1:44 am, Tuesday, 15 September 2026

৭০ বছরের দাম্পত্য জীবনের শেষপ্রান্তে ভালোবাসার অনন্য দৃষ্টান্ত

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

৭০ বছরের দাম্পত্য জীবনের শেষপ্রান্তে এসে ভালোবাসার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন শেরপুর সদর উপজেলার খুনুয়া চরপাড়া গ্রামের বৃদ্ধ সাজু শেখ ও নূরজাহান দম্পতি। প্রায় ৮৫ বছর বয়সী সাজু শেখ নিজে বার্ধক্যে ন্যুব্জ হলেও গত সাত বছর ধরে অসুস্থ স্ত্রী নূরজাহানের সেবাযত্ন করে যাচ্ছেন। দরিদ্রতা ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তাদের ভালোবাসা ও পারস্পরিক নির্ভরতা মুগ্ধ করেছে স্থানীয়দের।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় ৭০ বছর আগে সাজু শেখ ও নূরজাহানের বিয়ে হয়। বিয়ের পর রিকশা চালানো এবং কখনো কাঁচামালের ব্যবসা করে সংসার চালাতেন সাজু শেখ। সীমিত আয় হলেও দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসার কোনো কমতি ছিল না। তাদের সংসারে তিন ছেলে ও তিন মেয়ের জন্ম হয়।

তিন মেয়েরই অনেক আগেই দরিদ্র ও শ্রমজীবী পরিবারে বিয়ে হয়েছে। তিন ছেলেও বিয়ে করে কেউ রিকশা, কেউ ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। নিজেদের সংসার চালাতেই তাদের হিমশিম খেতে হয়। ফলে বৃদ্ধ মা-বাবার ভরণপোষণ করাও তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

বৃদ্ধ বয়সে সাজু শেখের আয়-রোজগারও বন্ধ হয়ে গেছে। এরই মধ্যে প্রায় সাত বছর আগে স্ত্রী নূরজাহান দরজা থেকে পড়ে গিয়ে মেরুদণ্ড ও কোমরে গুরুতর আঘাত পান। অর্থাভাবে যথাযথ চিকিৎসা করাতে না পারায় এখন তিনি হাঁটতে বা বসতে পারেন না। সেই থেকে স্ত্রীকে নিজের হাতেই সেবা-শুশ্রূষা করছেন সাজু শেখ। নিজে বার্ধক্যে আক্রান্ত হলেও স্ত্রীর সেবা করতে তার যেন কোনো ক্লান্তি নেই।

সাজু শেখের ছোট ছেলে দীন ইসলামের স্ত্রী লেবুজা বেগম সাত মাস আগে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এতে দীন ইসলামও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। বড় ছেলেও শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ। আরেক ছেলে ঢাকায় থাকেন এবং রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। নিজেদের সংসার চালাতেই হিমশিম খাওয়ায় মা-বাবার দেখাশোনা করা তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।

সাজু শেখের পুত্রবধূ মনিজা বেগম বলেন, ‘তিন সন্তান নিয়ে খুব কষ্টে আছি। আমার স্বামীও পুরোপুরি সুস্থ নন। রিকশা চালিয়ে যে টাকা আয় করেন, তা দিয়ে আমাদের সংসারই চলে না। শ্বশুর-শাশুড়িকে কীভাবে দেখব? মানুষের সাহায্য ছাড়া আমাদের কোনো গতি নেই।’

স্থানীয় বাসিন্দা আকবর আলী বলেন, ‘সাজু শেখ খুব কষ্ট করে তার স্ত্রীর সেবা করছেন। বয়স্ক ভাতা হিসেবে যে সামান্য টাকা পান, তা দিয়ে সংসার চালানো সম্ভব নয়।’

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা অপু মিয়া বলেন, ‘এটি একটি অনন্য ঘটনা। সাধারণত স্ত্রীকে স্বামীর সেবা করতে দেখা যায়। এখানে উল্টো স্বামীই অসুস্থ স্ত্রীকে সেবা করছেন। তবে তারা খুব কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন।’

স্থানীয় বাসিন্দা হাফিজুর ইসলাম বলেন, ‘আমরা এই অসহায় পরিবারের জন্য সবার সহযোগিতা চাই।’

বিষয়টি জানতে পেরে শেরপুর সদর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আলহাজ মো. হযরত আলী ওই বাড়িতে গিয়ে পরিবারটির সঙ্গে দেখা করেন এবং আর্থিক সহযোগিতা করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা পরিবারটির পাশে থাকব।’

এদিকে খবর পেয়ে ওই বাড়িতে যান শেরপুরের জেলা প্রশাসক মিজ ফরিদা ইয়াসমিন। তিনি পরিবারটির খোঁজখবর নেন এবং প্রাথমিকভাবে কিছু খাদ্যসামগ্রী প্রদান করেন। এ সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসমা বিনতে রফিক উপস্থিত ছিলেন।

সমাজসেবা বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, সাজু শেখকে বয়স্ক ভাতা দেওয়া হচ্ছে। তবে অসুস্থ নূরজাহানের চিকিৎসা, খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় বহন করা এই বৃদ্ধ দম্পতির জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। অসহায় এই দম্পতির চিকিৎসা ও জীবনযাপনে সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

Nagorik Sangram

Popular Post

ডাকসুর সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি ছেঁড়ার তীব্র নিন্দা জানালেন সম্পাদক জুমা

৭০ বছরের দাম্পত্য জীবনের শেষপ্রান্তে ভালোবাসার অনন্য দৃষ্টান্ত

Update Time : 12:59:33 am, Tuesday, 15 September 2026

৭০ বছরের দাম্পত্য জীবনের শেষপ্রান্তে এসে ভালোবাসার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন শেরপুর সদর উপজেলার খুনুয়া চরপাড়া গ্রামের বৃদ্ধ সাজু শেখ ও নূরজাহান দম্পতি। প্রায় ৮৫ বছর বয়সী সাজু শেখ নিজে বার্ধক্যে ন্যুব্জ হলেও গত সাত বছর ধরে অসুস্থ স্ত্রী নূরজাহানের সেবাযত্ন করে যাচ্ছেন। দরিদ্রতা ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তাদের ভালোবাসা ও পারস্পরিক নির্ভরতা মুগ্ধ করেছে স্থানীয়দের।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় ৭০ বছর আগে সাজু শেখ ও নূরজাহানের বিয়ে হয়। বিয়ের পর রিকশা চালানো এবং কখনো কাঁচামালের ব্যবসা করে সংসার চালাতেন সাজু শেখ। সীমিত আয় হলেও দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসার কোনো কমতি ছিল না। তাদের সংসারে তিন ছেলে ও তিন মেয়ের জন্ম হয়।

তিন মেয়েরই অনেক আগেই দরিদ্র ও শ্রমজীবী পরিবারে বিয়ে হয়েছে। তিন ছেলেও বিয়ে করে কেউ রিকশা, কেউ ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। নিজেদের সংসার চালাতেই তাদের হিমশিম খেতে হয়। ফলে বৃদ্ধ মা-বাবার ভরণপোষণ করাও তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

বৃদ্ধ বয়সে সাজু শেখের আয়-রোজগারও বন্ধ হয়ে গেছে। এরই মধ্যে প্রায় সাত বছর আগে স্ত্রী নূরজাহান দরজা থেকে পড়ে গিয়ে মেরুদণ্ড ও কোমরে গুরুতর আঘাত পান। অর্থাভাবে যথাযথ চিকিৎসা করাতে না পারায় এখন তিনি হাঁটতে বা বসতে পারেন না। সেই থেকে স্ত্রীকে নিজের হাতেই সেবা-শুশ্রূষা করছেন সাজু শেখ। নিজে বার্ধক্যে আক্রান্ত হলেও স্ত্রীর সেবা করতে তার যেন কোনো ক্লান্তি নেই।

সাজু শেখের ছোট ছেলে দীন ইসলামের স্ত্রী লেবুজা বেগম সাত মাস আগে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এতে দীন ইসলামও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। বড় ছেলেও শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ। আরেক ছেলে ঢাকায় থাকেন এবং রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। নিজেদের সংসার চালাতেই হিমশিম খাওয়ায় মা-বাবার দেখাশোনা করা তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।

সাজু শেখের পুত্রবধূ মনিজা বেগম বলেন, ‘তিন সন্তান নিয়ে খুব কষ্টে আছি। আমার স্বামীও পুরোপুরি সুস্থ নন। রিকশা চালিয়ে যে টাকা আয় করেন, তা দিয়ে আমাদের সংসারই চলে না। শ্বশুর-শাশুড়িকে কীভাবে দেখব? মানুষের সাহায্য ছাড়া আমাদের কোনো গতি নেই।’

স্থানীয় বাসিন্দা আকবর আলী বলেন, ‘সাজু শেখ খুব কষ্ট করে তার স্ত্রীর সেবা করছেন। বয়স্ক ভাতা হিসেবে যে সামান্য টাকা পান, তা দিয়ে সংসার চালানো সম্ভব নয়।’

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা অপু মিয়া বলেন, ‘এটি একটি অনন্য ঘটনা। সাধারণত স্ত্রীকে স্বামীর সেবা করতে দেখা যায়। এখানে উল্টো স্বামীই অসুস্থ স্ত্রীকে সেবা করছেন। তবে তারা খুব কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন।’

স্থানীয় বাসিন্দা হাফিজুর ইসলাম বলেন, ‘আমরা এই অসহায় পরিবারের জন্য সবার সহযোগিতা চাই।’

বিষয়টি জানতে পেরে শেরপুর সদর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আলহাজ মো. হযরত আলী ওই বাড়িতে গিয়ে পরিবারটির সঙ্গে দেখা করেন এবং আর্থিক সহযোগিতা করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা পরিবারটির পাশে থাকব।’

এদিকে খবর পেয়ে ওই বাড়িতে যান শেরপুরের জেলা প্রশাসক মিজ ফরিদা ইয়াসমিন। তিনি পরিবারটির খোঁজখবর নেন এবং প্রাথমিকভাবে কিছু খাদ্যসামগ্রী প্রদান করেন। এ সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসমা বিনতে রফিক উপস্থিত ছিলেন।

সমাজসেবা বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, সাজু শেখকে বয়স্ক ভাতা দেওয়া হচ্ছে। তবে অসুস্থ নূরজাহানের চিকিৎসা, খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় বহন করা এই বৃদ্ধ দম্পতির জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। অসহায় এই দম্পতির চিকিৎসা ও জীবনযাপনে সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন।