আধুনিক বাংলা শিশুসাহিত্যের আকাশে আমীরুল ইসলাম একটি অনন্য নাম। আশির দশকে ছড়া রচনার মাধ্যমে সাহিত্য আঙিনায় তার দীপ্ত পদার্পণ ঘটেছিল। ঐতিহ্যবাহী লোকজ ছড়ার চিরন্তন ছন্দ ও গঠনরীতির সাথে আধুনিক নাগরিক জীবনের রূপকল্প, মনস্তত্ত্ব ও জটিল বাস্তবতার রসায়ন ঘটিয়ে তিনি বাংলা ছড়াসাহিত্যকে নবতর ও আধুনিক মাত্রায় উন্নীত করেছিলেন।
তার ছড়া সৃষ্টির প্রধান শক্তিই ছিল নিপুণ ও স্বতঃস্ফূর্ত ছন্দজ্ঞান, আড়ম্বরহীন কথ্য ভাষা, অনাবিল হাস্যরস এবং অতুলনীয় আত্মব্যঙ্গ করার দুর্লভ ক্ষমতা। শিশু-কিশোরদের মনস্তাত্ত্বিক জগৎকে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন গভীর দরদ দিয়ে। ফলে তার লেখনীতে প্রকৃতি, রূপকথা, পশুপাখি যেমন ঠাঁই পেয়েছে, তেমনি ঠাঁই পেয়েছে সমাজসচেতনতা, প্রখর সামাজিক কৌতুক ও শ্লেষাত্মক চমক।
ছন্দোবদ্ধ ছড়ার নিখুঁত বুনটের পাশাপাশি জীবনের শেষভাগে তিনি কিছু ছন্দহীন গদ্যছড়ার নিরীক্ষাও চালিয়েছিলেন, যা তার বৈচিত্র্যময় প্রয়াসের সাক্ষ্য দেয়। তিন শতাধিক গ্রন্থ রচনার সুবিশাল ভা-ার গড়ে তুলে তিনি বাংলা শিশুসাহিত্যকে যেভাবে সমৃদ্ধ ও ঋদ্ধ করেছেন, তা এক কথায় অতুলনীয়। মাতৃস্নেহ ও চিরন্তন সম্পর্কের পরম আশ্রয়ে রচিত তার ‘মা’ শীর্ষক ছড়াটি বাংলা শিশুসাহিত্যের অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ও আবেগময় রূপকল্প।
পৃথিবীর অজস্র প্রতিকূলতা, ঘৃণা বা বিষময় পরিস্থিতির বিপরীতে মায়ের গভীর স্নেহচ্ছায়াকেই কবি মানুষের একমাত্র পরম ভরসা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। চারপাশে যখন বিষের আগুন জ্বলে কিংবা ফাল্গুনে কৃষ্ণচূড়া রাঙিয়ে ওঠে, সেই তীব্র ও কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মায়ের মুখ স্মরণে কবির হৃদয়ে অদম্য শক্তি ও সাহস সঞ্চারিত হয়। কবি রূপকের মাধ্যমে মাকে মাথার ওপর ছাতা এবং ভালোবাসার পরম গৃহ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
নীল হতাশা কিংবা কষ্টের সাগরে নিমজ্জিত হলে মায়ের নিখাদ ভালোবাসা ও কোলের ওমই মানুষকে সান্ত¡না দেয়; এমনকি সমাজের নানাবিধ অনাচারে নিশ্চুপ থাকার ধৈর্যও কবি শেখেন মায়ের থেকে। সৃষ্টিশীলতার সংকটকালে বা ছড়া রচনার মৌল অনুপ্রেরণা হারিয়ে ফেললেও কবি বারবার ফিরে যান সেই মাতৃীয় সত্তার কাছে। সহজ-সরল স্বরবৃত্ত ছন্দের প্রবহমানতায় ছড়াটি কেবল একটি কবিতা নয়, বরং মাতৃপ্রেমের এক প্রামাণ্য দলিলে পরিণত হয়েছে।
কবির স্বকীয় রসিকতা ও ব্যঙ্গাত্মক চেতনার অসাধারণ বিচ্ছুরণ ঘটেছে তার ‘ছড়া’ নামের রচনাটিতে, যেখানে সামাজিক কপটতা ও ভ-ামির মুখোশ তিনি উন্মোচিত করেছেন নির্দ্বিধায়। বাহ্যিক সুস্বাস্থ্যের আড়ালে সমাজে যে মিথ্যাচার, চাটুকারিতা ও ঠকানোর প্রবণতা লুকিয়ে থাকে, তা অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এই শ্লেষাত্মক স্পষ্টবাদিতা পাঠককে আনন্দ দেওয়ার পাশাপাশি নৈতিক ভাবনায় আন্দোলিত করে।
অন্যদিকে ‘বই’ ছড়ায় গ্রন্থপ্রেমিকের শখ এবং বাস্তবতার ইঁদুরছানাদের উপদ্রবকে তিনি এক পরম হাস্যরসে রূপায়িত করেছেন। পরম মমতায় ও অদম্য মোহে সংগৃহীত মূল্যবান বইগুলোকে ইঁদুর যখন বিস্কুট মনে করে কেটে কুচিকুচি করে ফেলে, তখন বইপ্রেমীর চিরচেনা সেই করুণ কৌতুকপ্রদ অভিজ্ঞতাটি ‘কাটুর কুটুর কুট’ ধ্বন্যাত্মক শব্দে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
বাংলা সাহিত্যে নিজেকে নিয়ে ঠাট্টা করা বা নির্মোহ আত্মব্যঙ্গ করার সাহস খুব কম সাহিত্যিকের মধ্যেই দেখা যায়, যা আমীরুল ইসলাম সম্পন্ন করেছেন নিখুঁত চপলতায়। ‘আমীরুল’ শীর্ষক আত্মজৈবনিক ছড়াটিতে নিজের ভবঘুরেপনা, সংসারের বাঁধন এড়িয়ে চলা এবং উদ্দেশ্যহীন ফুর্তিকে তিনি হালকা চালের চপল ছন্দে মৃদু ভর্ৎসনা করেছেন। তবে এই কৌতুকের আবরণের পেছনে লুকিয়ে ছিল একজন শিল্পীর চরম একাকিত্ব, অন্তর্দাাহ ও আত্মবিশ্লেষণ।
জীবনের সময় ক্ষয় হয়ে যাওয়াকে নির্দ্বিধায় মেনে নিয়ে ছড়া বাঁধার এই ক্ষমতা তার রসময় ব্যক্তিত্বকেই প্রকাশ করে। সমান্তরালভাবে, ‘বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্তিতে’ ছড়াটিতে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির বাহ্যিক মহিমা এবং দৈনন্দিন জীবনের নির্মম বাস্তবতার ব্যবধানকে তিনি প্রখর শ্লেষে বিদ্ধ করেছেন। পুরস্কার প্রাপ্তির ক্ষণিক আনন্দ যে জীবনের প্রাত্যহিক সংকট কাটাতে পারে না, সেই সত্যকে পরম বিনয় ও কৌতুকের মোড়কে তিনি পরিবেশন করেছেন।
মহাকালের অসীম ব্যাপ্তির সামনে নিজের সৃষ্টির ক্ষণস্থায়িত্বকে স্বীকার করে নিয়ে জীবদ্দশাতেই পাঠকের বিস্মৃতির কষ্টকে তিনি কোনো আক্ষেপ ছাড়া সহজভাবে মেনে নিয়েছিলেন, যা তার প্রাজ্ঞ ও নির্লোভ শিল্পীসত্তার পরিচয় বহন করে। সম্প্রতি ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অকালেই সুর্য অস্তমিত হলো এই মহতী ছড়াকারের। ৬২ বছর বয়সে কালব্যাধির কাছে আত্মসমর্পণ করে তিনি না-ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন।
অথচ শারীরিক অসুস্থতাকে উপেক্ষা করে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি দুহাতে লিখে গেছেন, সাহিত্যের আড্ডায় মেতে থেকেছেন এবং সামাজিক দায়িত্ব পালন করেছেন। মানুষের পার্থিব শরীর একসময় বিলীন হয়ে যায়, অনেকেই বেঁচে থেকেও মৃতবৎ জীবনযাপন করেন; কিন্তু আমীরুল ইসলাম তাঁর বিপুল ও চিরসবুজ সৃষ্টির মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যের পাঠকের হৃদয়ে অনন্তকাল বেঁচে থাকবেন।
শিশুসাহিত্যের এই ঋদ্ধিমান ও অকালপ্রয়াত সন্তানকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য চিরদিন গভীর পরম মমতায় বুকের গভীরে আগলে রাখবে।













