কাতার থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ বাড়ানোর মেয়াদ আবারও বাড়াল কাতার। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল সীমিত থাকায় এলএনজি সরবরাহের ক্ষেত্রে অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির (ফোর্স মেজার) এ সিদ্ধান্ত বলে জানিয়েছে কাতারএনার্জি।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এএউ বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, এর ফলে এলএনজির সরবরাহ আগামী অক্টোবর পর্যন্ত বাতিল হতে পারে বলে ইউরোপীয় ও এশীয় ক্রেতাদের জানিয়ে দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। কাতারএনার্জির তেল সরবরাহ বাতিলের এই তালিকায় বাংলাদেশও রয়েছে। কাতারের সংবাদমাধ্যম দোহা নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির কারণে যেসব ক্রেতা দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ইতালি।
এই পরিস্থিতিতে কোনো অস্বাভাবিক ঘটনার প্রেক্ষাপটে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায় ও বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। গত শুক্রবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কাতারএনার্জি বাংলাদেশের জন্য এলএনজি সরবরাহে জারি করা এই নির্দেশনার মেয়াদ সেপ্টেম্বর মাসের পরও বাড়িয়ে দিয়েছে। অপরদিকে পাকিস্তানি ক্রেতাদের চলতি সপ্তাহে জানানো হয়েছে, আগামী অক্টোবর মাস পর্যন্ত কার্গো বাতিল প্রক্রিয়া জারি থাকবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপের ক্রেতারাও এ-সংক্রান্ত নোটিস পাওয়া শুরু করেছেন। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সও ইতালিতে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার কথা জানিয়েছিল। এর আগে গত শুক্রবার ইতালীয় প্রতিষ্ঠান এডিসন বলেছে, কাতারএনার্জি দেশটিতে এলএনজি সরবরাহের স্থগিতাদেশ নভেম্বরের শুরু পর্যন্ত বাড়িয়েছে। এডিসন এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, ইতালির আদ্রিয়াটিক এলএনজি রিসিভিং টার্মিনালের জন্য নির্ধারিত অতিরিক্ত পাঁচটি এলএনজি কার্গো পাঠাতে পারবে না বলে কাতারএনার্জি এডিসনকে জানিয়েছে।
এর ফলে সামগ্রিক ফোর্স মেজারের সময়সীমা এপ্রিলের শুরু থেকে বেড়ে ২০২৬ সালের নভেম্বরের শুরু পর্যন্ত গড়াচ্ছে। এডিসন বলছে, এখন পর্যন্ত বাতিল হওয়া মোট কার্গোর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৯টিতে। তারা নিজেদের জ¦ালানি চাহিদা মেটাতে বিকল্প উৎসের ব্যবস্থা করছে বলে উল্লেখ করেছে। এই বাধার কারণে এশিয়া ও ইউরোপের ক্রেতারা বিকল্প সরবরাহ খুঁজতে, অন্য জ¦ালানিতে স্থানান্তরিত হতে কিংবা গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে আনতে বাধ্য হচ্ছেন।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সাম্প্রতিক হামলা বৃদ্ধি পাওয়ায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ঠিক কবে নাগাদ স্বাভাবিক হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও ঘনীভূত হয়েছে। প্রধান এই নৌপথে নিয়মিত এলএনজি কার্গো পরিবহন কার্যক্রম প্রায় বন্ধই রয়েছে। কাতার গত মার্চ মাসে প্রথমবার এই বিশেষ স্থগিতাদেশ বা ফোর্স মেজার জারি করে এবং এই অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতি মাসে তা নবায়ন করছে।
কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির বৈশ্বিক গবেষণা ফেলো অ্যান-সোফি করবেউ ইউরোনিউজকে বলেন, কোনো রাজনৈতিক সমাধান বা প্রধান অংশীদারদের সমঝোতা ছাড়া মনে হচ্ছে আমাদের আরও বেশ কিছু দিন এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই যেতে হবে। তিনি বলেন, স্বাভাবিক রপ্তানি প্রক্রিয়া আবার কবে শুরু করা সম্ভব হবে, সে বিষয়ে কাতারএনার্জির কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তারিখ নেই।
এ কারণে তারা প্রতি মাসে সরবরাহ বাতিলের সিদ্ধান্তের মেয়াদ বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের কারণে গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে জ¦ালানি রপ্তানির বিশ্ব মানচিত্র থেকে কাতার একপ্রকার অদৃশ্য হয়ে পড়েছে। আইসিআইএসের তথ্য বলছে, যুদ্ধের প্রথম ছয় মাসে দেশটি মাত্র ১৮টি এলএনজি কার্গো রপ্তানি করেছে। অথচ আগের বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৫০৯।
ইউরোনিউজ বলছে, গ্যাস বিক্রিতে কাতারের আনুমানিক রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৪০০ কোটি (২৪ বিলিয়ন) ডলার। এই ঘাটতি আংশিকভাবে পূরণ করছে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মতো অন্যান্য রপ্তানিকারক দেশগুলো। এ ছাড়া নাইজেরিয়া ও মালয়েশিয়ায় উৎপাদন কিছুটা বেড়েছে। তা সত্ত্বেও সার্বিক ঘাটতি পুরোপুরি মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। এশিয়ার কিছু বাজার ব্যবহার কমিয়ে কিংবা বিকল্প জ¦ালানিতে চলে গিয়ে এর সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে।
অন্যদিকে ইউরোপ স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে গ্যাস না কিনে নিজেদের জমানো গ্যাসই খরচ করছে। ইরানে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট এলএনজি বাণিজ্যের এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। এই জলপথ দিয়ে কিছু তেলবাহী ট্যাংকার এখনো চলাচল করছে। তবে এলএনজিবাহী জাহাজগুলো তেমন সহজলভ্য নয়। এসব জাহাজ বেশ বিশেষায়িত এবং এর বিকল্প খুঁজে পাওয়া কঠিন, যা চলমান সংঘাতের মধ্যে এসব জাহাজকে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।





