12:30 am, Monday, 9 November 2026

জিরো সুগার ও ডায়েট খাবারের আড়ালে অদৃশ্য ঝুঁকি

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

শহুরে ব্যস্ত জীবনে নাগরিক আভিজাত্য, ফিটনেস সচেতনতা আর আধুনিকতার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে জিরো সুগার বা ডায়েট খাবার। একই সঙ্গে তীব্র গরমে কিংবা সামাজিক আড্ডায় নামি-দামি ক্যাফে বা রেস্টুরেন্টের কোল্ড কফি কিংবা জুসের গ্লাসে চুমুক দেওয়া এখন উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তের প্রতিদিনের লাইফস্টাইল।

কিন্তু এই চকচকে ও আধুনিক খাদ্যাভ্যাসের আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ ও নীরব জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়। একদিকে ডায়েট ও সুগার-ফ্রি পণ্যের মোড়কে চলছে আন্তর্জাতিক মানের পুষ্টি-প্রতারণা, অন্যদিকে নামি ক্যাফেগুলোর সুস্বাদু পানীয়তে অবাধে মেশানো হচ্ছে নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর কারখানার বাণিজ্যিক বরফ। ল্যাবরেটরি টেস্ট এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দুই অদৃশ্য বিষের কারণে দেশে ফ্যাটি লিভার, ক্রনিক কিডনি ডিজিজ, জন্ডিস ও টাইফয়েডের মতো মারাত্মক রোগের প্রকোপ তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।

সরকারি সূত্র মতে, ‘জিরো সুগার’ বা কৃত্রিম চিনি দিয়ে তৈরি পণ্যের প্রচারণাকে সরাসরি ‘প্রতারণা’ আখ্যা দিয়ে বাংলাদেশ সরকারের আলাদা কোনো নির্দিষ্ট আইন বা সরকারি ঘোষণা নেই। তবে ভোক্তাদের বিভ্রান্ত করা বা পণ্যের গুণগত মান নিয়ে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত সাধারণ আইন ও স্বাস্থ্য নির্দেশিকায় স্পষ্ট বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর ৪৪ ধারা অনুযায়ী, কোনো পণ্য বা সেবা সম্পর্কে অসত্য বা বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপন দ্বারা ক্রেতাসাধারণকে প্রতারিত করা দণ্ডনীয় অপরাধ। পণ্যের মোড়কে পুষ্টিগুণ বা উপাদানের ভুল তথ্য দেওয়া হলে ৪৫ ধারা অনুযায়ী জরিমানা ও শাস্তির বিধান রয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ অনুযায়ী যেকোনো প্যাকেটজাত খাবারের লেবেলে সঠিক উপাদান ও পুষ্টিগুণের তথ্য থাকা বাধ্যতামূলক।

সরকারি সংস্থা যেমন বিএসটিআই এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিক মান (যেমন ইউএস-এফডিএ বা ডব্লিউএইচও) অনুসরণ করে সুক্রালোজ, অ্যাসপারটেম কিংবা স্টিভিয়ার মতো নন-নিউট্রিটিভ সুইটনার বা কৃত্রিম মিষ্টি নির্দিষ্ট মাত্রায় ব্যবহারের অনুমোদন দেয়। কোনো পণ্যে সাধারণ চিনি না থাকলে কোম্পানি ‘জিরো সুগার’ বা ‘নো সুগার অ্যাডেড’ লিখতে পারে, তবে সেখানে কোন কৃত্রিম মিষ্টি ব্যবহার করা হয়েছে তা উপাদানের তালিকায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হয়।

এটি না করা হলে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ জরিমানা বা আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে। ২০০৯-এ বলা হয়েছে, যদি কোনো কোম্পানি ‘জিরো সুগার’ দাবি করে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে পণ্যটিতে সাধারণ চিনি (সুক্রোজ) বা লুকানো কোনো প্রাকৃতিক ক্যালরিযুক্ত চিনি ব্যবহার করে, তবে তা এই আইনের আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, সুপারশপ থেকে শুরু করে পাড়ার মুদি দোকানেও এখন ‘ডায়েট ওটস বিস্কুট’, ‘জিরো ক্যালরি ড্রিংকস’, ‘সুগার ফ্রি’ এনার্জি বার বা জ্যাম-জেলির ছড়াছড়ি।

ওজন কমাতে, মেদ ঝরাতে কিংবা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সচেতন মানুষ সাধারণ পণ্যের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ বা তিন গুণ দাম দিয়ে এগুলো কিনছেন। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই পণ্যগুলোতে সরাসরি চিনি না থাকলেও চিনির বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে উচ্চমাত্রার কৃত্রিম সুইটনার (আর্টিফিসিয়াল সুইটএনার্স), যার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত উপাদানটি হচ্ছে অ্যাস্পারটেম, এ ছাড়া দেদারসে ব্যবহৃত হচ্ছে সুক্রালোজ এবং অ্যাসেসালফেম পটাশিয়াম।

দেশের নামি ব্রান্ডের মিষ্টিও সুগার ফ্রির নামে বিক্রি হচ্ছে। তবে বাস্তবে তার পরিমাণ কতটা সঠিক তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সাধারণ ক্রেতাদের চোখ এড়াতে মোড়কের পেছনে অত্যন্ত ছোট অক্ষরে রাসায়নিক নামগুলো লিখে রাখা হয়, যা ফ্রন্ট-অব-প্যাক লেবেলিং বা সামনের সতর্কবার্তা না থাকায় সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা অসম্ভব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কৃত্রিম সুইটনার নিয়ে বৈশ্বিক সতর্কতা জারি করে জানিয়েছে, ওজন কমানোর ক্ষেত্রে এই নন-সুগার সুইটনারগুলোর (এনএসএস) কোনো দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নেই।

উল্টো এগুলো নিয়মিত গ্রহণে টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে। তদুপরি, ডব্লিউএইচও-এর ক্যান্সার গবেষণা শাখা (আইএআরসি) অ্যাস্পারটেমকে মানুষের জন্য, সম্ভাব্য ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদান (পসিবলি কারসিনোজেনিক) হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, কৃত্রিম সুইটনারগুলো যখন জিহ্বায় লাগে, তখন মস্তিষ্ক সংকেত পায় যে শরীরে চিনি বা ক্যালরি আসছে।

কিন্তু বাস্তবে কোনো ক্যালরি না পাওয়ায় শরীরের বিপাক প্রক্রিয়া (মেটাবলিজম) সম্পূর্ণ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। এটি অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে দেয়, যা হজমক্ষমতা নষ্ট করে এবং লিভারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। দীর্ঘদিন এগুলো গ্রহণের ফলে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বেড়ে যায়, যা মানুষকে আরও দ্রুত স্থূলতার দিকে ঠেলে দেয়।

বারডেম হাসপাতালের প্রধান পুষ্টিবিদ শামসুননাহার মহুয়া বলেন, ‘আমাদের কাছে প্রতিদিন অনেক রোগী আসেন, যারা বলেন, তারা চিনি পুরোপুরি ছেড়ে ডায়েট কোক বা সুগার-ফ্রি বিস্কুট খাচ্ছেন, তা-ও ওজন কমছে না, উল্টো লিভারে চর্বি জমছে। কৃত্রিম সুইটনার হলো এক ধরনের রাসায়নিক ফাঁদ। এটি মানুষের মিষ্টি খাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে প্রাকৃতিকভাবে না কমিয়ে কৃত্রিমভাবে সজাগ রাখে।

সাধারণ মানুষ ভাবছে, তারা স্বাস্থ্যকর খাবার খাচ্ছে; অথচ তারা প্রতিদিন এক চামচ করে রাসায়নিক বিষ শরীরে ঢোকাচ্ছে। ’ নিউক্লিয়ার মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এবং পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক সানোয়ার হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘এসব কোল্ড কফি জাতীয় খাবারে অ্যাস্পারটেম থাকে। সম্ভাব্য ক্যান্সার সৃষ্টিকারী এই উপাদানটি সরাসরি লিভারের বিপাক প্রক্রিয়া ব্যাহত করে ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি বাড়ায় এবং মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

এরপর রয়েছে সুক্রালোজ। অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে খাবার হজম ও পুষ্টি শোষণের ক্ষমতা নষ্ট করে। দীর্ঘদিন গ্রহণে রক্তে শর্করার মাত্রা ও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স উল্টো বাড়িয়ে দেয়। আরও আছে, অ্যাসেসালফেম পটাশিয়াম। এই রাসায়নিকটিতে মিথিলিন ক্লোরাইড থাকে। এটি নিয়মিত শরীরে প্রবেশ করলে মাথাব্যথা, বমি ভাব, লিভার-কিডনির কার্যক্ষমতা হ্রাস এবং দীর্ঘ মেয়াদে টিউমার হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

’ অধ্যাপক সানোয়ার হোসেন আরও বলেন, ‘বরফে থাকা ই-কোলাই ও টোটাল কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া সরাসরি পরিপাকতন্ত্রে আক্রমণ করে তীব্র ডায়রিয়া, গ্যাস্ট্রোএন্টারটাইটিস, জন্ডিস এবং টাইফয়েড জ্বর তৈরি করে। ’ গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুরে বা সন্ধ্যায় ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী কিংবা উত্তরার কোনো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ও নান্দনিক ক্যাফেতে বসে যখন আপনি আকর্ষণীয় কোনো কোল্ড কফি, মিন্ট লেমোনাড বা ম্যাঙ্গো স্মুদি অর্ডার করছেন, তখন আপনি মূলত কয়েকশত টাকার বিনিময়ে কিনে নিচ্ছেন জন্ডিস বা টাইফয়েডের জীবাণু।

বেসরকারি সংস্থা হেলফ ফর ইউ-এর নির্বাহী ডা. নাসিমা আক্তার জানান, তাদের অনুসন্ধানে জানা গেছে, সব রেস্টুরেন্ট না হলেও রাজধানীর প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ মাঝারি ও অভিজাত রেস্টুরেন্ট বা ক্যাফে তাদের কোল্ড ড্রিংকসে যে বরফ ব্যবহার করে, তা তৈরি করার মতো নিজস্ব কমার্শিয়াল আইস-মেকার মেশিন তাদের নেই। খরচ বাঁচাতে তারা এই বরফ নামমাত্র মূল্যে বস্তা হিসেবে কিনে আনে পুরান ঢাকা, কারওয়ান বাজার, যাত্রাবাড়ী বা সাভারের বাণিজ্যিক বরফ কলগুলো থেকে।

এই কলগুলোতে সরাসরি ওয়াসার বা ভূগর্ভস্থ অনিরাপদ, ময়লা, লোহা ও ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াযুক্ত পানি কোনো প্রকার ফিল্টারিং ছাড়াই বরফ জমানোর জন্য ব্যবহার করা হয়। মূলত মাছ সংরক্ষণ, মৃতদেহ বা শিল্প-কারখানায় ব্যবহারের জন্য উৎপাদিত এই বাণিজ্যিক বরফই নোংরা পাটের বস্তায় ভরে সরবরাহ করা হয় অভিজাত ক্যাফেগুলোতে। সেখানে চকচকে কিচেনের ভেতরে বিশেষ ক্রাশার মেশিনে এগুলো গুঁড়ো করে মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে ক্রেতার সাধের পানীয়তে।

আবার অনেক রেস্টুরেন্টে নিজস্ব ফ্রিজে বরফ তৈরি করলেও সেখানে যে পানি ব্যবহার করা হয়, সেগুলো সাধারণ ওয়াসার পানি। কোনো মিনারেল বা ফিল্টার করা পানি নয়। সম্প্রতি ঢাকার বেশ কয়েকটি ক্যাফে থেকে সংগৃহীত বরফের নমুনার ল্যাবরেটরি টেস্টে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের গবেষণাগারে ভয়াবহ তথ্য মিলেছে। এই বরফগুলোতে ক্ষতিকারক ই-কোলাই এবং টোটাল কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে শতগুণ বেশি।

মানুষের মলমূত্রের মাধ্যমে ছড়ানো এই ব্যাকটেরিয়াগুলো প্রমাণ করে যে, বরফ তৈরিতে ব্যবহৃত পানি কতটা দূষিত ও মল-দূষিত ছিল। ভুক্তভোগিদের অবিযোগের আঙ্গুল রাজধানীর অভিজাত এলাকার বড় বড় কফি হাউসগুলোর দিকেও। সেখানে কোল্ড কফিতে যে বরফ মেশানো হয় সেগুলোও স্বাস্থ্যসম্মত নয়। তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করে গুলশান-২ অবস্থিত গ্লোরিয়া জিন’স কফিস ম্যানেজার মেহেদী হাসান শুভ বলেন, ‘অন্য কোন হাউসের কথা বলতে পারব না, আমরা নিজস্ব প্রযুক্তির মাধ্যমে পানি ফিল্টারিং করে সেই পানির বরফ দিয়ে কোল্ড কফি বানানো হয়।

’ ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজের শিক্ষক ও সংক্রামক ব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডা. জাকিয়া ফেরদৌসী খান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘শহরাঞ্চলে টাইফয়েড ও হেপাটাইটিসে (জন্ডিস) রোগে আক্রান্ত তরুণদের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, তাদের প্রায় সবারই বাইরের কোল্ড কফি বা জুস খাওয়ার নিয়মিত অভ্যাস রয়েছে। বাণিজ্যিক বরফ কখনোই ফুটানো পানি দিয়ে তৈরি হয় না।

বরফ হয়ে যাওয়ার পর পানির ভেতরের ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস মরে যায় না, বরং সুপ্ত অবস্থায় থাকে। যখনই তা কফি বা জুসের সঙ্গে মিশে আবার তরল হয়, তখন তা মানবদেহের পাকস্থলীতে গিয়ে তীব্র সংক্রমণ ঘটায়। এটি সরাসরি লিভার ড্যামেজের জন্য দায়ী। ’ কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হারুন-অর-রশিদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘একদিকে কৃত্রিম সুইটনারের কেমিক্যাল লোড, অন্যদিকে অনিরাপদ বরফের ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ, এই দুয়ের জোড়া আঘাতে নগরবাসীর ফিল্টারিং অর্গান— অর্থাৎ লিভার ও কিডনি অল্প বয়সেই বিকল হয়ে যাচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে তরুণদের মাঝে ক্রনিক কিডনি ডিজিজ (সিকেডি) বাড়ার পেছনে এই ভেজাল লাইফস্টাইল অন্যতম প্রধান কারণ। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) নিয়মিত অভিযানের তালিকায় রেস্টুরেন্টের নোংরা পরিবেশ বা বাসি খাবার থাকলেও, পানীয়তে ব্যবহৃত বরফের উৎস বা এর গুণগত মান পরীক্ষা করার মতো আধুনিক ব্যবস্থা মাঠ পর্যায়ে খুবই সীমিত।

বরফ কলগুলোর ওপর সরকারের কোনো কার্যকর তদারকি নেই বললেই চলে। অন্যদিকে, বিএসটিআই প্যাকেটজাত খাবারের অনুমোদন দিলেও, চটকদার বিজ্ঞাপনে ‘ডায়েট’ বা ‘জিরো ক্যালরি’ লেখার আড়ালে যে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে, তা মোড়কের সামনে বাধ্যতামূলকভাবে সতর্কবার্তা (ফ্রন্ট-অফ-প্যাক ওয়ার্নিং লেবেলিং) হিসেবে লিখে দেওয়ার কোনো কঠোর আইনি ফ্রেমওয়ার্ক এখনো দেশে বাস্তবায়ন করা হয়নি।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্যাকেটের গায়ে উচ্চমাত্রার সুইটনার বা স্বাস্থ্যঝুঁকির ব্যাপারে লাল চিহ্নের ব্যবহার থাকলেও আমাদের দেশে আইনের এই শিথিলতাকে কাজে লাগাচ্ছে বহুজাতিক ও স্থানীয় খাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো।

জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, অতিরিক্ত সচিব মো. জহিরুল ইসলাম অনুসন্ধানী এই রিপোর্টের পরিপ্রেক্ষিতে রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘ডায়াবেটিস বা মেদ কমানোর নামে সাধারণ মানুষকে যারা বিভ্রান্তিকর লেবেলিংয়ের মাধ্যমে ক্ষতিকর কেমিক্যাল খাওয়াচ্ছে, তারা মূলত ভোক্তার পকেট কাটার পাশাপাশি তাদের জীবন নিয়ে খেলছে।

ফ্রন্ট-অফ-প্যাক লেবেলিং বা মোড়কের সামনে বড় অক্ষরে সতর্কবার্তা না দেওয়াও এক ধরনের অপরাধ। অন্যদিকে, চকচকে ক্যাফেতে বসে মানুষ চড়া দামে বিষাক্ত ব্যাকটেরিয়াযুক্ত বরফ খাবে, এটা মেনে নেওয়া যায় না। খুব শিগগিরই নামি ক্যাফেগুলোর বরফের উৎস এবং সুপারশপের ডায়েট ফুডের ল্যাব টেস্ট রিপোর্ট ধরে চিরুনি অভিযান শুরু করা হবে। জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি করে অভিজাত প্রতারণা বরদাশত করা হবে না।

’ বিশেষজ্ঞদের মতে, নাগরিক আভিজাত্যের মোড়কে এবং জৌলুসপূর্ণ ক্যাফের আলো-আঁধারিতে প্রতিদিন এক নীরব ও দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য বিপর্যয় ঘটে চলেছে দেশের নগরগুলোতে, যার মাশুল সাধারণ মানুষকে দিতে হচ্ছে নিজেদের অমূল্য জীবন ও কোটি কোটি টাকার চিকিৎসা ব্যয় দিয়ে। এই সংকট থেকে বাঁচতে এখনই প্রয়োজন সরকারি কঠোর তদারকি, আইন সংশোধন এবং ভোক্তা হিসেবে নিজস্ব সচেতনতা।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

Nagorik Sangram

Popular Post

দাগনভূঞায় বিএনপির দুপক্ষের সংঘর্ষ ও ককটেল বিস্ফোরণ, ওসির দাবি বাজির শব্দ

জিরো সুগার ও ডায়েট খাবারের আড়ালে অদৃশ্য ঝুঁকি

Update Time : 12:12:44 am, Sunday, 6 September 2026

শহুরে ব্যস্ত জীবনে নাগরিক আভিজাত্য, ফিটনেস সচেতনতা আর আধুনিকতার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে জিরো সুগার বা ডায়েট খাবার। একই সঙ্গে তীব্র গরমে কিংবা সামাজিক আড্ডায় নামি-দামি ক্যাফে বা রেস্টুরেন্টের কোল্ড কফি কিংবা জুসের গ্লাসে চুমুক দেওয়া এখন উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তের প্রতিদিনের লাইফস্টাইল।

কিন্তু এই চকচকে ও আধুনিক খাদ্যাভ্যাসের আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ ও নীরব জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়। একদিকে ডায়েট ও সুগার-ফ্রি পণ্যের মোড়কে চলছে আন্তর্জাতিক মানের পুষ্টি-প্রতারণা, অন্যদিকে নামি ক্যাফেগুলোর সুস্বাদু পানীয়তে অবাধে মেশানো হচ্ছে নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর কারখানার বাণিজ্যিক বরফ। ল্যাবরেটরি টেস্ট এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দুই অদৃশ্য বিষের কারণে দেশে ফ্যাটি লিভার, ক্রনিক কিডনি ডিজিজ, জন্ডিস ও টাইফয়েডের মতো মারাত্মক রোগের প্রকোপ তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।

সরকারি সূত্র মতে, ‘জিরো সুগার’ বা কৃত্রিম চিনি দিয়ে তৈরি পণ্যের প্রচারণাকে সরাসরি ‘প্রতারণা’ আখ্যা দিয়ে বাংলাদেশ সরকারের আলাদা কোনো নির্দিষ্ট আইন বা সরকারি ঘোষণা নেই। তবে ভোক্তাদের বিভ্রান্ত করা বা পণ্যের গুণগত মান নিয়ে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত সাধারণ আইন ও স্বাস্থ্য নির্দেশিকায় স্পষ্ট বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর ৪৪ ধারা অনুযায়ী, কোনো পণ্য বা সেবা সম্পর্কে অসত্য বা বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপন দ্বারা ক্রেতাসাধারণকে প্রতারিত করা দণ্ডনীয় অপরাধ। পণ্যের মোড়কে পুষ্টিগুণ বা উপাদানের ভুল তথ্য দেওয়া হলে ৪৫ ধারা অনুযায়ী জরিমানা ও শাস্তির বিধান রয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ অনুযায়ী যেকোনো প্যাকেটজাত খাবারের লেবেলে সঠিক উপাদান ও পুষ্টিগুণের তথ্য থাকা বাধ্যতামূলক।

সরকারি সংস্থা যেমন বিএসটিআই এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিক মান (যেমন ইউএস-এফডিএ বা ডব্লিউএইচও) অনুসরণ করে সুক্রালোজ, অ্যাসপারটেম কিংবা স্টিভিয়ার মতো নন-নিউট্রিটিভ সুইটনার বা কৃত্রিম মিষ্টি নির্দিষ্ট মাত্রায় ব্যবহারের অনুমোদন দেয়। কোনো পণ্যে সাধারণ চিনি না থাকলে কোম্পানি ‘জিরো সুগার’ বা ‘নো সুগার অ্যাডেড’ লিখতে পারে, তবে সেখানে কোন কৃত্রিম মিষ্টি ব্যবহার করা হয়েছে তা উপাদানের তালিকায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হয়।

এটি না করা হলে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ জরিমানা বা আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে। ২০০৯-এ বলা হয়েছে, যদি কোনো কোম্পানি ‘জিরো সুগার’ দাবি করে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে পণ্যটিতে সাধারণ চিনি (সুক্রোজ) বা লুকানো কোনো প্রাকৃতিক ক্যালরিযুক্ত চিনি ব্যবহার করে, তবে তা এই আইনের আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, সুপারশপ থেকে শুরু করে পাড়ার মুদি দোকানেও এখন ‘ডায়েট ওটস বিস্কুট’, ‘জিরো ক্যালরি ড্রিংকস’, ‘সুগার ফ্রি’ এনার্জি বার বা জ্যাম-জেলির ছড়াছড়ি।

ওজন কমাতে, মেদ ঝরাতে কিংবা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সচেতন মানুষ সাধারণ পণ্যের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ বা তিন গুণ দাম দিয়ে এগুলো কিনছেন। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই পণ্যগুলোতে সরাসরি চিনি না থাকলেও চিনির বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে উচ্চমাত্রার কৃত্রিম সুইটনার (আর্টিফিসিয়াল সুইটএনার্স), যার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত উপাদানটি হচ্ছে অ্যাস্পারটেম, এ ছাড়া দেদারসে ব্যবহৃত হচ্ছে সুক্রালোজ এবং অ্যাসেসালফেম পটাশিয়াম।

দেশের নামি ব্রান্ডের মিষ্টিও সুগার ফ্রির নামে বিক্রি হচ্ছে। তবে বাস্তবে তার পরিমাণ কতটা সঠিক তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সাধারণ ক্রেতাদের চোখ এড়াতে মোড়কের পেছনে অত্যন্ত ছোট অক্ষরে রাসায়নিক নামগুলো লিখে রাখা হয়, যা ফ্রন্ট-অব-প্যাক লেবেলিং বা সামনের সতর্কবার্তা না থাকায় সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা অসম্ভব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কৃত্রিম সুইটনার নিয়ে বৈশ্বিক সতর্কতা জারি করে জানিয়েছে, ওজন কমানোর ক্ষেত্রে এই নন-সুগার সুইটনারগুলোর (এনএসএস) কোনো দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নেই।

উল্টো এগুলো নিয়মিত গ্রহণে টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে। তদুপরি, ডব্লিউএইচও-এর ক্যান্সার গবেষণা শাখা (আইএআরসি) অ্যাস্পারটেমকে মানুষের জন্য, সম্ভাব্য ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদান (পসিবলি কারসিনোজেনিক) হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, কৃত্রিম সুইটনারগুলো যখন জিহ্বায় লাগে, তখন মস্তিষ্ক সংকেত পায় যে শরীরে চিনি বা ক্যালরি আসছে।

কিন্তু বাস্তবে কোনো ক্যালরি না পাওয়ায় শরীরের বিপাক প্রক্রিয়া (মেটাবলিজম) সম্পূর্ণ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। এটি অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে দেয়, যা হজমক্ষমতা নষ্ট করে এবং লিভারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। দীর্ঘদিন এগুলো গ্রহণের ফলে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বেড়ে যায়, যা মানুষকে আরও দ্রুত স্থূলতার দিকে ঠেলে দেয়।

বারডেম হাসপাতালের প্রধান পুষ্টিবিদ শামসুননাহার মহুয়া বলেন, ‘আমাদের কাছে প্রতিদিন অনেক রোগী আসেন, যারা বলেন, তারা চিনি পুরোপুরি ছেড়ে ডায়েট কোক বা সুগার-ফ্রি বিস্কুট খাচ্ছেন, তা-ও ওজন কমছে না, উল্টো লিভারে চর্বি জমছে। কৃত্রিম সুইটনার হলো এক ধরনের রাসায়নিক ফাঁদ। এটি মানুষের মিষ্টি খাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে প্রাকৃতিকভাবে না কমিয়ে কৃত্রিমভাবে সজাগ রাখে।

সাধারণ মানুষ ভাবছে, তারা স্বাস্থ্যকর খাবার খাচ্ছে; অথচ তারা প্রতিদিন এক চামচ করে রাসায়নিক বিষ শরীরে ঢোকাচ্ছে। ’ নিউক্লিয়ার মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এবং পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক সানোয়ার হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘এসব কোল্ড কফি জাতীয় খাবারে অ্যাস্পারটেম থাকে। সম্ভাব্য ক্যান্সার সৃষ্টিকারী এই উপাদানটি সরাসরি লিভারের বিপাক প্রক্রিয়া ব্যাহত করে ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি বাড়ায় এবং মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

এরপর রয়েছে সুক্রালোজ। অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে খাবার হজম ও পুষ্টি শোষণের ক্ষমতা নষ্ট করে। দীর্ঘদিন গ্রহণে রক্তে শর্করার মাত্রা ও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স উল্টো বাড়িয়ে দেয়। আরও আছে, অ্যাসেসালফেম পটাশিয়াম। এই রাসায়নিকটিতে মিথিলিন ক্লোরাইড থাকে। এটি নিয়মিত শরীরে প্রবেশ করলে মাথাব্যথা, বমি ভাব, লিভার-কিডনির কার্যক্ষমতা হ্রাস এবং দীর্ঘ মেয়াদে টিউমার হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

’ অধ্যাপক সানোয়ার হোসেন আরও বলেন, ‘বরফে থাকা ই-কোলাই ও টোটাল কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া সরাসরি পরিপাকতন্ত্রে আক্রমণ করে তীব্র ডায়রিয়া, গ্যাস্ট্রোএন্টারটাইটিস, জন্ডিস এবং টাইফয়েড জ্বর তৈরি করে। ’ গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুরে বা সন্ধ্যায় ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী কিংবা উত্তরার কোনো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ও নান্দনিক ক্যাফেতে বসে যখন আপনি আকর্ষণীয় কোনো কোল্ড কফি, মিন্ট লেমোনাড বা ম্যাঙ্গো স্মুদি অর্ডার করছেন, তখন আপনি মূলত কয়েকশত টাকার বিনিময়ে কিনে নিচ্ছেন জন্ডিস বা টাইফয়েডের জীবাণু।

বেসরকারি সংস্থা হেলফ ফর ইউ-এর নির্বাহী ডা. নাসিমা আক্তার জানান, তাদের অনুসন্ধানে জানা গেছে, সব রেস্টুরেন্ট না হলেও রাজধানীর প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ মাঝারি ও অভিজাত রেস্টুরেন্ট বা ক্যাফে তাদের কোল্ড ড্রিংকসে যে বরফ ব্যবহার করে, তা তৈরি করার মতো নিজস্ব কমার্শিয়াল আইস-মেকার মেশিন তাদের নেই। খরচ বাঁচাতে তারা এই বরফ নামমাত্র মূল্যে বস্তা হিসেবে কিনে আনে পুরান ঢাকা, কারওয়ান বাজার, যাত্রাবাড়ী বা সাভারের বাণিজ্যিক বরফ কলগুলো থেকে।

এই কলগুলোতে সরাসরি ওয়াসার বা ভূগর্ভস্থ অনিরাপদ, ময়লা, লোহা ও ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াযুক্ত পানি কোনো প্রকার ফিল্টারিং ছাড়াই বরফ জমানোর জন্য ব্যবহার করা হয়। মূলত মাছ সংরক্ষণ, মৃতদেহ বা শিল্প-কারখানায় ব্যবহারের জন্য উৎপাদিত এই বাণিজ্যিক বরফই নোংরা পাটের বস্তায় ভরে সরবরাহ করা হয় অভিজাত ক্যাফেগুলোতে। সেখানে চকচকে কিচেনের ভেতরে বিশেষ ক্রাশার মেশিনে এগুলো গুঁড়ো করে মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে ক্রেতার সাধের পানীয়তে।

আবার অনেক রেস্টুরেন্টে নিজস্ব ফ্রিজে বরফ তৈরি করলেও সেখানে যে পানি ব্যবহার করা হয়, সেগুলো সাধারণ ওয়াসার পানি। কোনো মিনারেল বা ফিল্টার করা পানি নয়। সম্প্রতি ঢাকার বেশ কয়েকটি ক্যাফে থেকে সংগৃহীত বরফের নমুনার ল্যাবরেটরি টেস্টে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের গবেষণাগারে ভয়াবহ তথ্য মিলেছে। এই বরফগুলোতে ক্ষতিকারক ই-কোলাই এবং টোটাল কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে শতগুণ বেশি।

মানুষের মলমূত্রের মাধ্যমে ছড়ানো এই ব্যাকটেরিয়াগুলো প্রমাণ করে যে, বরফ তৈরিতে ব্যবহৃত পানি কতটা দূষিত ও মল-দূষিত ছিল। ভুক্তভোগিদের অবিযোগের আঙ্গুল রাজধানীর অভিজাত এলাকার বড় বড় কফি হাউসগুলোর দিকেও। সেখানে কোল্ড কফিতে যে বরফ মেশানো হয় সেগুলোও স্বাস্থ্যসম্মত নয়। তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করে গুলশান-২ অবস্থিত গ্লোরিয়া জিন’স কফিস ম্যানেজার মেহেদী হাসান শুভ বলেন, ‘অন্য কোন হাউসের কথা বলতে পারব না, আমরা নিজস্ব প্রযুক্তির মাধ্যমে পানি ফিল্টারিং করে সেই পানির বরফ দিয়ে কোল্ড কফি বানানো হয়।

’ ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজের শিক্ষক ও সংক্রামক ব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডা. জাকিয়া ফেরদৌসী খান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘শহরাঞ্চলে টাইফয়েড ও হেপাটাইটিসে (জন্ডিস) রোগে আক্রান্ত তরুণদের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, তাদের প্রায় সবারই বাইরের কোল্ড কফি বা জুস খাওয়ার নিয়মিত অভ্যাস রয়েছে। বাণিজ্যিক বরফ কখনোই ফুটানো পানি দিয়ে তৈরি হয় না।

বরফ হয়ে যাওয়ার পর পানির ভেতরের ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস মরে যায় না, বরং সুপ্ত অবস্থায় থাকে। যখনই তা কফি বা জুসের সঙ্গে মিশে আবার তরল হয়, তখন তা মানবদেহের পাকস্থলীতে গিয়ে তীব্র সংক্রমণ ঘটায়। এটি সরাসরি লিভার ড্যামেজের জন্য দায়ী। ’ কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হারুন-অর-রশিদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘একদিকে কৃত্রিম সুইটনারের কেমিক্যাল লোড, অন্যদিকে অনিরাপদ বরফের ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ, এই দুয়ের জোড়া আঘাতে নগরবাসীর ফিল্টারিং অর্গান— অর্থাৎ লিভার ও কিডনি অল্প বয়সেই বিকল হয়ে যাচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে তরুণদের মাঝে ক্রনিক কিডনি ডিজিজ (সিকেডি) বাড়ার পেছনে এই ভেজাল লাইফস্টাইল অন্যতম প্রধান কারণ। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) নিয়মিত অভিযানের তালিকায় রেস্টুরেন্টের নোংরা পরিবেশ বা বাসি খাবার থাকলেও, পানীয়তে ব্যবহৃত বরফের উৎস বা এর গুণগত মান পরীক্ষা করার মতো আধুনিক ব্যবস্থা মাঠ পর্যায়ে খুবই সীমিত।

বরফ কলগুলোর ওপর সরকারের কোনো কার্যকর তদারকি নেই বললেই চলে। অন্যদিকে, বিএসটিআই প্যাকেটজাত খাবারের অনুমোদন দিলেও, চটকদার বিজ্ঞাপনে ‘ডায়েট’ বা ‘জিরো ক্যালরি’ লেখার আড়ালে যে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে, তা মোড়কের সামনে বাধ্যতামূলকভাবে সতর্কবার্তা (ফ্রন্ট-অফ-প্যাক ওয়ার্নিং লেবেলিং) হিসেবে লিখে দেওয়ার কোনো কঠোর আইনি ফ্রেমওয়ার্ক এখনো দেশে বাস্তবায়ন করা হয়নি।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্যাকেটের গায়ে উচ্চমাত্রার সুইটনার বা স্বাস্থ্যঝুঁকির ব্যাপারে লাল চিহ্নের ব্যবহার থাকলেও আমাদের দেশে আইনের এই শিথিলতাকে কাজে লাগাচ্ছে বহুজাতিক ও স্থানীয় খাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো।

জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, অতিরিক্ত সচিব মো. জহিরুল ইসলাম অনুসন্ধানী এই রিপোর্টের পরিপ্রেক্ষিতে রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘ডায়াবেটিস বা মেদ কমানোর নামে সাধারণ মানুষকে যারা বিভ্রান্তিকর লেবেলিংয়ের মাধ্যমে ক্ষতিকর কেমিক্যাল খাওয়াচ্ছে, তারা মূলত ভোক্তার পকেট কাটার পাশাপাশি তাদের জীবন নিয়ে খেলছে।

ফ্রন্ট-অফ-প্যাক লেবেলিং বা মোড়কের সামনে বড় অক্ষরে সতর্কবার্তা না দেওয়াও এক ধরনের অপরাধ। অন্যদিকে, চকচকে ক্যাফেতে বসে মানুষ চড়া দামে বিষাক্ত ব্যাকটেরিয়াযুক্ত বরফ খাবে, এটা মেনে নেওয়া যায় না। খুব শিগগিরই নামি ক্যাফেগুলোর বরফের উৎস এবং সুপারশপের ডায়েট ফুডের ল্যাব টেস্ট রিপোর্ট ধরে চিরুনি অভিযান শুরু করা হবে। জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি করে অভিজাত প্রতারণা বরদাশত করা হবে না।

’ বিশেষজ্ঞদের মতে, নাগরিক আভিজাত্যের মোড়কে এবং জৌলুসপূর্ণ ক্যাফের আলো-আঁধারিতে প্রতিদিন এক নীরব ও দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য বিপর্যয় ঘটে চলেছে দেশের নগরগুলোতে, যার মাশুল সাধারণ মানুষকে দিতে হচ্ছে নিজেদের অমূল্য জীবন ও কোটি কোটি টাকার চিকিৎসা ব্যয় দিয়ে। এই সংকট থেকে বাঁচতে এখনই প্রয়োজন সরকারি কঠোর তদারকি, আইন সংশোধন এবং ভোক্তা হিসেবে নিজস্ব সচেতনতা।