11:21 am, Sunday, 9 August 2026

হুথিদের হামলায় ইয়েমেনে বড় ধরনের যুদ্ধের আভাস

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

বৃহস্পতিবার ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর সামরিক অবস্থানে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় অন্তত ৩০ সরকারি সেনা নিহত এবং আরও ১৫ জন আহত হয়েছেন। কয়েক বছর পর এ ধরনের হামলার ঘটনা ঘটল।

হাদরামাউত ও মারিবে সরকারি বাহিনীর সামরিক শিবির ও সেনাদের সমাবেশ লক্ষ্য করে চালানো এসব হামলা হুথি ও সরকারের মধ্যকার যুদ্ধে বড় ধরনের উত্তেজনা তৈরি করেছে।

হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি এক সম্প্রচারিত বিবৃতিতে দাবি করেন, হামলায় ‘শত শত’ মানুষ নিহত হয়েছেন এবং ‘বিপুলসংখ্যক শিবির ও অস্ত্রের গুদাম’ ধ্বংস হয়েছে।

তিনি অভিযোগ করেন, হুথি বাহিনী ‘সৌদি আরবের ব্যাপক সামরিক সমাবেশ’ শনাক্ত করার পর সম্ভাব্য উত্তেজনার আশঙ্কায় এসব হামলা চালিয়েছে।

২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে হুথি ও তাদের মিত্ররা রাজধানী সানা দখল করার পর থেকে দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ চলছে। ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের পক্ষে যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তীব্র লড়াই অনেকটাই কমে এলেও ২০২৫ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইয়েমেন থেকে সরে যাওয়ার পর সরকারি বাহিনী ও কিছু দক্ষিণাঞ্চলীয় শক্তির মধ্যে পুনর্গঠন ও সমন্বয় হয়েছে। ইরানের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হুথিরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের আঞ্চলিক যুদ্ধে ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়েছে। এর অংশ হিসেবে গত মাসে সৌদি বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে হামলার ঘোষণা দেয় তারা।

ইয়াহিয়া সারি বলেন, যেকোনো সামরিক পরিস্থিতির জন্য হুথিরা এখন উচ্চ সতর্কতায় রয়েছে। অন্যদিকে, সরকারি বাহিনী বৃহস্পতিবারের হামলার প্রতিশোধ নিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের স্থবির যুদ্ধকে আবারও সক্রিয় করে তুলতে পারে।

না শান্তি, না যুদ্ধ

মারিব ও হাদরামাউতে সরকারি বাহিনীর ওপর হামলাকে ইয়েমেনের সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, দেশটি আরও বড় ধরনের সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

সানায় বসবাসকারী ৩৪ বছর বয়সী আবদুর রহমান সালেহ বলেন, ইয়েমেনের মানুষের কাছে যুদ্ধ এখন আর সম্ভাব্য কোনো হুমকি নয়, বরং বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিনি বলেন, ‘এটি আর সম্ভাব্য হুমকি নয়। এটি বাস্তবে পরিণত হয়েছে। গত কয়েক দিনে আমরা সানায় বারবার বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছি। খবরের মাধ্যমে নিহত ও আহতদের সংখ্যা দেখছি। প্রতিটি পক্ষ তাদের গণমাধ্যমে প্রাণঘাতী হামলা নিয়ে গর্ব করছে।’

তিনি বলেন, ‘এটি আমাদের ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির আগের সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। প্রতিটি পক্ষ প্রতিশোধের জন্য মরিয়া। একজন বেসামরিক নাগরিক হিসেবে আমার মনে হচ্ছে, এখন এই যুদ্ধ থামাতে অলৌকিক কিছু ঘটতে হবে।’

রাজনৈতিক ও সামরিক বিষয় নিয়ে কাজ করা ইয়েমেনি গবেষক ফুয়াদ মুসেদ মনে করেন, সরকারি বাহিনীর সামরিক শিবিরে সাম্প্রতিক হুথি হামলা প্রমাণ করে যে, প্রতিপক্ষের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে গোষ্ঠীটি।

তিনি বলেন, ‘হুথিদের বার্তা স্পষ্ট—ইয়েমেনের ভেতরে ও বাইরে তারা উত্তেজনা বাড়ানোর পথ বেছে নিয়েছে। তারা অভ্যন্তরীণভাবে হামলা বাড়ানোর পাশাপাশি লোহিত সাগরে জাহাজ এবং সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। বলা যায়, না শান্তি, না যুদ্ধ—এই পরিস্থিতির অবসান ঘটেছে।’

২০২২ সালের এপ্রিলে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষ যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছানোর পর থেকে ইয়েমেনে যুদ্ধ অনেকটাই থেমে ছিল। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে উভয় পক্ষই একটি চূড়ান্ত সামরিক লড়াইয়ের আকাঙ্ক্ষার কথা জানিয়েছে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক আহমেদ নাগি বলেন, সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে হুথিদের সীমান্তপারের হামলা সম্প্রসারণের অর্থ হলো দুই পক্ষের মধ্যে সর্বাত্মক যুদ্ধের আশঙ্কা আর দূরের বিষয় নয়।

তিনি বলেন, ‘উভয় পক্ষের এখনো উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের নীতিতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো, প্রতিটি নতুন উত্তেজনামূলক পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে এবং হুথিরা হামলা বাড়ালে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতির ভিত্তিতে আমরা যে লক্ষণগুলো দেখছি, তাতে উত্তেজনা কমার চেয়ে নতুন করে সংঘাত শুরুর ইঙ্গিতই বেশি শক্তিশালী।’

‘যুদ্ধই অগ্রাধিকার’

সৌদি-সমর্থিত প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের সদস্য শেখ ওসমান মাজালি বলেন, ‘সন্ত্রাসী হুথি মিলিশিয়া’ ইয়েমেন ও অঞ্চলটির জন্য হুমকি হয়ে থাকলে শান্তি, নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন, সহাবস্থান বা জাতীয় অংশীদারত্বের কোনো সম্ভাবনা নেই।

সরকারি নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেন টেলিভিশনকে তিনি বলেন, ‘এটি অর্জনের একমাত্র পথ হলো মিলিশিয়াকে মোকাবিলা ও উৎখাত করা এবং আমাদের জনগণ ও অঞ্চলের ওপর তাদের ক্ষতি ও অনিষ্ট বন্ধ করা।’

ইয়েমেনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাদ্দাম আল-হুরাইবি বলেন, বর্তমানে ইয়েমেনে শান্তির বিষয়ে যেকোনো আলোচনা অর্থহীন। বৃহস্পতিবার সরকারি সেনাদের ওপর হুথিদের হামলা ‘যুদ্ধই অগ্রাধিকার’—গোষ্ঠীটির পক্ষ থেকে এমন একটি স্পষ্ট বার্তা।

তিনি বলেন, ‘ইয়েমেনিরা বছরের পর বছর ধরে হুথি ও ইয়েমেন সরকারের মধ্যে শান্তিচুক্তি বা শান্তির রোডম্যাপ বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে। এখন হুথিরা প্রকৃত যুদ্ধ শুরু করেছে, যা শান্তির সব সম্ভাবনাকে ধ্বংস করছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘তারা বছরের পর বছর ধরে চলা শান্তি আলোচনাকে অস্ত্র সংগ্রহ ও তৈরির জন্য ব্যবহার করেছে। এতে তারা স্থানীয় প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘাতের জন্য প্রস্তুত হয়েছে এবং ইসরায়েল ও সৌদি আরব পর্যন্ত হামলা চালানোর সক্ষমতা অর্জন করেছে। তাদের যুদ্ধের পথ থেকে সরে আসতে রাজি করানো সহজ হবে না।’

আল-হুরাইবি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও সৌদি আরব শান্তি প্রস্তাবে সম্মত হওয়ার জন্য হুথিদের অনেক বেশি সময় দিয়েছে। হুথি কর্মকর্তারা বলে আসছেন, সানা কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা সৌদি-সংশ্লিষ্ট কোনো ইয়েমেনি মিলিশিয়া বা সামরিক ইউনিটের উপস্থিতি তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

সাম্প্রতিক হুথি উত্তেজনার পর ইয়েমেন সরকার ও সৌদি আরবের পক্ষ থেকে কোনো জবাব না আসাকে দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবে দেখা হতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, ‘ইয়েমেনি বাহিনী বা সৌদি স্থাপনায় হুথিদের হামলার বিষয়ে নীরবতাকে কৌশলগত ধৈর্য হিসেবে দেখা অর্থহীন। এই অবস্থান অব্যাহত থাকলে তা ইয়েমেন সরকার ও সৌদি আরবের অসহায়ত্বের ইঙ্গিত দেবে এবং জনগণের আস্থা হারাবে।’

মারিবের যুদ্ধ

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মারিব আবারও সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। সেখানে সম্মুখসারিতে প্রাণঘাতী সংঘর্ষও হয়েছে।

সানা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষক আদেল দাশেলা বলেন, উত্তর-মধ্যাঞ্চলীয় মারিব প্রদেশের নিয়ন্ত্রণ হুথিদের জন্য জীবন-মরণ লড়াই হয়ে উঠতে পারে।

তিনি বলেন, ‘আজকের উত্তেজনা এবং হাদরামাউত ও মারিবে সরকারি বাহিনীর শিবিরে হামলার ভিত্তিতে স্পষ্ট যে, হুথি গোষ্ঠী মারিবের তেল ও গ্যাসসমৃদ্ধ অঞ্চলকে লক্ষ্য করে বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সংকটের কোনো সমাধান না হলে সরকারি বাহিনী ও হুথি গোষ্ঠীর মধ্যে স্থলযুদ্ধ আসন্ন—সব ইঙ্গিতই সেদিকেই। তবে এই মুহূর্তে এমন কোনো অগ্রগতির সম্ভাবনা খুবই কম।’

বৃহস্পতিবার হুথি গোষ্ঠী এক বিবৃতিতে জানায়, ইয়েমেনের সীমানার ভেতরে কোনো সৌদি সামরিক উপস্থিতি তারা ‘সহ্য করবে না’। পাশাপাশি তাদের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করে এমন যেকোনো শত্রুতামূলক পদক্ষেপ মোকাবিলায় তাদের ‘বৈধ অধিকার’ রয়েছে বলেও দাবি করে।

আদেল দাশেলার মতে, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার দিক থেকে হুথিরা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারে। তবে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু হলে সহিংসতার মাত্রা ভয়াবহ হবে।

তিনি বলেন, ‘সব যুদ্ধফ্রন্টে পূর্ণমাত্রার সংঘাত শুরু হলে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে পাল্লা দেওয়া হুথি গোষ্ঠীর জন্য কঠিন হবে। ফলে এমন যুদ্ধ শুরু হলে তা আগের সংঘাতগুলোর মতো হবে না; বরং আরও রক্তক্ষয়ী হবে।’

সংযমের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে

হুথিরা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিলেও সৌদি আরব ও ইয়েমেন সরকার সামরিক জবাবের পরিবর্তে উত্তেজনা কমানোর ওপর জোর দিয়েছে। যদিও গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে কিছু নিয়ন্ত্রিত হামলা চালানো হয়েছে।

আহমেদ নাগি বলেন, ‘সৌদি আরব ও ইয়েমেন সরকার এখনো উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের নীতিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে মনে হচ্ছে এবং সম্ভবত তারা এই রাজনৈতিক পদ্ধতির সীমা পরীক্ষা করছে।’

তিনি বলেন, ‘প্রশ্ন হলো, তারা কতদিন এই কৌশল ধরে রাখতে পারবে। বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে তারা যখন জোট গঠন ও সম্মুখসারিতে সামরিক ইউনিট শক্তিশালী করার মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করছে।’

বর্তমান উত্তেজনার ধারা অব্যাহত থাকলে সৌদি আরব ও ইয়েমেন সরকারের ওপর আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার চাপ বাড়বে বলেও জানান নাগি।

তিনি বলেন, ‘এর অর্থ সীমিত সামরিক অভিযান হতে পারে অথবা কৌশলে আরও বড় পরিবর্তন আসতে পারে। তবে বিষয়টি এখনো দেখা বাকি। কিন্তু আরও দীর্ঘ সময় সংযম বজায় রাখার সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে।’

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

Nagorik Sangram নাগরিক সংগ্রাম

Nagorik Sangram | নাগরিক সংগ্রাম
Popular Post

অস্ট্রেলিয়ার তৃতীয় সারির দলের কাছে ইনিংস ব্যবধানে হারল বাংলাদেশ

হুথিদের হামলায় ইয়েমেনে বড় ধরনের যুদ্ধের আভাস

Update Time : 09:56:38 am, Saturday, 8 August 2026

বৃহস্পতিবার ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর সামরিক অবস্থানে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় অন্তত ৩০ সরকারি সেনা নিহত এবং আরও ১৫ জন আহত হয়েছেন। কয়েক বছর পর এ ধরনের হামলার ঘটনা ঘটল।

হাদরামাউত ও মারিবে সরকারি বাহিনীর সামরিক শিবির ও সেনাদের সমাবেশ লক্ষ্য করে চালানো এসব হামলা হুথি ও সরকারের মধ্যকার যুদ্ধে বড় ধরনের উত্তেজনা তৈরি করেছে।

হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি এক সম্প্রচারিত বিবৃতিতে দাবি করেন, হামলায় ‘শত শত’ মানুষ নিহত হয়েছেন এবং ‘বিপুলসংখ্যক শিবির ও অস্ত্রের গুদাম’ ধ্বংস হয়েছে।

তিনি অভিযোগ করেন, হুথি বাহিনী ‘সৌদি আরবের ব্যাপক সামরিক সমাবেশ’ শনাক্ত করার পর সম্ভাব্য উত্তেজনার আশঙ্কায় এসব হামলা চালিয়েছে।

২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে হুথি ও তাদের মিত্ররা রাজধানী সানা দখল করার পর থেকে দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ চলছে। ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের পক্ষে যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তীব্র লড়াই অনেকটাই কমে এলেও ২০২৫ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইয়েমেন থেকে সরে যাওয়ার পর সরকারি বাহিনী ও কিছু দক্ষিণাঞ্চলীয় শক্তির মধ্যে পুনর্গঠন ও সমন্বয় হয়েছে। ইরানের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হুথিরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের আঞ্চলিক যুদ্ধে ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়েছে। এর অংশ হিসেবে গত মাসে সৌদি বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে হামলার ঘোষণা দেয় তারা।

ইয়াহিয়া সারি বলেন, যেকোনো সামরিক পরিস্থিতির জন্য হুথিরা এখন উচ্চ সতর্কতায় রয়েছে। অন্যদিকে, সরকারি বাহিনী বৃহস্পতিবারের হামলার প্রতিশোধ নিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের স্থবির যুদ্ধকে আবারও সক্রিয় করে তুলতে পারে।

না শান্তি, না যুদ্ধ

মারিব ও হাদরামাউতে সরকারি বাহিনীর ওপর হামলাকে ইয়েমেনের সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, দেশটি আরও বড় ধরনের সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

সানায় বসবাসকারী ৩৪ বছর বয়সী আবদুর রহমান সালেহ বলেন, ইয়েমেনের মানুষের কাছে যুদ্ধ এখন আর সম্ভাব্য কোনো হুমকি নয়, বরং বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিনি বলেন, ‘এটি আর সম্ভাব্য হুমকি নয়। এটি বাস্তবে পরিণত হয়েছে। গত কয়েক দিনে আমরা সানায় বারবার বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছি। খবরের মাধ্যমে নিহত ও আহতদের সংখ্যা দেখছি। প্রতিটি পক্ষ তাদের গণমাধ্যমে প্রাণঘাতী হামলা নিয়ে গর্ব করছে।’

তিনি বলেন, ‘এটি আমাদের ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির আগের সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। প্রতিটি পক্ষ প্রতিশোধের জন্য মরিয়া। একজন বেসামরিক নাগরিক হিসেবে আমার মনে হচ্ছে, এখন এই যুদ্ধ থামাতে অলৌকিক কিছু ঘটতে হবে।’

রাজনৈতিক ও সামরিক বিষয় নিয়ে কাজ করা ইয়েমেনি গবেষক ফুয়াদ মুসেদ মনে করেন, সরকারি বাহিনীর সামরিক শিবিরে সাম্প্রতিক হুথি হামলা প্রমাণ করে যে, প্রতিপক্ষের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে গোষ্ঠীটি।

তিনি বলেন, ‘হুথিদের বার্তা স্পষ্ট—ইয়েমেনের ভেতরে ও বাইরে তারা উত্তেজনা বাড়ানোর পথ বেছে নিয়েছে। তারা অভ্যন্তরীণভাবে হামলা বাড়ানোর পাশাপাশি লোহিত সাগরে জাহাজ এবং সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। বলা যায়, না শান্তি, না যুদ্ধ—এই পরিস্থিতির অবসান ঘটেছে।’

২০২২ সালের এপ্রিলে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষ যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছানোর পর থেকে ইয়েমেনে যুদ্ধ অনেকটাই থেমে ছিল। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে উভয় পক্ষই একটি চূড়ান্ত সামরিক লড়াইয়ের আকাঙ্ক্ষার কথা জানিয়েছে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক আহমেদ নাগি বলেন, সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে হুথিদের সীমান্তপারের হামলা সম্প্রসারণের অর্থ হলো দুই পক্ষের মধ্যে সর্বাত্মক যুদ্ধের আশঙ্কা আর দূরের বিষয় নয়।

তিনি বলেন, ‘উভয় পক্ষের এখনো উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের নীতিতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো, প্রতিটি নতুন উত্তেজনামূলক পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে এবং হুথিরা হামলা বাড়ালে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতির ভিত্তিতে আমরা যে লক্ষণগুলো দেখছি, তাতে উত্তেজনা কমার চেয়ে নতুন করে সংঘাত শুরুর ইঙ্গিতই বেশি শক্তিশালী।’

‘যুদ্ধই অগ্রাধিকার’

সৌদি-সমর্থিত প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের সদস্য শেখ ওসমান মাজালি বলেন, ‘সন্ত্রাসী হুথি মিলিশিয়া’ ইয়েমেন ও অঞ্চলটির জন্য হুমকি হয়ে থাকলে শান্তি, নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন, সহাবস্থান বা জাতীয় অংশীদারত্বের কোনো সম্ভাবনা নেই।

সরকারি নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেন টেলিভিশনকে তিনি বলেন, ‘এটি অর্জনের একমাত্র পথ হলো মিলিশিয়াকে মোকাবিলা ও উৎখাত করা এবং আমাদের জনগণ ও অঞ্চলের ওপর তাদের ক্ষতি ও অনিষ্ট বন্ধ করা।’

ইয়েমেনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাদ্দাম আল-হুরাইবি বলেন, বর্তমানে ইয়েমেনে শান্তির বিষয়ে যেকোনো আলোচনা অর্থহীন। বৃহস্পতিবার সরকারি সেনাদের ওপর হুথিদের হামলা ‘যুদ্ধই অগ্রাধিকার’—গোষ্ঠীটির পক্ষ থেকে এমন একটি স্পষ্ট বার্তা।

তিনি বলেন, ‘ইয়েমেনিরা বছরের পর বছর ধরে হুথি ও ইয়েমেন সরকারের মধ্যে শান্তিচুক্তি বা শান্তির রোডম্যাপ বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে। এখন হুথিরা প্রকৃত যুদ্ধ শুরু করেছে, যা শান্তির সব সম্ভাবনাকে ধ্বংস করছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘তারা বছরের পর বছর ধরে চলা শান্তি আলোচনাকে অস্ত্র সংগ্রহ ও তৈরির জন্য ব্যবহার করেছে। এতে তারা স্থানীয় প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘাতের জন্য প্রস্তুত হয়েছে এবং ইসরায়েল ও সৌদি আরব পর্যন্ত হামলা চালানোর সক্ষমতা অর্জন করেছে। তাদের যুদ্ধের পথ থেকে সরে আসতে রাজি করানো সহজ হবে না।’

আল-হুরাইবি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও সৌদি আরব শান্তি প্রস্তাবে সম্মত হওয়ার জন্য হুথিদের অনেক বেশি সময় দিয়েছে। হুথি কর্মকর্তারা বলে আসছেন, সানা কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা সৌদি-সংশ্লিষ্ট কোনো ইয়েমেনি মিলিশিয়া বা সামরিক ইউনিটের উপস্থিতি তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

সাম্প্রতিক হুথি উত্তেজনার পর ইয়েমেন সরকার ও সৌদি আরবের পক্ষ থেকে কোনো জবাব না আসাকে দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবে দেখা হতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, ‘ইয়েমেনি বাহিনী বা সৌদি স্থাপনায় হুথিদের হামলার বিষয়ে নীরবতাকে কৌশলগত ধৈর্য হিসেবে দেখা অর্থহীন। এই অবস্থান অব্যাহত থাকলে তা ইয়েমেন সরকার ও সৌদি আরবের অসহায়ত্বের ইঙ্গিত দেবে এবং জনগণের আস্থা হারাবে।’

মারিবের যুদ্ধ

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মারিব আবারও সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। সেখানে সম্মুখসারিতে প্রাণঘাতী সংঘর্ষও হয়েছে।

সানা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষক আদেল দাশেলা বলেন, উত্তর-মধ্যাঞ্চলীয় মারিব প্রদেশের নিয়ন্ত্রণ হুথিদের জন্য জীবন-মরণ লড়াই হয়ে উঠতে পারে।

তিনি বলেন, ‘আজকের উত্তেজনা এবং হাদরামাউত ও মারিবে সরকারি বাহিনীর শিবিরে হামলার ভিত্তিতে স্পষ্ট যে, হুথি গোষ্ঠী মারিবের তেল ও গ্যাসসমৃদ্ধ অঞ্চলকে লক্ষ্য করে বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সংকটের কোনো সমাধান না হলে সরকারি বাহিনী ও হুথি গোষ্ঠীর মধ্যে স্থলযুদ্ধ আসন্ন—সব ইঙ্গিতই সেদিকেই। তবে এই মুহূর্তে এমন কোনো অগ্রগতির সম্ভাবনা খুবই কম।’

বৃহস্পতিবার হুথি গোষ্ঠী এক বিবৃতিতে জানায়, ইয়েমেনের সীমানার ভেতরে কোনো সৌদি সামরিক উপস্থিতি তারা ‘সহ্য করবে না’। পাশাপাশি তাদের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করে এমন যেকোনো শত্রুতামূলক পদক্ষেপ মোকাবিলায় তাদের ‘বৈধ অধিকার’ রয়েছে বলেও দাবি করে।

আদেল দাশেলার মতে, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার দিক থেকে হুথিরা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারে। তবে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু হলে সহিংসতার মাত্রা ভয়াবহ হবে।

তিনি বলেন, ‘সব যুদ্ধফ্রন্টে পূর্ণমাত্রার সংঘাত শুরু হলে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে পাল্লা দেওয়া হুথি গোষ্ঠীর জন্য কঠিন হবে। ফলে এমন যুদ্ধ শুরু হলে তা আগের সংঘাতগুলোর মতো হবে না; বরং আরও রক্তক্ষয়ী হবে।’

সংযমের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে

হুথিরা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিলেও সৌদি আরব ও ইয়েমেন সরকার সামরিক জবাবের পরিবর্তে উত্তেজনা কমানোর ওপর জোর দিয়েছে। যদিও গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে কিছু নিয়ন্ত্রিত হামলা চালানো হয়েছে।

আহমেদ নাগি বলেন, ‘সৌদি আরব ও ইয়েমেন সরকার এখনো উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের নীতিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে মনে হচ্ছে এবং সম্ভবত তারা এই রাজনৈতিক পদ্ধতির সীমা পরীক্ষা করছে।’

তিনি বলেন, ‘প্রশ্ন হলো, তারা কতদিন এই কৌশল ধরে রাখতে পারবে। বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে তারা যখন জোট গঠন ও সম্মুখসারিতে সামরিক ইউনিট শক্তিশালী করার মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করছে।’

বর্তমান উত্তেজনার ধারা অব্যাহত থাকলে সৌদি আরব ও ইয়েমেন সরকারের ওপর আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার চাপ বাড়বে বলেও জানান নাগি।

তিনি বলেন, ‘এর অর্থ সীমিত সামরিক অভিযান হতে পারে অথবা কৌশলে আরও বড় পরিবর্তন আসতে পারে। তবে বিষয়টি এখনো দেখা বাকি। কিন্তু আরও দীর্ঘ সময় সংযম বজায় রাখার সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে।’