1:44 am, Tuesday, 15 September 2026

অনিয়ম রোধে কঠোর অবস্থানে এনসিটিবি

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, ইবতেদায়ি ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) ৩১ কোটি বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ শুরু করেছে ১২৮টি প্রিন্টিং প্রেস।

গত মাসের মাঝামাঝি থেকে শুরু হওয়া বই ছাপার কাজে নানা অনিয়মের কারণে ইতোমধ্যে ৮টি প্রেসকে কারণ দর্শানো নোটিশ দিয়েছে এনসিটিবি। প্রেস থেকে নিম্নমানের কাগজ না সরানো ও ছাপার মান খারাপ হওয়ায় বাতিল করা হয়েছে প্রায় ২৭ হাজার বই। আর বাতিল করা হয়েছে ছাপা হওয়া প্রায় ৩ লাখ ফর্মা। এ ছাড়া নানা অভিযোগ ওঠায় মাধ্যমিক স্তরের বইয়ের মান যাচাইয়ে তৃতীয়পক্ষ হিসেবে এনসিটিবির নিয়োগ করা প্রি-ডেলিভারি ইন্সপেকশন (পিডিআই) এজেন্ট ইনডিপেনডেন্ট ইন্সপেকশন সার্ভিসসে বিডিকেও কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে এ সময় পর্যন্ত প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের মোট বইয়ের মধ্যে ছাপা ও বিতরণ হয়েছে ৩০ লাখ বই। আর ইবতেদায়িসহ মাধ্যমিক স্তরের মোট বইয়ের মধ্যে ছাপা হয়েছে প্রায় অর্ধকোটি। আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে বই ছাপা শেষ করে ডিসেম্বরের মাঝামঝি অথবা ১ জানুয়ারি সারা দেশে শিক্ষার্থীদের মাঝে বই বিতরণের পরিকল্পনা করেছে এনসিটিবি। তবে প্রতিদিন নিয়মিত বিরতিতে বিদ্যুতের লোডশেডিং এনসিটিবির এই লক্ষ্যপূরণে কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই সমস্যার সমাধানে এনসিটিবি নানা উদ্যোগ নিলেও নিরবচ্ছিন্নভাবে বই ছাপার কাজ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে প্রেসগুলোকে। এনসিটিবির পরিকল্পনা অনুযায়ী, বর্তমান শুরুর পরিস্থিতি ভালো হলেও নতুন শিক্ষাবর্ষের সময় যত এগিয়ে আসবে, ততই পাল্লা দিয়ে বাড়বে বই ছাপার কাজের চাপ। তাই লোডশেডিং সমস্যার দ্রুত সমাধান না হলে বই বিতরণে এনসিটিবির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

অন্যদিকে পিডিআই এজেন্টের কাজ কঠোরভাবে নজরদারি করা না হলে এনসিটিবির স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী বইয়ের গুণগত মান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েও শঙ্কা রয়েছে। এনসিটিবি, মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান ও বই ছাপার কাজে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপার বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে এসব তথ্য জানা গেছে। ৩১ কোটি বই বিতরণে এনসিটিবির লক্ষ্যমাত্রা : আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রাক-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত ৬১৭টি বিষয়ের প্রায় ৩০ কোটি ৭১ লাখ ৯৮ হাজার ১০১ কপি বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপা হবে।

প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের জন্য মোট ৮ কোটি ২১ লাখ ৬৭ হাজার ৭৩০ কপি, ইবতেদায়ির প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির জন্য ৩ কোটি ৩২ লাখ ৯৬ হাজার ৪০০ কপি এবং ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির জন্য মোট প্রায় ১৮ কোটি বই ছাপানো হবে। এর মধ্যে নবম শ্রেণির জন্য সবচেয়ে বেশি ৫ কোটি ৫৬ লাখ ২৭ হাজার ২৩৫ কপি বই রয়েছে। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য থাকবে ৯ হাজার ৪ কপি ব্রেইল বই।

গত ১৭ আগস্ট থেকে প্রাক-প্রাথমিকের বই ছাপা শুরু হয়। ৫২টি প্রেস প্রি-প্রাইমারি-প্রাইমারির বই ছাপার কাজ করছে। গত ১৯ আগস্ট থেকে ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রি-প্রাইমারির মোট ৫৭ লাখ বইয়ের মধ্যে ছাপা ও মাঠপর্যায়ে সরবরাহ হয়েছে ১২ লাখ। প্রাইমারির সাড়ে ৭ কোটির বেশি বইয়ের মধ্যে ছাপা ও সরবরাহ হয়েছে সাড়ে ১৮ লাখ। অন্যদিকে মাদ্রাসার ইবতেদায়িসহ মাধ্যমিক স্তরের ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির বই ছাপা হবে ৭৬টি প্রেসে।

এর মধ্যে বর্তমানে ৩৫টিতে কাজ চলছে। গত ৯ সেপ্টেম্বর মাধ্যমিক স্তরের মোট বইয়ের মধ্যে প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ বই ছাপা ও বাঁধাই হয়েছে। আর সাড়ে ৩০ লাখ বই ইতিমধ্যে ছাপা হয়ে গেছে। অন্যদিকে অষ্টম ও নবম শ্রেণির বই ছাপার জন্য প্রেসগুলোর সঙ্গে এনসিটিবির চুক্তির প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে। আগামী শিক্ষাবর্ষে এনসিটিবির বই বিতরণ পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৩০ নভেম্বরের মধ্যে বই ছাপার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে সরবরাহ শেষ করা হবে।

এরপর ডিসেম্বরের মাঝামাঝি অথবা ১ জানুয়ারি শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেওয়া হবে। এ প্রসঙ্গে এনসিটিবির চেয়ারম্যান প্রফেসর মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘৩০ নভেম্বরের মধ্যে বই ছাপা শেষ করে মাঠপর্যায়ে সরবরাহ করা হবে। এরপর ডিসেম্বরের মাঝামাঝি অথবা ১ জানুয়ারি শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেওয়া হবে। ডিসেম্বরের ১৫ তারিখের পর সাধারণত স্কুল বন্ধ থাকে।

তাই বিতরণের দিনক্ষণ নিয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অনিয়ম ঠেকাতে অ্যাকশনে এনসিটিবি : বই ছাপার কাজ শুরু হওয়ার পর বর্তমান সময় পর্যন্ত নানা ধরনের অনিয়মের কারণে ৭-৮টি প্রেসকে কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এমনকি একই প্রেসকে একাধিকবার নোটিশ দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। যদিও নোটিশ পাওয়া একাধিক প্রেস নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছে, ‘সাধারণ অজুহাতে’ এসব শোকজ দেওয়া হচ্ছে।

বড় কোনো বিষয় না হলেও অহেতুক এসব নোটিশে এনসিটিবি-প্রেসের সম্পর্কে আস্থার ঘাটতি তৈরি হবে; যা বই ছাপার পুরো প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে। নোটিশ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে— আনন্দ প্রিন্টার্স, লেটার অ্যান্ড কালার, সাগরিকা প্রিন্টার্স, লিখন আর্ট প্রেস, মেঘদূত প্রিন্টিং প্রেস ও ফেইমস প্রেস। মেঘদূত প্রিন্টিং প্রেসকে দেওয়া কারণ দর্শানো নোটিশ থেকে জানা গেছে, ওই প্রেসে নিউজপ্রিন্ট কাগজের রোল ছিল; যা এনসিটিবির মনিটরিং কর্মকর্তারা প্রেসকে ওই কাগজ সরানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন।

কিন্তু প্রেস ওই কাগজ না সরানোয় তিন দিন সময় দিয়ে এর ব্যাখা চেয়ে নোটিশ দেওয়া হয়। নোটিশের উত্তর সন্তোষজনক না হলে প্রেসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়। বইয়ের গুণগত মান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে যেকোনো পদক্ষেপ নিতে পিছপা হবে না এনসিটিবি, বলেন, এনসিটিবির চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ‘আমাদের একটাই লক্ষ্য, পরিকল্পনা অনুযায়ী যথাসময়ে শিক্ষার্থীদের হাতে শতভাগ মানসম্পন্ন বই তুলে দেওয়া।

’ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাঁটা ‘লোডশেডিং’: এনসিটিবির বই ছাপানোর বর্তমান পরিস্থিতি ভালো হলেও আগামী শিক্ষাবর্ষে পরিকল্পনা অনুযায়ী বই বিতরণে প্রধান কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্যুতের ‘লোডশেডিং’। রাজধানীর বাইরে সাভার, মানিকগঞ্জ, নোয়াখালী, বগুড়াসহ যেসব স্থানের প্রেসে বইয়ের ছাপার কাজ চলছে, নিয়মিত বিরতিতে প্রায় ৫ থেকে ৬ ঘণ্টার লোডশেডিংয়ে ভোগান্তি বেড়েছে।

রাজধানীর মাতুয়াইলের প্রেসগুলোও একই যন্ত্রণায় ভুগছে। ছোট ছাপাখানাগুলোর অনেকের জেনারেটর না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো জেনারেটর ব্যবহার করলেও এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ছাপাখানাগুলোয় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে গত ২৩ আগস্ট বিদ্যুৎ বিতরণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিঠি দিয়েছে এনসিটিবি।

চিঠিতে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বিনা মূল্যের পাঠ্যপুস্তক সরবরাহকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রাধিকারমূলক কার্যক্রম উল্লেখ করে মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। পাশপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য জোনভিত্তিক পল্লী বিদ্যুৎ ও ডিপিডিসির সংশ্লিষ্ট জোনে এনসিটিবির তরফ থেকে ব্যক্তিগত পর্যায়েও যোগাযোগ করা হচ্ছে।

তবে পরিস্থিতির আশানুরূপ উন্নতি হয়নি। লোডশেডিংয়ের ভোগান্তির কথা স্বীকার করে বাংলাদেশ মুদ্রণশিল্প সমিতির ভাইস প্রেসিডেন্ট আনোয়ার হোসনে বলেন, ‘মাতুয়াইলের ডগাইরের শাপলা চক্করে আমার প্রেস। প্রতিদিন অন্তত তিনবার কমপক্ষে ৩ ঘণ্টা লোডশেডিং হয়। ’ এ ছাড়া সমিতির বৈঠকেও সদস্য প্রেসগুলো লোডশেডিংয়ের ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন বলে তিনি জানান।

সামনের দিনগুলোয় বই ছাপার কাজের চাপ বাড়বে, তাই দ্রুত এ সমস্যার সমাধান না হলে বই উৎপাদন ও বিতরণে ঝুঁকি তৈরি হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। অন্যদিকে এনসিটিবির বই ছাপার জন্য কাগজ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান রশিদ পেপার মিল বিদ্যুৎ সংকটের কারণে দুই মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। কাগজ ছাপার জন্য কাঁচামাল পাল্প থাকলেও দুটি মেশিন চালানোর মতো ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ না পাওয়ায় মিল চালানো যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ইসমাইল হোসেন।

ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘উৎপাদন বন্ধ থাকায় বিরাট আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। ’ এ প্রসঙ্গে এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) প্রফেসর মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু বলেন, ‘লোডশেডিংয়ে একটু সমস্যা হচ্ছে ঠিকই, তবে তা সমাধানে আমরা সর্বোচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ করে বিষয়টি সেটেলড করার চেষ্টা করছি। ’ কয়েক দিনের মধ্যে এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

পিডিআই এজেন্টকে কারণ দর্শানো নোটিশ : এদিকে বই উৎপাদন থেকে শুরু করে সরবরাহ পর্যন্ত সব তদারকির জন্য তৃতীয়পক্ষ হিসেবে এনসিটিবির নিয়োগ করা ইন্সপেকশন এজেন্ট ইনডিপেনডেন্ট ইন্সপেকশন সার্ভিসেস বিডির বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব অনিয়মের মধ্যে রয়েছে— টাকার বিনিময়ে প্রেসগুলোর নিম্নমানের কাগজ অনুমোদন, কাগজ ও বইয়ের গুণগত মান পরীক্ষার প্রয়োজনীয় মেশিন ও কেমিস্ট না থাকা, এনসিটিবির সরেজমিন পরিদর্শনের সময় অন্য ল্যাবের মেশিন নিজের দেখানো ইত্যাদি।

এনসিটিবি সূত্র জানিয়েছে, এমন অভিযোগ ওঠায় এনসিটিবি ইন্সপেকশন এজেন্টের অনুমোদিত কাগজ বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) থেকে পুনঃপরীক্ষার উদ্যোগ নিচ্ছে। ইন্সপেকশন এজেন্টের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়টি স্বীকার করে এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) প্রফেসর মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটিকে শোকজ করা হচ্ছে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

Nagorik Sangram

Popular Post

ডাকসুর সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি ছেঁড়ার তীব্র নিন্দা জানালেন সম্পাদক জুমা

অনিয়ম রোধে কঠোর অবস্থানে এনসিটিবি

Update Time : 12:39:28 am, Tuesday, 15 September 2026

আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, ইবতেদায়ি ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) ৩১ কোটি বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ শুরু করেছে ১২৮টি প্রিন্টিং প্রেস।

গত মাসের মাঝামাঝি থেকে শুরু হওয়া বই ছাপার কাজে নানা অনিয়মের কারণে ইতোমধ্যে ৮টি প্রেসকে কারণ দর্শানো নোটিশ দিয়েছে এনসিটিবি। প্রেস থেকে নিম্নমানের কাগজ না সরানো ও ছাপার মান খারাপ হওয়ায় বাতিল করা হয়েছে প্রায় ২৭ হাজার বই। আর বাতিল করা হয়েছে ছাপা হওয়া প্রায় ৩ লাখ ফর্মা। এ ছাড়া নানা অভিযোগ ওঠায় মাধ্যমিক স্তরের বইয়ের মান যাচাইয়ে তৃতীয়পক্ষ হিসেবে এনসিটিবির নিয়োগ করা প্রি-ডেলিভারি ইন্সপেকশন (পিডিআই) এজেন্ট ইনডিপেনডেন্ট ইন্সপেকশন সার্ভিসসে বিডিকেও কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে এ সময় পর্যন্ত প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের মোট বইয়ের মধ্যে ছাপা ও বিতরণ হয়েছে ৩০ লাখ বই। আর ইবতেদায়িসহ মাধ্যমিক স্তরের মোট বইয়ের মধ্যে ছাপা হয়েছে প্রায় অর্ধকোটি। আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে বই ছাপা শেষ করে ডিসেম্বরের মাঝামঝি অথবা ১ জানুয়ারি সারা দেশে শিক্ষার্থীদের মাঝে বই বিতরণের পরিকল্পনা করেছে এনসিটিবি। তবে প্রতিদিন নিয়মিত বিরতিতে বিদ্যুতের লোডশেডিং এনসিটিবির এই লক্ষ্যপূরণে কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই সমস্যার সমাধানে এনসিটিবি নানা উদ্যোগ নিলেও নিরবচ্ছিন্নভাবে বই ছাপার কাজ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে প্রেসগুলোকে। এনসিটিবির পরিকল্পনা অনুযায়ী, বর্তমান শুরুর পরিস্থিতি ভালো হলেও নতুন শিক্ষাবর্ষের সময় যত এগিয়ে আসবে, ততই পাল্লা দিয়ে বাড়বে বই ছাপার কাজের চাপ। তাই লোডশেডিং সমস্যার দ্রুত সমাধান না হলে বই বিতরণে এনসিটিবির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

অন্যদিকে পিডিআই এজেন্টের কাজ কঠোরভাবে নজরদারি করা না হলে এনসিটিবির স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী বইয়ের গুণগত মান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েও শঙ্কা রয়েছে। এনসিটিবি, মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান ও বই ছাপার কাজে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপার বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে এসব তথ্য জানা গেছে। ৩১ কোটি বই বিতরণে এনসিটিবির লক্ষ্যমাত্রা : আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রাক-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত ৬১৭টি বিষয়ের প্রায় ৩০ কোটি ৭১ লাখ ৯৮ হাজার ১০১ কপি বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপা হবে।

প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের জন্য মোট ৮ কোটি ২১ লাখ ৬৭ হাজার ৭৩০ কপি, ইবতেদায়ির প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির জন্য ৩ কোটি ৩২ লাখ ৯৬ হাজার ৪০০ কপি এবং ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির জন্য মোট প্রায় ১৮ কোটি বই ছাপানো হবে। এর মধ্যে নবম শ্রেণির জন্য সবচেয়ে বেশি ৫ কোটি ৫৬ লাখ ২৭ হাজার ২৩৫ কপি বই রয়েছে। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য থাকবে ৯ হাজার ৪ কপি ব্রেইল বই।

গত ১৭ আগস্ট থেকে প্রাক-প্রাথমিকের বই ছাপা শুরু হয়। ৫২টি প্রেস প্রি-প্রাইমারি-প্রাইমারির বই ছাপার কাজ করছে। গত ১৯ আগস্ট থেকে ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রি-প্রাইমারির মোট ৫৭ লাখ বইয়ের মধ্যে ছাপা ও মাঠপর্যায়ে সরবরাহ হয়েছে ১২ লাখ। প্রাইমারির সাড়ে ৭ কোটির বেশি বইয়ের মধ্যে ছাপা ও সরবরাহ হয়েছে সাড়ে ১৮ লাখ। অন্যদিকে মাদ্রাসার ইবতেদায়িসহ মাধ্যমিক স্তরের ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির বই ছাপা হবে ৭৬টি প্রেসে।

এর মধ্যে বর্তমানে ৩৫টিতে কাজ চলছে। গত ৯ সেপ্টেম্বর মাধ্যমিক স্তরের মোট বইয়ের মধ্যে প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ বই ছাপা ও বাঁধাই হয়েছে। আর সাড়ে ৩০ লাখ বই ইতিমধ্যে ছাপা হয়ে গেছে। অন্যদিকে অষ্টম ও নবম শ্রেণির বই ছাপার জন্য প্রেসগুলোর সঙ্গে এনসিটিবির চুক্তির প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে। আগামী শিক্ষাবর্ষে এনসিটিবির বই বিতরণ পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৩০ নভেম্বরের মধ্যে বই ছাপার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে সরবরাহ শেষ করা হবে।

এরপর ডিসেম্বরের মাঝামাঝি অথবা ১ জানুয়ারি শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেওয়া হবে। এ প্রসঙ্গে এনসিটিবির চেয়ারম্যান প্রফেসর মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘৩০ নভেম্বরের মধ্যে বই ছাপা শেষ করে মাঠপর্যায়ে সরবরাহ করা হবে। এরপর ডিসেম্বরের মাঝামাঝি অথবা ১ জানুয়ারি শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেওয়া হবে। ডিসেম্বরের ১৫ তারিখের পর সাধারণত স্কুল বন্ধ থাকে।

তাই বিতরণের দিনক্ষণ নিয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অনিয়ম ঠেকাতে অ্যাকশনে এনসিটিবি : বই ছাপার কাজ শুরু হওয়ার পর বর্তমান সময় পর্যন্ত নানা ধরনের অনিয়মের কারণে ৭-৮টি প্রেসকে কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এমনকি একই প্রেসকে একাধিকবার নোটিশ দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। যদিও নোটিশ পাওয়া একাধিক প্রেস নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছে, ‘সাধারণ অজুহাতে’ এসব শোকজ দেওয়া হচ্ছে।

বড় কোনো বিষয় না হলেও অহেতুক এসব নোটিশে এনসিটিবি-প্রেসের সম্পর্কে আস্থার ঘাটতি তৈরি হবে; যা বই ছাপার পুরো প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে। নোটিশ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে— আনন্দ প্রিন্টার্স, লেটার অ্যান্ড কালার, সাগরিকা প্রিন্টার্স, লিখন আর্ট প্রেস, মেঘদূত প্রিন্টিং প্রেস ও ফেইমস প্রেস। মেঘদূত প্রিন্টিং প্রেসকে দেওয়া কারণ দর্শানো নোটিশ থেকে জানা গেছে, ওই প্রেসে নিউজপ্রিন্ট কাগজের রোল ছিল; যা এনসিটিবির মনিটরিং কর্মকর্তারা প্রেসকে ওই কাগজ সরানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন।

কিন্তু প্রেস ওই কাগজ না সরানোয় তিন দিন সময় দিয়ে এর ব্যাখা চেয়ে নোটিশ দেওয়া হয়। নোটিশের উত্তর সন্তোষজনক না হলে প্রেসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়। বইয়ের গুণগত মান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে যেকোনো পদক্ষেপ নিতে পিছপা হবে না এনসিটিবি, বলেন, এনসিটিবির চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ‘আমাদের একটাই লক্ষ্য, পরিকল্পনা অনুযায়ী যথাসময়ে শিক্ষার্থীদের হাতে শতভাগ মানসম্পন্ন বই তুলে দেওয়া।

’ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাঁটা ‘লোডশেডিং’: এনসিটিবির বই ছাপানোর বর্তমান পরিস্থিতি ভালো হলেও আগামী শিক্ষাবর্ষে পরিকল্পনা অনুযায়ী বই বিতরণে প্রধান কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্যুতের ‘লোডশেডিং’। রাজধানীর বাইরে সাভার, মানিকগঞ্জ, নোয়াখালী, বগুড়াসহ যেসব স্থানের প্রেসে বইয়ের ছাপার কাজ চলছে, নিয়মিত বিরতিতে প্রায় ৫ থেকে ৬ ঘণ্টার লোডশেডিংয়ে ভোগান্তি বেড়েছে।

রাজধানীর মাতুয়াইলের প্রেসগুলোও একই যন্ত্রণায় ভুগছে। ছোট ছাপাখানাগুলোর অনেকের জেনারেটর না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো জেনারেটর ব্যবহার করলেও এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ছাপাখানাগুলোয় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে গত ২৩ আগস্ট বিদ্যুৎ বিতরণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিঠি দিয়েছে এনসিটিবি।

চিঠিতে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বিনা মূল্যের পাঠ্যপুস্তক সরবরাহকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রাধিকারমূলক কার্যক্রম উল্লেখ করে মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। পাশপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য জোনভিত্তিক পল্লী বিদ্যুৎ ও ডিপিডিসির সংশ্লিষ্ট জোনে এনসিটিবির তরফ থেকে ব্যক্তিগত পর্যায়েও যোগাযোগ করা হচ্ছে।

তবে পরিস্থিতির আশানুরূপ উন্নতি হয়নি। লোডশেডিংয়ের ভোগান্তির কথা স্বীকার করে বাংলাদেশ মুদ্রণশিল্প সমিতির ভাইস প্রেসিডেন্ট আনোয়ার হোসনে বলেন, ‘মাতুয়াইলের ডগাইরের শাপলা চক্করে আমার প্রেস। প্রতিদিন অন্তত তিনবার কমপক্ষে ৩ ঘণ্টা লোডশেডিং হয়। ’ এ ছাড়া সমিতির বৈঠকেও সদস্য প্রেসগুলো লোডশেডিংয়ের ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন বলে তিনি জানান।

সামনের দিনগুলোয় বই ছাপার কাজের চাপ বাড়বে, তাই দ্রুত এ সমস্যার সমাধান না হলে বই উৎপাদন ও বিতরণে ঝুঁকি তৈরি হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। অন্যদিকে এনসিটিবির বই ছাপার জন্য কাগজ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান রশিদ পেপার মিল বিদ্যুৎ সংকটের কারণে দুই মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। কাগজ ছাপার জন্য কাঁচামাল পাল্প থাকলেও দুটি মেশিন চালানোর মতো ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ না পাওয়ায় মিল চালানো যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ইসমাইল হোসেন।

ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘উৎপাদন বন্ধ থাকায় বিরাট আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। ’ এ প্রসঙ্গে এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) প্রফেসর মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু বলেন, ‘লোডশেডিংয়ে একটু সমস্যা হচ্ছে ঠিকই, তবে তা সমাধানে আমরা সর্বোচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ করে বিষয়টি সেটেলড করার চেষ্টা করছি। ’ কয়েক দিনের মধ্যে এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

পিডিআই এজেন্টকে কারণ দর্শানো নোটিশ : এদিকে বই উৎপাদন থেকে শুরু করে সরবরাহ পর্যন্ত সব তদারকির জন্য তৃতীয়পক্ষ হিসেবে এনসিটিবির নিয়োগ করা ইন্সপেকশন এজেন্ট ইনডিপেনডেন্ট ইন্সপেকশন সার্ভিসেস বিডির বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব অনিয়মের মধ্যে রয়েছে— টাকার বিনিময়ে প্রেসগুলোর নিম্নমানের কাগজ অনুমোদন, কাগজ ও বইয়ের গুণগত মান পরীক্ষার প্রয়োজনীয় মেশিন ও কেমিস্ট না থাকা, এনসিটিবির সরেজমিন পরিদর্শনের সময় অন্য ল্যাবের মেশিন নিজের দেখানো ইত্যাদি।

এনসিটিবি সূত্র জানিয়েছে, এমন অভিযোগ ওঠায় এনসিটিবি ইন্সপেকশন এজেন্টের অনুমোদিত কাগজ বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) থেকে পুনঃপরীক্ষার উদ্যোগ নিচ্ছে। ইন্সপেকশন এজেন্টের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়টি স্বীকার করে এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) প্রফেসর মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটিকে শোকজ করা হচ্ছে।