শুটিং সেটে ক্যামেরা আর অভিনয়শিল্পীদের আলোয় ভাসিয়ে রাখার কাজই ছিল তাঁর প্রতিদিনের জীবন। ককশিট ধরা কিংবা লাইট অ্যাডজাস্ট করার ব্যস্ততায় যাঁর দিন কেটে যেত, আজ সেই রবিন এক হাত হারিয়ে অত্যন্ত একা ও অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।
বলছিলাম বিনোদন অঙ্গনের পরিচিত মুখ, লাইটম্যান সহকারী রবিনের কথা। ঠিক এক বছর আগেÑ ইউটিউব চ্যানেল ‘প্রাঙ্ক কিং’-এর একটি নাটকের শুটিংয়ে যাওয়ার পথে টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারে জেনারেটরবাহী এক ভয়াবহ পিকআপ দুর্ঘটনায় তছনছ হয়ে যায় রবিনের জীবন। পঙ্গু হাসপাতালে দীর্ঘ সময় চিকিৎসার পর কেটে ফেলতে হয় তার বাম হাতটি, আর এক পায়ে বসানো হয় রড।
জীবনের সমস্ত আলো নিভে যাওয়া সেই রবিনের এক বছর পরের বাস্তবতা আরও বেশি করুণ ও হৃদয়বিদারক। হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফেরার পর, রবিনের জীবনে নেমে আসে আরও বড় আঘাত। শারীরিক অক্ষমতা ও উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায়, গত রমজান মাসে তিন বছরের কন্যাসন্তানকে নিয়ে তাকে ছেড়ে চলে যান তার স্ত্রী। মুঠোফোনে নিজের জীবনের এই কঠিন মুহূর্তের কথা জানাতে গিয়ে রবিন আবেগাপ্লুত হয়ে রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘হাসপাতাল থেকে আসার পর গত রমজানে আমার স্ত্রী সন্তানকে নিয়ে চলে যায়।
এই দুঃসময়ে আমার আর্থিক সহযোগিতার চেয়ে মানসিক সাহায্য অনেক বেশি প্রয়োজন ছিল। আমার তিন বছরের মেয়েটার সঙ্গে একটু কথা বলতেও পারি না, ওর মা বাধা দেয়। এখনো বিচ্ছেদ হয়নি, কিন্তু বেকার স্বামীর কাছে তারা আর ফিরতে চায় না। শ্বশুরবাড়ির সোজা কথাÑ আমি যদি নতুন কোনো উপার্জনের পথ বা ব্যবসা দাঁড় করাতে পারি, তবেই তারা ফিরবে। ’ দুর্ঘটনার পর অনেক শিল্পী ও সহকর্মী রবিনের চিকিৎসার জন্য সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।
রবিন জানান, সে সময় প্রায় ১০ লাখ টাকার মতো অর্থ উঠেছিল। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টাকার মতো চিকিৎসায় খরচ হয়। কিন্তু বাকি টাকা তার নিজের পরিবারের সদস্যরা আত্মসাৎ করেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। রবিন আক্ষেপ করে বলেন, ‘নিজের পরিবারই আমার সঙ্গে গাদ্দারি করেছে। ওই টাকাগুলো থাকলে আজ আমাকে ওষুধ কেনার টাকা পর্যন্ত খুঁজতে হতো না।
এখন স্ত্রী-সন্তান যেমন নেই, পরিবারের সহযোগিতাও পাচ্ছি না। ’ এখন আর কারো বোঝা হয়ে থাকতে চান না রবিন। শোবিজের পরিচালক-প্রযোজক-অভিনয়শিল্পীসহ সবার কাছে এটাই তার শেষ আকুতিÑ তিনি আবার তার স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে নতুন করে বাঁচতে চান। আকুল আবেদন জানিয়ে রবিন বলেন, ‘আমি আবার স্বাভাবিক সংসারে ফিরতে চাই। একটি মুদিদোকান দেওয়ার পরিকল্পনা আছে, কিন্তু আমার কাছে বর্তমানে কোনো টাকা নেই।
দেড় থেকে দুই লাখ টাকার ব্যবস্থা হলেÑ একটা দোকান দিতে পারি। মিডিয়ার সবাই মিলে যদি একটু চেষ্টা করতেন, হয়তো আমার সন্তানকে ফিরে পেতাম। ’ উল্লেখ্য, গত বছরের সেপ্টেম্বরে ঢাকা থেকে জামালপুর শুটিং ইউনিটে যাওয়ার পথে দুর্ঘটনায় পড়েন রবিনসহ সাতজন। পিকআপে ঝুঁকিপূর্ণভাবে ইউনিটের সদস্যদের নেওয়ার কারণে সেই দুর্ঘটনা ঘটেছিল।
প্রাঙ্ক কিং-এর কর্ণধার ও পরিচালক আর্থিক সজীবের ইউনিটের হয়ে কাজে গিয়ে রবিন জীবনের এত বড় মূল্য দিলেও, পরবর্তীতে আর কোনো আর্থিক কিংবা মানসিক সাহায্য পাননি বলে জানান। প্রথমদিকে সহায়তার পর আর কেউ খোঁজ নেননি। তবে আজও রবিনের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন, ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া লাইটম্যান অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহিম শাহরিয়ার। তিনিই সার্বক্ষণিক রবিনের খোঁজখবর রাখছেন।
একদিন যারা লাইট হাতে আলোর পেছনে কাজ করেছেন, আজ সেই মানুষটিই জীবনের অন্ধকারে একটু আলোর সন্ধান করছেন। মিডিয়া অঙ্গনের মানবিক সহায়তা আর সামান্য সহানুভূতিই পারে রবিনকে আবার তার ছোট্ট সন্তানকে বুকে জড়িয়ে বাঁচার নতুন পথ দেখাতে।














