1:44 am, Tuesday, 15 September 2026

ইরানে বিমান বিধ্বস্তের পর ভাঙা পিঠ ও কাঁধ নিয়ে ৫০ ঘণ্টা লুকিয়ে ছিলেন মার্কিন সেনা

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর ভাঙা পিঠ, হাত ও কাঁধের আঘাত নিয়ে শত্রুভূমিতে প্রায় ৫০ ঘণ্টা আত্মগোপনে ছিলেন এক মার্কিন সেনা কর্মকর্তা। পরবর্তীতে দুর্গম পাহাড়ি এলাকার প্রায় ৭ হাজার ফুট উঁচু একটি রিজলাইন অতিক্রম করার পর তাকে উদ্ধার করে মার্কিন বাহিনী।

নিজের এই বেঁচে ফেরার ঘটনাকে আধুনিক সময়ের এক ‘অলৌকিক ঘটনা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন ওই কর্মকর্তা। সম্প্রতি মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজের ‘৬০ মিনিটস’ অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন তিনি। নিরাপত্তাজনিত কারণে তার প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। সাক্ষাৎকারে তাকে ‘ডুড ৪৪ ব্রাভো’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঘটনাটি ঘটে গত ২ এপ্রিল। ইরানের ছোড়া কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে একটি মার্কিন এফ-১৫ই যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়। যুদ্ধবিমানটিতে থাকা দুই কর্মকর্তা নিরাপদে বের হয়ে ইরানের ভূখণ্ডে অবতরণ করেন। পাইলটকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উদ্ধার করা সম্ভব হলেও অস্ত্র ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ব্রাভো প্রায় দুই দিন ইরানি বাহিনীর নজর এড়িয়ে পাহাড়ি এলাকায় অবস্থান করেন।

ব্রাভোর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই রাতে তাদের লক্ষ্য ছিল ইসফাহানের দক্ষিণে একটি পার্বত্য এলাকার কাছে কয়েকটি শিল্প স্থাপনা। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের দাবি, ওই এলাকার কাছাকাছি ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ পারমাণবিক উপাদান মজুত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়। ব্রাভো বলেন, হামলার আগ পর্যন্ত দিনটি ছিল যুদ্ধের অন্য যেকোনো দিনের মতোই স্বাভাবিক।

প্রায় ৩ কোটি ডলার মূল্যের দুই আসনের এফ-১৫ই যুদ্ধবিমানটি হঠাৎ কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতকে তিনি একটি মালবাহী ট্রেনের ধাক্কার সঙ্গে তুলনা করেন। পাইলট ‘আলফা’ যুদ্ধবিমানটি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করলেও দ্রুত বুঝতে পারেন, সেটি আর বাঁচানো সম্ভব নয়। এরপর দুজনই বিমান থেকে বের হয়ে যান।

আলফা নিরাপদে অবতরণ করে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে উদ্ধার হন। কিন্তু ব্রাভোর প্যারাসুট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তিনি পাইলটের অবস্থান থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে গিয়ে আছড়ে পড়েন। সেই মুহূর্তের কথা স্মরণ করে ব্রাভো বলেন, আকাশের দিকে তাকিয়ে প্যারাসুট দেখতে না পাওয়াই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর মুহূর্তগুলোর একটি। প্রচণ্ড গতিতে মাটিতে আঘাতের ফলে তার পিঠ, একটি হাত ও একটি কাঁধ ভেঙে যায়।

পরদিন সকালে তিনি বুঝতে পারেন, শত্রুভূমির একটি দুর্গম এলাকায় পড়ে আছেন। চারপাশ পর্যবেক্ষণ করে দেখতে পান, তিনি এমন একটি উপত্যকায় অবস্থান করছেন যার দুই পাশে খাড়া পাহাড়। সেখান থেকে বের হওয়ার জন্য পাহাড়ের ওপরের দিকে ওঠার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। গুরুতর আহত অবস্থায় ধীরে ধীরে পাহাড় বেয়ে প্রায় ৭ হাজার ফুট উঁচু একটি রিজলাইনে উঠে যান।

ব্রাভোর ভাষ্য, শরীরে গুরুতর আঘাত থাকলেও সামরিক প্রশিক্ষণ তাকে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে এবং বাধা অতিক্রম করতে সাহায্য করেছে। ইরানি বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার আশঙ্কার মধ্যেও তিনি দ্রুত ওই এলাকা থেকে দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে তখন মধ্যরাত। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার খবর জানানো হয়।

এরপর দুই কর্মকর্তাকে জীবিত অথবা মৃত—যেকোনো অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য ব্যাপক উদ্ধার অভিযান শুরু করে মার্কিন সামরিক বাহিনী। অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের তথ্য অনুযায়ী, শত শত সেনাকে আকাশপথের অভিযানে এবং আরও কয়েক হাজার সদস্যকে সহায়তামূলক কার্যক্রমে যুক্ত করা হয়। ইরানে ৯০ জনের বেশি মার্কিন সেনাকে স্থলভিত্তিক অভিযানে মোতায়েন করা হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।

কুপারের ভাষ্য অনুযায়ী, ৪৬ বছরের মধ্যে ইরানের মাটিতে মার্কিন স্থলসেনা মোতায়েনের এটিই ছিল প্রথম ঘটনা। অন্যদিকে আলফাকে ছয় ঘণ্টার মধ্যেই শনাক্ত করে উদ্ধার করা গেলেও ব্রাভোর অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছিল না। ফলে প্রায় এক দিন তাকে একাই পাহাড়ে কাটাতে হয়। তার কাছে খাবার ও পানিও ছিল খুবই সীমিত। একপর্যায়ে ব্রাভো যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নিজের অবস্থান সম্পর্কে একটি বার্তা পাঠাতে সক্ষম হন।

এরপর তার আশপাশে অবস্থান করা ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সদস্যদের লক্ষ্য করে বিমান ও ড্রোন হামলা চালানো হয় বলে মার্কিন কর্মকর্তারা জানান। পরে চূড়ান্ত উদ্ধারকারী দল দুর্গম এলাকায় পৌঁছে ব্রাভোকে উদ্ধার করে। উদ্ধার অভিযানে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বলে কর্মকর্তাদের বরাতে জানিয়েছে সিবিএস।

ইরানি বাহিনীকে বিভ্রান্ত করতে একটি প্রতারণামূলক অভিযান এবং ব্রাভোর অবস্থান শনাক্তে গোপন প্রযুক্তি ব্যবহারের দাবিও করা হয়েছে। প্রায় ৫০ ঘণ্টা ধরে বিমান ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে তল্লাশি চালানোর পর শেষ পর্যন্ত ব্রাভোর অবস্থান শনাক্ত করা হয়। পরে তাকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারের মুহূর্তকে নিজের জীবনের সবচেয়ে আনন্দের সময়গুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করেছেন ওই মার্কিন সেনা কর্মকর্তা।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

Nagorik Sangram

Popular Post

ডাকসুর সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি ছেঁড়ার তীব্র নিন্দা জানালেন সম্পাদক জুমা

ইরানে বিমান বিধ্বস্তের পর ভাঙা পিঠ ও কাঁধ নিয়ে ৫০ ঘণ্টা লুকিয়ে ছিলেন মার্কিন সেনা

Update Time : 12:44:39 am, Tuesday, 15 September 2026

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর ভাঙা পিঠ, হাত ও কাঁধের আঘাত নিয়ে শত্রুভূমিতে প্রায় ৫০ ঘণ্টা আত্মগোপনে ছিলেন এক মার্কিন সেনা কর্মকর্তা। পরবর্তীতে দুর্গম পাহাড়ি এলাকার প্রায় ৭ হাজার ফুট উঁচু একটি রিজলাইন অতিক্রম করার পর তাকে উদ্ধার করে মার্কিন বাহিনী।

নিজের এই বেঁচে ফেরার ঘটনাকে আধুনিক সময়ের এক ‘অলৌকিক ঘটনা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন ওই কর্মকর্তা। সম্প্রতি মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজের ‘৬০ মিনিটস’ অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন তিনি। নিরাপত্তাজনিত কারণে তার প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। সাক্ষাৎকারে তাকে ‘ডুড ৪৪ ব্রাভো’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঘটনাটি ঘটে গত ২ এপ্রিল। ইরানের ছোড়া কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে একটি মার্কিন এফ-১৫ই যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়। যুদ্ধবিমানটিতে থাকা দুই কর্মকর্তা নিরাপদে বের হয়ে ইরানের ভূখণ্ডে অবতরণ করেন। পাইলটকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উদ্ধার করা সম্ভব হলেও অস্ত্র ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ব্রাভো প্রায় দুই দিন ইরানি বাহিনীর নজর এড়িয়ে পাহাড়ি এলাকায় অবস্থান করেন।

ব্রাভোর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই রাতে তাদের লক্ষ্য ছিল ইসফাহানের দক্ষিণে একটি পার্বত্য এলাকার কাছে কয়েকটি শিল্প স্থাপনা। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের দাবি, ওই এলাকার কাছাকাছি ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ পারমাণবিক উপাদান মজুত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়। ব্রাভো বলেন, হামলার আগ পর্যন্ত দিনটি ছিল যুদ্ধের অন্য যেকোনো দিনের মতোই স্বাভাবিক।

প্রায় ৩ কোটি ডলার মূল্যের দুই আসনের এফ-১৫ই যুদ্ধবিমানটি হঠাৎ কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতকে তিনি একটি মালবাহী ট্রেনের ধাক্কার সঙ্গে তুলনা করেন। পাইলট ‘আলফা’ যুদ্ধবিমানটি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করলেও দ্রুত বুঝতে পারেন, সেটি আর বাঁচানো সম্ভব নয়। এরপর দুজনই বিমান থেকে বের হয়ে যান।

আলফা নিরাপদে অবতরণ করে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে উদ্ধার হন। কিন্তু ব্রাভোর প্যারাসুট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তিনি পাইলটের অবস্থান থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে গিয়ে আছড়ে পড়েন। সেই মুহূর্তের কথা স্মরণ করে ব্রাভো বলেন, আকাশের দিকে তাকিয়ে প্যারাসুট দেখতে না পাওয়াই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর মুহূর্তগুলোর একটি। প্রচণ্ড গতিতে মাটিতে আঘাতের ফলে তার পিঠ, একটি হাত ও একটি কাঁধ ভেঙে যায়।

পরদিন সকালে তিনি বুঝতে পারেন, শত্রুভূমির একটি দুর্গম এলাকায় পড়ে আছেন। চারপাশ পর্যবেক্ষণ করে দেখতে পান, তিনি এমন একটি উপত্যকায় অবস্থান করছেন যার দুই পাশে খাড়া পাহাড়। সেখান থেকে বের হওয়ার জন্য পাহাড়ের ওপরের দিকে ওঠার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। গুরুতর আহত অবস্থায় ধীরে ধীরে পাহাড় বেয়ে প্রায় ৭ হাজার ফুট উঁচু একটি রিজলাইনে উঠে যান।

ব্রাভোর ভাষ্য, শরীরে গুরুতর আঘাত থাকলেও সামরিক প্রশিক্ষণ তাকে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে এবং বাধা অতিক্রম করতে সাহায্য করেছে। ইরানি বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার আশঙ্কার মধ্যেও তিনি দ্রুত ওই এলাকা থেকে দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে তখন মধ্যরাত। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার খবর জানানো হয়।

এরপর দুই কর্মকর্তাকে জীবিত অথবা মৃত—যেকোনো অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য ব্যাপক উদ্ধার অভিযান শুরু করে মার্কিন সামরিক বাহিনী। অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের তথ্য অনুযায়ী, শত শত সেনাকে আকাশপথের অভিযানে এবং আরও কয়েক হাজার সদস্যকে সহায়তামূলক কার্যক্রমে যুক্ত করা হয়। ইরানে ৯০ জনের বেশি মার্কিন সেনাকে স্থলভিত্তিক অভিযানে মোতায়েন করা হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।

কুপারের ভাষ্য অনুযায়ী, ৪৬ বছরের মধ্যে ইরানের মাটিতে মার্কিন স্থলসেনা মোতায়েনের এটিই ছিল প্রথম ঘটনা। অন্যদিকে আলফাকে ছয় ঘণ্টার মধ্যেই শনাক্ত করে উদ্ধার করা গেলেও ব্রাভোর অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছিল না। ফলে প্রায় এক দিন তাকে একাই পাহাড়ে কাটাতে হয়। তার কাছে খাবার ও পানিও ছিল খুবই সীমিত। একপর্যায়ে ব্রাভো যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নিজের অবস্থান সম্পর্কে একটি বার্তা পাঠাতে সক্ষম হন।

এরপর তার আশপাশে অবস্থান করা ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সদস্যদের লক্ষ্য করে বিমান ও ড্রোন হামলা চালানো হয় বলে মার্কিন কর্মকর্তারা জানান। পরে চূড়ান্ত উদ্ধারকারী দল দুর্গম এলাকায় পৌঁছে ব্রাভোকে উদ্ধার করে। উদ্ধার অভিযানে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বলে কর্মকর্তাদের বরাতে জানিয়েছে সিবিএস।

ইরানি বাহিনীকে বিভ্রান্ত করতে একটি প্রতারণামূলক অভিযান এবং ব্রাভোর অবস্থান শনাক্তে গোপন প্রযুক্তি ব্যবহারের দাবিও করা হয়েছে। প্রায় ৫০ ঘণ্টা ধরে বিমান ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে তল্লাশি চালানোর পর শেষ পর্যন্ত ব্রাভোর অবস্থান শনাক্ত করা হয়। পরে তাকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারের মুহূর্তকে নিজের জীবনের সবচেয়ে আনন্দের সময়গুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করেছেন ওই মার্কিন সেনা কর্মকর্তা।