7:30 am, Wednesday, 30 September 2026

মরিচা ধরা মেশিনে থেমে আছে হাজারো শ্রমিকের স্বপ্ন

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

একসময় ভোর হলেই সরিষাবাড়ীর আকাশে ভেসে আসত জুট মিলের সাইরেন। সেই শব্দে কর্মচঞ্চল হয়ে উঠত পুরো এলাকা। হাজারো শ্রমিক ছুটে যেতেন কর্মস্থলে। কারখানার মেশিনের শব্দে মুখর থাকত চারপাশ। পাট থেকে তৈরি হতো সুতা, সুতলি, চট ও চটের বস্তাসহ নানা ধরনের পাটজাত পণ্য।

একটি মিলকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল অসংখ্য পরিবারের জীবিকা ও স্বপ্ন। যমুনা, ব্রহ্মপুত্র ও ঝিনাই নদীর পললভূমিতে গড়ে ওঠা এ জনপদকে বলা হতো ‘প্রাচ্যের দ্বিতীয় ডান্ডি’। মাইজবাড়ি-দিয়ারকৃষ্ণাই এলাকায় অবস্থিত আলহাজ জুট মিল দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। একসময় যে কারখানার প্রতিটি প্রান্তে শ্রমিকদের পদচারণায় মুখর থাকত, সেখানে এখন নীরবতা।

বিশাল কারখানাজুড়ে পড়ে আছে মরিচা ধরা যন্ত্রপাতি। কোথাও আগাছা, কোথাও ভাঙাচোরা অবকাঠামো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নষ্ট ও চুরি হয়ে যাচ্ছে কোটি কোটি টাকার মূল্যবান যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম। ১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এ জুট মিলটি ছিল এলাকার অন্যতম বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান। প্রায় ৩৯ একর জায়গার ওপর গড়ে ওঠা কারখানাটিতে একসময় কয়েক হাজার শ্রমিক কাজ করতেন।

মিলের ওপর নির্ভরশীল ছিল শুধু শ্রমিক পরিবার নয়, স্থানীয় কৃষক, ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে মিলটির পরিস্থিতি বদলে যেতে থাকে। মালিকানা পরিবর্তন, দীর্ঘদিনের লোকসান, ব্যাংকঋণ, অর্থসংকট, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং ব্যবস্থাপনার নানা সমস্যায় ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে প্রতিষ্ঠানটি। একপর্যায়ে উৎপাদন প্রায় বন্ধের পথে চলে যায়।

২০১৮ সালের জুলাইয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মিলটি বন্ধ হয়ে গেলে কয়েক হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন। যারা একসময় নিয়মিত বেতন নিয়ে সংসার চালাতেন, তাদের অনেকেই বাধ্য হয়ে পেশা বদলেছেন। কেউ দিনমজুর হয়েছেন, কেউ ছোটখাটো ব্যবসায় নেমেছেন, আবার কেউ জীবিকার সন্ধানে অন্যত্র পাড়ি জমিয়েছেন। সবচেয়ে বড় আক্ষেপ, বহু শ্রমিক এখনো তাদের পাওনা পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।

প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা নিয়ে তাদের মধ্যে রয়েছে অনিশ্চয়তা। দীর্ঘদিন চাকরি করে অবসরের পর যে নিশ্চিন্ত জীবন পাওয়ার কথা ছিল, অনেক শ্রমিকের সেই স্বপ্নও আজ অনিশ্চিত। অন্যদিকে বছরের পর বছর উৎপাদন বন্ধ থাকায় মিলের যন্ত্রপাতিও ক্রমেই ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। বিদ্যুৎ ও নিরাপত্তাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে মূল্যবান যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সম্পদ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি চুরির আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

একটি সচল শিল্পপ্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে পরিত্যক্ত স্থাপনায়। শ্রমিক ও স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে আলহাজ জুট মিলসহ সরিষাবাড়ীর বন্ধ পাটকলগুলো পুনরায় চালু করার। বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ এবং পর্যাপ্ত ব্যাংকঋণের ব্যবস্থা করা গেলে মিলটি আবারও উৎপাদনে ফিরতে পারে।

মিলের সহকারী হিসাব কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী খান বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সঠিক ব্যবস্থাপনা আর সরকারি নজরদারি থাকলে মিলটি আবার চালু করা সম্ভব। মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হারুনুর রশিদ বলেন, ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় সিসি সুবিধা না পাওয়ায় উৎপাদন কার্যক্রম চালু রাখা সম্ভব হয়নি। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আলম শরীফ খান বলেন, পাটকলগুলো পুনরায় চালু হলে পাটের চাহিদা বাড়বে।

এতে এ অঞ্চলে পাটের আবাদ আরও বৃদ্ধি পাবে এবং কৃষকরা লাভবান হবেন।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

Nagorik Sangram

Popular Post

মরিচা ধরা মেশিনে থেমে আছে হাজারো শ্রমিকের স্বপ্ন

Update Time : 05:55:06 am, Wednesday, 30 September 2026

একসময় ভোর হলেই সরিষাবাড়ীর আকাশে ভেসে আসত জুট মিলের সাইরেন। সেই শব্দে কর্মচঞ্চল হয়ে উঠত পুরো এলাকা। হাজারো শ্রমিক ছুটে যেতেন কর্মস্থলে। কারখানার মেশিনের শব্দে মুখর থাকত চারপাশ। পাট থেকে তৈরি হতো সুতা, সুতলি, চট ও চটের বস্তাসহ নানা ধরনের পাটজাত পণ্য।

একটি মিলকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল অসংখ্য পরিবারের জীবিকা ও স্বপ্ন। যমুনা, ব্রহ্মপুত্র ও ঝিনাই নদীর পললভূমিতে গড়ে ওঠা এ জনপদকে বলা হতো ‘প্রাচ্যের দ্বিতীয় ডান্ডি’। মাইজবাড়ি-দিয়ারকৃষ্ণাই এলাকায় অবস্থিত আলহাজ জুট মিল দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। একসময় যে কারখানার প্রতিটি প্রান্তে শ্রমিকদের পদচারণায় মুখর থাকত, সেখানে এখন নীরবতা।

বিশাল কারখানাজুড়ে পড়ে আছে মরিচা ধরা যন্ত্রপাতি। কোথাও আগাছা, কোথাও ভাঙাচোরা অবকাঠামো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নষ্ট ও চুরি হয়ে যাচ্ছে কোটি কোটি টাকার মূল্যবান যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম। ১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এ জুট মিলটি ছিল এলাকার অন্যতম বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান। প্রায় ৩৯ একর জায়গার ওপর গড়ে ওঠা কারখানাটিতে একসময় কয়েক হাজার শ্রমিক কাজ করতেন।

মিলের ওপর নির্ভরশীল ছিল শুধু শ্রমিক পরিবার নয়, স্থানীয় কৃষক, ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে মিলটির পরিস্থিতি বদলে যেতে থাকে। মালিকানা পরিবর্তন, দীর্ঘদিনের লোকসান, ব্যাংকঋণ, অর্থসংকট, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং ব্যবস্থাপনার নানা সমস্যায় ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে প্রতিষ্ঠানটি। একপর্যায়ে উৎপাদন প্রায় বন্ধের পথে চলে যায়।

২০১৮ সালের জুলাইয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মিলটি বন্ধ হয়ে গেলে কয়েক হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন। যারা একসময় নিয়মিত বেতন নিয়ে সংসার চালাতেন, তাদের অনেকেই বাধ্য হয়ে পেশা বদলেছেন। কেউ দিনমজুর হয়েছেন, কেউ ছোটখাটো ব্যবসায় নেমেছেন, আবার কেউ জীবিকার সন্ধানে অন্যত্র পাড়ি জমিয়েছেন। সবচেয়ে বড় আক্ষেপ, বহু শ্রমিক এখনো তাদের পাওনা পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।

প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা নিয়ে তাদের মধ্যে রয়েছে অনিশ্চয়তা। দীর্ঘদিন চাকরি করে অবসরের পর যে নিশ্চিন্ত জীবন পাওয়ার কথা ছিল, অনেক শ্রমিকের সেই স্বপ্নও আজ অনিশ্চিত। অন্যদিকে বছরের পর বছর উৎপাদন বন্ধ থাকায় মিলের যন্ত্রপাতিও ক্রমেই ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। বিদ্যুৎ ও নিরাপত্তাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে মূল্যবান যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সম্পদ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি চুরির আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

একটি সচল শিল্পপ্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে পরিত্যক্ত স্থাপনায়। শ্রমিক ও স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে আলহাজ জুট মিলসহ সরিষাবাড়ীর বন্ধ পাটকলগুলো পুনরায় চালু করার। বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ এবং পর্যাপ্ত ব্যাংকঋণের ব্যবস্থা করা গেলে মিলটি আবারও উৎপাদনে ফিরতে পারে।

মিলের সহকারী হিসাব কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী খান বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সঠিক ব্যবস্থাপনা আর সরকারি নজরদারি থাকলে মিলটি আবার চালু করা সম্ভব। মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হারুনুর রশিদ বলেন, ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় সিসি সুবিধা না পাওয়ায় উৎপাদন কার্যক্রম চালু রাখা সম্ভব হয়নি। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আলম শরীফ খান বলেন, পাটকলগুলো পুনরায় চালু হলে পাটের চাহিদা বাড়বে।

এতে এ অঞ্চলে পাটের আবাদ আরও বৃদ্ধি পাবে এবং কৃষকরা লাভবান হবেন।