্যাণী স্ট্র্যাটেজিক সিস্টেমস এবং ইসরায়েলের রাফায়েল অ্যাডভান্সড ডিফেন্স সিস্টেমসের একটি যৌথ উদ্যোগ; রাফায়েল অ্যাডভান্সড ডিফেন্স সিস্টেমসের কাছে হেভি ফ্রাগ উপাদান হিসেবে বর্ণিত মোট ৫ লাখ ৫৪ হাজার ১২০টি ইউনিট রপ্তানি করেছে। রেকর্ডগুলো পর্যালোচনা করা অস্ত্র বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ফ্র্যাগমেন্টেশন উপাদানগুলো সাধারণত বিস্ফোরক যুদ্ধাস্ত্রে ব্যবহৃত হয়; যা বিস্ফোরণের পর ধাতব টুকরো ছড়িয়ে দেয়।

ভারতীয় অংশীদার কল্যাণী স্ট্র্যাটেজিক সিস্টেমস কেআরএএসের সিংহভাগ শেয়ারের মালিক। আইএমআই সিস্টেমসের কাছে ১৫৫ মিলিমিটার প্রজেক্টাইল বডি হিসেবে চিহ্নিত ৫০টি ইউনিট রপ্তানি করেছে। অস্ত্র বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ১৫৫ মিলিমিটার প্রজেক্টাইল বডি হলো একটি বড় কামানের গোলার প্রধান ইস্পাত কাঠামো; যা বিস্ফোরক দিয়ে ভর্তি করার জন্য তৈরি করা হয়েছে।

ইকোনমিক এক্সপ্লোসিভস লিমিটেড (ভারত) ইসরায়েলের রেশেফ টেকনোলজিস লিমিটেডের কাছে বুস্টার পেলেট (যুদ্ধাস্ত্র, প্রতিরক্ষা) হিসেবে বর্ণিত ৯৯ হাজার ৪০০টি ইউনিট রপ্তানি করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামরিক যুদ্ধাস্ত্রে বড় ধরনের বিস্ফোরক চার্জ শুরু করতে বুস্টার পেলেট ব্যবহার করা হয়।

অন্যান্য চালানের মধ্যে অশোকা ম্যানুফ্যাকচারিং প্রাইভেট লিমিটেড কর্তৃক এমসিটি মেটেরিয়ালসের কাছে রপ্তানি করা ৩২০টি ইউনিট অন্তর্ভুক্ত ছিল; যা যুদ্ধাস্ত্রের ধাতব অংশ হিসেবে বর্ণিত।

এসব নথি ভারতীয় রপ্তানির সম্পূর্ণ পরিসরের তথ্য তুলে ধরেনি এবং এগুলো গাজায় শেষ ব্যবহার হয়েছে, সেই দাবিকেও শতভাগ নিশ্চিত করে না। তবে এগুলো ইসরায়েল এইচএস কোড ‘‘৯৩০৬’’ এর আওতায় কী ধরনের আমদানি পেয়েছিল তার একটি সুক্ষ্ম চিত্র তুলে ধরেছে।

এই বিষয়ে মন্তব্য জানতে ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল আল-জাজিরা। কিন্তু প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত দেশটির সরকারের কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে কাতারের এই সংবাদমাধ্যম।

• অস্ত্রের বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন
আইটিএর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের সময় ইসরায়েলের সামরিক আমদানির সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী ছিল যুক্তরাষ্ট্র; যা এই অনুসন্ধানে চিহ্নিত মোট ঘোষিত মূল্যের ৪২ শতাংশেরও বেশির জন্য দায়ী।

ভারত দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। দেশটি ইসরায়েলের আমদানি করা মোট অস্ত্রের প্রায় ২৬ শতাংশ সরবরাহ করেছে। এই দুটি দেশের রেকর্ডকৃত অস্ত্র আমদানির মোট মূল্যের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি।

পরবর্তী তিনটি বৃহত্তম সরবরাহকারী ছিল রোমানিয়া (৮ শতাংশ), তাইওয়ান (৪ শতাংশ) এবং চেক প্রজাতন্ত্র (৩ শতাংশ)। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলো সম্মিলিতভাবে ইসরায়েলের অস্ত্র-সম্পর্কিত আমদানির মোট মূল্যের প্রায় ১৯ শতাংশের জন্য দায়ী। আরও প্রায় ৮ শতাংশ এসেছে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে, যার মধ্যে তাইওয়ান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম এবং সিঙ্গাপুর রয়েছে।

এই পরিসংখ্যানে সময়ের সাথে সাথে সরবরাহের ধরনেও পরিবর্তন দেখা গেছে। ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিস্ফোরক যুদ্ধাস্ত্রের এইচএস কোডের অধীনে ইসরায়েলে সম্মিলিত ৮০.৯ মিলিয়ন শেকেল (২২.৩ মিলিয়ন ডলার) মূল্যের তিনটি বৃহত্তম চালানের দুটি এসেছিল আজারবাইজান থেকে। গাজায় গণহত্যামূলক যুদ্ধের সময় এটি কমে মোট ৮.২ মিলিয়ন শেকেলে (২.৩ মিলিয়ন ডলার) দাঁড়ায়।

একই এইচএস কোডের অধীনে নেদারল্যান্ডস থেকে উৎপাদিত ৪০.৪ মিলিয়ন শেকেল (১১.১ মিলিয়ন ডলার) মূল্যের অস্ত্র ও গোলাবারুদ ২০২২ সালের আগস্টে ইসরায়েলে পাঠানো হয়েছিল। বিপরীতে পুরো যুদ্ধজুড়ে ইসরায়েলে ডাচ সামরিক রপ্তানির মূল্য ছিল ১ লাখ ৫ হাজার শেকেল (২৯ হাজার ডলার)।

নেদারল্যান্ডসের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র আল-জাজিরাকে বলেছেন, ইসরায়েলে সামরিক পণ্য রপ্তানি কেবল বিশুদ্ধ প্রতিরক্ষামূলক উদ্দেশ্যে অনুমোদিত। কিন্তু আল-জাজিরার বিশ্লেষণে পূর্ববর্তী ২১ মাসের তুলনায় যুদ্ধের সময় কয়েকটি দেশ ইসরায়েলের আমদানিকৃত সামরিক পণ্যের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছিল। আইটিএর তথ্য কেবল ২০২২ সাল পর্যন্ত পাওয়া যাওয়ায় এটিই ছিল সবচেয়ে আগের প্রাপ্ত সময়কাল।

এর মধ্যে সামরিক চালানের শীর্ষ পাঁচ সরবরাহকারী দেশের তালিকায় রয়েছে : যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, রোমানিয়া, তাইওয়ান এবং চেক প্রজাতন্ত্র। এতে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আইসিজের রায়কে জনসমক্ষে সমর্থন করা দেশগুলোর অল্প পরিমাণের সামরিক সরবরাহও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

উদাহরণ হিসেবে চীন সেই সময় বলেছিল, আদালতের নির্দেশিত সাময়িক পদক্ষেপগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হবে বলে প্রত্যাশা করে বেইজিং। তবে যুদ্ধের সময় চীন থেকে উৎপাদিত ইসরায়েলে সামরিক চালানের পরিমাণ ছিল মোট ৭১.১ মিলিয়ন শেকেল (১৯.৬ মিলিয়ন ডলার); যার প্রায় ৮৩ শতাংশ মূল্য আদালতের রায়ের পর নথিভুক্ত করা হয়েছে।

এই রপ্তানির বিষয়ে মন্তব্যের জন্য চীন সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল আল-জাজিরা। কিন্তু প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি।

সিঙ্গাপুর বলেছে, আইসিজের নির্দেশ সাধারণত বাধ্যতামূলক এবং তারা তাৎক্ষণিক মানবিক যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানো জাতিসংঘের সব প্রস্তাবকে সমর্থন করেছে। কিন্তু ইসরায়েলি শুল্ক তথ্যে দেখা যায়, যুদ্ধের সময় সিঙ্গাপুর থেকে ২০.২ মিলিয়ন শেকেল (৫.৬ মিলিয়ন ডলার) সামরিক আমদানি হয়েছে; যার ৮৮ শতাংশ আইসিজের সিদ্ধান্তের পর রেকর্ড করা হয়েছিল।

সুইজারল্যান্ড বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তিতে আইসিজের ভূমিকার এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি পূর্ণ সম্মান জানিয়ে সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে। কিন্তু যুদ্ধ চলাকালীন ইসরায়েলের সামরিক আমদানির ৯ মিলিয়ন শেকেল (২.৫ মিলিয়ন ডলার) মূল্যের পণ্য এসেছে এই মধ্য ইউরোপীয় দেশ থেকে; যার মোট মূল্যের ৯৮ শতাংশ রায়ের পর নিবন্ধিত হয়েছে। সুইস সরকার এক বিবৃতিতে আল-জাজিরাকে বলেছে, নির্দিষ্ট সামরিক পণ্যের জন্য লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে।

আইটিএর তথ্য অনুযায়ী, এমনকি বিশ্বমঞ্চে ফিলিস্তিনপন্থী সবচেয়ে জোরালো কণ্ঠস্বর ছিল এমন দেশগুলোর অঞ্চল থেকেও যুদ্ধের সময় ইসরায়েলে সামরিক পণ্য প্রবেশ করেছে। যদিও পরিমাপ অনেক কম ছিল।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয্যেপ এরদোয়ান বলেছিলেন, নারী, শিশু এবং বৃদ্ধদের ওপর ইসরায়েলের হামলা বন্ধ হবে বলে প্রত্যাশা করেন তিনি। দেশটি থেকে উৎপাদিত সামরিক পণ্যের পরিমাণ ছিল মোট ৭.৫ মিলিয়ন শেকেল (২.১ মিলিয়ন ডলার); যার ৭৯ শতাংশ আইসিজের নির্দেশের পর রেকর্ড করা হয়েছে।

দেশটির সরকার আল-জাজিরাকে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ২ মের পর তুরস্ক থেকে ইসরায়েলে সমস্ত পণ্য গ্রুপের রপ্তানি, আমদানি, মুক্ত অঞ্চল বাণিজ্য এবং ট্রানজিট বাণিজ্য সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা হয়েছে। তখন থেকে ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য শূন্যে রয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর তুরস্ক কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ইসরায়েলকে কোনও অস্ত্র রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয়নি।

আল-জাজিরার পর্যালোচনা করা ইসরায়েলি শুল্ক তথ্যে অবশ্য দেখা যায়, তুরস্কের বাণিজ্য স্থগিতের ঘোষণার পর ২০২৪ সালের মে মাসের পর ইসরায়েলের আশদোদ বন্দরের মাধ্যমে প্রবেশ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে আইটিএর তথ্য অনুযায়ী, তুরস্ক থেকে উৎপাদিত হিসেবে রেকর্ডকৃত সামরিক পণ্যগুলো সেই তারিখের পরও বেন গুরিয়ন বিমানবন্দর এবং হাইফা বন্দরের মাধ্যমে ইসরায়েলে প্রবেশ করা অব্যাহত ছিল।

ব্রাজিলও একইভাবে জোর দিয়ে বলেছিল, আইসিজের পদক্ষেপগুলো আইনত বাধ্যতামূলক। এসব পদক্ষেপের পূর্ণ ও অবিলম্বে কার্যকরের আহ্বান জানিয়েছিল দেশটি। কিন্তু যুদ্ধ চলাকালীন দেশটি থেকে উৎপাদিত সামরিক চালানের পরিমাণ ছিল মোট ৮.৭ মিলিয়ন শেকেল (২.৪ মিলিয়ন ডলার); যার প্রায় ৮০ শতাংশ ছিল ২০২৪ সালের জানুয়ারির পরে।

ব্রাজিলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, দেশটি ২০২৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ইসরায়েলে নতুন কোনও প্রতিরক্ষা সংশ্লিষ্ট রপ্তানির আবেদন অনুমোদন করেনি। তবে তারা বলেছে, কিছু অস্ত্র যার মধ্যে আগ্নেয়াস্ত্রের উপাদান, আনুষাঙ্গিক, ছোট ক্যালিবারের গোলাবারুদ, প্রতিরক্ষা-সম্পর্কিত উৎপাদন সরঞ্জাম এবং সামরিক প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আর এগুলো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্ব অনুমোদনের অধীন নয়।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের গবেষক প্যাট্রিক উইলকেন বলেন, ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পরিধি এই ধরনের আন্তর্জাতিক সমর্থনকে অপরিহার্য করে তুলেছে। তিনি বলেন, এমন কোনও উপায় নেই যে ইসরায়েল একাই গাজা উপত্যকাজুড়ে তার ব্যাপক বোমাবর্ষণের তীব্রতা বজায় রাখতে পারত। ইসরায়েল অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং সহায়তা পরিষেবার একটি বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর নির্ভর করেছে; যা মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরবরাহ করেছে। তবে অন্যান্য অনেক রাষ্ট্রও সমর্থন জানিয়েছে।

যুদ্ধ যতই এগিয়েছে, ইসরায়েলে অস্ত্র-সম্পর্কিত আমদানি ততই বেড়েছে। তথ্যটি তা প্রমাণ করে বলে মনে হয়। প্রথম চার মাস—২০২৩ সালের অক্টোবর এবং ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে—দুই বছরের গণহত্যামূলক যুদ্ধজুড়ে সবচেয়ে কম আমদানির সংখ্যা দেখা গিয়েছিল।

যুদ্ধ যতই দীর্ঘায়িত হয়েছে, দশ হাজারেরও বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন, স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বোমাবর্ষণ করা হয়েছে এবং হাসপাতালগুলোতে আঘাত হানা হয়েছে, পরিস্থিতি বদলে গেছে।

২০২৪ সালের মার্চে ১২১.৭ মিলিয়ন শেকেল (৩৩.৫ মিলিয়ন ডলার) মূল্যের সামরিক আমদানি তার আগের বছরের অর্থাৎ ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের পরিমাণের দ্বিগুণেরও বেশি ছিল। আইটিএর তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ার এই সময়ের সবচেয়ে বড় চালানটি এই মাসে ইসরায়েলে প্রবেশ করেছিল; যার মধ্যে ১৪.০ মিলিয়ন শেকেল (৩.৮ মিলিয়ন ডলার) মূল্যের ট্যাংক এবং সাঁজোয়া যানের যন্ত্রাংশ ছিল।

২০২৪ সালের মে মাসে ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ গাজার রাফা শহরে প্রবেশ করে। তখন আইসিজে ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য প্রচণ্ড ঝুঁকি উল্লেখ করে ইসরায়েলকে সেখানে অভিযান বন্ধ করার নির্দেশ দেয়।

কিন্তু ইসরায়েলের অস্ত্রাগার তখনও পূর্ণ হচ্ছিল। চালানগুলো আবার বেড়ে যায়; যা ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে একটি নতুন রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছায়। এর পরিমাণ ছিল প্রায় ১৪১.৭ মিলিয়ন শেকেল (৩৯ মিলিয়ন ডলার)। বুলগেরিয়ার যুদ্ধের সবচেয়ে বড় চালানটি সেই মাসে এসেছিল; ২০.১ মিলিয়ন শেকেল (৫.৫ মিলিয়ন ডলার) মূল্যের বিস্ফোরক যুদ্ধাস্ত্র। অন্যদিকে চেক প্রজাতন্ত্র ইসরায়েলে সামরিক-সম্পর্কিত রপ্তানির জন্য সামগ্রিকভাবে সবচেয়ে বড় মাস রেকর্ড করেছে; যার মূল্য ছিল ১০.৫ মিলিয়ন শেকেল (২.৯ মিলিয়ন ডলার)।

• অস্ত্র রপ্তানি স্থগিত ও নিষেধাজ্ঞা
যুদ্ধ যতই চলতে থাকে, বিশ্বের বড় বড় শহরগুলোর লাখ লাখ মানুষ লড়াই বন্ধের দাবিতে এবং তাদের সরকারকে ইসরায়েলে অস্ত্র রপ্তানি বন্ধের আহ্বান জানিয়ে রাস্তায় নেমে আসে। অনেক রাষ্ট্র অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে। অন্যরা অস্ত্র বিক্রির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেয়; যা সাধারণত নির্দিষ্ট লাইসেন্স বা সরঞ্জামের শ্রেণির ওপর সাময়িক বা আংশিক স্থগিতাদেশ।

সাসেক্স ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক এবং বৈশ্বিক অস্ত্র বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ আনা স্ট্যাভরিয়ানাকিস বলেন, সরকারকে রপ্তানি নীতি পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করার ক্ষেত্রে জনগণের চাপ নিষ্পত্তিমূলক ভূমিকা পালন করেছে।

তিনি বলেন, বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে এটি ছিল জনগণের প্রতিবাদ, শ্রমিক সংগঠন এবং কৌশলগত মামলা; যা অস্ত্র রপ্তানিকারক রাষ্ট্রগুলোকে হস্তান্তর পুনর্বিবেচনা বা সীমিত করতে বাধ্য করেছে।

যুক্তরাজ্যে অধিকৃত পশ্চিম তীর ভিত্তিক এনজিও আল-হক এবং অলাভজনক গ্লোবাল লিগ্যাল অ্যাকশন নেটওয়ার্কের (জিএলএএন) আনা এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও অন্যদের সমর্থিত একটি মামলা আদালতে ব্রিটেনের অস্ত্র রপ্তানিকে চ্যালেঞ্জ করেছিল। স্পেনে, ডক শ্রমিকরা ইসরায়েলগামী সামরিক সরঞ্জাম বহনকারী জাহাজে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানায়; যা কর্তৃপক্ষকে চালানগুলো অবরুদ্ধ বা তদন্ত করতে বাধ্য করে।

কানাডায় নাগরিকদের বিক্ষোভ এবং আইন প্রণেতাদের চাপ একটি সংসদীয় ভোটের আগে হয়েছিল; যা হস্তান্তর বন্ধের আহ্বান জানিয়েছিল, যার পরে সরকার নতুন অনুমতি স্থগিত করে। ফ্রান্সে, বড় আকারের প্রতিবাদ অস্ত্র বিক্রির ওপর নজরদারি জোরদার করেছিল।

স্ট্যাভরিয়ানাকিস বলেন, দেশের ভেতরের এসব বিতর্ক ইসরায়েলের প্রতি সরকারের কৌশলগত প্রতিশ্রুতি এবং আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করার অভ্যন্তরীণ দাবির মাঝে উত্তেজনা বৃদ্ধি করে। রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মার্টিন ড্রু বলেন, অস্ত্র রপ্তানির ওপর বিধিনিষেধ অস্ত্র বিক্রি নিষিদ্ধ করার আইনি ব্যবস্থার বিকল্প ছিল না।

তিনি বলেন, একটি সরকার রপ্তানি লাইসেন্সের ওপর বিধিনিষেধ তৈরি করতে পারে। তবে এটি আইনের চেয়ে নীতি বেশি। এর অর্থ হলো তারা চাইলে এখনও রপ্তানি অনুমোদন করতে পারে।

বাস্তবে বেশিরভাগ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে একটি ধারা অন্তর্ভুক্ত থাকে; যাতে বলা হয় সরবরাহ ‘‘রপ্তানি লাইসেন্স অনুমোদনের অধীন’’। যদি লাইসেন্স বাতিল করা হয়, তাহলে চালানগুলো স্থগিত বা বাতিল হতে পারে। কিন্তু সরকার যদি কেবল নতুন লাইসেন্স ইস্যু করা বন্ধ করে, তাহলে বিদ্যমান লাইসেন্সগুলো বৈধ থাকতে পারে; যা আগে অনুমোদিত রপ্তানিগুলো অব্যাহত রাখার অনুমতি দেয়।

ড্রু বলেন, লাইসেন্সের ধরনও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাজ্যে স্ট্যান্ডার্ড ইন্ডিভিজুয়াল এক্সপোর্ট লাইসেন্স (এসআইইএল) একটি নির্দিষ্ট আইটেমের নির্দিষ্ট চালান কাভার করে। যদি সেই লাইসেন্স স্থগিত করা হয়, তাহলে রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। তবে এর বিরুদ্ধে আপিলও করা যেতে পারে।

কিন্তু অন্যান্য লাইসেন্স, যেমন যুক্তরাজ্যের ওপেন ইন্ডিভিজুয়াল এক্সপোর্ট লাইসেন্স (ওআইইএলএস) বা ওপেন জেনারেল এক্সপোর্ট লাইসেন্স (ওজিইএলএস), একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে একাধিক চালান কাভার করতে পারে। নীতিটি কীভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে ‘‘স্থগিতকরণ’’ সম্পর্কে রাজনৈতিক ঘোষণার পরও এই বিস্তৃত লাইসেন্স কার্যকর থাকতে পারে।

এর আরও ব্যাপক শিল্পগত পরিণতিও রয়েছে। প্রতিরক্ষা সংস্থা এবং অংশীদার সরকারগুলো এমন সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর নির্ভর করে; যা বেশ কয়েক বছর ধরে কাজ করে। আর এগুলো প্রায়ই বহুবছর মেয়াদী সংগ্রহ চুক্তি এবং দীর্ঘ উৎপাদন সময়ের সাথে যুক্ত। যদি কোনও দেশ অপ্রত্যাশিতভাবে রপ্তানি লাইসেন্স স্থগিত করে, তাহলে এটি সুনাম এবং বাণিজ্যিক ঝুঁকির সম্মুখীন হতে পারে।

ড্রু বলেন, ‘‘প্রধান প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলো বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে হয়। ক্রেতারা যদি মনে করে, আপনি আপনার প্রতিশ্রুতি পূরণ নাও করতে পারেন, তাহলে তারা অন্য কোথাও চলে যেতে পারে।’’

তিনি বলেন, বিমানের প্রোগ্রামসহ বড় অস্ত্র ব্যবস্থাগুলো সাধারণত বছরের পর বছর এবং কখনও কখনও দশক ধরে চলে; যা খরচ ভাগ করে নিতে এবং উৎপাদন বজায় রাখতে রপ্তানি আদেশের ওপর নির্ভর করে। স্থগিতাদেশ বা নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে লাইসেন্স ব্যাহত করা তাই কেবল একটি একক চালানকে নয়, বরং সমগ্র উৎপাদন লাইনের কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করতে পারে।

এর ফলে সরকারগুলো প্রায়ই রাজনৈতিক চাপ, আইনি ঝুঁকি এবং শিল্প স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করে। এই কারণে এমন নীতি তৈরি করতে পারে; যা জনসমক্ষে বিবৃতিতে বিধিনিষেধমূলক বলে মনে হলেও বাস্তবে আরও সংকীর্ণ।

সূত্র : আল জাজিরা।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

Nagorik Sangram নাগরিক সংগ্রাম

Nagorik Sangram | নাগরিক সংগ্রাম

বিরোধীদলের ছোট বন্ধুরা আসলে মাদকাসক্ত কি না, সন্দেহ হয়: আলাল

গাজা যুদ্ধকালীন ইসরায়েলকে যেভাবে অস্ত্র জুগিয়েছে ৫১টি দেশ

Update Time : 07:07:16 pm, Saturday, 23 May 2026

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি গণহত্যামূলক যুদ্ধের নিন্দা জানাতে ২০২৪ সালের জানুয়ারির শুরুর দিকের এক শীতের দিনে নেদারল্যান্ডসের হেগের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) বাইরে কিছু বিক্ষোভকারী জড়ো হয়েছিলেন। সেই সময় যুদ্ধের বয়স ছিল প্রায় ১০০ দিন। সেখান থেকে ৩ হাজার কিলোমিটারেরও (১ হাজার ৮৬৪ মাইল) বেশি দূরে গাজার কিছু ফিলিস্তিনি ইউটিউবে সরাসরি সম্প্রচারিত আদালতের কার্যক্রেমে নজর রাখছিলেন। তবে বেশিরভাগ মানুষই তখন ইসরায়েলের টানা বোমাবর্ষণের মুখে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত ছিলেন।

গণহত্যা অপরাধ প্রতিরোধ ও শাস্তি সংক্রান্ত কনভেনশনের প্রায় আট দশকের ইতিহাসে মাত্র কয়েকটি মামলাই ওই আদালত পর্যন্ত পৌঁছেছে। সেদিন বিশ্বের সর্বোচ্চ আদালতের কাছে গাজায় ইসরায়েলি হামলাকে একটি গণহত্যার—অর্থাৎ জাতিগত, বংশগত, ধর্মীয় বা গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ কিংবা আংশিকভাবে ধ্বংস করার শামিল কি না, তা বিবেচনার আবেদন জানিয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা।

আদালত কক্ষের ভেতরে, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রতিনিধিত্বকারী আইরিশ আইনজীবী ব্লিন নি ঘরালাইঘ বক্তব্য দেওয়া শুরু করেন। বিচারকদের তিনি বলেন, গাজায় সামরিক অভিযান চলাকালীন ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের ‌‌‘‘অমানবিক, গণহত্যামূলক বক্তব্য’’ থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ফিলিস্তিনি জনগণের পাশে দাঁড়াতে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে।

তিনি বলেন, ইতিহাসে এটিই প্রথম গণহত্যা, যেখানে এর শিকার ব্যক্তিরা নিজেরাই সরাসরি নিজেদের ধ্বংসের দৃশ্য সম্প্রচার করছেন এই আশায় যে, বিশ্ব হয়তো কিছু একটা করবে। যদিও এখন পর্যন্ত সে আশা বৃথাই রয়ে গেছে।

নি ঘরালাইঘ আদালতকে সেদিন বলেছিলেন, প্রতিদিন গড়ে ২৪৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত হচ্ছেন; যার মধ্যে ৪৮ জন মা। অর্থাৎ প্রতি ঘণ্টায় দুজন মা ইসরায়েলি হামলায় প্রাণ হারাচ্ছেন। একই সঙ্গে প্রতিদিন ১১৭ জনের বেশি শিশু মারা যাচ্ছে; যা প্রতি ঘণ্টায় পাঁচজন।

তিনি এই ধ্বংসযজ্ঞ থেকে চিকিৎসাকর্মী ও ত্রাণসহায়তাকারীদের মধ্যে তৈরি হওয়া নতুন সংক্ষিপ্ত কিছু শব্দের উল্লেখ করেন। সেগুলো ডব্লিউসিএনএসএফ— এর অর্থ আহত শিশু; যার কোনও জীবিত পরিবার নেই। ততদিনে ৭ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছিলেন।

নি ঘরালাইঘ বলেন, এসব তথ্য ‘‘গণহত্যার পক্ষের’’। এর চেয়ে স্পষ্ট বা জোরালো কোনও প্রমাণ উপস্থাপন করা যায় না।

একই বছরের ২৬ জানুয়ারি, আইসিজে রায় দেয়, গাজায় গণহত্যার একটি বাস্তব ঝুঁকি রয়েছে এবং সাময়িক পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেয় আন্তর্জাতিক এই বিচার আদালত। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আদালত গণহত্যা কনভেনশনের পক্ষভুক্ত ১৫৩টি দেশের সবকটিকে তাদের দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়, তা হলো গণহত্যা প্রতিরোধে পদক্ষেপ নেওয়া।

কিন্তু পরবর্তী ২২ মাস ধরে হত্যাকাণ্ড চলতেই থাকে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে যখন একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি অর্জিত হয়, ততদিনে ৭০ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত এবং ১ লাখ ৭১ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন।

এই পুরো সময়জুড়ে ইসরায়েলে অস্ত্রের সরবরাহ অব্যাহত ছিল।

• অস্ত্র রপ্তানি
কাতার-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার মাসব্যাপী এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গাজায় গণহত্যার বাস্তব ঝুঁকি রয়েছে বলে আইসিজের সতর্কবার্তার পরও অন্তত ৫১টি দেশ ও স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল থেকে উৎপাদিত সামরিক সরঞ্জাম ইসরায়েলে প্রবেশ অব্যাহত ছিল।

২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যকার ইসরায়েলি কর কর্তৃপক্ষের (আইটিএ) আমদানি তথ্যের বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে এবং শুল্ক রেকর্ড ও তথ্য অধিকার আইনের আবেদনের সহায়তায়, এই অনুসন্ধান ইউরোপ, এশিয়া, উত্তর আমেরিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর সাথে যুক্ত সামরিক সরবরাহ শৃঙ্খলের খোঁজ পেয়েছে আল-জাজিরা। সেখানে উল্লেখ করা এসব দেশই গণহত্যা কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী।

কিছু ক্ষেত্রে সামরিক সরঞ্জামগুলো এমন সব দেশ থেকে এসেছে যারা আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা জারি বা দেশটিতে অস্ত্র সরবরাহ আংশিকভাবে স্থগিত করেছিল। প্রকৃতপক্ষে, আইটিএর তথ্য অনুযায়ী, আইসিজের রায়ের পর অস্ত্র আমদানি আরও বৃদ্ধি পায়; যার মধ্যে বড় অংশই ছিল গোলাবারুদ শ্রেণির অস্ত্র।

ইসরায়েলে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহে শীর্ষ পাঁচটি উৎস দেশ শনাক্ত করেছে আল-জাজিরা। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, রোমানিয়া, তাইওয়ান এবং চেক প্রজাতন্ত্র—সবকটি দেশই যুদ্ধের সময় ইসরায়েলে চালানের পরিমাণ বৃদ্ধির রেকর্ড গড়েছে।

এই অনুসন্ধানের অন্তর্ভুক্ত অনেক দেশ ইসরায়েলে অস্ত্র রপ্তানির পরিসংখ্যান প্রকাশ না করলেও আইটিএর তথ্যে দেখা যায়, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে সামরিক সরঞ্জামবাহী ২ হাজার ৬০৩টি চালান ইসরায়েলে প্রবেশ করেছে; যার মধ্যে গোলাবারুদ, বিস্ফোরক যুদ্ধাস্ত্র, অস্ত্রের অংশ এবং সাঁজোয়া যানের যন্ত্রাংশ হিসেবে চিহ্নিত আমদানি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

আইটিএ বলেছে, মোট আমদানির মূল্য ছিল ৩ দশমিক ২২ বিলিয়ন ইসরায়েলি শেকেল (৮৮৫.৬ মিলিয়ন ডলার), যার মধ্যে ৯১ শতাংশ মূল্য রেকর্ড করা হয়েছে আইসিজের রায়ের পর।

তুলনামূলকভাবে ২০২৩ সালের অক্টোবরের আগের ২০ মাসে ইসরায়েলে সামরিক সরঞ্জাম আমদানি ছিল মোট ১.৪১ বিলিয়ন শেকেল (৩৮৮.১ মিলিয়ন ডলার)। এই তথ্যে গাজায় সামরিক অভিযান বজায় রাখতে ইসরায়েলের বিদেশি অস্ত্র সরবরাহের ওপর নিজের নির্ভরতা বাড়ানোর ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

এমনকি ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর সর্বশেষ যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও অস্ত্রের প্রবাহ থামেনি। আইটিএর তথ্য অনুযায়ী, ওই বছরের শেষ দুই মাসে ইসরায়েল অতিরিক্ত ৩২৪.৯ মিলিয়ন শেকেল (৮৯.৪ মিলিয়ন ডলার) মূল্যের সামরিক সরঞ্জাম আমদানি করেছে।

• গণহত্যা প্রতিরোধের দায়
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইসিজের রায়ের পরও যেসব দেশের সরকার ইসরায়েলকে অস্ত্র দেওয়া অব্যাহত রেখেছে, তারা গণহত্যায় সহযোগিতার জন্য দায়ী হতে পারে।

লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক স্টিফেন হামফ্রেস আল-জাজিরাকে বলেন, রায়ের আগেই প্রচুর প্রমাণ ছিল যে ইসরায়েলকে অস্ত্র সরবরাহকারী দেশগুলো যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধসহ আন্তর্জাতিক অপরাধে জড়িত থাকতে পারে।

ইউনিভার্সিটি অব দ্য ওয়েস্ট অব ইংল্যান্ডের ফৌজদারি আইনের অধ্যাপক গেরহার্ড কেম্প বলেন, গাজা এখনও একটি চলমান গণহত্যামূলক অভিযানের বিষয়বস্তু হয়ে রয়েছে।

চলতি সামরিক অভিযান, বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা এবং এমন জীবনযাত্রা চাপিয়ে দেওয়া; যা কোনও গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ কিংবা আংশিকভাবে ধ্বংস করতে পারে—সেসবের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, সবচেয়ে সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতিতেও এটি পরিবর্তন হয়নি।

গণহত্যা কনভেনশনের আওতায়, রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্ব কেবল গণহত্যার শাস্তি দেওয়া নয়, বরং এটি প্রতিরোধ করাও। কেম্প বলেন, এই বাধ্যবাধকতা আদালতের চূড়ান্ত রায়ের মাধ্যমে নয়, বরং মারাত্মক ঝুঁকির কথা জানার পর থেকেই কার্যকর হয়।

তিনি বলেন, কিছু রাষ্ট্রের গণহত্যা প্রতিরোধের দায়িত্ব সম্পর্কে অত্যন্ত সংকীর্ণ ধারণা রয়েছে এবং তারা গাজায় গণহত্যা হচ্ছে কি না সে বিষয়ে আদালতের বিচারিক সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করছে। কিন্তু আইসিজের এমন এক সিদ্ধান্ত নিতে সম্ভবত বেশ কয়েক বছর সময় লাগবে। সবচেয়ে ভালো দৃষ্টিভঙ্গি হলো অভ্যন্তরীণ আইনি বাধ্যবাধকতা… এবং আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতা ও বিদ্যমান প্রমাণের ভিত্তিতে সক্রিয় হওয়া আইনি হাতিয়ারগুলোর দিকে নজর দেওয়া।

তিনি অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড সংক্রান্ত জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের ফলাফলের দিকে ইঙ্গিত করেন; যা ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, ইসরায়েল গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালিয়েছে।

কমিশনের এই সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করে কেম্প বলেন, রাষ্ট্রগুলো এমন আচরণ প্রতিরোধ নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য; যা গণহত্যার শামিল হতে পারে… যার মধ্যে এমন অস্ত্র হস্তান্তরও রয়েছে; যা ইসরায়েল গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড চালাতে ব্যবহার করেছে বা ব্যবহার করার সম্ভাবনা রয়েছে।

তিনি বলেন, এই প্রতিবেদনটি জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক ছিল না। তবে এটি বিদ্যমান আইনি বাধ্যবাধকতার বিষয়ে কর্তৃত্বপূর্ণ। আমি মনে করি রাষ্ট্রগুলোর জন্য কমিশনের ফলাফল ও সব সুপারিশ কার্যকর করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে, বিশেষ করে ইসরায়েলে অস্ত্র সরবরাহের ক্ষেত্রে।

আইনজীবীরা বলেছেন, গণহত্যা কনভেনশনের বাইরেও অস্ত্র বাণিজ্য চুক্তির অনুচ্ছেদ ৬ অনুযায়ী, এমন কোনও হস্তান্তর অনুমোদন করা নিষিদ্ধ; যেখানে অস্ত্রগুলো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটাতে ব্যবহার হওয়ার স্পষ্ট ঝুঁকি রয়েছে।

ইতোমধ্যে অস্ত্র সরবরাহকারী দেশগুলোকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ আইনি বাধ্যবাধকতার মুখোমুখিও হতে হচ্ছে। কেম্প বলেন, এর মধ্যে যুক্তরাজ্য এবং অন্যান্য রাষ্ট্রের আইনও রয়েছে। আইনে আন্তর্জাতিক অপরাধে জড়িত থাকার সম্ভাব্য বা বাস্তব ঝুঁকিতে থাকা রাষ্ট্রগুলোতে অস্ত্র রপ্তানির ক্ষেত্রে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বনের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

• ইসরায়েলি আমদানির তথ্য বিশ্লেষণ
আইটিএ সর্বসাধারণের জন্য আট সংখ্যার শুল্ক কোডে আমদানির একটি উন্মুক্ত ডাটাবেজ প্রকাশ করেছে।

এসব কোড ওয়ার্ল্ড কাস্টমস অর্গানাইজেশনের হারমোনাইজড সিস্টেম (এইচএস) অনুযায়ী গঠিত। প্রথম ছয়টি সংখ্যা আন্তর্জাতিকভাবে প্রণীত পণ্য শ্রেণির সাথে মিলে যায়। অন্যদিকে দেশগুলোকে সংখ্যা যোগ করে আরও বিস্তারিত জাতীয় পরিসংখ্যান প্রদানের অনুমতি দেওয়া হয়। ইসরায়েলের ক্ষেত্রে এটি প্রায়ই আট সংখ্যার কোড হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে বৈশ্বিক ছয়টি সংখ্যা এবং জাতীয় বিবরণের জন্য অতিরিক্ত দুটি সংখ্যা।

আল-জাজিরা ২০২২ এবং ২০২৫ সালের মাঝে ইসরায়েলি আমদানিকে অন্তর্ভুক্ত করে ৬৫ লাখেরও বেশি স্বতন্ত্র শুল্ক তথ্য বিশ্লেষণ করেছে। এই অনুসন্ধানে এমন আমদানির ওপর নজর দেওয়া হয়েছে, যেখানে শুল্ক কোড ‌‌‘‘৯৩’’ দিয়ে শুরু হয়; যা অস্ত্র এবং বুলেট সম্পর্কিত রপ্তানি কাভার করে। পাশাপাশি কোড ৮৭১০০০০০, যা ট্যাংক এবং অন্যান্য সাঁজোয়া যুদ্ধযান এবং সেগুলোর যন্ত্রাংশ কাভার করে।

• ইসরায়েলের শুল্ক কোডবুকে যা আছে
• বিস্ফোরক যুদ্ধাস্ত্র, যেমন— বোমা, গ্রেনেড, টর্পেডো, মাইন, মিসাইল এবং অনুরূপ যুদ্ধাস্ত্র এবং যন্ত্রাংশ। এটি কার্তুজ, কিছু ধরনের গোলাবারুদ ও প্রজেক্টাইল এবং যন্ত্রাংশকেও চিহ্নিত করে; যার মধ্যে রয়েছে শট এবং কার্তুজ ওয়াড (৯৩০৬৯০৯০)।
• বুলেট হিসেবে চিহ্নিত আইটেম (৯৩০৬৯এমডিইডব্লিউ)
• সামরিক অস্ত্রের যন্ত্রাংশ এবং আনুষাঙ্গিক, যার মধ্যে রিভলভার এবং পিস্তল তৈরির উপকরণ অন্তর্ভুক্ত (৯৩০৫১০০০)
• শটগান এবং রাইফেল (৯৩০৫২০০০)
• সামরিক অস্ত্রের যন্ত্রাংশ এবং অন্যান্য সরঞ্জাম (৯৩০৫৯১০০)
• অন্যান্য ধরনের যন্ত্রাংশ এবং উপকরণ (৯৩০৫৯৯০০)
• রকেট লাঞ্চার, ফ্লেমথ্রোয়ার, গ্রেনেড লাঞ্চার, টর্পেডো টিউব এবং অনুরূপ প্রজেক্টর (৯৩০১২০০০)
• ট্যাংক এবং অন্যান্য সাঁজোয়া যুদ্ধযান, মোটরচালিত, অস্ত্রযুক্ত হোক বা না হোক, এবং যন্ত্রাংশ (৮৭১০০০০০)

• তথ্য যা দেখায় এবং যা দেখায় না
এই ডেটাসেটটি যুদ্ধের সময় ইসরায়েলের অস্ত্র-সম্পর্কিত আমদানির একটি অস্বাভাবিক বিশদ চিত্র তুলে ধরলেও এটি মোট অস্ত্র হস্তান্তরের আংশিক পরিসংখ্যান মাত্র।

শুল্ক রেকর্ডগুলোতে অস্ত্রের সুনির্দিষ্ট প্রকৃতি, চূড়ান্ত প্রাপক বা প্রেরিত অস্ত্র ও অস্ত্রের সরঞ্জামের শেষ ব্যবহারকারীর বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কোনও তথ্য উল্লেখ করা হয় নাই। তবে তথ্যে আমদানিকৃত পণ্যের জন্য একটি ‘‘উৎস দেশ’’ রেকর্ড করা হয়েছে। এর মানে এই নয় যে, আমদানি করা যুদ্ধাস্ত্র সরাসরি সেই দেশ থেকেই ইসরায়েলে রপ্তানি করা হয়েছিল। এর পরিবর্তে সেগুলো তৃতীয় দেশের মাধ্যমেও পাঠানো হয়ে থাকতে পারে।

অনেক আন্তর্জাতিক অস্ত্র সরবরাহ চেইনে সামরিক উপকরণগুলো চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছানোর আগে বৃহত্তর অস্ত্র ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় বা নির্মাতাদের মাঝে স্থানান্তরিত হয়।

অস্ত্র বিশেষজ্ঞরা আল-জাজিরাকে বলেছেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার রপ্তানি অনুমোদনের আগে সামরিক সরঞ্জামের উদ্দেশ্যমূলক শেষ ব্যবহারকারী মূল্যায়ন করে। তবে আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইনের মাধ্যমে স্থানান্তরিত হওয়ার পর সেসব সরঞ্জাম শেষ পর্যন্ত কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে তা নির্ধারণ করতে বিদেশি চালানের পরবর্তী যাচাইকরণ পদ্ধতিগতভাবে পরিচালনা করে না।

এসব কোডের অধীনে রেকর্ডকৃত সমস্ত পণ্যই ইসরায়েলি আমদানি ব্যবস্থায় সামরিক সম্পর্কিত হিসেবে তালিকাভূক্ত করা হয়। অস্ত্র বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু ক্ষেত্রে সামরিক সরঞ্জাম প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হতে পারে। এই তথ্যে প্রতিটি চালানের প্রবেশের স্থানও রেকর্ড করা হয়েছে; যার মধ্যে বেন গুরিয়ন বিমানবন্দর, হাইফা ও আশদোদ বন্দর এবং জর্ডান নদী পারাপার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

আল-জাজিরার বিশ্লেষণে, ইসরায়েলকে বিনামূল্যে সরবরাহ করা অস্ত্র, সামরিক বিমানের যন্ত্রাংশ এবং কৌশলগত যোগাযোগ বা রাডার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। আল-জাজিরার পরামর্শ নেওয়া অস্ত্র বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এসব অস্ত্র প্রায়ই বিস্তৃত শুল্ক শিরোনামের অধীনে রেকর্ড করা হয়; যা কিছু ক্ষেত্রে সামরিক রপ্তানির মধ্যে বেসামরিক পণ্যও অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। যেমন, বাণিজ্যিক বিমান চালনায় ব্যবহৃত বিমানের যন্ত্রাংশ—যার ফলে এই ধরনের চালান সামরিক প্রকৃতির ছিল কি না তা নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

সেই কারণে আল-জাজিরা এমন শুল্ক কোডগুলোকে বাদ দিয়েছে, যেখানে পণ্যের সামরিক প্রকৃতি যথাযথভাবে নিশ্চিত হতে পারেনি।

• এইচএস কোড ৯৩-এর অর্থ কী?
ইসরায়েলি আমদানির ডেটাসেটে সুনির্দিষ্ট মডেল বা শেষ ব্যবহারকারী নির্দিষ্ট করা না থাকায় আল-জাজিরা স্বতন্ত্র নথিপত্র খোঁজার চেষ্টা করেছিল পরীক্ষা করার জন্য। যাতে ‘‘৯৩’’ দিয়ে শুরু হওয়া এইচএস কোডের অধীনে রেকর্ড করা সব চালান নামধারী প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলোর মধ্যে চলাচলকারী শনাক্তযোগ্য অস্ত্রের উপাদানের সাথে মিলে যায় কি না।

আল-জাজিরা ২০৪টি অস্ত্র-সম্পর্কিত চালানের ভারতীয় শুল্ক রপ্তানি নথি পেয়েছে; যা ২০২৪ সালে ইসরায়েলে পাঠানো হয়েছিল ৯৩০৬৯০০০ শ্রেণিভুক্ত কোডের অধীনে।

এইচএস কোড ৯৩০৬ বলতে বোঝায় ‘‘বোমা, গ্রেনেড, টর্পেডো, মাইন, মিসাইল এবং অনুরূপ যুদ্ধাস্ত্র, এবং সেগুলোর যন্ত্রাংশ’’। ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের শুল্ক বই অনুযায়ী, ভারতীয় উপশ্রেণি ৯৩০৬৯০০০ ‘‘বোমা, গ্রেনেড’’ হিসেবে চিহ্নিত।

নথিতে দেখা যায়, ভারতীয় সংস্থাগুলো ইসরায়েলি অস্ত্র প্রস্তুতকারকদের কাছে অস্ত্রের উপাদান রপ্তানি করছে; যার মধ্যে রাফায়েল অ্যাডভান্সড ডিফেন্স সিস্টেমস, আইএমআই সিস্টেমস লিমিটেড এবং এমসিটি মেটেরিয়ালস রয়েছে।

একাধিক চালানের মাধ্যমে কল্যাণী রাফায়েল অ্যাডভান্সড সিস্টেমস প্রাইভেট লিমিটেড (কেআরএএস)—যা ভারতের কল্যাণী স্ট্র্যাটেজিক সিস্টেমস এবং ইসরায়েলের রাফায়েল অ্যাডভান্সড ডিফেন্স সিস্টেমসের একটি যৌথ উদ্যোগ; রাফায়েল অ্যাডভান্সড ডিফেন্স সিস্টেমসের কাছে হেভি ফ্রাগ উপাদান হিসেবে বর্ণিত মোট ৫ লাখ ৫৪ হাজার ১২০টি ইউনিট রপ্তানি করেছে। রেকর্ডগুলো পর্যালোচনা করা অস্ত্র বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ফ্র্যাগমেন্টেশন উপাদানগুলো সাধারণত বিস্ফোরক যুদ্ধাস্ত্রে ব্যবহৃত হয়; যা বিস্ফোরণের পর ধাতব টুকরো ছড়িয়ে দেয়।

ভারতীয় অংশীদার কল্যাণী স্ট্র্যাটেজিক সিস্টেমস কেআরএএসের সিংহভাগ শেয়ারের মালিক। আইএমআই সিস্টেমসের কাছে ১৫৫ মিলিমিটার প্রজেক্টাইল বডি হিসেবে চিহ্নিত ৫০টি ইউনিট রপ্তানি করেছে। অস্ত্র বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ১৫৫ মিলিমিটার প্রজেক্টাইল বডি হলো একটি বড় কামানের গোলার প্রধান ইস্পাত কাঠামো; যা বিস্ফোরক দিয়ে ভর্তি করার জন্য তৈরি করা হয়েছে।

ইকোনমিক এক্সপ্লোসিভস লিমিটেড (ভারত) ইসরায়েলের রেশেফ টেকনোলজিস লিমিটেডের কাছে বুস্টার পেলেট (যুদ্ধাস্ত্র, প্রতিরক্ষা) হিসেবে বর্ণিত ৯৯ হাজার ৪০০টি ইউনিট রপ্তানি করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামরিক যুদ্ধাস্ত্রে বড় ধরনের বিস্ফোরক চার্জ শুরু করতে বুস্টার পেলেট ব্যবহার করা হয়।

অন্যান্য চালানের মধ্যে অশোকা ম্যানুফ্যাকচারিং প্রাইভেট লিমিটেড কর্তৃক এমসিটি মেটেরিয়ালসের কাছে রপ্তানি করা ৩২০টি ইউনিট অন্তর্ভুক্ত ছিল; যা যুদ্ধাস্ত্রের ধাতব অংশ হিসেবে বর্ণিত।

এসব নথি ভারতীয় রপ্তানির সম্পূর্ণ পরিসরের তথ্য তুলে ধরেনি এবং এগুলো গাজায় শেষ ব্যবহার হয়েছে, সেই দাবিকেও শতভাগ নিশ্চিত করে না। তবে এগুলো ইসরায়েল এইচএস কোড ‘‘৯৩০৬’’ এর আওতায় কী ধরনের আমদানি পেয়েছিল তার একটি সুক্ষ্ম চিত্র তুলে ধরেছে।

এই বিষয়ে মন্তব্য জানতে ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল আল-জাজিরা। কিন্তু প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত দেশটির সরকারের কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে কাতারের এই সংবাদমাধ্যম।

• অস্ত্রের বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন
আইটিএর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের সময় ইসরায়েলের সামরিক আমদানির সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী ছিল যুক্তরাষ্ট্র; যা এই অনুসন্ধানে চিহ্নিত মোট ঘোষিত মূল্যের ৪২ শতাংশেরও বেশির জন্য দায়ী।

ভারত দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। দেশটি ইসরায়েলের আমদানি করা মোট অস্ত্রের প্রায় ২৬ শতাংশ সরবরাহ করেছে। এই দুটি দেশের রেকর্ডকৃত অস্ত্র আমদানির মোট মূল্যের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি।

পরবর্তী তিনটি বৃহত্তম সরবরাহকারী ছিল রোমানিয়া (৮ শতাংশ), তাইওয়ান (৪ শতাংশ) এবং চেক প্রজাতন্ত্র (৩ শতাংশ)। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলো সম্মিলিতভাবে ইসরায়েলের অস্ত্র-সম্পর্কিত আমদানির মোট মূল্যের প্রায় ১৯ শতাংশের জন্য দায়ী। আরও প্রায় ৮ শতাংশ এসেছে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে, যার মধ্যে তাইওয়ান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম এবং সিঙ্গাপুর রয়েছে।

এই পরিসংখ্যানে সময়ের সাথে সাথে সরবরাহের ধরনেও পরিবর্তন দেখা গেছে। ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিস্ফোরক যুদ্ধাস্ত্রের এইচএস কোডের অধীনে ইসরায়েলে সম্মিলিত ৮০.৯ মিলিয়ন শেকেল (২২.৩ মিলিয়ন ডলার) মূল্যের তিনটি বৃহত্তম চালানের দুটি এসেছিল আজারবাইজান থেকে। গাজায় গণহত্যামূলক যুদ্ধের সময় এটি কমে মোট ৮.২ মিলিয়ন শেকেলে (২.৩ মিলিয়ন ডলার) দাঁড়ায়।

একই এইচএস কোডের অধীনে নেদারল্যান্ডস থেকে উৎপাদিত ৪০.৪ মিলিয়ন শেকেল (১১.১ মিলিয়ন ডলার) মূল্যের অস্ত্র ও গোলাবারুদ ২০২২ সালের আগস্টে ইসরায়েলে পাঠানো হয়েছিল। বিপরীতে পুরো যুদ্ধজুড়ে ইসরায়েলে ডাচ সামরিক রপ্তানির মূল্য ছিল ১ লাখ ৫ হাজার শেকেল (২৯ হাজার ডলার)।

নেদারল্যান্ডসের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র আল-জাজিরাকে বলেছেন, ইসরায়েলে সামরিক পণ্য রপ্তানি কেবল বিশুদ্ধ প্রতিরক্ষামূলক উদ্দেশ্যে অনুমোদিত। কিন্তু আল-জাজিরার বিশ্লেষণে পূর্ববর্তী ২১ মাসের তুলনায় যুদ্ধের সময় কয়েকটি দেশ ইসরায়েলের আমদানিকৃত সামরিক পণ্যের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছিল। আইটিএর তথ্য কেবল ২০২২ সাল পর্যন্ত পাওয়া যাওয়ায় এটিই ছিল সবচেয়ে আগের প্রাপ্ত সময়কাল।

এর মধ্যে সামরিক চালানের শীর্ষ পাঁচ সরবরাহকারী দেশের তালিকায় রয়েছে : যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, রোমানিয়া, তাইওয়ান এবং চেক প্রজাতন্ত্র। এতে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আইসিজের রায়কে জনসমক্ষে সমর্থন করা দেশগুলোর অল্প পরিমাণের সামরিক সরবরাহও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

উদাহরণ হিসেবে চীন সেই সময় বলেছিল, আদালতের নির্দেশিত সাময়িক পদক্ষেপগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হবে বলে প্রত্যাশা করে বেইজিং। তবে যুদ্ধের সময় চীন থেকে উৎপাদিত ইসরায়েলে সামরিক চালানের পরিমাণ ছিল মোট ৭১.১ মিলিয়ন শেকেল (১৯.৬ মিলিয়ন ডলার); যার প্রায় ৮৩ শতাংশ মূল্য আদালতের রায়ের পর নথিভুক্ত করা হয়েছে।

এই রপ্তানির বিষয়ে মন্তব্যের জন্য চীন সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল আল-জাজিরা। কিন্তু প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি।

সিঙ্গাপুর বলেছে, আইসিজের নির্দেশ সাধারণত বাধ্যতামূলক এবং তারা তাৎক্ষণিক মানবিক যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানো জাতিসংঘের সব প্রস্তাবকে সমর্থন করেছে। কিন্তু ইসরায়েলি শুল্ক তথ্যে দেখা যায়, যুদ্ধের সময় সিঙ্গাপুর থেকে ২০.২ মিলিয়ন শেকেল (৫.৬ মিলিয়ন ডলার) সামরিক আমদানি হয়েছে; যার ৮৮ শতাংশ আইসিজের সিদ্ধান্তের পর রেকর্ড করা হয়েছিল।

সুইজারল্যান্ড বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তিতে আইসিজের ভূমিকার এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি পূর্ণ সম্মান জানিয়ে সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে। কিন্তু যুদ্ধ চলাকালীন ইসরায়েলের সামরিক আমদানির ৯ মিলিয়ন শেকেল (২.৫ মিলিয়ন ডলার) মূল্যের পণ্য এসেছে এই মধ্য ইউরোপীয় দেশ থেকে; যার মোট মূল্যের ৯৮ শতাংশ রায়ের পর নিবন্ধিত হয়েছে। সুইস সরকার এক বিবৃতিতে আল-জাজিরাকে বলেছে, নির্দিষ্ট সামরিক পণ্যের জন্য লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে।

আইটিএর তথ্য অনুযায়ী, এমনকি বিশ্বমঞ্চে ফিলিস্তিনপন্থী সবচেয়ে জোরালো কণ্ঠস্বর ছিল এমন দেশগুলোর অঞ্চল থেকেও যুদ্ধের সময় ইসরায়েলে সামরিক পণ্য প্রবেশ করেছে। যদিও পরিমাপ অনেক কম ছিল।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয্যেপ এরদোয়ান বলেছিলেন, নারী, শিশু এবং বৃদ্ধদের ওপর ইসরায়েলের হামলা বন্ধ হবে বলে প্রত্যাশা করেন তিনি। দেশটি থেকে উৎপাদিত সামরিক পণ্যের পরিমাণ ছিল মোট ৭.৫ মিলিয়ন শেকেল (২.১ মিলিয়ন ডলার); যার ৭৯ শতাংশ আইসিজের নির্দেশের পর রেকর্ড করা হয়েছে।

দেশটির সরকার আল-জাজিরাকে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ২ মের পর তুরস্ক থেকে ইসরায়েলে সমস্ত পণ্য গ্রুপের রপ্তানি, আমদানি, মুক্ত অঞ্চল বাণিজ্য এবং ট্রানজিট বাণিজ্য সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা হয়েছে। তখন থেকে ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য শূন্যে রয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর তুরস্ক কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ইসরায়েলকে কোনও অস্ত্র রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয়নি।

আল-জাজিরার পর্যালোচনা করা ইসরায়েলি শুল্ক তথ্যে অবশ্য দেখা যায়, তুরস্কের বাণিজ্য স্থগিতের ঘোষণার পর ২০২৪ সালের মে মাসের পর ইসরায়েলের আশদোদ বন্দরের মাধ্যমে প্রবেশ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে আইটিএর তথ্য অনুযায়ী, তুরস্ক থেকে উৎপাদিত হিসেবে রেকর্ডকৃত সামরিক পণ্যগুলো সেই তারিখের পরও বেন গুরিয়ন বিমানবন্দর এবং হাইফা বন্দরের মাধ্যমে ইসরায়েলে প্রবেশ করা অব্যাহত ছিল।

ব্রাজিলও একইভাবে জোর দিয়ে বলেছিল, আইসিজের পদক্ষেপগুলো আইনত বাধ্যতামূলক। এসব পদক্ষেপের পূর্ণ ও অবিলম্বে কার্যকরের আহ্বান জানিয়েছিল দেশটি। কিন্তু যুদ্ধ চলাকালীন দেশটি থেকে উৎপাদিত সামরিক চালানের পরিমাণ ছিল মোট ৮.৭ মিলিয়ন শেকেল (২.৪ মিলিয়ন ডলার); যার প্রায় ৮০ শতাংশ ছিল ২০২৪ সালের জানুয়ারির পরে।

ব্রাজিলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, দেশটি ২০২৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ইসরায়েলে নতুন কোনও প্রতিরক্ষা সংশ্লিষ্ট রপ্তানির আবেদন অনুমোদন করেনি। তবে তারা বলেছে, কিছু অস্ত্র যার মধ্যে আগ্নেয়াস্ত্রের উপাদান, আনুষাঙ্গিক, ছোট ক্যালিবারের গোলাবারুদ, প্রতিরক্ষা-সম্পর্কিত উৎপাদন সরঞ্জাম এবং সামরিক প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আর এগুলো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্ব অনুমোদনের অধীন নয়।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের গবেষক প্যাট্রিক উইলকেন বলেন, ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পরিধি এই ধরনের আন্তর্জাতিক সমর্থনকে অপরিহার্য করে তুলেছে। তিনি বলেন, এমন কোনও উপায় নেই যে ইসরায়েল একাই গাজা উপত্যকাজুড়ে তার ব্যাপক বোমাবর্ষণের তীব্রতা বজায় রাখতে পারত। ইসরায়েল অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং সহায়তা পরিষেবার একটি বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর নির্ভর করেছে; যা মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরবরাহ করেছে। তবে অন্যান্য অনেক রাষ্ট্রও সমর্থন জানিয়েছে।

যুদ্ধ যতই এগিয়েছে, ইসরায়েলে অস্ত্র-সম্পর্কিত আমদানি ততই বেড়েছে। তথ্যটি তা প্রমাণ করে বলে মনে হয়। প্রথম চার মাস—২০২৩ সালের অক্টোবর এবং ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে—দুই বছরের গণহত্যামূলক যুদ্ধজুড়ে সবচেয়ে কম আমদানির সংখ্যা দেখা গিয়েছিল।

যুদ্ধ যতই দীর্ঘায়িত হয়েছে, দশ হাজারেরও বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন, স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বোমাবর্ষণ করা হয়েছে এবং হাসপাতালগুলোতে আঘাত হানা হয়েছে, পরিস্থিতি বদলে গেছে।

২০২৪ সালের মার্চে ১২১.৭ মিলিয়ন শেকেল (৩৩.৫ মিলিয়ন ডলার) মূল্যের সামরিক আমদানি তার আগের বছরের অর্থাৎ ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের পরিমাণের দ্বিগুণেরও বেশি ছিল। আইটিএর তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ার এই সময়ের সবচেয়ে বড় চালানটি এই মাসে ইসরায়েলে প্রবেশ করেছিল; যার মধ্যে ১৪.০ মিলিয়ন শেকেল (৩.৮ মিলিয়ন ডলার) মূল্যের ট্যাংক এবং সাঁজোয়া যানের যন্ত্রাংশ ছিল।

২০২৪ সালের মে মাসে ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ গাজার রাফা শহরে প্রবেশ করে। তখন আইসিজে ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য প্রচণ্ড ঝুঁকি উল্লেখ করে ইসরায়েলকে সেখানে অভিযান বন্ধ করার নির্দেশ দেয়।

কিন্তু ইসরায়েলের অস্ত্রাগার তখনও পূর্ণ হচ্ছিল। চালানগুলো আবার বেড়ে যায়; যা ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে একটি নতুন রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছায়। এর পরিমাণ ছিল প্রায় ১৪১.৭ মিলিয়ন শেকেল (৩৯ মিলিয়ন ডলার)। বুলগেরিয়ার যুদ্ধের সবচেয়ে বড় চালানটি সেই মাসে এসেছিল; ২০.১ মিলিয়ন শেকেল (৫.৫ মিলিয়ন ডলার) মূল্যের বিস্ফোরক যুদ্ধাস্ত্র। অন্যদিকে চেক প্রজাতন্ত্র ইসরায়েলে সামরিক-সম্পর্কিত রপ্তানির জন্য সামগ্রিকভাবে সবচেয়ে বড় মাস রেকর্ড করেছে; যার মূল্য ছিল ১০.৫ মিলিয়ন শেকেল (২.৯ মিলিয়ন ডলার)।

• অস্ত্র রপ্তানি স্থগিত ও নিষেধাজ্ঞা
যুদ্ধ যতই চলতে থাকে, বিশ্বের বড় বড় শহরগুলোর লাখ লাখ মানুষ লড়াই বন্ধের দাবিতে এবং তাদের সরকারকে ইসরায়েলে অস্ত্র রপ্তানি বন্ধের আহ্বান জানিয়ে রাস্তায় নেমে আসে। অনেক রাষ্ট্র অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে। অন্যরা অস্ত্র বিক্রির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেয়; যা সাধারণত নির্দিষ্ট লাইসেন্স বা সরঞ্জামের শ্রেণির ওপর সাময়িক বা আংশিক স্থগিতাদেশ।

সাসেক্স ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক এবং বৈশ্বিক অস্ত্র বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ আনা স্ট্যাভরিয়ানাকিস বলেন, সরকারকে রপ্তানি নীতি পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করার ক্ষেত্রে জনগণের চাপ নিষ্পত্তিমূলক ভূমিকা পালন করেছে।

তিনি বলেন, বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে এটি ছিল জনগণের প্রতিবাদ, শ্রমিক সংগঠন এবং কৌশলগত মামলা; যা অস্ত্র রপ্তানিকারক রাষ্ট্রগুলোকে হস্তান্তর পুনর্বিবেচনা বা সীমিত করতে বাধ্য করেছে।

যুক্তরাজ্যে অধিকৃত পশ্চিম তীর ভিত্তিক এনজিও আল-হক এবং অলাভজনক গ্লোবাল লিগ্যাল অ্যাকশন নেটওয়ার্কের (জিএলএএন) আনা এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও অন্যদের সমর্থিত একটি মামলা আদালতে ব্রিটেনের অস্ত্র রপ্তানিকে চ্যালেঞ্জ করেছিল। স্পেনে, ডক শ্রমিকরা ইসরায়েলগামী সামরিক সরঞ্জাম বহনকারী জাহাজে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানায়; যা কর্তৃপক্ষকে চালানগুলো অবরুদ্ধ বা তদন্ত করতে বাধ্য করে।

কানাডায় নাগরিকদের বিক্ষোভ এবং আইন প্রণেতাদের চাপ একটি সংসদীয় ভোটের আগে হয়েছিল; যা হস্তান্তর বন্ধের আহ্বান জানিয়েছিল, যার পরে সরকার নতুন অনুমতি স্থগিত করে। ফ্রান্সে, বড় আকারের প্রতিবাদ অস্ত্র বিক্রির ওপর নজরদারি জোরদার করেছিল।

স্ট্যাভরিয়ানাকিস বলেন, দেশের ভেতরের এসব বিতর্ক ইসরায়েলের প্রতি সরকারের কৌশলগত প্রতিশ্রুতি এবং আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করার অভ্যন্তরীণ দাবির মাঝে উত্তেজনা বৃদ্ধি করে। রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মার্টিন ড্রু বলেন, অস্ত্র রপ্তানির ওপর বিধিনিষেধ অস্ত্র বিক্রি নিষিদ্ধ করার আইনি ব্যবস্থার বিকল্প ছিল না।

তিনি বলেন, একটি সরকার রপ্তানি লাইসেন্সের ওপর বিধিনিষেধ তৈরি করতে পারে। তবে এটি আইনের চেয়ে নীতি বেশি। এর অর্থ হলো তারা চাইলে এখনও রপ্তানি অনুমোদন করতে পারে।

বাস্তবে বেশিরভাগ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে একটি ধারা অন্তর্ভুক্ত থাকে; যাতে বলা হয় সরবরাহ ‘‘রপ্তানি লাইসেন্স অনুমোদনের অধীন’’। যদি লাইসেন্স বাতিল করা হয়, তাহলে চালানগুলো স্থগিত বা বাতিল হতে পারে। কিন্তু সরকার যদি কেবল নতুন লাইসেন্স ইস্যু করা বন্ধ করে, তাহলে বিদ্যমান লাইসেন্সগুলো বৈধ থাকতে পারে; যা আগে অনুমোদিত রপ্তানিগুলো অব্যাহত রাখার অনুমতি দেয়।

ড্রু বলেন, লাইসেন্সের ধরনও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাজ্যে স্ট্যান্ডার্ড ইন্ডিভিজুয়াল এক্সপোর্ট লাইসেন্স (এসআইইএল) একটি নির্দিষ্ট আইটেমের নির্দিষ্ট চালান কাভার করে। যদি সেই লাইসেন্স স্থগিত করা হয়, তাহলে রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। তবে এর বিরুদ্ধে আপিলও করা যেতে পারে।

কিন্তু অন্যান্য লাইসেন্স, যেমন যুক্তরাজ্যের ওপেন ইন্ডিভিজুয়াল এক্সপোর্ট লাইসেন্স (ওআইইএলএস) বা ওপেন জেনারেল এক্সপোর্ট লাইসেন্স (ওজিইএলএস), একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে একাধিক চালান কাভার করতে পারে। নীতিটি কীভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে ‘‘স্থগিতকরণ’’ সম্পর্কে রাজনৈতিক ঘোষণার পরও এই বিস্তৃত লাইসেন্স কার্যকর থাকতে পারে।

এর আরও ব্যাপক শিল্পগত পরিণতিও রয়েছে। প্রতিরক্ষা সংস্থা এবং অংশীদার সরকারগুলো এমন সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর নির্ভর করে; যা বেশ কয়েক বছর ধরে কাজ করে। আর এগুলো প্রায়ই বহুবছর মেয়াদী সংগ্রহ চুক্তি এবং দীর্ঘ উৎপাদন সময়ের সাথে যুক্ত। যদি কোনও দেশ অপ্রত্যাশিতভাবে রপ্তানি লাইসেন্স স্থগিত করে, তাহলে এটি সুনাম এবং বাণিজ্যিক ঝুঁকির সম্মুখীন হতে পারে।

ড্রু বলেন, ‘‘প্রধান প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলো বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে হয়। ক্রেতারা যদি মনে করে, আপনি আপনার প্রতিশ্রুতি পূরণ নাও করতে পারেন, তাহলে তারা অন্য কোথাও চলে যেতে পারে।’’

তিনি বলেন, বিমানের প্রোগ্রামসহ বড় অস্ত্র ব্যবস্থাগুলো সাধারণত বছরের পর বছর এবং কখনও কখনও দশক ধরে চলে; যা খরচ ভাগ করে নিতে এবং উৎপাদন বজায় রাখতে রপ্তানি আদেশের ওপর নির্ভর করে। স্থগিতাদেশ বা নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে লাইসেন্স ব্যাহত করা তাই কেবল একটি একক চালানকে নয়, বরং সমগ্র উৎপাদন লাইনের কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করতে পারে।

এর ফলে সরকারগুলো প্রায়ই রাজনৈতিক চাপ, আইনি ঝুঁকি এবং শিল্প স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করে। এই কারণে এমন নীতি তৈরি করতে পারে; যা জনসমক্ষে বিবৃতিতে বিধিনিষেধমূলক বলে মনে হলেও বাস্তবে আরও সংকীর্ণ।

সূত্র : আল জাজিরা।