মফস্বলী লেখকদের ব্যাপারে মহানাগরিক লেখকদের মনোভাব অনেকটা পিঠ চাপড়ানো গোছের। মহানাগরিকেরা চেতনে বা অবচেতনে মফস্বলিদের খানিকটা কৃপাপাত্র বলে মনে করেন হয়তো। প্রতিভা শুধু মহানগরের পিচঢালা রাজপথে ছড়িয়ে ছিটিয়ে নেই, মফস্বলের কাঁচা রাস্তার ধুলোর মধ্যেও যে অনেক মণি রত্ন লুকিয়ে আছে, সেটা মহানাগরিকেরা হয়তো জেনেও জানেন না।
এতসব কথা দিয়ে গৌরচন্দ্রিকা করলাম আমাদের প্রিয় মফস্বলগন্ধী মহানগর চট্টগ্রামের একজন কুশলী কথাকার কামরুল হাসান বাদলের লেখা অসামান্য কিছু ছোটগল্প নিয়ে আলোচনার আগে, প্রকৃত সোনা চিনতে আমাদের কষ্টি পাথরের ব্যর্থতা নিয়ে কিঞ্চিৎ খেদ প্রকাশের জন্যে। কামরুল হাসান বাদলের জন্ম চট্টগ্রামে ১৯৬১ সালে। তরুণ বয়স থেকে ফটোগ্রাফির পাশাপাশি লেখালেখি করে আসছেন তিনি।
গত চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এদেশের, এ শহরের সকল প্রগতিমুখী, মানবিকতাবাদী, স্বৈরাচার, সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় জঙ্গিবাদ-বিরোধী সকল আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি সদাসক্রিয়ভাবে অন্যতম অগ্রণীর ভূমিকা পালন করে আসছেন। জীবনের ছয়টি দশকের সৌম্য অথচ অগ্নিগর্ভ পদচারণায় ঋদ্ধ মানুষটি যখন গল্প বলতে বসেন, তখন কান পেতে বামন পেতে শুনতে হয় বইকি।
বড়দের আর ছোটদের জন্যে বাদল সমতালে সাড়া জাগানো ছড়া আর কবিতা লিখে আসছেন বিগত শতকের আশির দশক থেকে। ইতোমধ্যে তার গোটা তিন ছড়ার বই বেরিয়ে তুমুল পাঠকপ্রিয় হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রকাশিত তাঁর তিনটি কবিতার বই ও সুধিজনের নজর কেড়েছে। প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট হিসেবেও তাঁর নামডাক আছে। তার চারটি প্রবন্ধ গ্রন্থও ইতোমধ্যে প্রকাশিত ও বহুল পঠিত হয়ে প্রবন্ধকার হিসেবে তার সামর্থ্যরে পরিচয় দিয়েছে।
কামরুল হাসান বাদল রচিত ছোটগল্পের সাথে অবশ্য আমাদের প্রথম পরিচয় হয়েছে ২০২১ সালে ছোটদের জন্যে তাঁর লেখা গল্পের বই ‘কাকবন্ধু আর লকডাউন’-এর সুবাদে। নাম শুনেই নিশ্চয় বোঝা যাচ্ছে, এটা করোনা মহামারী চলার সময়কার গল্পের বই। এর পর একেবারে সাম্প্রতিক সময়ে এসে প্রকাশিত হয়েছে পরিণত বয়স্ক ও মনস্কদের জন্যে লেখা তাঁর দুটি অনবদ্য গল্পগ্রন্থ ‘খুন ও হুইসেল’ (২০২৪) এবং ‘সুনীলের কুকুরটা’ (২০২৫)।
বই দুটি নিয়ে কিছু বলার অভিপ্রায়ে আজকের এ লেখার অবতারণা। দুটি বইয়ে আমরা বাদলের মোট উনিশটা গল্প পেয়েছি— প্রথমোক্তটাতে নয়টা এবং দ্বিতীয়টাতে দশটা। প্রায় প্রতিটি গল্পই সুপাঠ্য। জাদুবাস্তবতার ফোড়ন অবশ্য নিজের লেখায় বাদল আজকালকার অনেক মাঠ কাঁপানো তরুণ (বয়সে নয়) তুর্কি গল্পকারের মতো সরাসরি ‘চেতনা প্রবাহ’ রীতি অনুসরণের বা ‘জাদু বাস্তবতা’র অবতারণার দাবি করে বসবেন, তাঁর গল্প পড়ে সেটা মনে হয় না।
জীবনের বাস্তবতার নানা দিক তিনি তুলে ধরেছেন সহজভাষায়, সহজ ভঙ্গিতে, অথচ তার ভিতরেই কোনো এক ফাঁকে হয়তোবা ঢুকে পড়েছে একফোঁটা যাদু বাস্তবতা, যেখানে সেটাকে মোটেও বেমানান মনে হচ্ছে না। বরং বিবাদী স্বর যুক্ত হয়ে যেমন কোনো রাগের মাধুর্যকে বাড়িয়ে তোলে, বাদলের কোনো কোনো গল্পে রিয়্যালিটির মাঝখানে কোথাও কোথাও ম্যাজিকরিয়্যালিটি ঢুকে গিয়ে গল্পের বোধগম্যতা অনুভববেদ্যতাকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে।
বলা যায়, বাস্তবতার গল্পে জাদু বাস্তবতার ফোড়ন দিয়ে গল্পগুলোকে আরো স্বাদু করে তুলেছেন লেখক। যেমন ধরা যাক, ‘সুনীলের কুকুরটা’ বইটির নাম গল্পটা। সেখানে গল্পের প্রটাগনিস্টের সঙ্গে মানুষের ভাষায় কথা বলে তার রাতের সঙ্গী কুকুরটা। শুধু তাই না, হঠাৎ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতার পঙ্ক্তি বলে ওঠে কুকুরটা : “আমি মানুষের পায়ের কাছে কুকুর হয়ে বসে থাকি—তার ভেতরের কুকুরটাকে দেখবো বলে…।
” কিন্তু জাদু বাস্তবতার এই কুশলী প্রয়োগে গল্পের বাস্তবতা কোথাও টোল খেয়ে গেছে বলে মনে হয় না, বরং গল্পটা যেন আরো নিটোল আর বর্ণোজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তবে ফ্রান্ৎজ্ কাফ্কার ‘রূপান্তর’ বা গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের ‘হাজার বছরের একাকিত্ব’ বা ইসাবেল আলেন্দের ‘প্রেতালয়’ সালমান রাশদির ‘মিডনাইট চিলড্রেন’ প্রভৃতি যেসব লেখাকে আমরা জাদু বাস্তবতার প্রধান প্রতিনিধিত্বকারী বলে মনে করি, সেগুলোর সঙ্গে বাদলের গল্পে জাদু বাস্তবতার প্রয়োগের একটা বড় গরমিল রয়েছে।
প্রথমোক্ত লেখাগুলোর মূল কাঠামো গড়ে উঠেছে জাদুবাস্তবতার উপর ভিত্তি করে; যেমন কাফকার ‘রূপান্তর’-এ প্রটাগনিস্টের পোকায় পরিণত হওয়ার জাদুকরি ঘটনাটাই মূল আখ্যান, বাস্তবের কিছু কিছু সংঘটন সেখানে এসেছে নেহায়েতই জাদু-সংঘটনের টুকরোগুলোকে জোড়া লাগানোর সুতো হিসেবে। কিন্তু বাদলের গল্পে ঘটেছে উল্টোটা—গল্পের মূল দেহ গড়ে উঠেছে নিরেট বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে, আর কিছু জাদু বাস্তবতা বা রহস্যময়তা সেখানে ফাঁকে ফাঁকে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে যেন পাঠকের অনুভবকে গাঢ়তর, গভীরতর করে দেয়ার জন্যেই।
এজন্যে কাফকা, মার্কেজ বা আলেন্দে আমরা মোহিত মন্ত্রমুগ্ধ হওয়ার পরও আমাদের প্রতিদিনকার জগৎ থেকে এই মহান কথাশিল্পীদের সৃষ্ট জগতের কোথাও যেন একটা দূরত্ব থেকে যায়, সেটা যতটা স্থান-কাল-পাত্রজনিত, তার চেয়ে বেশি কাহিনির বুনন বা নির্মাণশৈলীর কারণে, বাদলের গল্পে সেটা ঘটে না। তাঁর গল্প পড়তে পড়তে পাঠক হঠাৎ তার চেনা রোজকার জগৎ বা অনুভবের সীমানার বাইরে এক-আধটু বেরিয়ে পড়ে বটে, কিন্তু লেখক শিগগিরই আবার তাকে তার নিত্যদিনের জানাশোনার পরিধিতে ফিরিয়ে আনেন।
রাজনীতির অনিবার্য উপস্থিতি ছড়া হোক বা কবিতা, প্রবন্ধ হোক বা গল্প—বাদল তার যেকোনো সৃষ্টিতেই তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বা চেতনার প্রতিফলন না ঘটিয়ে পারেন না, এটা আমরা লক্ষ্য করে আসছি গত চল্লিশ বছর ধরে। তাঁর প্রায় প্রতিটি লেখায় রাজনীতি চলে আসে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে, অথচ তিনি নিজে কোনো রাজনৈতিক দলের সক্রিয় সদস্য বা নেতৃস্থানীয় কেউ নন।
গত চার দশক বা অর্ধশতক ব্যাপী দেশে বা চট্টগ্রাম শহরে এমন কোনো রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন হয়নি, যেখানে বাদলের অন্যতম নেতৃস্থানীয় ভূমিকা নেই। লেখ্য-দৃশ্য-শ্রাব্য সকল মাধ্যমে তিনি তাঁর রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক চেতনার বিকীরণ ঘটিয়ে আসছেন অক্লান্তভাবে। তাঁর এ চেতনা দাঁড়িয়ে আছে চারটি অনড় অটল স্তম্ভের উপর, যেগুলো হল : (১) বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, (২) অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদ, (৩) প্রশ্নাতীত বঙ্গবন্ধু-প্রীতি, এবং (৪) মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের কঠোর বিরোধিতা।
তাঁর জীবনাচরণও সৃজনকর্ম এই একই চেতনা সূত্রে গ্রথিত হয়ে আছে। বাদলের দুটো বইয়ের প্রায় সব গল্পেই তার এই রাজনৈতিক চেতনা বিধৃত হয়ে আছে—লক্ষ্যে বা আপাত-অলক্ষ্যে, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে। তবে তিনি এ চেতনার একটা সামগ্রিক রূপ দিয়েছেন তাঁর দ্বিতীয় বই ‘সুনীলের কুকুরটা’-এর সর্বশেষে অন্তর্ভুক্ত রূপকগল্প ‘রহিমা’য়।
এ গল্পে তিনি তাঁর স্বদেশের প্রতীক হিসেবে রহিমা নামের এক পল্লীবালাকে তুলে ধরে তার করুণ পরিণতি বর্ণনা করেছেন। এ গল্পে রহিমাকে একবার মনে হয় এক পল্লীবালা, আবার মনে হয় রহিমা নিজেই যেন বাংলাদেশ। গল্পটার নির্মাণশৈলীতেও লেখক অভিনবত্বের পরিচয় দিয়েছেন। শুরু করেছেন নাটকের নান্দিপাঠের মতো অন্ত্যমিলহীন মুক্তক ছন্দের প্রবহমান গদ্য কবিতার ঢঙে, যেটা পড়তে পড়তে সৈয়দ শামসুল হকের নাটক ‘নুরলদিনের সারাজীবন’ বা সেলিম আল দীনের ‘কেরামত মঙ্গল’-এর কথা মনে পড়ে যায়।
সবচেয়ে উজ্জ্বল গল্পগুলো উল্লেখযোগ্য গল্পের কথা বলতে গিয়ে বাদলের গল্পের প্রথম বই ‘খুন ও হুইসেল’ হাতে নিয়ে আমার ‘কাকে ফেলে কাকে রাখি’ অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, এ বইয়ের নয়টা গল্পের প্রতিটাকেই কোনো না কোনোদিক থেকে অনন্যসাধারণ বলে মনে হয়। যেমন ধরা যাক, বইটির নাম গল্প ‘খুন ও হুইসেল’-এর কথা।
বাস্তবতা আর জাদু বাস্তবতাকে লেখক এ গল্পে এমন নিপুণভাবে মিশিয়ে দিয়েছেন যে, গল্পের মূল চরিত্র ‘বিহারী শামসুইয়া’র মতো পাঠক নিজেও বিভ্রান্ত হয়ে যায় চরিত্রটা জীবিত নাকি মৃত—এটা ভেবে। মৃত যদি হয়, সে চলছে-বলছে-দেখছে-খাচ্ছে কী করে? সে নিজে তার নিজের রক্তাক্ত লাশ দেখল কী করে? আবার জীবিত যদি হয়, তাহলে সে দ্বিতীয়বার গুলিবিদ্ধ হয়ে মরল কী করে?
রবীন্দ্রনাথের ‘জীবিত ও মৃত’ গল্পের কাদম্বিনীর মতো শামসুওকি “মরিয়া এ প্রমাণ করিল যে সে মরে নাই’? রবীন্দ্রনাথ তাঁর গল্পে কিন্তু এ ব্যাপারে কোনো দ্ব্যর্থবোধকতা রাখেননি। তাঁর গল্পটা পড়ে পাঠকের বুঝতে কোনো অসুবিধা হয় না যে, কাদম্বিনী প্রথমবার না মরেও মৃত ঘোষিত হয়েছে, এবং পরে সে আত্মহত্যা করে এই অসহনীয় অবস্থা থেকে মুক্তি পেয়েছে।
কিন্তু ‘খুনও হুইসেল’ গল্পে বাদল ব্যাপারটা খোলসা করেননি, পাঠকদের ধন্ধে রেখে দিয়েছেন শেষ পর্যন্ত। এবং এখানেই গল্পটার মজা—এই রহস্যময়তায়। এ বইয়ের আরেকটা দারুণ গল্প হল ‘আবসেরাব’। কথাটা হিন্দি ‘আপ সে আপ’-এর চাটগাঁইয়া অপভ্রংশ। হিন্দি-উর্দুতে কথাটা ব্যবহৃত হয় ‘নিজে নিজেই’ অর্থে।
নিজে নিজে কিছু ঘটে গেলে হিন্দি-উর্দুতে বলা হয়, “আপ সে আপ হোগয়া। ” আমাদের দেশের বাস্তবতার একটা দর্পণ-প্রতিবিম্ব তুলে ধরা গল্পটা সরল বর্ণনা ভঙ্গিতে বলে গেছেন বাদল, কোনো বিমূর্ততা বা জাদুবাস্তবতার ধারে কাছেও যাননি। নিতান্ত শখের খাতিরে বা ঝোঁকের বশে নিজের দীর্ঘ লালিত দাড়ি গোঁফ কামিয়ে ফেলে গল্পের প্রটাগনিস্ট মহিউদ্দিন যে কি বিষম বিপত্তিতে পড়ে গিয়েছিল, সেই উদ্বেগজনক অথচ শেষ পর্যন্ত হাস্যরসাত্মক কাহিনীই এ গল্পে বিবৃত হয়েছে।
বইটিতে এরকমই আরেক আধিভৌতিক বা জাদুবাস্তবতার গল্পের নাম ‘কর্পূর’, যেখানে জীবৎকালে অপূর্ণ ক্ষুধা নিয়ে মারা যাওয়া বাতেন সাহেব মৃত্যুর ছয়দিন পর কবর থেকে উঠে ঊর্ধ্বতন সহকর্মী করিমুল্লাহ্ সাহেবের অফিসকক্ষে এসে তাঁর টিফিন বক্ষ থেকে রুটি-তরকারি চেয়ে নিয়ে খেয়ে যায়। কোনোরকম আধিভৌতিকতা বা রহস্যময়তার ধারে কাছে না গিয়ে নিরেট বাস্তবতার আরেকটা মর্মান্তিক কাহিনি হল ‘বিভ্রম’ নামের গল্পটি।
মগজ ধোলাই হয়ে যাওয়া পরবর্তী প্রজন্মের হাতে পূর্ববর্তী প্রজন্মের বর্তমান ও ভবিষ্যত কতটা ভয়াবহ বিপন্ন হয়ে উঠতে পারে, বাদল এ গল্পে তার সুস্পষ্ট পূর্বাভাস দিয়েছেন ২০২৪-এর গোড়াতেই, যার পরপরই আমরা এর অসংখ্য ভয়াবহ উদাহরণ সৃষ্টি হতে দেখে চলেছি ওই বছরের শেষার্ধ থেকে অদ্যাবধি। এ গল্প কতটা বাস্তবোচিত, তা আমরা আমাদের নিত্যদিনের পারিপার্শ্বিক থেকেই জানি।
প্রফেটিক দূরদর্শিতায় বাদল এখানে সমস্যাটাকে লিপিবদ্ধ করেছেন গল্পের আকারে। এ বইয়ের আরো দুটো দুর্দান্ত গল্প ‘ঘাড়ত্যাড়া বাচ্চু’ এবং ‘একটি মাদকতাহীন রাত’, যেগুলোকে অন্তত একটু বুড়ি ছোঁয়াও যদি করে না যাই তো গল্পদ্বয় আর তাদের রচয়িতার প্রতি সুবিচার হবে না। প্রথম গল্পটা হল গ্রামাঞ্চলের একজন সংবাদদাতাকে নিয়ে, যাকে আমাদের দেশের সংবাদপত্র জগতের ভাষায় ‘মফস্বল সাংবাদিক’ বলা হয়ে থাকে।
একটা পত্রিকার উপজেলা প্রতিনিধি সে। আবদুল লতিফ বাচ্চু সাধারণ্যে পরিচিত ঘাড়ত্যাড়া বাচ্চু নামে। নিজের অনমনীয় নিরাপোষ স্বভাবের কারণে এ অভিধাটা পেয়েছে সে। বাদলের গল্পগুলোর গড়পড়তা দৈর্ঘ্য বিচারে এ গল্পটা একটু বড়। কিন্তু তাই বলে লেখক কোথাও কোনো অতি কথন বা কিছুর পুনরাবৃত্তি করেননি। আমাদের দেশে পির-ফকির, আউলিয়া-কেরাম, দরগাহ্-মাজারের দোহাই দিয়ে যে রমরমা বাণিজ্য চলে, এবং যারা এ বাণিজ্য চালায় তারা যে সব বড়মাপের ভণ্ড বা বেড়াল তপস্বী, সেটা খুব নিপুণভাবে তুলে ধরতে পেরেছেন তিনি।
বইটায় আরেকটা বিচিত্র গল্প ‘একটি মাদকতাহীন রাত’। মাত্র পৃষ্ঠা চারেকের এই ক্ষুদ্রায়তন গল্পটিতে আমরা একজন পচন ধরা বাম প্রগতিবাদী রাজনীতিকের দেখা পাই। এ ছাড়া আরো পাঁচটা গল্প রয়েছে ‘খুন ও হুইসেল’ বইটিতে, যেগুলোর শিরোনাম—‘যে রাতে আমি মদ্যপান করিনি’, ‘ব্রেকিং নিউজ’, ‘আবুল সওদাগর’, ‘রাজ্জাক কবরীর শেষ অধ্যায়’, ও ‘জমিনদার’।
প্রত্যেকটা গল্প বিষয়ের বৈচিত্র্য ও অভিনবত্ব নিয়ে পৃথকভাবে আলোচিত হওয়ার দাবি রাখে, যদিও সেটা আপাতত পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ গল্পগুলোতে মূলত নিও-রিয়্যালিজম বা নব বাস্তববাদের ছাপ দেখা যায়। আমাদের পরিপার্শ্বের নানা চেনা চরিত্রের দেখা মিলবে এসব গল্পের মোড়ক খুলে, সেই সাথে চট্টগ্রামবাসীদের জন্যে বিশেষ পাওনা হিসেবে আসবে তাদের প্রিয় শহরটির অতীত-বর্তমানের মনোহর আলেখ্য।
বাদলে দ্বিতীয় বইয়ের দশটা গল্পের মধ্যে বইটার নাম গল্প ‘সুনীলের কুকুর’ আর রূপক গল্প ‘রহিমা’র কথা আগেই বলেছি। বইয়ের বাকি গল্পগুলো হল : ‘থাডার’, ‘ছেলেটি সুস্থ হয়ে উঠেছিল’, ‘সাদমা’, ‘গল্পগুলো একই ধরনের’, ‘আর্তনাদ’, এবং ‘হাওয়াই মিঠাই’।
একমাত্র নাম গল্পটা ছাড়া এ বইয়ের আর কোনো গল্পে কোনো অবাস্তবতা বা জাদু বাস্তবতার ছায়াপাত চোখে পড়ে না। এগুলোকে, এবং ‘খুন ও হুইসেল’ বইটির কিছু গল্পকেও আমি নব বাস্তববাদী ধারা গল্প হিসেবে চিহ্নিত করবো। এ বইয়ের একটা গল্পের নাম ‘গল্পগুলো একই ধরনের’ হলেও, আসলে কিন্তু গল্পগুলো প্রতিটিই ভিন্ন ভিন্ন থিমের ওপর রচিত।
কোনোটার সাথে কোনোটার কিছু মাত্র মিল নেই, কেবল লিখনশৈলীর ধরনটুকু ছাড়া। কামরুল হাসান বাদলের গ্রন্থভুক্ত গল্পগুলোর সিংহভাগ নববাস্তবতা মতবাদের ধারার অনুবর্তী বলে প্রতীয়মান হয়। গল্পগুলো পড়তে পড়তে আমরা আমাদের চারপাশের নিত্যচেনা বাস্তবতাকে বা আমাদের অন্তর্গত বোধগুলোকে নতুন নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি আর নতুনভাবে অনুধাবনের চেষ্টা করি।
সাহিত্যচর্চার কাল বিচারে কামরুল হাসান বাদলের গল্পের সংখ্যা কমই বলতে হবে। তবে যা লিখেছেন, সেগুলো সর্বার্থে উত্তম সাহিত্য হিসেবে বিবেচিত হওয়ার যোগ্য। বৈচিত্র্য বৈভবে গল্পগুলোর তুলনা নেই। প্রতিটি গল্পসুখপাঠ্য। তাঁর ভাষা সহজসরল হয়েও গূঢ় গভীর তাৎপর্যবহ। তাঁর বই দুটোতে অন্তর্ভুক্ত গল্পগুলো বাংলা সাহিত্যে যুগান্তকারী সংযেজন হয়তো নয়, তবে সৎ সাহিত্য নিশ্চিত।
বাদলের গল্পগুলো আমাদের দেশ-কাল-পাত্রের নিখুঁত আয়না, যা চিনে নিতে আমাদের একটুও কষ্ট হয় না। কামরুল হাসান বাদলের গল্পগুলো আমাদের আত্মদর্শন করায়, আমাদের জ্ঞানচক্ষু উন্মীলন করে।





















