10:26 pm, Tuesday, 28 July 2026

বাংলাদেশে ইয়াবা আসক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ভয়ঙ্কর তথ্য

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

বাংলাদেশে ইয়াবা আসক্তি মহামারি আকার ধারণ করেছে। লাখ লাখ মানুষ এ নেশায় আসক্ত এবং এ সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। মেথামফেটামিন ও ক্যাফেইনের মিশ্রণে তৈরি এ মাদক কিভাবে বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষের জীবন ধ্বংস করে দিচ্ছে- তা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দ্য আইরিশ টাইমস।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘মেটালফ্রিক’ প্রতিদিন তার পোষা পাখির সঙ্গে সময় কাটাতেন—তাকে আদর করতেন, খাঁচা পরিষ্কার করতেন এবং উড়ে বেড়ানোর জন্য ছেড়ে দিতেন। ঢাকার নিজের অগোছালো শোবার ঘরে শুয়ে তিনি বলেন, ‘এখন আমি এসব আর করতে পারি না। কে-ই বা পাত্তা দেয়?’

চল্লিশোর্ধ্ব এই ব্যক্তি নিজের ছদ্মনামটিই ব্যবহার করতে চেয়েছেন। তিনি ইয়াবায় মারাত্মকভাবে আসক্ত হয়ে পড়েছেন। এ মাদক বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষের জীবন ধ্বংস করে দিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘এ জিনিসটা আমার মাথা পুরোপুরি নষ্ট করে দিয়েছে’।

থাই ভাষায় ইয়াবা শব্দের অর্থ ‘পাগলা ওষুধ’। ধারণা করা হয়, বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষ এটি সেবন করছেন এবং এ সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।

ইয়াবা সেবনের জন্য মেটালফ্রিক একটি টিনফয়েলের ওপর বড়িটি রাখেন এবং নিচ থেকে তাপ দিয়ে এর ধোঁয়া টানেন। তিনি জানান, কমলা রঙের প্রতিটি বড়ির প্রভাব চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা থাকে। তিনি টানা তিন দিন জেগে থাকেন, এরপর ক্লান্ত হয়ে একবারে ১২ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় ধরে ঘুমান।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, গত জুনে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, ‘দেশের প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি জনসংখ্যার প্রায় ৫ শতাংশ মাদকাসক্ত’। তিনি আরও বলেন, ‘নতুন সিন্থেটিক ও সেমি-সিন্থেটিক মাদকের আবির্ভাব এ সমস্যাটিকে আরও তীব্র করে তুলছে। ’চলতি মাসে বাংলাদেশের সংসদে মাদকসংক্রান্ত কয়েকটি অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে একটি বিল পাস করা হয়েছে।

বাংলাদেশে ইয়াবাকে ‘ক’ শ্রেণির নিষিদ্ধ মাদক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০১৮ সালে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে কর্তৃপক্ষ মাদকের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছিল। ফিলিপাইনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের নির্মম ‘মাদকবিরোধী যুদ্ধের’ মতো সেই অভিযানে কয়েক মাসের মধ্যেই ২০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হন।

এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানায়, ২০১৮ সালে ৪৬৬ জন নিহত হয়েছিলেন। সংস্থাটির মতে, মাদকবিরোধী অভিযান হিসেবে যা তুলে ধরা হয়েছিল, তা ‘দেশের কয়েকটি দরিদ্রতম এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। সেখানকার মানুষের মনে এ ভয় ঢুকে যায় যে, মাদক সেবনের সামান্যতম সন্দেহ থেকেই হয়তো তাদের প্রিয়জনদের আরেকটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হবে।’ এছাড়া সে সময় আরও কয়েক হাজার মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।

তবে স্থানীয় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এত কিছুর পরও মাদকের ব্যবহার বেড়েই চলেছে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের রেজিস্ট্রার ডা. মো. আরিফুজ্জামান বলেন, ‘আমরা যদি মাদকের ব্যবহার কমাতে চাই, তবে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি করতে হবে।’ তিনি ঢাকার নিরাময় রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারেও (পুনর্বাসন কেন্দ্র) কাজ করেন। এ সেন্টারের অভ্যর্থনা কক্ষের পেছনের দেয়ালে লেখা রয়েছে- ‘যেখানে আরোগ্য শুরু, সেখানেই জীবন অপেক্ষমাণ।’

তিনি জানান, পুরো দেশে প্রায় ৩৫০ জন সাইকিয়াট্রিস্ট বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞদের এক ঘণ্টায় হয়তো ২০ জন রোগী দেখতে হয়, ‘তবে আমাদের আর কোনো বিকল্প নেই।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে যোগ্যতাসম্পন্ন সাইকোলজিস্টের (মনোবিজ্ঞানী) ক্ষেত্রেও একই রকম অভাব রয়েছে।’ তিনি চান, সরকার যেন মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত করে।

২০১৮-২০১৯ সালে পরিচালিত বাংলাদেশের সর্বশেষ জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপে দেখা গেছে, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন এমন প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষই চিকিৎসার শরণাপন্ন হন না। ডা. আরিফুজ্জামান বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বা স্টিগমা পুরো বিশ্বেই রয়েছে, আমাদের দেশেও আছে। তবে গত কয়েক বছরে সচেতনতা অভাবনীয় মাত্রায় বেড়েছে।

তিনি জানান, ইয়াবায় আসক্তি এখন খুবই সাধারণ ঘটনা; যদিও অনেক ব্যবহারকারী অন্যান্য মাদকও গ্রহণ করেন, যার মধ্যে বুপ্রেনরফিন ইনজেকশন, হেরোইন এবং ওমোরফোন ট্যাবলেট থাকতে পারে। প্রায় প্রতিটি মাদকেরই ব্যবহার বাড়ছে, তবে ইয়াবার ব্যবহার বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে।

তিনি আরও বলেন, কিছু ব্যবহারকারী তাদের ‘স্বাভাবিক কার্যক্রম’ চালিয়ে যেতে পারলেও, অন্যদের ‘মস্তিষ্কে দুর্বলতা’ থাকে—যার মানে তারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। কিছু বাহ্যিক ঘটনা, যেমন—বন্যা, অগ্নিকাণ্ড এবং কোভিড-১৯ মহামারির মতো সংকটও আসক্তির এ পরিস্থিতিকে উসকে দিতে পারে।

ডা. আরিফুজ্জামানের মতে, কিছু ব্যবহারকারী মাদক ব্যবসায়ী হয়ে যান, কারণ তাদের এ নেশার খরচ জোগানোর অন্য কোনো উপায় থাকে না। আবার অনেক ব্যবহারকারী মূলত বিষণ্নতা, উদ্বেগ বা সাইকোসিসের মতো মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন এবং এসব থেকে মুক্তি পেতেই তারা মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়েন।

কোন মাদকগুলো সাধারণত বেশি গ্রহণ করা হয়, তার পেছনে সেগুলোর সহজলভ্যতার সুস্পষ্ট ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন ডা. আরিফুজ্জামান। ইউএন অফিস অন ড্রাগস অ্যান্ড ক্রাইমের তথ্যমতে, নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে এটি ‘যুব সংস্কৃতির’ অংশে পরিণত হওয়ার আগে, ঐতিহ্যগতভাবে এশিয়ার কিছু অংশে ট্রাকচালকদের মতো পেশাজীবী শ্রমিকরা ইয়াবা ব্যবহার করতেন। সংস্থাটি আরও জানায়, ২০০৭ সালে বাংলাদেশে ১২ লাখ ইয়াবা বড়ি জব্দ করা হয়েছিল।

থাইল্যান্ড, মিয়ানমার এবং লাওস যেখানে মিলিত হয়েছে, সেই ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল’ (সোনালি ত্রিভুজ) এলাকাটিকে সিন্থেটিক মাদক উৎপাদনের জন্য বিশ্বের অন্যতম সক্রিয় অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইউএন অফিস অন ড্রাগস অ্যান্ড ক্রাইম জানিয়েছে, ২০২৪ সালে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রেকর্ড ২৩৬ টন মেথামফেটামিন (সাধারণত মেথ নামে পরিচিত) জব্দ করা হয়, যা ২০২৩ সালের তুলনায় ২৪ শতাংশ বেশি। তবে সম্ভবত এর চেয়েও অনেক বেশি পরিমাণ মাদক বিক্রি হচ্ছে। ধারণা করা হয়, বাংলাদেশে আসা ইয়াবার প্রধান উৎপাদক মিয়ানমার।

মেটালফ্রিক বলেন, ‘সবারই একই করুণ গল্প রয়েছে।’ তিনি জানান, ইয়াবায় আসক্ত বাংলাদেশিরা সাধারণত প্রথমে সিগারেট দিয়ে শুরু করেন, এরপর গাঁজা, তারপর কাশির সিরাপ। যুবক বয়সে তিনি গাঁজার মতো ‘ডাউনার্স’ (downers) মাদকের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। প্রথমবার যখন তিনি ইয়াবা গ্রহণ করেন, তখন ভেবেছিলেন এটা ‘আড্ডা দেওয়া ও চিল’ করার জন্য ভালো হবে; কিন্তু এটি ‘আমার মাথার তার ছিঁড়ে দেয়… এ জিনিস মানুষকে পশু বানিয়ে দেয়।’

ইয়াবা আগে বেশ দামি ছিল। এখন এ মাদকের দুটি ধরন পাওয়া যায়- সস্তা ও দামি। তিনি বলেন, সস্তা সংস্করণটি মুখ ও দাঁতের ‘বারোটা বাজিয়ে দেয়’, আর (একজন ব্যবহারকারীর) চোখের দিকে তাকালেই বোঝা যায় যে তারা উন্মাদ।’ মেটালফ্রিক জানান, এ বড়ির কারণে তিনি বন্ধুদের হারিয়েছেন—নিয়মিত এটি সেবন করলে স্ট্রোক হতে পারে। অনেকের দাঁত পড়ে যায় বা ‘খিঁচুনি’ শুরু হয়।

মেটালফ্রিক বলেন, গত কয়েক বছরে আফিম বা হেরোইন পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে। ইয়াবা অন্য সব মাদককে পুরোপুরি হটিয়ে দিয়েছে। ঢাকায় রাস্তায় তরুণদের এ বড়ির প্যাকেট বিক্রি করতে দেখা খুব সাধারণ দৃশ্য। মোহাম্মদপুর এলাকায় অল্প বয়সী ছেলেরা বড়ির ছোট প্যাকেট উঁচিয়ে ধরে থাকে, আর রিকশাচালকেরা হাত বাড়িয়ে তা কিনে নেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ তীব্র রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে গেছে। ২০২৪ সালের যে বিক্ষোভের ফলে শেখ হাসিনার পতন ঘটে, তাতে প্রায় ১৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। এরপর ২০২৬ সালের নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বিজয়ী হয়। বিশ্বব্যাংকের মতে নিম্ন-মধ্যম আয়ের এ দক্ষিণ এশিয়ার দেশটি বিভিন্ন বৈশ্বিক সূচকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবেও মূল্যায়িত হয়েছে। অনেক তরুণই এখন তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন।

এসব অস্থিরতার ব্যক্তিগত প্রভাবও রয়েছে। মেটালফ্রিক জানান, সম্প্রতি মারা যাওয়া তার বাবাকে এক সময় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সম্মান করা হতো, কিন্তু ইদানিং তার বন্ধুরাই তাকে ‘ভুয়া’ বলে আখ্যায়িত করে। মেটালফ্রিকের একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ছিল, কিন্তু বাংলাদেশে যে ধরনের অগ্নিকাণ্ড আশ্চর্যজনকভাবে নৈমিত্তিক ঘটনা—সেরকম এক আগুনে তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানটি পুড়ে যায়। তিনি মনে করেন, এটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে করা হয়েছিল, যদিও অন্যরা বলেন, এটি হয়তো বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট বা অন্য কোনো দুর্ঘটনা হতে পারে।

এখন তিনি বাইরের জগতের সঙ্গে যুক্ত হন কেবল ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে, যেখানে তিনি গাজার অসংখ্য ভিডিও দেখেন। তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে বাদামি বর্ণের মানুষ এবং বিশেষ করে মুসলমানদের মূল্যহীন হিসেবে দেখা হয়। পশ্চিমা গণমাধ্যম এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিও তিনি তীব্র হতাশা ব্যক্ত করেন।

মেটালফ্রিক বলেন, ইয়াবা মানুষকে ‘মিথ্যা আত্মবিশ্বাস’ দেয়, যার কারণে অনেকে ‘অদ্ভুত সব ষড়যন্ত্র তত্ত্বে’ বিশ্বাস করতে শুরু করে। তার কথাবার্তা এক প্রসঙ্গ থেকে আরেক প্রসঙ্গে লাফিয়ে বেড়ায়; কখনো কিম জং-উন, কখনো চীনের উইঘুর, নি-ক্যাপ, ভেনেজুয়েলা, অং সান সু চি কিংবা ভ্লাদিমির পুতিনকে নিয়ে তার চিন্তার কথা উঠে আসে।

মেটালফ্রিক বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সবকিছুকেই প্রভাবিত করে—সন্ত্রাস, অপরাধ এবং আসক্তি। তার মতে, বিত্তবান মানুষরাই আসক্ত হওয়ার মতো পর্যাপ্ত সময় পান। ‘আমি সুবিধাপ্রাপ্ত… আমার একটি ঘর আছে। আমি শুয়ে থাকতে পারি। আগামী কাল কে আমাকে খাওয়াবে, কে আমার পরিবারকে খাওয়াবে—এসব নিয়ে আমাকে ভাবতে হয় না।

তিনি মাদকের চূড়ান্ত প্রভাব নিয়ে শঙ্কিত। ইয়াবা সেবনকারীরা যেহেতু ঘুমান না, তাই কীভাবে তারা ‘কখনোই দুই বছর টিকতে পারবেন না’ তা নিয়ে তিনি কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘এটি একটি ধীর গতির বিষক্রিয়া, এটি একটি নিখুঁত পরিকল্পনা।’

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

Nagorik Sangram নাগরিক সংগ্রাম

Nagorik Sangram | নাগরিক সংগ্রাম

বাংলাদেশে ইয়াবা আসক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ভয়ঙ্কর তথ্য

Update Time : 08:13:37 pm, Tuesday, 28 July 2026

বাংলাদেশে ইয়াবা আসক্তি মহামারি আকার ধারণ করেছে। লাখ লাখ মানুষ এ নেশায় আসক্ত এবং এ সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। মেথামফেটামিন ও ক্যাফেইনের মিশ্রণে তৈরি এ মাদক কিভাবে বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষের জীবন ধ্বংস করে দিচ্ছে- তা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দ্য আইরিশ টাইমস।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘মেটালফ্রিক’ প্রতিদিন তার পোষা পাখির সঙ্গে সময় কাটাতেন—তাকে আদর করতেন, খাঁচা পরিষ্কার করতেন এবং উড়ে বেড়ানোর জন্য ছেড়ে দিতেন। ঢাকার নিজের অগোছালো শোবার ঘরে শুয়ে তিনি বলেন, ‘এখন আমি এসব আর করতে পারি না। কে-ই বা পাত্তা দেয়?’

চল্লিশোর্ধ্ব এই ব্যক্তি নিজের ছদ্মনামটিই ব্যবহার করতে চেয়েছেন। তিনি ইয়াবায় মারাত্মকভাবে আসক্ত হয়ে পড়েছেন। এ মাদক বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষের জীবন ধ্বংস করে দিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘এ জিনিসটা আমার মাথা পুরোপুরি নষ্ট করে দিয়েছে’।

থাই ভাষায় ইয়াবা শব্দের অর্থ ‘পাগলা ওষুধ’। ধারণা করা হয়, বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষ এটি সেবন করছেন এবং এ সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।

ইয়াবা সেবনের জন্য মেটালফ্রিক একটি টিনফয়েলের ওপর বড়িটি রাখেন এবং নিচ থেকে তাপ দিয়ে এর ধোঁয়া টানেন। তিনি জানান, কমলা রঙের প্রতিটি বড়ির প্রভাব চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা থাকে। তিনি টানা তিন দিন জেগে থাকেন, এরপর ক্লান্ত হয়ে একবারে ১২ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় ধরে ঘুমান।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, গত জুনে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, ‘দেশের প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি জনসংখ্যার প্রায় ৫ শতাংশ মাদকাসক্ত’। তিনি আরও বলেন, ‘নতুন সিন্থেটিক ও সেমি-সিন্থেটিক মাদকের আবির্ভাব এ সমস্যাটিকে আরও তীব্র করে তুলছে। ’চলতি মাসে বাংলাদেশের সংসদে মাদকসংক্রান্ত কয়েকটি অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে একটি বিল পাস করা হয়েছে।

বাংলাদেশে ইয়াবাকে ‘ক’ শ্রেণির নিষিদ্ধ মাদক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০১৮ সালে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে কর্তৃপক্ষ মাদকের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছিল। ফিলিপাইনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের নির্মম ‘মাদকবিরোধী যুদ্ধের’ মতো সেই অভিযানে কয়েক মাসের মধ্যেই ২০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হন।

এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানায়, ২০১৮ সালে ৪৬৬ জন নিহত হয়েছিলেন। সংস্থাটির মতে, মাদকবিরোধী অভিযান হিসেবে যা তুলে ধরা হয়েছিল, তা ‘দেশের কয়েকটি দরিদ্রতম এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। সেখানকার মানুষের মনে এ ভয় ঢুকে যায় যে, মাদক সেবনের সামান্যতম সন্দেহ থেকেই হয়তো তাদের প্রিয়জনদের আরেকটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হবে।’ এছাড়া সে সময় আরও কয়েক হাজার মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।

তবে স্থানীয় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এত কিছুর পরও মাদকের ব্যবহার বেড়েই চলেছে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের রেজিস্ট্রার ডা. মো. আরিফুজ্জামান বলেন, ‘আমরা যদি মাদকের ব্যবহার কমাতে চাই, তবে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি করতে হবে।’ তিনি ঢাকার নিরাময় রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারেও (পুনর্বাসন কেন্দ্র) কাজ করেন। এ সেন্টারের অভ্যর্থনা কক্ষের পেছনের দেয়ালে লেখা রয়েছে- ‘যেখানে আরোগ্য শুরু, সেখানেই জীবন অপেক্ষমাণ।’

তিনি জানান, পুরো দেশে প্রায় ৩৫০ জন সাইকিয়াট্রিস্ট বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞদের এক ঘণ্টায় হয়তো ২০ জন রোগী দেখতে হয়, ‘তবে আমাদের আর কোনো বিকল্প নেই।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে যোগ্যতাসম্পন্ন সাইকোলজিস্টের (মনোবিজ্ঞানী) ক্ষেত্রেও একই রকম অভাব রয়েছে।’ তিনি চান, সরকার যেন মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত করে।

২০১৮-২০১৯ সালে পরিচালিত বাংলাদেশের সর্বশেষ জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপে দেখা গেছে, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন এমন প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষই চিকিৎসার শরণাপন্ন হন না। ডা. আরিফুজ্জামান বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বা স্টিগমা পুরো বিশ্বেই রয়েছে, আমাদের দেশেও আছে। তবে গত কয়েক বছরে সচেতনতা অভাবনীয় মাত্রায় বেড়েছে।

তিনি জানান, ইয়াবায় আসক্তি এখন খুবই সাধারণ ঘটনা; যদিও অনেক ব্যবহারকারী অন্যান্য মাদকও গ্রহণ করেন, যার মধ্যে বুপ্রেনরফিন ইনজেকশন, হেরোইন এবং ওমোরফোন ট্যাবলেট থাকতে পারে। প্রায় প্রতিটি মাদকেরই ব্যবহার বাড়ছে, তবে ইয়াবার ব্যবহার বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে।

তিনি আরও বলেন, কিছু ব্যবহারকারী তাদের ‘স্বাভাবিক কার্যক্রম’ চালিয়ে যেতে পারলেও, অন্যদের ‘মস্তিষ্কে দুর্বলতা’ থাকে—যার মানে তারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। কিছু বাহ্যিক ঘটনা, যেমন—বন্যা, অগ্নিকাণ্ড এবং কোভিড-১৯ মহামারির মতো সংকটও আসক্তির এ পরিস্থিতিকে উসকে দিতে পারে।

ডা. আরিফুজ্জামানের মতে, কিছু ব্যবহারকারী মাদক ব্যবসায়ী হয়ে যান, কারণ তাদের এ নেশার খরচ জোগানোর অন্য কোনো উপায় থাকে না। আবার অনেক ব্যবহারকারী মূলত বিষণ্নতা, উদ্বেগ বা সাইকোসিসের মতো মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন এবং এসব থেকে মুক্তি পেতেই তারা মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়েন।

কোন মাদকগুলো সাধারণত বেশি গ্রহণ করা হয়, তার পেছনে সেগুলোর সহজলভ্যতার সুস্পষ্ট ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন ডা. আরিফুজ্জামান। ইউএন অফিস অন ড্রাগস অ্যান্ড ক্রাইমের তথ্যমতে, নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে এটি ‘যুব সংস্কৃতির’ অংশে পরিণত হওয়ার আগে, ঐতিহ্যগতভাবে এশিয়ার কিছু অংশে ট্রাকচালকদের মতো পেশাজীবী শ্রমিকরা ইয়াবা ব্যবহার করতেন। সংস্থাটি আরও জানায়, ২০০৭ সালে বাংলাদেশে ১২ লাখ ইয়াবা বড়ি জব্দ করা হয়েছিল।

থাইল্যান্ড, মিয়ানমার এবং লাওস যেখানে মিলিত হয়েছে, সেই ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল’ (সোনালি ত্রিভুজ) এলাকাটিকে সিন্থেটিক মাদক উৎপাদনের জন্য বিশ্বের অন্যতম সক্রিয় অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইউএন অফিস অন ড্রাগস অ্যান্ড ক্রাইম জানিয়েছে, ২০২৪ সালে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রেকর্ড ২৩৬ টন মেথামফেটামিন (সাধারণত মেথ নামে পরিচিত) জব্দ করা হয়, যা ২০২৩ সালের তুলনায় ২৪ শতাংশ বেশি। তবে সম্ভবত এর চেয়েও অনেক বেশি পরিমাণ মাদক বিক্রি হচ্ছে। ধারণা করা হয়, বাংলাদেশে আসা ইয়াবার প্রধান উৎপাদক মিয়ানমার।

মেটালফ্রিক বলেন, ‘সবারই একই করুণ গল্প রয়েছে।’ তিনি জানান, ইয়াবায় আসক্ত বাংলাদেশিরা সাধারণত প্রথমে সিগারেট দিয়ে শুরু করেন, এরপর গাঁজা, তারপর কাশির সিরাপ। যুবক বয়সে তিনি গাঁজার মতো ‘ডাউনার্স’ (downers) মাদকের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। প্রথমবার যখন তিনি ইয়াবা গ্রহণ করেন, তখন ভেবেছিলেন এটা ‘আড্ডা দেওয়া ও চিল’ করার জন্য ভালো হবে; কিন্তু এটি ‘আমার মাথার তার ছিঁড়ে দেয়… এ জিনিস মানুষকে পশু বানিয়ে দেয়।’

ইয়াবা আগে বেশ দামি ছিল। এখন এ মাদকের দুটি ধরন পাওয়া যায়- সস্তা ও দামি। তিনি বলেন, সস্তা সংস্করণটি মুখ ও দাঁতের ‘বারোটা বাজিয়ে দেয়’, আর (একজন ব্যবহারকারীর) চোখের দিকে তাকালেই বোঝা যায় যে তারা উন্মাদ।’ মেটালফ্রিক জানান, এ বড়ির কারণে তিনি বন্ধুদের হারিয়েছেন—নিয়মিত এটি সেবন করলে স্ট্রোক হতে পারে। অনেকের দাঁত পড়ে যায় বা ‘খিঁচুনি’ শুরু হয়।

মেটালফ্রিক বলেন, গত কয়েক বছরে আফিম বা হেরোইন পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে। ইয়াবা অন্য সব মাদককে পুরোপুরি হটিয়ে দিয়েছে। ঢাকায় রাস্তায় তরুণদের এ বড়ির প্যাকেট বিক্রি করতে দেখা খুব সাধারণ দৃশ্য। মোহাম্মদপুর এলাকায় অল্প বয়সী ছেলেরা বড়ির ছোট প্যাকেট উঁচিয়ে ধরে থাকে, আর রিকশাচালকেরা হাত বাড়িয়ে তা কিনে নেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ তীব্র রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে গেছে। ২০২৪ সালের যে বিক্ষোভের ফলে শেখ হাসিনার পতন ঘটে, তাতে প্রায় ১৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। এরপর ২০২৬ সালের নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বিজয়ী হয়। বিশ্বব্যাংকের মতে নিম্ন-মধ্যম আয়ের এ দক্ষিণ এশিয়ার দেশটি বিভিন্ন বৈশ্বিক সূচকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবেও মূল্যায়িত হয়েছে। অনেক তরুণই এখন তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন।

এসব অস্থিরতার ব্যক্তিগত প্রভাবও রয়েছে। মেটালফ্রিক জানান, সম্প্রতি মারা যাওয়া তার বাবাকে এক সময় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সম্মান করা হতো, কিন্তু ইদানিং তার বন্ধুরাই তাকে ‘ভুয়া’ বলে আখ্যায়িত করে। মেটালফ্রিকের একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ছিল, কিন্তু বাংলাদেশে যে ধরনের অগ্নিকাণ্ড আশ্চর্যজনকভাবে নৈমিত্তিক ঘটনা—সেরকম এক আগুনে তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানটি পুড়ে যায়। তিনি মনে করেন, এটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে করা হয়েছিল, যদিও অন্যরা বলেন, এটি হয়তো বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট বা অন্য কোনো দুর্ঘটনা হতে পারে।

এখন তিনি বাইরের জগতের সঙ্গে যুক্ত হন কেবল ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে, যেখানে তিনি গাজার অসংখ্য ভিডিও দেখেন। তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে বাদামি বর্ণের মানুষ এবং বিশেষ করে মুসলমানদের মূল্যহীন হিসেবে দেখা হয়। পশ্চিমা গণমাধ্যম এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিও তিনি তীব্র হতাশা ব্যক্ত করেন।

মেটালফ্রিক বলেন, ইয়াবা মানুষকে ‘মিথ্যা আত্মবিশ্বাস’ দেয়, যার কারণে অনেকে ‘অদ্ভুত সব ষড়যন্ত্র তত্ত্বে’ বিশ্বাস করতে শুরু করে। তার কথাবার্তা এক প্রসঙ্গ থেকে আরেক প্রসঙ্গে লাফিয়ে বেড়ায়; কখনো কিম জং-উন, কখনো চীনের উইঘুর, নি-ক্যাপ, ভেনেজুয়েলা, অং সান সু চি কিংবা ভ্লাদিমির পুতিনকে নিয়ে তার চিন্তার কথা উঠে আসে।

মেটালফ্রিক বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সবকিছুকেই প্রভাবিত করে—সন্ত্রাস, অপরাধ এবং আসক্তি। তার মতে, বিত্তবান মানুষরাই আসক্ত হওয়ার মতো পর্যাপ্ত সময় পান। ‘আমি সুবিধাপ্রাপ্ত… আমার একটি ঘর আছে। আমি শুয়ে থাকতে পারি। আগামী কাল কে আমাকে খাওয়াবে, কে আমার পরিবারকে খাওয়াবে—এসব নিয়ে আমাকে ভাবতে হয় না।

তিনি মাদকের চূড়ান্ত প্রভাব নিয়ে শঙ্কিত। ইয়াবা সেবনকারীরা যেহেতু ঘুমান না, তাই কীভাবে তারা ‘কখনোই দুই বছর টিকতে পারবেন না’ তা নিয়ে তিনি কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘এটি একটি ধীর গতির বিষক্রিয়া, এটি একটি নিখুঁত পরিকল্পনা।’