4:10 am, Tuesday, 29 September 2026

অ্যাডলফ হিটলারের দেশে পাঁচদিন: ফেরার পথে কঠিন অভিজ্ঞতা

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

জার্মানিতে যাওয়ার ইচ্ছে অনেক আগের। সময় সুযোগ হয়ে ওঠেনি। বার্লিন শহরে বাংলা কাগজ বেস্ট পারফরম্যান্স অ্যাওয়ার্ড ২০২৬ প্রদান অনুষ্ঠানে যাওয়ার দাওয়াত পেয়ে রাজি হয়ে গেলাম। যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন শহর থেকে প্রায় দুই শতাধিক কবি, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সমাজকর্মী যোগ দেবেন এই অনুষ্ঠানে।

আমরা ম্যানচেস্টার থেকে প্রায় পনের জন একসঙ্গে যাওয়ার কথা। দুর্ভাগ্যবশত একসাথে যাওয়া সম্ভব হয়নি। কেউ ভোরে, কেউ দুপুরে আবার কেউ ব্রতের ফ্লাইটে যাওয়া হলো।

আমরা তিনজন আমি (বকুল), জগলু ভাই ও বুলু মামা একসাথে সন্ধ্যার ফ্লাইটে যাওয়ার জন্য এয়ারপোর্টে পৌঁছালাম। এয়ারপোর্টে যোগ দিল সুজন ভাই। আমরা চারজন বার্লিন পৌঁছালাম রাত সাড়ে ১১টায়। এয়ারপোর্টে ট্যাক্সি থাকার কথা, অথচ ট্যাক্সি নেই। প্রায় বিশ মিনিট পর ট্যাক্সি এসে আমাদেরকে নিয়ে গেল আগে থেকে বুক করা হলিহুড মিডিয়া হোটেলে।

রাত তখন প্রায় সাড়ে ১২টা বাজে। অনেক খিদে পেয়েছে। মামুন ভাই সকাল থেকে হোটেলে অবস্থান করছেন। সেই সুবাদে মামুন ভাই আমাদের জন্য দুই প্যাকেট খাবার রেখেছেন-একটাতে ডাল ভাত, অন্যটাতে সবজি ভাত! কী আর করা, এগুলো খেয়ে রাত পার করলাম।

দ্বিতীয় দিন বিকেলে অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠান। সকালে হোটেলের বুফে নাস্তা সেরে আমাদের হাতে আছে নয় ঘণ্টা সময়। আমরা ছয়জনের একটা গ্রুপ হলাম। এই ৯ ঘণ্টা আমরা বার্লিন শহর ঘুরে দেখব। আমি আগে থেকেই বার্লিনের টপ টেন ঘুরে দেখার লিস্ট করে রেখেছি। জগলু ভাই পণ্ডিত মানুষ। ইন্টারনেট দেখা, উবার ডাকা সবই জগলু ভাইয়ের কাজ! তার আগে জার্মান সম্পর্কে কিছু কথা বলে রাখি।

বার্লিন জার্মানির রাজধানী। বার্লিন দেশটির সবচেয়ে বড় শহর। শহরটি স্প্রি নদীর তীরে অবস্থিত। ঐতিহাসিক গুরুত্ব, সংস্কৃতি, শিল্পকলা এবং আধুনিক জীবনযাত্রার জন্য বার্লিন পুরো বিশ্বে অত্যন্ত পরিচিত ও জনপ্রিয়। জার্মানির ঐতিহাসিক ও স্থানীয় নাম হলো ডয়েচল্যান্ড (Deutschland)। প্রাচীনকালে রোমানরা এই অঞ্চলকে জার্মেনিয়া (Germania) বলত।

ইউরোপীয় সমভূমিতে তার অবস্থানের কারণে, বার্লিন একটি নাতিশীতোষ্ণ মৌসুমি জলবায়ু দ্বারা প্রভাবিত হয়। শহরটির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এলাকা বন, উদ্যান, নদী, খাল এবং হ্রদ দ্বারা গঠিত। জার্মানির বর্তমান জনসংখ্যা আনুমানিক সাড়ে আট কোটি। এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সবচেয়ে জনবহুল দেশ। বার্লিন শহরে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা প্রায় পঁয়ত্রিশ লাখ।

আমরা হেঁটে হেঁটে বার্লিন শহরের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো-বার্লিন গেইট, বার্লিন টিভি টাওয়ার, মিউজিয়াম, ইউনিভার্সিটি ও চার্চ দেখে ফেলেছি। সবার হাতে মোঠোফোন। ফটো তোলার কোনো ঝামেলা নেই। আমাদের গ্রুপে একমাত্র মহিলা সদস্য লুবনা। লুবনা আবার পাপ্পুর পার্টনার। বেশিরভাগ ফটোগুলো লুবনা তুলে দিয়ে ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করল।

২৪ আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, সোমবার বিকেলে যোগ দিলাম Melia Hotel International-এ। এর বল রুমে ‘বাংলা কাগজ বেস্ট পারফরম্যান্স অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’ প্রদান অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হলো এই অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ৯ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও ২টি প্রতিষ্ঠানকে বাংলা কাগজ অ্যাওয়ার্ড ২০২৬ প্রদান করা হয়। পুরো অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন রিয়াদ আহাদ ও শামিমা মিতা।

তৃতীয় দিন গন্তব্য ছিল বার্লিন শহর থেকে প্রায় দুইশত মাইল দূরে ড্রেসডেন (Dresden) শহর। শহরটি জার্মানের পূর্বাঞ্চল চেক প্রজাতন্ত্রের সীমানায় এলবে নদীর তীরে মনোরম উপত্যকায় গড়ে উঠেছে। শহরটিকে এর অসাধারণ সুন্দর, প্রাচীন স্থাপত্য ও প্রাকৃতিক দৃশ্যের জন্য ‘এলবের ফ্লোরেন্স’ (ফ্লোরেন্স ইতালির এক অপূর্ব নান্দনিক শহরের নাম) বলা হয়।

প্রাচীন স্থাপত্যকলার এক অপূর্ব নান্দনিক লীলাভূমি ড্রেসডেন সিটি। এই শহরে শত শত বছরের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক নিদর্শন ছড়িয়ে আছে। এখানকার দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো সুইঙ্গার প্যালেস, ঐতিহাসিক বিশ্ববিখ্যাত অপেরা হাউজ, লুথারান গীর্জা, গ্রীন ভল্ট। এছাড়া বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম রাজকীয় রত্ন ভাণ্ডার, জাদুঘর-সহ প্রাচীন স্থাপনা, ইতিহাস-ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর মনোমুগ্ধকর ড্রেসডেন (Dresden) শহর।

দিনটির অন্যতম আনন্দের অংশ ছিল আমাদের দীর্ঘ কোচযাত্রা। আমাদের দলের নেতৃত্বে ছিলেন সাবেক ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী। যিনি বাংলাদেশে ঢাকাস্থ ব্রিটিশ হাইকমিশনে হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি তিনি পেরুতে রাষ্ট্রদূত এবং কেম্যান দ্বীপপুঞ্জের গভর্নর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্ব ছিল অত্যন্ত আন্তরিক। ভ্রমণের আনন্দ আরও বাড়িয়ে দিলেন তিনি নিজেই। আধা ভাঙা সিলেটি বাংলায় কথা বলার ঢং তাঁর মধ্যে বিদ্যমান। লোকগান ও রসিকতায় তিনি পুরো দলের মধ্যে তৈরি করেছিলেন প্রাণবন্ত উচ্ছ্বাস।

গীতিকার ও সুরকার সৈয়দ দুলাল তাঁর প্রিয় কয়েকটি গান পরিবেশন করেন। প্রতিভাবান শিল্পী জিনাত শাফিক, বুলু মামা-সহ দলের আরও অনেকে গানে যোগ দেন। একসময় আমাদের কোচটি যেন পরিণত হয় চলন্ত এক সংগীতের আসরে। গান, হাসি, আড্ডা ও বন্ধুত্বে পুরো পথ হয়ে ওঠে আনন্দময়। যারা ভালো গান করেছেন, আনোয়ার চৌধুরী তাদেরকে বগডুল উপাধিতে সম্মানিত করেন।

আমাদের চালক তিত্বও পুরো যাত্রায় অত্যন্ত বন্ধুত্ব ও সহযোগিতাপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দীর্ঘ যাত্রায় তাঁর আন্তরিক সহযোগিতা বিশেষভাবে প্রশংসনীয়। মামুন ভাই কিপটে মানুষ, সহজে পকেটে হাত দেন না। একরকম তাঁর কাছ থেকে জোর করে আইসক্রিম আদায় করলাম। আইসক্রিম খেতে খেতে বিকেল হয়ে গেল।

সকাল আনুমানিক ১০টায় বার্লিন থেকে যাত্রা শুরু করে রাত সাড়ে ৮টার দিকে আমরা হোটেলে ফিরে আসি। প্রায় সাড়ে ১০ ঘণ্টার এই দীর্ঘ সফর ক্লান্তিকর হলেও আনন্দে পরিপূর্ণ ছিল। এই আনন্দের সবটুকু ক্রেডিটম্যান হলেন সবার প্রিয় আনোয়ার চৌধুরী। ভ্রমণের মাঝে একটি মজার অভিজ্ঞতাও হলো। কিছু জায়গায় শৌচাগার ব্যবহারের জন্য অর্থ দিতে হয়। যুক্তরাজ্য থেকে আসা আমাদের অনেকের কাছেই বিষয়টি ছিল কিছুটা অপ্রত্যাশিত।

পরে আমরা একটি মনোরম ঐতিহাসিক ক্যাফে কুনস্ট অ্যান্টিকের সন্ধান পাই। প্রাচীন সামগ্রীতে সাজানো ক্যাফেটির পরিবেশ ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয়। কফি খাওয়ার পাশাপাশি শৌচাগারের প্রয়োজনেও সেখানে প্রবেশ করি।

চতুর্থ দিন অবশিষ্ট বার্লিন শহর ঘুরে দেখার পালা। আমাদের ছয়জনের দল দু’ভাগে ভাগ হলাম। লুবনা আর পাপ্পু গেল ক্যাবলে বার্লিন দেখবে বলে। আর আমরা চারজন আমি (বকুল), মামুন ভাই, জগলু ভাই ও বুলু মামা যোগ দিলাম বাসে করে বার্লিন দেখব বলে। সকালে হোটেলে বুফে নাস্তা সেরে রওনা হলাম হপ অন হপ অফ (Hop on Hop off) বাসের উদ্দেশে।

আগের দিন আমরা সব খবর নিয়ে রেখেছিলাম। বাসের টিকেট যারা বিক্রি করে সবাই বাঙালি। কথা বলতে সুবিধা হলো। টিকেট কাটলাম প্রায় অর্ধেক দামে। এবার দেখা হলো বার্লিন প্রাচীর, পার্লামেন্ট বিল্ডিং, নান্দনিক রেলওয়ে স্টেশন ও হলোকস্ট ইত্যাদি।

বার্লিন প্রাচীর নিয়ে দুটো কথা বলে রাখি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৫ সালে জার্মান এবং এর রাজধানী বার্লিনকে চারটি ভাগে ভাগ করা হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন পূর্ব অংশ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স পশ্চিম অংশ নিয়ন্ত্রণ করতো। পরবর্তীতে ১৯৪৯ সালে এটি দুটি পৃথক রাষ্ট্রে বিভক্তি হয়-ইস্ট জার্মান ও ওয়েস্ট জার্মান।

সোভিয়েত নিয়ন্ত্রিত পূর্ব জার্মানি থেকে হাজার হাজার মানুষ উন্নত জীবনের আশায় পশ্চিম বার্লিনে পাড়ি জমাচ্ছিল। এই জনস্রোত ও দেশত্যাগ ঠেকাতে পূর্ব জার্মানির কমিউনিস্ট সরকার ১৯৬১ সালে প্রাচীর নির্মাণ শুরু করে যা পশ্চিম ও পূর্ব বার্লিনকে দীর্ঘ আটাশ বছর পৃথক করে রেখেছিল। বার্লিন দেয়ালের দীর্ঘ ছিল ১৫৫ কিলোমিটার। দুই দেওয়ালের মাঝখানের খালি জায়গাকে বলা হতো ‘ডেথ স্ট্রিপ’। সেখানে প্রহরি ও ঘাতক কুকুরের পাশাপাশি গুলিরও নির্দেশ ছিল। দুই জার্মানির মানুষের আন্দোলন ও চাপের মুখে ১৯৮৯ সালে মানুষ প্রাচীর ভেঙে ফেলে। অবশেষে ১৯৯০ সালে দু’ভাগে বিভক্ত জার্মানি পুনরায় একত্রিত হয় এবং এর মধ্যে দিয়ে ‘কোল্ড ওয়ার’-এর অবসান হয়।

পার্লামেন্ট বিল্ডিংয়ের ভেতরের অংশ দেখার জন্য আগে থেকে অনুমতি নিতে হয়। তা আমাদের জানা ছিল না। আমরা চারজনের জন্য পরের দিন দুপুর ১২টার অনুমতিপত্র সংগ্রহ করলাম। বিকেলে বোটে (নৌকায়) করে নদী পথে বার্লিন দেখা। প্রতিজনের টিকিট ২২ (বাইশ) ইউরো। সিনিয়র হলে তা ১৮ ইউরো। আমি কৌশল করে কাউন্টারে বললাম দুজন সিনিয়র আছি– এমনিতেই আট ইউরো কমে গেল।

শেষ দিন (পাঁচ) সকালে নাস্তা সেরে উবার ডেকে রওনা হলাম পার্লামেন্টে বিল্ডিং-এর ভেতরের অংশ দেখব বলে। পুরোনো বিল্ডিংয়ের সাথে নতুন গ্লাস অবকাঠামো সত্যি অসাধারণ স্থাপনায় রূপ নিয়েছে। এককথায় পার্লামেন্ট বিল্ডিংয়ের ভেতরের অংশ অসাধারণ।

দুপুরে ফিরে ভোজন বিলাস-এর নিমন্ত্রণে হাজির হই আমরা প্রায় শতাধিক জন। নানা রকম ভর্তা, বিভিন্ন রকম মজাদার খাবার খেয়ে হোটেলে ফিরি। আমাদেরকে আপ্যায়ন করান ভোজন বিলাসের স্বত্বাধিকারী আবু হানিফ।

পাঁচদিনে ঘুরে দেখা হলো অ্যাডলফ হিটলারের (Adolf Hitler) দেশ। সুনামে-দুর্নামে চ্যান্সেলর হিটলারের শাসন আমল ছিল। এবার বাড়ি ফেরার পথে বিকেল ৫টায় কোচযোগে রওনা হলাম বার্লিন এয়ারপোর্টে। কয়েক ভাগে ভাগ হয়ে যার যার গন্তব্য যাওয়া।

আমাদের আটজনের গ্রুপ ইজিজেট এয়ারলাইন্সে ম্যানচেস্টার ফেরার কথা। ফেরার পথেই শুরু হলো চরম ভোগান্তি। আমাদের EasyJet ফ্লাইট প্রথমে দু’বার বিলম্বিত হয় এবং দীর্ঘ অপেক্ষার পর শেষ পর্যন্ত ফ্লাইটটি বাতিল হয়ে যায়।

সবচেয়ে হতাশার বিষয় হলো– এয়ারপোর্টে EasyJet-এর কোনো হেল্প ডেস্ক বা পর্যাপ্ত তথ্যের ব্যবস্থা ছিল না। যাত্রীদের বলা হচ্ছিল সবকিছু অনলাইনে করতে। কয়েক শতাধিক যাত্রী অদের পরিবার ও প্রিয়জনদের নিয়ে অনিশ্চয়তা ও দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। প্রায় ৬ ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর বাধ্য হয়ে আমরা অন্য এয়ারলাইন্সে অনেক বেশি খরচে নতুন টিকিট কাটি।

আমাদের আরও এক রাত থাকার জন্য মরক্কো থেকে মনসুর ভাইয়ের মেয়ে নাসরিন অনলাইনে হোটেলে চারটি রুম বুকিং করে দেয়। এই পরিস্থিতি শুধু আমাদের নয়, কয়েক শতাধিক মানুষের জীবনকে কঠিন করে দিয়েছে। কারও সন্তান বাড়িতে অপেক্ষা করছে, কারও কর্মস্থলে দায়িত্ব, কারও পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ কাজ, আবার কেউ হয়তো প্রিয়জনের কাছে ফেরার জন্য অধীর অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন। সত্যি করে যদি বলি, EasyJet আমাদের যাত্রাকে অনেক কঠিন করে দিয়েছে। Shame on EasyJet!

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

Nagorik Sangram

Popular Post

দেশে হামের উপসর্গে আরও তিনজনের মৃত্যু, মোট প্রাণহানি বেড়ে ১০৯৯

অ্যাডলফ হিটলারের দেশে পাঁচদিন: ফেরার পথে কঠিন অভিজ্ঞতা

Update Time : 03:12:15 am, Tuesday, 29 September 2026

জার্মানিতে যাওয়ার ইচ্ছে অনেক আগের। সময় সুযোগ হয়ে ওঠেনি। বার্লিন শহরে বাংলা কাগজ বেস্ট পারফরম্যান্স অ্যাওয়ার্ড ২০২৬ প্রদান অনুষ্ঠানে যাওয়ার দাওয়াত পেয়ে রাজি হয়ে গেলাম। যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন শহর থেকে প্রায় দুই শতাধিক কবি, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সমাজকর্মী যোগ দেবেন এই অনুষ্ঠানে।

আমরা ম্যানচেস্টার থেকে প্রায় পনের জন একসঙ্গে যাওয়ার কথা। দুর্ভাগ্যবশত একসাথে যাওয়া সম্ভব হয়নি। কেউ ভোরে, কেউ দুপুরে আবার কেউ ব্রতের ফ্লাইটে যাওয়া হলো।

আমরা তিনজন আমি (বকুল), জগলু ভাই ও বুলু মামা একসাথে সন্ধ্যার ফ্লাইটে যাওয়ার জন্য এয়ারপোর্টে পৌঁছালাম। এয়ারপোর্টে যোগ দিল সুজন ভাই। আমরা চারজন বার্লিন পৌঁছালাম রাত সাড়ে ১১টায়। এয়ারপোর্টে ট্যাক্সি থাকার কথা, অথচ ট্যাক্সি নেই। প্রায় বিশ মিনিট পর ট্যাক্সি এসে আমাদেরকে নিয়ে গেল আগে থেকে বুক করা হলিহুড মিডিয়া হোটেলে।

রাত তখন প্রায় সাড়ে ১২টা বাজে। অনেক খিদে পেয়েছে। মামুন ভাই সকাল থেকে হোটেলে অবস্থান করছেন। সেই সুবাদে মামুন ভাই আমাদের জন্য দুই প্যাকেট খাবার রেখেছেন-একটাতে ডাল ভাত, অন্যটাতে সবজি ভাত! কী আর করা, এগুলো খেয়ে রাত পার করলাম।

দ্বিতীয় দিন বিকেলে অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠান। সকালে হোটেলের বুফে নাস্তা সেরে আমাদের হাতে আছে নয় ঘণ্টা সময়। আমরা ছয়জনের একটা গ্রুপ হলাম। এই ৯ ঘণ্টা আমরা বার্লিন শহর ঘুরে দেখব। আমি আগে থেকেই বার্লিনের টপ টেন ঘুরে দেখার লিস্ট করে রেখেছি। জগলু ভাই পণ্ডিত মানুষ। ইন্টারনেট দেখা, উবার ডাকা সবই জগলু ভাইয়ের কাজ! তার আগে জার্মান সম্পর্কে কিছু কথা বলে রাখি।

বার্লিন জার্মানির রাজধানী। বার্লিন দেশটির সবচেয়ে বড় শহর। শহরটি স্প্রি নদীর তীরে অবস্থিত। ঐতিহাসিক গুরুত্ব, সংস্কৃতি, শিল্পকলা এবং আধুনিক জীবনযাত্রার জন্য বার্লিন পুরো বিশ্বে অত্যন্ত পরিচিত ও জনপ্রিয়। জার্মানির ঐতিহাসিক ও স্থানীয় নাম হলো ডয়েচল্যান্ড (Deutschland)। প্রাচীনকালে রোমানরা এই অঞ্চলকে জার্মেনিয়া (Germania) বলত।

ইউরোপীয় সমভূমিতে তার অবস্থানের কারণে, বার্লিন একটি নাতিশীতোষ্ণ মৌসুমি জলবায়ু দ্বারা প্রভাবিত হয়। শহরটির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এলাকা বন, উদ্যান, নদী, খাল এবং হ্রদ দ্বারা গঠিত। জার্মানির বর্তমান জনসংখ্যা আনুমানিক সাড়ে আট কোটি। এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সবচেয়ে জনবহুল দেশ। বার্লিন শহরে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা প্রায় পঁয়ত্রিশ লাখ।

আমরা হেঁটে হেঁটে বার্লিন শহরের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো-বার্লিন গেইট, বার্লিন টিভি টাওয়ার, মিউজিয়াম, ইউনিভার্সিটি ও চার্চ দেখে ফেলেছি। সবার হাতে মোঠোফোন। ফটো তোলার কোনো ঝামেলা নেই। আমাদের গ্রুপে একমাত্র মহিলা সদস্য লুবনা। লুবনা আবার পাপ্পুর পার্টনার। বেশিরভাগ ফটোগুলো লুবনা তুলে দিয়ে ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করল।

২৪ আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, সোমবার বিকেলে যোগ দিলাম Melia Hotel International-এ। এর বল রুমে ‘বাংলা কাগজ বেস্ট পারফরম্যান্স অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’ প্রদান অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হলো এই অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ৯ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও ২টি প্রতিষ্ঠানকে বাংলা কাগজ অ্যাওয়ার্ড ২০২৬ প্রদান করা হয়। পুরো অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন রিয়াদ আহাদ ও শামিমা মিতা।

তৃতীয় দিন গন্তব্য ছিল বার্লিন শহর থেকে প্রায় দুইশত মাইল দূরে ড্রেসডেন (Dresden) শহর। শহরটি জার্মানের পূর্বাঞ্চল চেক প্রজাতন্ত্রের সীমানায় এলবে নদীর তীরে মনোরম উপত্যকায় গড়ে উঠেছে। শহরটিকে এর অসাধারণ সুন্দর, প্রাচীন স্থাপত্য ও প্রাকৃতিক দৃশ্যের জন্য ‘এলবের ফ্লোরেন্স’ (ফ্লোরেন্স ইতালির এক অপূর্ব নান্দনিক শহরের নাম) বলা হয়।

প্রাচীন স্থাপত্যকলার এক অপূর্ব নান্দনিক লীলাভূমি ড্রেসডেন সিটি। এই শহরে শত শত বছরের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক নিদর্শন ছড়িয়ে আছে। এখানকার দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো সুইঙ্গার প্যালেস, ঐতিহাসিক বিশ্ববিখ্যাত অপেরা হাউজ, লুথারান গীর্জা, গ্রীন ভল্ট। এছাড়া বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম রাজকীয় রত্ন ভাণ্ডার, জাদুঘর-সহ প্রাচীন স্থাপনা, ইতিহাস-ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর মনোমুগ্ধকর ড্রেসডেন (Dresden) শহর।

দিনটির অন্যতম আনন্দের অংশ ছিল আমাদের দীর্ঘ কোচযাত্রা। আমাদের দলের নেতৃত্বে ছিলেন সাবেক ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী। যিনি বাংলাদেশে ঢাকাস্থ ব্রিটিশ হাইকমিশনে হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি তিনি পেরুতে রাষ্ট্রদূত এবং কেম্যান দ্বীপপুঞ্জের গভর্নর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্ব ছিল অত্যন্ত আন্তরিক। ভ্রমণের আনন্দ আরও বাড়িয়ে দিলেন তিনি নিজেই। আধা ভাঙা সিলেটি বাংলায় কথা বলার ঢং তাঁর মধ্যে বিদ্যমান। লোকগান ও রসিকতায় তিনি পুরো দলের মধ্যে তৈরি করেছিলেন প্রাণবন্ত উচ্ছ্বাস।

গীতিকার ও সুরকার সৈয়দ দুলাল তাঁর প্রিয় কয়েকটি গান পরিবেশন করেন। প্রতিভাবান শিল্পী জিনাত শাফিক, বুলু মামা-সহ দলের আরও অনেকে গানে যোগ দেন। একসময় আমাদের কোচটি যেন পরিণত হয় চলন্ত এক সংগীতের আসরে। গান, হাসি, আড্ডা ও বন্ধুত্বে পুরো পথ হয়ে ওঠে আনন্দময়। যারা ভালো গান করেছেন, আনোয়ার চৌধুরী তাদেরকে বগডুল উপাধিতে সম্মানিত করেন।

আমাদের চালক তিত্বও পুরো যাত্রায় অত্যন্ত বন্ধুত্ব ও সহযোগিতাপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দীর্ঘ যাত্রায় তাঁর আন্তরিক সহযোগিতা বিশেষভাবে প্রশংসনীয়। মামুন ভাই কিপটে মানুষ, সহজে পকেটে হাত দেন না। একরকম তাঁর কাছ থেকে জোর করে আইসক্রিম আদায় করলাম। আইসক্রিম খেতে খেতে বিকেল হয়ে গেল।

সকাল আনুমানিক ১০টায় বার্লিন থেকে যাত্রা শুরু করে রাত সাড়ে ৮টার দিকে আমরা হোটেলে ফিরে আসি। প্রায় সাড়ে ১০ ঘণ্টার এই দীর্ঘ সফর ক্লান্তিকর হলেও আনন্দে পরিপূর্ণ ছিল। এই আনন্দের সবটুকু ক্রেডিটম্যান হলেন সবার প্রিয় আনোয়ার চৌধুরী। ভ্রমণের মাঝে একটি মজার অভিজ্ঞতাও হলো। কিছু জায়গায় শৌচাগার ব্যবহারের জন্য অর্থ দিতে হয়। যুক্তরাজ্য থেকে আসা আমাদের অনেকের কাছেই বিষয়টি ছিল কিছুটা অপ্রত্যাশিত।

পরে আমরা একটি মনোরম ঐতিহাসিক ক্যাফে কুনস্ট অ্যান্টিকের সন্ধান পাই। প্রাচীন সামগ্রীতে সাজানো ক্যাফেটির পরিবেশ ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয়। কফি খাওয়ার পাশাপাশি শৌচাগারের প্রয়োজনেও সেখানে প্রবেশ করি।

চতুর্থ দিন অবশিষ্ট বার্লিন শহর ঘুরে দেখার পালা। আমাদের ছয়জনের দল দু’ভাগে ভাগ হলাম। লুবনা আর পাপ্পু গেল ক্যাবলে বার্লিন দেখবে বলে। আর আমরা চারজন আমি (বকুল), মামুন ভাই, জগলু ভাই ও বুলু মামা যোগ দিলাম বাসে করে বার্লিন দেখব বলে। সকালে হোটেলে বুফে নাস্তা সেরে রওনা হলাম হপ অন হপ অফ (Hop on Hop off) বাসের উদ্দেশে।

আগের দিন আমরা সব খবর নিয়ে রেখেছিলাম। বাসের টিকেট যারা বিক্রি করে সবাই বাঙালি। কথা বলতে সুবিধা হলো। টিকেট কাটলাম প্রায় অর্ধেক দামে। এবার দেখা হলো বার্লিন প্রাচীর, পার্লামেন্ট বিল্ডিং, নান্দনিক রেলওয়ে স্টেশন ও হলোকস্ট ইত্যাদি।

বার্লিন প্রাচীর নিয়ে দুটো কথা বলে রাখি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৫ সালে জার্মান এবং এর রাজধানী বার্লিনকে চারটি ভাগে ভাগ করা হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন পূর্ব অংশ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স পশ্চিম অংশ নিয়ন্ত্রণ করতো। পরবর্তীতে ১৯৪৯ সালে এটি দুটি পৃথক রাষ্ট্রে বিভক্তি হয়-ইস্ট জার্মান ও ওয়েস্ট জার্মান।

সোভিয়েত নিয়ন্ত্রিত পূর্ব জার্মানি থেকে হাজার হাজার মানুষ উন্নত জীবনের আশায় পশ্চিম বার্লিনে পাড়ি জমাচ্ছিল। এই জনস্রোত ও দেশত্যাগ ঠেকাতে পূর্ব জার্মানির কমিউনিস্ট সরকার ১৯৬১ সালে প্রাচীর নির্মাণ শুরু করে যা পশ্চিম ও পূর্ব বার্লিনকে দীর্ঘ আটাশ বছর পৃথক করে রেখেছিল। বার্লিন দেয়ালের দীর্ঘ ছিল ১৫৫ কিলোমিটার। দুই দেওয়ালের মাঝখানের খালি জায়গাকে বলা হতো ‘ডেথ স্ট্রিপ’। সেখানে প্রহরি ও ঘাতক কুকুরের পাশাপাশি গুলিরও নির্দেশ ছিল। দুই জার্মানির মানুষের আন্দোলন ও চাপের মুখে ১৯৮৯ সালে মানুষ প্রাচীর ভেঙে ফেলে। অবশেষে ১৯৯০ সালে দু’ভাগে বিভক্ত জার্মানি পুনরায় একত্রিত হয় এবং এর মধ্যে দিয়ে ‘কোল্ড ওয়ার’-এর অবসান হয়।

পার্লামেন্ট বিল্ডিংয়ের ভেতরের অংশ দেখার জন্য আগে থেকে অনুমতি নিতে হয়। তা আমাদের জানা ছিল না। আমরা চারজনের জন্য পরের দিন দুপুর ১২টার অনুমতিপত্র সংগ্রহ করলাম। বিকেলে বোটে (নৌকায়) করে নদী পথে বার্লিন দেখা। প্রতিজনের টিকিট ২২ (বাইশ) ইউরো। সিনিয়র হলে তা ১৮ ইউরো। আমি কৌশল করে কাউন্টারে বললাম দুজন সিনিয়র আছি– এমনিতেই আট ইউরো কমে গেল।

শেষ দিন (পাঁচ) সকালে নাস্তা সেরে উবার ডেকে রওনা হলাম পার্লামেন্টে বিল্ডিং-এর ভেতরের অংশ দেখব বলে। পুরোনো বিল্ডিংয়ের সাথে নতুন গ্লাস অবকাঠামো সত্যি অসাধারণ স্থাপনায় রূপ নিয়েছে। এককথায় পার্লামেন্ট বিল্ডিংয়ের ভেতরের অংশ অসাধারণ।

দুপুরে ফিরে ভোজন বিলাস-এর নিমন্ত্রণে হাজির হই আমরা প্রায় শতাধিক জন। নানা রকম ভর্তা, বিভিন্ন রকম মজাদার খাবার খেয়ে হোটেলে ফিরি। আমাদেরকে আপ্যায়ন করান ভোজন বিলাসের স্বত্বাধিকারী আবু হানিফ।

পাঁচদিনে ঘুরে দেখা হলো অ্যাডলফ হিটলারের (Adolf Hitler) দেশ। সুনামে-দুর্নামে চ্যান্সেলর হিটলারের শাসন আমল ছিল। এবার বাড়ি ফেরার পথে বিকেল ৫টায় কোচযোগে রওনা হলাম বার্লিন এয়ারপোর্টে। কয়েক ভাগে ভাগ হয়ে যার যার গন্তব্য যাওয়া।

আমাদের আটজনের গ্রুপ ইজিজেট এয়ারলাইন্সে ম্যানচেস্টার ফেরার কথা। ফেরার পথেই শুরু হলো চরম ভোগান্তি। আমাদের EasyJet ফ্লাইট প্রথমে দু’বার বিলম্বিত হয় এবং দীর্ঘ অপেক্ষার পর শেষ পর্যন্ত ফ্লাইটটি বাতিল হয়ে যায়।

সবচেয়ে হতাশার বিষয় হলো– এয়ারপোর্টে EasyJet-এর কোনো হেল্প ডেস্ক বা পর্যাপ্ত তথ্যের ব্যবস্থা ছিল না। যাত্রীদের বলা হচ্ছিল সবকিছু অনলাইনে করতে। কয়েক শতাধিক যাত্রী অদের পরিবার ও প্রিয়জনদের নিয়ে অনিশ্চয়তা ও দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। প্রায় ৬ ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর বাধ্য হয়ে আমরা অন্য এয়ারলাইন্সে অনেক বেশি খরচে নতুন টিকিট কাটি।

আমাদের আরও এক রাত থাকার জন্য মরক্কো থেকে মনসুর ভাইয়ের মেয়ে নাসরিন অনলাইনে হোটেলে চারটি রুম বুকিং করে দেয়। এই পরিস্থিতি শুধু আমাদের নয়, কয়েক শতাধিক মানুষের জীবনকে কঠিন করে দিয়েছে। কারও সন্তান বাড়িতে অপেক্ষা করছে, কারও কর্মস্থলে দায়িত্ব, কারও পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ কাজ, আবার কেউ হয়তো প্রিয়জনের কাছে ফেরার জন্য অধীর অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন। সত্যি করে যদি বলি, EasyJet আমাদের যাত্রাকে অনেক কঠিন করে দিয়েছে। Shame on EasyJet!