ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় তিতাস নদীর ওপর প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন সেতুর কাজ ছয় বছরেও শেষ হয়নি। নির্ধারিত মেয়াদের দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কাজ অসম্পূর্ণ থাকায় চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন আশপাশের কয়েকটি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ।
প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাদের নৌকায় নদী পারাপার হতে হচ্ছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ধরখার ইউনিয়নের কৃষ্ণনগর গ্রামে তিতাস নদীর ওপর ২০৮ মিটার দীর্ঘ এই সেতুটির নির্মাণকাজ ২০২০ সালের অক্টোবরে শুরু হয়। প্রায় ১৯ কোটি ২ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুটির কাজ ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে শেষ করে চালু হওয়ার কথা ছিল। তবে নির্ধারিত সময় পার হয়ে আরও তিন বছরের বেশি সময় অতিবাহিত হলেও এখনো কাজ শেষ হয়নি।
মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স হাসান এন্টারপ্রাইজ হলেও বর্তমানে এই কাজ করছে সাব-ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স রবিন এন্টারপ্রাইজ। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, সেতুর মাঝের ৪৪ মিটার দীর্ঘ মূল স্প্যানের কাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। পাশাপাশি দুই পাশের অ্যাপ্রোচ সড়ক, রেলিং ও ডেক স্ল্যাবসহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাকি রয়েছে। এর মধ্যে দীর্ঘ সময় নির্মাণকাজ বন্ধও ছিল।
সেতুটি চালু না হওয়ায় কৃষ্ণনগর, ভবানীপুর, বনগজ ও বরিশলসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দাদের একমাত্র ভরসা এখন নৌকা। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, রোগী, নারী ও কৃষকদের দুর্ভোগের শেষ নেই। সন্ধ্যার পর নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে দুপাড়ের যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। স্থানীয় বৃদ্ধ আব্দুল খালেক বলেন, কৃষ্ণনগর গ্রামে প্রায় এক হাজার মানুষের বসবাস।
সেতুর নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় আমাদের চলাচলে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় ছেলে-মেয়ের বিয়ে-শাদি দিতেও লজ্জায় পড়তে হয়। উপজেলা সদরে যেতে অনেক পথ ঘুরে যেতে হয়। আমরা খুব কষ্টে আছি। আরেক বৃদ্ধ রুক্কু মিয়া বলেন, নদীর পানির ভয়ে শিশুরা স্কুলে যেতে চায় না। সেতুটি নির্মাণ করা হলে হাজারো মানুষের যাতায়াত সহজ হবে।
এই সেতু দেখার অপেক্ষায় থেকে গ্রামের অনেক মুরব্বি মৃত্যুবরণ করেছেন। অথচ এখনো সেতুর কাজ শেষ হয়নি! গৃহবধূ নাসিমা বেগম বলেন, সেতু না থাকায় নদী পারাপারে নারী ও শিশুদের খুব কষ্ট হয়। বিশেষ করে ছেলে-মেয়েদের স্কুলে যাতায়াতে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়। স্কুলছাত্রী ফাহমিদা সুলতানা বলেন, নৌকায় নদী পার হয়ে স্কুলে যাওয়া খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।
প্রতিদিন ভয় নিয়ে যাতায়াত করতে হয়। সেতুটি নির্মাণ হলে আমাদের অনেক উপকার হবে। এদিকে দীর্ঘদিন ধরে কাজ ঝুলে থাকায় জনমনে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। দ্রুত সব জটিলতা নিরসন করে সেতুটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে জনসাধারণের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী। এদিকে কাজ দ্রুত শেষ করতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দিয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)।
উপজেলা প্রকৌশলী মো. আমিনুল ইসলাম সুমন জানান, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকবল ও নির্মাণসামগ্রীর সংকট এবং ভূমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত কিছু সমস্যার কারণে কাজ ব্যাহত হয়েছে। জেলা কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আগামী ছয় মাসের মধ্যে কাজ শেষের আশ্বাস দেওয়ায় বর্তমানে পুনরায় কাজ শুরু হয়েছে। তবে সিআইবি প্রজেক্টের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অ্যাসিস্ট্যান্ট ফিল্ড ইঞ্জিনিয়ার রাজিব কুমার ও সাব-ঠিকাদার রবিউল ইসলাম দাবি করেন, ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতার কারণেই মূলত কাজ দীর্ঘায়িত হয়েছে।
ওই এলাকায় খাস জমি না থাকায় ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির মালিকরা ক্ষতিপূরণের টাকা না পাওয়ায় কাজ করতে বাধা দিচ্ছেন। অধিগ্রহণের টাকা পরিশোধ ও প্রক্রিয়া শেষ হলে বাকি কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।










