পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে আশঙ্কার চেয়েও দ্রুত। এর মধ্যে শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাব যুক্ত হওয়ায় আগামী কয়েক মাসে বিশ্বজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহ, খরা, দাবানল ও পানির সংকট আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
জলবায়ু বিজ্ঞানীদের নতুন এক পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী ছয় থেকে নয় মাসে অতিরিক্ত তাপের কারণে প্রায় ৪ লাখ ৫১ হাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক জলবায়ু গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের গবেষণায় এই আশঙ্কা তুলে ধরা হয়েছে। গবেষকেরা বিশ্বের ২৪ হাজারের বেশি অঞ্চলের তাপমাত্রা ও তাপজনিত মৃত্যুর দীর্ঘমেয়াদি তথ্য বিশ্লেষণ করে এই হিসাব করেছেন।
১৯৯৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তাপজনিত মৃত্যুর গড় হারকে ভিত্তি ধরে এল নিনোর কারণে সম্ভাব্য অতিরিক্ত তাপমাত্রার সঙ্গে তা তুলনা করা হয়েছে। ছয় মাসেই প্রাণহানির ভয়াবহ পূর্বাভাস : গবেষকদের হিসাবে, চলতি বছরের জুন থেকে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এল নিনোর অতিরিক্ত উত্তাপের কারণে প্রায় ৪ লাখ ৫১ হাজার মানুষ প্রাণ হারাতে পারে। তবে ফেব্রুয়ারিতে এল নিনোর প্রভাব কমে গেলেও তাপজনিত মৃত্যুর ঝুঁকি আরও কয়েক মাস বেশি থাকতে পারে।
আগামী বছরের জুন বা জুলাই পর্যন্ত এর প্রভাব অনুভূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত তাপের সবচেয়ে বড় ধাক্কা যেতে পারে দরিদ্র ও উষ্ণ দেশগুলোর ওপর। এসব অঞ্চলে শীতাতপনিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা, নিরাপদ পানির সরবরাহ ও উন্নত চিকিৎসাসেবা তুলনামূলক কম থাকায় তাপমাত্রা সামান্য বাড়লেও মানুষের জন্য ঝুঁকি দ্রুত বেড়ে যায়। সাহেল থেকে দক্ষিণ এশিয়া, ঝুঁকিতে বহু অব্জল : গবেষণায় আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সেখানে এল নিনোর অতিরিক্ত উত্তাপের কারণে প্রায় ৬৬ হাজার ৮০০ মানুষের মৃত্যু হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন এলাকায়ও বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ায় মিলিয়ে প্রায় ১৯ হাজার ৪০০ মানুষের অতিরিক্ত মৃত্যুর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় ১৯ হাজার ৩০০, ভারতে ১৫ হাজার ৮০০ এবং ব্রাজিলে ১৩ হাজার ৩০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটতে পারে বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন।
এ ছাড়া আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের আরও অনেক অঞ্চলে তাপজনিত মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। তাপের সঙ্গে বাড়বে খরা, দাবানল ও বন্যা : এল নিনো শুধু তাপমাত্রা বাড়ায় না, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের বৃষ্টিপাতের ধরনও বদলে দেয়। কোথাও দেখা দিতে পারে দীর্ঘস্থায়ী খরা, আবার কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যা। অতিরিক্ত গরমের সঙ্গে খরা ও শুষ্ক আবহাওয়া যুক্ত হলে দাবানলের ঝুঁকিও বাড়ে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে খাদ্য উৎপাদন ও পানির ওপর। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে, এল নিনোর কারণে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটের মুখে পড়তে পারে। ফসল উৎপাদন কমে গেলে খাদ্যের দামও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতিহাসেও বড় এল নিনোর ভয়াবহ প্রভাবের নজির রয়েছে। ১৮৭৭-৭৮ সালের শক্তিশালী এল নিনোর সময় খরা ও দুর্ভিক্ষে পাঁচ কোটির বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারত, ব্রাজিল ও চীন তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোর মধ্যে ছিল। শীতেও কমবে না গরমের দাপট। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থাও শক্তিশালী এল নিনো নিয়ে সতর্ক করেছে। সংস্থাটির মতে, এই এল নিনো আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধরন বদলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে আসন্ন শীত অনেক অঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় উষ্ণ হতে পারে। এরই মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন অংশে তাপমাত্রার অস্বাভাবিক রেকর্ড দেখা যাচ্ছে। প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের পানি অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে উঠলে এল নিনো তৈরি হয়। এটি একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র হলেও বিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষের কর্মকা-ে পৃথিবী আগে থেকেই উত্তপ্ত হয়ে থাকায় এর প্রভাব আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে।
আগস্টে বৈশ্বিক তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড : এদিকে বিশ্বের উষ্ণতার আরেকটি উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে আগস্টের তাপমাত্রার হিসাবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে বিশ্বের গড় তাপমাত্রা দাঁড়িয়েছিল ১৬ দশমিক ৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। কোনো একটি মাসের হিসাবে এটিই এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা।
এর আগে সর্বোচ্চ মাসিক বৈশ্বিক তাপমাত্রার রেকর্ড হয়েছিল ২০২৩ সালের জুলাইয়ে। এবারের আগস্টের তাপমাত্রা সেই রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেছে। ইউরোপে এবারের গ্রীষ্ম ছিল সাম্প্রতিক দশকগুলোর মধ্যে অন্যতম উষ্ণ। দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, খরা ও দাবানলে পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চল বিপর্যস্ত হয়েছে। অতিরিক্ত গরমের কারণে ইউরোপে হাজার হাজার অতিরিক্ত মৃত্যুর আশঙ্কাও প্রকাশ করা হয়েছে।
সমুদ্রও উত্তপ্ত, বাড়ছে বহুমুখী বিপদ : শুধু স্থলভাগ নয়, সমুদ্রের তাপমাত্রাও অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। টানা কয়েক মাস ধরে বিশ্বের সমুদ্রগুলোয় রেকর্ড মাত্রার উষ্ণতা দেখা যাচ্ছে। সমুদ্রের অতিরিক্ত তাপ সামুদ্রিক প্রাণী, প্রবালপ্রাচীর এবং উপকূলীয় জনবসতির ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। বিজ্ঞানীদের মতে, সমুদ্রের উষ্ণতা বাড়লে সামুদ্রিক পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ঝড় ও বৃষ্টিপাতের ধরনেও পরিবর্তন আসতে পারে।
এর প্রভাব উপকূলীয় মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশের জন্যও সতর্কবার্তা : বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, ভারত মহাসাগরে ইতিবাচক পর্যায়ের একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু পরিবর্তনও তৈরি হতে পারে। এটি কিছু ক্ষেত্রে এল নিনোর প্রভাব কমাতে পারে। তবে এর অবস্থান ও শক্তি পরিবর্তিত হলে দক্ষিণ এশিয়ার আবহাওয়ায়ও এর প্রভাব পড়তে পারে।
ফলে বাংলাদেশসহ এই অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য অতিরিক্ত গরম, অনিয়মিত বৃষ্টি, বন্যা কিংবা খরার ঝুঁকি নিয়ে আগাম প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ভবিষ্যতের আগাম বার্তা : গবেষকদের কাছে এবারের শক্তিশালী এল নিনো শুধু একটি সাময়িক প্রাকৃতিক ঘটনা নয়; এটি ভবিষ্যতের জলবায়ু পরিস্থিতির একটি সতর্কসংকেতও। তাদের মতে, আজ যে মাত্রার চরম তাপমাত্রা দেখা যাচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে প্রায় দুই দশক পর অনেক অঞ্চলে সেটিই স্বাভাবিক আবহাওয়ার অংশ হয়ে উঠতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে দাবদাহের আগাম সতর্কবার্তা, শীতল আশ্রয়কেন্দ্র, বিনা মূল্যে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো এবং বাইরে কাজ করা শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন গবেষকেরা। বয়স্ক ও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকা মানুষদের জন্য বাড়তি নজরদারি এবং তীব্র গরমের আগেই জরুরি অর্থ ও প্রয়োজনীয় সম্পদ প্রস্তুত রাখারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
গবেষকদের ভাষায়, এখনই যথাযথ প্রস্তুতি নেওয়া গেলে আসন্ন তাপপ্রবাহে বহু মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব। তবে দীর্ঘমেয়াদে শুধু জরুরি পরিস্থিতি সামাল দিলেই হবে না। পৃথিবীর ক্রমবর্ধমান উষ্ণতার মূল কারণ কমানো না গেলে ভবিষ্যতে এমন চরম আবহাওয়াই নিয়মিত বাস্তবতায় পরিণত হতে পারে।













