ভিটামিন সি যে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে, ত্বকের যত্ন নিতে এবং আয়রন শোষণ করতে দারুণ কার্যকরী—তা আমরা সবাই জানি। তবে সম্প্রতি জাপানের হিরোসাকি ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক চমকপ্রদ এক তথ্য সামনে এনেছেন।
তারা জানিয়েছেন, ভিটামিন সি কেবল শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখতেই সাহায্য করে না, এটি সরাসরি আমাদের মস্তিষ্কের বয়স ধরে রাখতে এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক জার্নাল পিএলওএস ওয়ান-এ প্রকাশিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, রক্তে ভিটামিন সি-এর অভাবের সঙ্গে মস্তিষ্কের দ্রুত বুড়িয়ে যাওয়া এবং এর কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার একটি সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মস্তিষ্কে স্বাভাবিকভাবেই কিছু পরিবর্তন আসে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের কিছু অংশ সংকুচিত হয়ে যায় (যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘অ্যাট্রোফি’ বলা হয়) এবং মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের পারস্পরিক যোগাযোগ ধীর হয়ে পড়ে। তবে আগের গবেষণাগুলো মূলত মানুষ প্রতিদিন কী পরিমাণ ভিটামিন সি খাচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করে করা হতো।
কিন্তু এবারই প্রথম জাপানি গবেষকরা নিখুঁত ফলাফলের জন্য ৬৪ বছরের ঊর্ধ্বের ২,০৪৪ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের রক্তের নমুনা থেকে সরাসরি ভিটামিন সি-এর মাত্রা পরীক্ষা করেন। একই সঙ্গে তাদের মস্তিষ্কের উচ্চ-রেজোলিউশনের এমআরআই স্ক্যান করা হয়। অংশগ্রহণকারীদের বয়স, লিঙ্গ, চিকিৎসা ইতিহাস (যেমন- উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিস) এবং জীবনযাত্রার অভ্যাস (যেমন- ধূমপান ও ব্যায়াম) বিবেচনা করার পরও এই ফলাফল অপরিবর্তিত থাকে।
গবেষণার প্রধান ৪টি দিক
মস্তিষ্কের ‘গ্রে ম্যাটার’ রক্ষা করে: রক্তে উচ্চ মাত্রার ভিটামিন সি-এর সঙ্গে মস্তিষ্কের ‘গ্রে ম্যাটার’ বা ধূসর পদার্থের ঘনত্বের সরাসরি ইতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
মস্তিষ্কের এই অংশটি মূলত তথ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, স্মৃতিশক্তি এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো জটিল কাজগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। যাদের রক্তে ভিটামিন সি কম ছিল, তাদের গ্রে ম্যাটারের পরিমাণও কম দেখা গেছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থা শক্তিশালী করে: আমাদের মস্তিষ্ক যখন বিশ্রামে থাকে, দিবাস্বপ্ন দেখে বা পুরোনো স্মৃতি রোমন্থন করে, তখন ‘ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্ক’ (ডিএমএন) নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ মাধ্যম সক্রিয় থাকে।
অ্যালঝেইমার্সের মতো জটিল রোগে এই নেটওয়ার্কটিই সবার আগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমআরআই স্ক্যানে দেখা গেছে, যাদের শরীরে পর্যাপ্ত ভিটামিন সি রয়েছে, তাদের এই ডিএমএন নেটওয়ার্কটি অনেক বেশি শক্তিশালী ও সুগঠিত।অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকিতেও কার্যকরী: গবেষণায় দেখা গেছে, একজন মানুষের উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিস থাকুক কিংবা তিনি ধূমপানের অভ্যাসে অভ্যস্ত হোন না কেন—শরীরে ভিটামিন সি-এর মাত্রা ঠিক থাকলে তা অন্যান্য ক্ষতি কাটিয়ে মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখতে স্বাধীনভাবে কাজ করে।
ক্ষতি পূরণে সমকক্ষ: গবেষকদের মতে, মস্তিষ্কের ওপর ভিটামিন সি-এর এই সুরক্ষাকবচের প্রভাব হয়তো আপাতদৃষ্টিতে অল্প মনে হতে পারে। তবে এর কার্যকারিতা ঠিক ততটাই শক্তিশালী, যতটা শক্তিশালীভাবে উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিস আমাদের মস্তিষ্কের ক্ষতি করে। অর্থাৎ, এটি ক্ষতিকারক উপাদানগুলোর বিরুদ্ধে সমানতালে লড়াই করতে পারে।
পুষ্টিবিদ ও গবেষকদের পরামর্শ
ভিটামিন সি মূলত একটি শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, যা মস্তিষ্কের কোষগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া থেকে বাঁচায়। যেহেতু আমাদের শরীর নিজে থেকে ভিটামিন সি তৈরি বা জমা রাখতে পারে না, তাই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার রাখা অত্যন্ত জরুরি।
প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় লেবু, কমলা, মাল্টা, ব্রকলি, ক্যাপসিকাম ও স্ট্রবেরির মতো ফল ও সবজি রাখার মাধ্যমে খুব সহজেই রক্তে ভিটামিন সি-এর আদর্শ মাত্রা বজায় রাখা সম্ভব। গবেষকদের মতে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কের গঠন ঠিক রাখতে এবং স্মৃতিশক্তি অটুট রাখতে প্রতিদিনের এই সামান্য পুষ্টিকর অভ্যাসটিই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে সহজ ও কার্যকরী উপায় হতে পারে।
সূত্র: এনডিটিভি





















