11:30 am, Saturday, 1 August 2026

স্পেন : সেউতায় ৫৭ মরদেহ উদ্ধার, ফিরে যাচ্ছেন অভিবাসনপ্রত্যাশীরা

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ছিটমহল সেউতায় শুক্রবার আকস্মিক বন্যার মতো যে ৫০ হাজারেরও বেশি অভিবাসনপ্রত্যাশী এসেছিলেন, তাদের মধ্যে থেকে এ পর্যন্ত কমপক্ষে ৫৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এই মৃতদের অধিকাংশই পানিতে ডুবে মারা গেছেন। ভবিষ্যতে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

এই মৃতদের অনেকেই মরক্কোর ফনিদেক থেকে সাঁতরে সেউতা আসার পথে ডুবে মরেছেন। বেশ কয়েকজন পদদলিত হয়েও মারা গেছেন।

এদিকে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা মরক্কোতে ফিরে যাওয়া শুরু করেছেন বলেও জানা গেছে। বৃহস্পতিবার সকালের দিকে ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ মরক্কোর সীমান্ত থেকে সাগর পাড়ি দিয়ে স্পেনের সেউতা ছিটমহলে প্রবেশ করে। এক বিবৃতেতে স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ৪৮ হাজার ৩০০ অভিবাসনপ্রত্যাশী ফিরে গেছে। বাকিরাও শিগগিরই ফিরে যাবে।

এদিকে সাঁতরে স্পেনে যেতে ইচ্ছুক অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ঢল থামাতে স্পেন-মরক্কো সাগর সীমান্তের সৈকত জুড়ে সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করেছে মরক্কো। সেউতা সীমান্তে সামরিক বাহিনী মোতায়েন করেছে স্পেনও। দুই সীমান্তে সামরিক বাহিনীর তৎপরতার কারণে গতকাল বিকেল থেকেই সেউতায় অভিবাসনপ্রত্যাশীদের প্রবেশ বন্ধ হয়েছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

সেউতা ও মেলিলা— ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত স্পেনের এই দুটি ছিটমহল শহর মিলে আফ্রিকার সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র স্থলসংযোগ তৈরি করেছে। ইউরোপে পাড়ি জমাতে চাওয়া মানুষেরা প্রায়ই এই দুই সীমান্ত দিয়ে দলে দলে ঢোকার চেষ্টা করেন।

সেউতায় পৌঁছাতে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা অনেক সময় মরক্কোর ফনিদেক শহর থেকে সাঁতার কাটেন। স্প্যানিশ ভূখণ্ডে পৌঁছাতে তাঁদের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। আবার অনেকেই কাছের বেলইউনেশ শহর দিয়েও পার হওয়ার চেষ্টা করেন। কারণ, ওই পথে দূরত্ব কিছুটা কম।

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ শুক্রবার সেউতা সফর করেছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় তার সরকার সব ধরনের প্রস্তুতি ও সক্ষমতা কাজে লাগাচ্ছে। সীমান্ত পার হওয়ার এই ঘটনাকে স্পেনের ভূখণ্ডগত সার্বভৌমত্বের ‘লঙ্ঘন’ বলে মন্তব্য করেছেন সানচেজ।

আকস্মিক সীমান্ত পার হওয়ার এই হিড়িকের সঙ্গে স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক একটি রায়ের যোগসূত্র দেখছে সেউতা কর্তৃপক্ষ। চলতি মাসের শুরুতে দেওয়া ওই রায়ে বলা হয়েছিল, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া সমুদ্রপথে আসা অভিবাসীদের কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত পাঠাতে পারবে না। তবে সীমান্ত বেড়া টপকে বা স্থলপথে স্পেনে প্রবেশকারীদের ক্ষেত্রে এই রায় প্রযোজ্য নয়।

শুক্রবার সানচেজ বলেন, আদালতের রায় নিয়ে গুজব ছড়িয়েছে মানবপাচারকারী মাফিয়ারা। এ কারণেই অভিবাসীদের এমন ঢল নেমেছে। তিনি আরও বলেন, ‘মরক্কোর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে আমরা জানতে পেরেছি, মানব পাচারকারী চক্রগুলো সুপ্রিম কোর্টের ওই রায়কে নিজেদের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করেছে। গত কয়েক ঘণ্টায় সেই মনগড়া ব্যাখ্যা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে।’

তবে এমন ঢলের পেছনে ওই রায়ের ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন মরক্কোর অধিকারকর্মীরা। তাঁদের যুক্তি, বেশির ভাগ অভিবাসীই এ ধরনের আইনি সিদ্ধান্তের কথা জানতেন না।

‘আমি ফিরে এসেছি’

অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ঢল থামাতে বৃহস্পতিবারই মরক্কো-সেউতা সীমান্তে বিপুল সংখ্যক দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করেছে মরক্কোর সরকার। সীমান্তের অপর পাশে সেউতায় মোতায়েন ছিল স্প্যানিশ সেনাবাহিনী। ফলে সাঁতরে সেউতায় পৌঁছানো অনেকেই ফের মরক্কোর উদ্দেশে ফিরতি যাত্রা শুরু করেছেন।

৫ কিলোমিটার পথ সাঁতরে মরক্কোতে ফিরে আসার পর মরক্কোর নাগরিক এক তরুণ রয়টার্সকে বলেন, “সত্যি কথা বলতে, আমি আসলে এখনও বুঝতে পারছি না যে কেন সেউতায় গিয়েছিলাম। সেউতায় পৌছানোর পর থেকে মরক্কোতে ফিরে আসার আগ পর্যন্ত আমি কোনো খাবার পাইনি। অথচ আমার পকেটে টাকা ছিল। আমরা যা করেছি, তা ভালো হয়নি, উপভোগ্যও হয়নি।”

২০ বছর বয়সী আয়মান মরক্কোর লারাচে শহরে সেলুনকর্মীর কাজ করেন। সাঁতরে সেউতায় যাওয়া লোকজনদের মধ্যে তিনিও ছিলেন, শুক্রবার ফের সাঁতার দিয়েই মরক্কোতে ফিরে এসেছেন।

রয়টার্সকে আয়মান বলেন, “স্পেনের সেনাবাহিনী আমাদের লাথি দিয়ে বের করে দিয়েছে। অবশ্য যদি তারা তা না করতো, তাহলেও আমি ফিরে আসতাম। কারণ সেউতায় কোনো খাবার নেই।”

সূত্র : রয়টার্স

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

Nagorik Sangram নাগরিক সংগ্রাম

Nagorik Sangram | নাগরিক সংগ্রাম
Popular Post

ডিপ স্টেট নির্মূল না হলে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়: জাহিদুল ইসলাম

স্পেন : সেউতায় ৫৭ মরদেহ উদ্ধার, ফিরে যাচ্ছেন অভিবাসনপ্রত্যাশীরা

Update Time : 10:05:40 am, Saturday, 1 August 2026

স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ছিটমহল সেউতায় শুক্রবার আকস্মিক বন্যার মতো যে ৫০ হাজারেরও বেশি অভিবাসনপ্রত্যাশী এসেছিলেন, তাদের মধ্যে থেকে এ পর্যন্ত কমপক্ষে ৫৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এই মৃতদের অধিকাংশই পানিতে ডুবে মারা গেছেন। ভবিষ্যতে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

এই মৃতদের অনেকেই মরক্কোর ফনিদেক থেকে সাঁতরে সেউতা আসার পথে ডুবে মরেছেন। বেশ কয়েকজন পদদলিত হয়েও মারা গেছেন।

এদিকে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা মরক্কোতে ফিরে যাওয়া শুরু করেছেন বলেও জানা গেছে। বৃহস্পতিবার সকালের দিকে ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ মরক্কোর সীমান্ত থেকে সাগর পাড়ি দিয়ে স্পেনের সেউতা ছিটমহলে প্রবেশ করে। এক বিবৃতেতে স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ৪৮ হাজার ৩০০ অভিবাসনপ্রত্যাশী ফিরে গেছে। বাকিরাও শিগগিরই ফিরে যাবে।

এদিকে সাঁতরে স্পেনে যেতে ইচ্ছুক অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ঢল থামাতে স্পেন-মরক্কো সাগর সীমান্তের সৈকত জুড়ে সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করেছে মরক্কো। সেউতা সীমান্তে সামরিক বাহিনী মোতায়েন করেছে স্পেনও। দুই সীমান্তে সামরিক বাহিনীর তৎপরতার কারণে গতকাল বিকেল থেকেই সেউতায় অভিবাসনপ্রত্যাশীদের প্রবেশ বন্ধ হয়েছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

সেউতা ও মেলিলা— ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত স্পেনের এই দুটি ছিটমহল শহর মিলে আফ্রিকার সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র স্থলসংযোগ তৈরি করেছে। ইউরোপে পাড়ি জমাতে চাওয়া মানুষেরা প্রায়ই এই দুই সীমান্ত দিয়ে দলে দলে ঢোকার চেষ্টা করেন।

সেউতায় পৌঁছাতে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা অনেক সময় মরক্কোর ফনিদেক শহর থেকে সাঁতার কাটেন। স্প্যানিশ ভূখণ্ডে পৌঁছাতে তাঁদের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। আবার অনেকেই কাছের বেলইউনেশ শহর দিয়েও পার হওয়ার চেষ্টা করেন। কারণ, ওই পথে দূরত্ব কিছুটা কম।

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ শুক্রবার সেউতা সফর করেছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় তার সরকার সব ধরনের প্রস্তুতি ও সক্ষমতা কাজে লাগাচ্ছে। সীমান্ত পার হওয়ার এই ঘটনাকে স্পেনের ভূখণ্ডগত সার্বভৌমত্বের ‘লঙ্ঘন’ বলে মন্তব্য করেছেন সানচেজ।

আকস্মিক সীমান্ত পার হওয়ার এই হিড়িকের সঙ্গে স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক একটি রায়ের যোগসূত্র দেখছে সেউতা কর্তৃপক্ষ। চলতি মাসের শুরুতে দেওয়া ওই রায়ে বলা হয়েছিল, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া সমুদ্রপথে আসা অভিবাসীদের কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত পাঠাতে পারবে না। তবে সীমান্ত বেড়া টপকে বা স্থলপথে স্পেনে প্রবেশকারীদের ক্ষেত্রে এই রায় প্রযোজ্য নয়।

শুক্রবার সানচেজ বলেন, আদালতের রায় নিয়ে গুজব ছড়িয়েছে মানবপাচারকারী মাফিয়ারা। এ কারণেই অভিবাসীদের এমন ঢল নেমেছে। তিনি আরও বলেন, ‘মরক্কোর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে আমরা জানতে পেরেছি, মানব পাচারকারী চক্রগুলো সুপ্রিম কোর্টের ওই রায়কে নিজেদের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করেছে। গত কয়েক ঘণ্টায় সেই মনগড়া ব্যাখ্যা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে।’

তবে এমন ঢলের পেছনে ওই রায়ের ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন মরক্কোর অধিকারকর্মীরা। তাঁদের যুক্তি, বেশির ভাগ অভিবাসীই এ ধরনের আইনি সিদ্ধান্তের কথা জানতেন না।

‘আমি ফিরে এসেছি’

অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ঢল থামাতে বৃহস্পতিবারই মরক্কো-সেউতা সীমান্তে বিপুল সংখ্যক দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করেছে মরক্কোর সরকার। সীমান্তের অপর পাশে সেউতায় মোতায়েন ছিল স্প্যানিশ সেনাবাহিনী। ফলে সাঁতরে সেউতায় পৌঁছানো অনেকেই ফের মরক্কোর উদ্দেশে ফিরতি যাত্রা শুরু করেছেন।

৫ কিলোমিটার পথ সাঁতরে মরক্কোতে ফিরে আসার পর মরক্কোর নাগরিক এক তরুণ রয়টার্সকে বলেন, “সত্যি কথা বলতে, আমি আসলে এখনও বুঝতে পারছি না যে কেন সেউতায় গিয়েছিলাম। সেউতায় পৌছানোর পর থেকে মরক্কোতে ফিরে আসার আগ পর্যন্ত আমি কোনো খাবার পাইনি। অথচ আমার পকেটে টাকা ছিল। আমরা যা করেছি, তা ভালো হয়নি, উপভোগ্যও হয়নি।”

২০ বছর বয়সী আয়মান মরক্কোর লারাচে শহরে সেলুনকর্মীর কাজ করেন। সাঁতরে সেউতায় যাওয়া লোকজনদের মধ্যে তিনিও ছিলেন, শুক্রবার ফের সাঁতার দিয়েই মরক্কোতে ফিরে এসেছেন।

রয়টার্সকে আয়মান বলেন, “স্পেনের সেনাবাহিনী আমাদের লাথি দিয়ে বের করে দিয়েছে। অবশ্য যদি তারা তা না করতো, তাহলেও আমি ফিরে আসতাম। কারণ সেউতায় কোনো খাবার নেই।”

সূত্র : রয়টার্স