দিনের বেশিরভাগ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে নীলফামারীর সৈয়দপুরের ঐতিহ্যবাহী শিল্পাঞ্চল। চাহিদার তুলনায় কম বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং দিনে প্রায় ৬ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের কারণে ইতোমধ্যে উপজেলার কয়েকশত শিল্পকারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
এতে কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন প্রায় এক লাখ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ শ্রমিক। উৎপাদন অর্ধেকে নেমে যাওয়ায় চরম লোকসান ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্পের (সিএমএসএমই) উদ্যোক্তারা। শহরের গোলাহাট এলাকার হালকা প্রকৌশল কারখানার শ্রমিক মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘দিনের বেশিরভাগ সময় কারেন্ট থাকছে না। কারখানার মালিকরা বাধ্য হয়ে কারখানা বন্ধ রাখছেন।
হাতে কাজকর্ম নেই, সংসার কেমন করে চালাব বুঝতে পারছি না। ’ তার মতো উপজেলার বিভিন্ন কারখানার বহু শ্রমিক এখন কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। জানা গেছে, সৈয়দপুরের বিসিক শিল্পনগরীতে ১৭টি খাদ্য ও খাদ্যজাত, ১৫টি রসায়ন, ১১টি হালকা প্রকৌশল, তিনটি পাট ও পাটজাত এবং তিনটি বনজ শিল্পসহ মোট ৪৯টি কারখানা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে এবং কাজ করছেন ৬ হাজার নারী-পুরুষ।
এই শিল্পনগর থেকে প্রতি বছর গড়ে ১৫০ কোটি টাকার পণ্য রপ্তানি হয় এবং উদ্যোক্তারা সরকারকে প্রায় ৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকার রাজস্ব দিয়ে থাকেন। এ ছাড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে প্রায় সাড়ে ৪০০ হালকা প্রকৌশল কারখানা। এগুলো রেলওয়ে ও বিভিন্ন খাতের খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরি করে উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। আমদানি-নির্ভরতা কমিয়ে প্রায় ২০০ ধরনের সরঞ্জাম উৎপাদিত হচ্ছে এসব কারখানায়।
পাশাপাশি এখানে রপ্তানিমুখী প্রায় ৩০০ ক্ষুদ্র পোশাক কারখানা রয়েছে, যেখান থেকে তৈরি পোশাক ভারত ও নেপালসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়। সব মিলিয়ে উপজেলায় প্রায় এক হাজার শিল্পকারখানা রয়েছে, যার ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করেন প্রায় এক লাখ মানুষ। কিন্তু বর্তমান বিদ্যুৎ বিপর্যয়ে এই পুরো অর্থনীতিই স্থবির হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে। সরেজমিনে শহরের শহিদ জহুরুল, বঙ্গবন্ধু সড়ক, বাস টার্মিনাল, আতিয়ার কলোনি ও মুন্সিপাড়া এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সারি সারি কারখানাগুলোতে নেই কোনো মেশিনের আওয়াজ।
শ্রমিকেরা অলস সময় পার করছেনÑ কেউ মোবাইল ফোনে ব্যস্ত, আবার কেউ বা বসে লুডু খেলছেন। শহরের মুন্সিপাড়ার সারা ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসপের মালিক আসিফ আহমেদ জানান, তার কারখানা খোলা থাকে সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত। এই ৯ ঘণ্টার মধ্যে ৫ থেকে ৬ বার লোডশেডিং হয়। ঘন ঘন বিদ্যুৎ যাওয়ার কারণে তার একটি মূল্যবান মেশিন নষ্ট হয়ে পড়ে রয়েছে এবং উৎপাদন অর্ধেকে নেমে গেছে।
বাস টার্মিনাল এলাকার রয়েল মেটালিক্স ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাজ কুমার পোদ্দার জানান, তার প্রতিষ্ঠানে প্রেসার কুকার, রাইস কুকার, ওভেন, ফ্রাইপ্যান ও স্টিল-অ্যালুমিনিয়ামের জিনিসপত্র তৈরি হয়। কিন্তু অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহের কারণে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ক্ষুদ্র গার্মেন্টস কারখানা এম আর ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী মতিয়ার রহমান দুলু জানান, ভারত ও নেপালে পোশাক রপ্তানির চুক্তি থাকলেও লোডশেডিংয়ের কারণে যথাসময়ে পণ্য সরবরাহ নিয়ে তিনি চরম দুশ্চিন্তায় আছেন।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, যত্রতত্র ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অবাধ বিচরণের কারণে এই বিদ্যুৎ সংকট প্রকট রূপ নিয়েছে। একটি অটোরিকশায় প্রতিদিন যে পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ হয়, তা দিয়ে একটি কারখানা ও তিনটি বাড়ির কাজ চালানো সম্ভব। এ বিষয়ে নর্দার্ন ইলেকট্রিক সাপ্লাই পিএলসির (নেসকো) সৈয়দপুর বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী আলিমুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘সৈয়দপুরে ৬১ হাজার গ্রাহকের ৪৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে এখন বিদ্যুৎ মিলছে মাত্র ৩৬ মেগাওয়াট।
এর সঙ্গে অটোরিকশায় চার্জ দেওয়ায় অর্ধেক বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে অটোরিকশার বিকল্প কোনো ব্যবস্থা করা না হলে এই সংকট নিরসন করা কঠিন।
















