1:31 pm, Saturday, 3 October 2026

অবহেলিত গ্রামে জামদানির জাদু, স্বপ্ন বুনছে বাতানিয়াপাড়া

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

ছোট্ট একটি গ্রাম বাতানিয়াপাড়া। নেই পাকা সড়ক, বর্ষায় কাদা-পানিতে একাকার হয়ে যায় চলাচলের পথ, ঠিকমতো থাকে না বিদ্যুৎ। অথচ এই অবহেলিত গ্রামের প্রতিটি ঘরেই এখন খটখট শব্দে বুনন হচ্ছে স্বপ্ন বিশ্বখ্যাত জামদানি শাড়ির স্বপ্ন।

গ্রামটি কলমাকান্দা উপজেলার দুর্গম রংছাতি ইউনিয়নে অবস্থিত। কয়েক মাস আগেও যে গ্রামটির নাম মানচিত্রেও খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল, আজ সেই বাতানিয়াপাড়াই এখন সবার মুখে মুখে। আর এর একমাত্র কারণ— জামদানি। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথেই তাঁতে বসেন কারিগররা, চলে রাত ১০টা পর্যন্ত। তাদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় সুতোয় সুতোয় ফুটে উঠছে নকশা।

একটি নিখুঁত জামদানি শাড়ি বুনতে সময় লাগে এক মাস থেকে দেড় মাস। প্রতিটি শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকে কারিগরের না বলা গল্প, পরিবারের হাসি আর বেঁচে থাকার স্বপ্ন। ঘরে ঘরে বাঁশ আর কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে এই জামদানির তাঁত। কারো ঘরে একটি, কারো ঘরে দুটি, আবার কারো ঘরে পাঁচ থেকে সাতটি মেশিন। একটি মেশিনে দুজন— একজন মূল কারিগর, অন্যজন সহকারী।

সাতটি মেশিনের মালিক মফিজুল ইসলাম আবেগভরা কণ্ঠে বলেন, এই গ্রামে আমিই প্রথম জামদানির কাজ শুরু করি। আমার অধীনে এখন ১৪ জন শ্রমিক কাজ করে। একজন হেলপারকে ১৫ হাজার আর একজন কারিগরকে ৩০ হাজার টাকা বেতন দেই। এই কাজ শুরু করা এতটা সহজ ছিল না, প্রথমে সবাই হাসি-ঠাট্টা করত, কিন্তু এখন অনেকেই শুরু করেছে। একটা শাড়ি বানাতে ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়, ঢাকায় বিক্রি হয় ৭০ হাজারে।

১০-১২ হাজার টাকা লাভ থাকে। লাভের চেয়ে বড় কথা, গ্রামের মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা জায়গা আর যাতায়াত। ঘরের ভেতর গাদাগাদি করে মেশিন বসিয়েছি, বড় পরিসরে কাজ করতে পারি না। রাস্তা খারাপ থাকায় ঢাকা থেকে সুতা আনতে ও শাড়ি পাঠাতে দ্বিগুণ খরচ হয়। বিদ্যুৎ থাকে না, দিনের অর্ধেক সময় অন্ধকারে বসে থাকতে হয়।

সরকার যদি আমাদের একটু জায়গা, একটা ভালো রাস্তা আর নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের ব্যবস্থা করে দিত, তাহলে এই বাতানিয়াপাড়া থেকেই শত শত জামদানি যাবে বিদেশে। এই গ্রামেই শত শত যুবকের চাকরি হবে, কাউকে ঢাকায় যেতে হবে না। কয়েকদিন আগে আমাদের কারখানা এসে দেখে গেছেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল সাহেব, আমরা আশা করছি তিনি আমাদের জন্য কিছু করবেন।

নারায়ণগঞ্জ থেকে কাজ শিখে আসা কারিগর ফরিদ মিয়া বলেন, ঢাকায় থাকলে বউ-বাচ্চা গ্রামে থাকে, মন টেকে না। যা বেতন পেতাম সব খরচ হয়ে যেত। এখানে পরিবারের সাথে থেকে কাজ করতে পারি, টাকাও আয় হয়, এটাই শান্তি। কর্মরত শ্রমিক রুবেল মিয়া বলেন, আমি এখানে প্রোডাকশনে কাজ করি। একটি জামদানি শাড়ি বানাতে প্রায় এক থেকে দুই মাসও লাগে। আমার বেতন প্রায় ৩০ হাজার টাকার মতো।

যদি ঠিকমতো কাজ করতে পারতাম, তাহলে বেতন আরও বাড়ত। দুই মেশিনের মালিক সারোয়ার বলেন, আমার দুটি মেশিন, জায়গা বেশি নেই, আবার পুঁজিও কম, তাই বড় করে শুরু করতে পারছি না। সরকার যদি আমাদের লোনের ব্যবস্থা করে দিত, তাহলে বড় করে শুরু করতাম এবং এখানে অনেক শ্রমিকও কাজ করতে পারত। কারখানা পরিদর্শন শেষে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, আমি সোনালী ব্যাংকের ম্যানেজারকে বলেছি, ডিসি সাহেবকেও বলেছি, তিনি অফিসিয়াল ভিজিট করবেন।

এই জামদানি শাড়ি আমাদের দুর্গাপুর-কলমাকান্দাকে বদলে দিতে পারে। একেকটা শাড়ি এক লাখ, দুই লাখ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আমরা যদি তাদের আর্থিকভাবে একটু প্রণোদনা দিতে পারি, শক্তি-সাহস আর প্রশাসনিক সুবিধা দিতে পারি, তাহলে এই কলমাকান্দা-দুর্গাপুর জামদানির হাবে পরিণত হবে, ইনশাআল্লাহ। এলাকাবাসীর দাবি, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই ছোট গ্রামটিই হতে পারে নেত্রকোনার অর্থনৈতিক মডেল।

আগে যারা গ্রামে বেকার ছিল, তারাও এখন কাজ করছে। যদি এখানে জায়গা আর মেশিন বেশি থাকত, তাহলে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়ন হতো। শুধু প্রয়োজন একটু নজর।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

Nagorik Sangram

Popular Post

অবহেলিত গ্রামে জামদানির জাদু, স্বপ্ন বুনছে বাতানিয়াপাড়া

অবহেলিত গ্রামে জামদানির জাদু, স্বপ্ন বুনছে বাতানিয়াপাড়া

Update Time : 11:39:30 am, Saturday, 3 October 2026

ছোট্ট একটি গ্রাম বাতানিয়াপাড়া। নেই পাকা সড়ক, বর্ষায় কাদা-পানিতে একাকার হয়ে যায় চলাচলের পথ, ঠিকমতো থাকে না বিদ্যুৎ। অথচ এই অবহেলিত গ্রামের প্রতিটি ঘরেই এখন খটখট শব্দে বুনন হচ্ছে স্বপ্ন বিশ্বখ্যাত জামদানি শাড়ির স্বপ্ন।

গ্রামটি কলমাকান্দা উপজেলার দুর্গম রংছাতি ইউনিয়নে অবস্থিত। কয়েক মাস আগেও যে গ্রামটির নাম মানচিত্রেও খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল, আজ সেই বাতানিয়াপাড়াই এখন সবার মুখে মুখে। আর এর একমাত্র কারণ— জামদানি। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথেই তাঁতে বসেন কারিগররা, চলে রাত ১০টা পর্যন্ত। তাদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় সুতোয় সুতোয় ফুটে উঠছে নকশা।

একটি নিখুঁত জামদানি শাড়ি বুনতে সময় লাগে এক মাস থেকে দেড় মাস। প্রতিটি শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকে কারিগরের না বলা গল্প, পরিবারের হাসি আর বেঁচে থাকার স্বপ্ন। ঘরে ঘরে বাঁশ আর কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে এই জামদানির তাঁত। কারো ঘরে একটি, কারো ঘরে দুটি, আবার কারো ঘরে পাঁচ থেকে সাতটি মেশিন। একটি মেশিনে দুজন— একজন মূল কারিগর, অন্যজন সহকারী।

সাতটি মেশিনের মালিক মফিজুল ইসলাম আবেগভরা কণ্ঠে বলেন, এই গ্রামে আমিই প্রথম জামদানির কাজ শুরু করি। আমার অধীনে এখন ১৪ জন শ্রমিক কাজ করে। একজন হেলপারকে ১৫ হাজার আর একজন কারিগরকে ৩০ হাজার টাকা বেতন দেই। এই কাজ শুরু করা এতটা সহজ ছিল না, প্রথমে সবাই হাসি-ঠাট্টা করত, কিন্তু এখন অনেকেই শুরু করেছে। একটা শাড়ি বানাতে ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়, ঢাকায় বিক্রি হয় ৭০ হাজারে।

১০-১২ হাজার টাকা লাভ থাকে। লাভের চেয়ে বড় কথা, গ্রামের মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা জায়গা আর যাতায়াত। ঘরের ভেতর গাদাগাদি করে মেশিন বসিয়েছি, বড় পরিসরে কাজ করতে পারি না। রাস্তা খারাপ থাকায় ঢাকা থেকে সুতা আনতে ও শাড়ি পাঠাতে দ্বিগুণ খরচ হয়। বিদ্যুৎ থাকে না, দিনের অর্ধেক সময় অন্ধকারে বসে থাকতে হয়।

সরকার যদি আমাদের একটু জায়গা, একটা ভালো রাস্তা আর নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের ব্যবস্থা করে দিত, তাহলে এই বাতানিয়াপাড়া থেকেই শত শত জামদানি যাবে বিদেশে। এই গ্রামেই শত শত যুবকের চাকরি হবে, কাউকে ঢাকায় যেতে হবে না। কয়েকদিন আগে আমাদের কারখানা এসে দেখে গেছেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল সাহেব, আমরা আশা করছি তিনি আমাদের জন্য কিছু করবেন।

নারায়ণগঞ্জ থেকে কাজ শিখে আসা কারিগর ফরিদ মিয়া বলেন, ঢাকায় থাকলে বউ-বাচ্চা গ্রামে থাকে, মন টেকে না। যা বেতন পেতাম সব খরচ হয়ে যেত। এখানে পরিবারের সাথে থেকে কাজ করতে পারি, টাকাও আয় হয়, এটাই শান্তি। কর্মরত শ্রমিক রুবেল মিয়া বলেন, আমি এখানে প্রোডাকশনে কাজ করি। একটি জামদানি শাড়ি বানাতে প্রায় এক থেকে দুই মাসও লাগে। আমার বেতন প্রায় ৩০ হাজার টাকার মতো।

যদি ঠিকমতো কাজ করতে পারতাম, তাহলে বেতন আরও বাড়ত। দুই মেশিনের মালিক সারোয়ার বলেন, আমার দুটি মেশিন, জায়গা বেশি নেই, আবার পুঁজিও কম, তাই বড় করে শুরু করতে পারছি না। সরকার যদি আমাদের লোনের ব্যবস্থা করে দিত, তাহলে বড় করে শুরু করতাম এবং এখানে অনেক শ্রমিকও কাজ করতে পারত। কারখানা পরিদর্শন শেষে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, আমি সোনালী ব্যাংকের ম্যানেজারকে বলেছি, ডিসি সাহেবকেও বলেছি, তিনি অফিসিয়াল ভিজিট করবেন।

এই জামদানি শাড়ি আমাদের দুর্গাপুর-কলমাকান্দাকে বদলে দিতে পারে। একেকটা শাড়ি এক লাখ, দুই লাখ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আমরা যদি তাদের আর্থিকভাবে একটু প্রণোদনা দিতে পারি, শক্তি-সাহস আর প্রশাসনিক সুবিধা দিতে পারি, তাহলে এই কলমাকান্দা-দুর্গাপুর জামদানির হাবে পরিণত হবে, ইনশাআল্লাহ। এলাকাবাসীর দাবি, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই ছোট গ্রামটিই হতে পারে নেত্রকোনার অর্থনৈতিক মডেল।

আগে যারা গ্রামে বেকার ছিল, তারাও এখন কাজ করছে। যদি এখানে জায়গা আর মেশিন বেশি থাকত, তাহলে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়ন হতো। শুধু প্রয়োজন একটু নজর।