সন্ধ্যার পর কাজ শেষে ছোট্ট ঘরে ফিরেই মেয়ের কাশির শব্দ শুনতে পান আসিয়া। সারা দিন মানুষের বাসায় কাজ করে ক্লান্ত শরীরটা তখন একটু বিশ্রাম চায়। কিন্তু ছয় বছরের আইমুনার কাশি শুনলেই সেই ক্লান্তি যেন উধাও হয়ে যায়।
মেয়েকে নিয়ে ছুটতে হয় চিকিৎসকের কাছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসক জানান, আইমুনার শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে শরীরে সিসা প্রবেশ করছে। কিন্তু সেই সিসা আসছে কোথা থেকেÑ এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে সামনে আসে তাদের ঘরের পাশের একটি অটোরিকশার গ্যারেজের কথা। নয়াগ্রামের ওই গ্যারেজে রয়েছে ৩০টিরও বেশি ব্যাটারিচালিত রিকশা। অথচ গ্যারেজের আশপাশে বসবাসকারী মানুষের অনেকেই জানতেন না, ব্যাটারির সঙ্গে যুক্ত সিসাজাত উপাদান পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
আইমুনার ঘটনা তাই শুধু একটি শিশুর অসুস্থতার গল্প নয়। এটি বিয়ানীবাজারের দ্রুত বদলে যাওয়া নগরজীবনের একটি প্রতিচ্ছবি। এই বাহনের দ্রুত বিস্তার এখন নতুন করে সামনে আনছে নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের প্রশ্ন। বিয়ানীবাজার পৌরশহর থেকে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নÑ প্রায় সর্বত্রই এখন ব্যাটারিচালিত রিকশার দাপট। শহরের অলিগলি, বাজার, প্রধান সড়ক ও আবাসিক এলাকার রাস্তায় দিনভর চলাচল করছে এসব যান।
ব্যাটারিরিকশার সংখ্যা কত, তার সঠিক হিসাব নেই। সরকারি বা স্থানীয় পর্যায়েও এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ কোনো পরিসংখ্যান সহজে পাওয়া যায় না। তবে সড়কে এসব বাহনের উপস্থিতি দেখলেই বোঝা যায়, কয়েক বছর আগের তুলনায় এর সংখ্যা কতটা বেড়েছে। শুধু যাত্রী পরিবহন নয়, স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গেও এখন ব্যাটারিরিকশা জড়িয়ে গেছে। মালিক, চালক, গ্যারেজকর্মী, ব্যাটারি চার্জিং ব্যবসাÑ সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে অর্থনৈতিকবলয়।
অনেক পরিবারের আয়ের অন্যতম উৎস হয়ে উঠেছে অটোরিকশা। কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন বিস্তারের কারণে সেই অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের সমস্যা। ব্যাটারিরিকশা শুধু সড়কের চিত্র বদলায়নি, বদলে দিয়েছে মানুষের পেশার ধরনও। তুলনামূলক সহজে কাজ পাওয়া এবং প্রতিদিন হাতে নগদ টাকা আসার কারণে বিভিন্ন পেশার মানুষ আগের কাজ ছেড়ে ব্যাটারিরিকশা চালানোর দিকে ঝুঁকছেন।
পৌরশহরের দাসগ্রামের বাসিন্দা বাবুল একসময় ট্রাকের হেলপার ছিলেন। প্রতিদিন প্রায় ৮০০ টাকা আয় করতেন। এখন ব্যাটারিরিকশা চালিয়ে প্রতিদিন হাজার টাকার কম নিয়ে বাড়ি ফেরেন না বলে জানান তিনি। ট্রাকের হেলপারের কাজ ছেড়ে ব্যাটারিরিকশা চালানোর কারণ জানতে চাইলে বাবুল বলেন, ‘বাসের হেলপার হয়ে মালামাল ওঠানামা করতে ভালো লাগে না। অটো রাত ১০টার মধ্যে বন্ধ করে বাসায় ফিরতে পারি।
’ ব্যাটারিরিকশার সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে গ্যারেজ ও চার্জিং পয়েন্ট। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে ছোটবড় অসংখ্য গ্যারেজ। কোথাও একই স্থানে কয়েকটি গাড়ি রাখা হচ্ছে, আবার কোথাও সারি করে বসানো হয়েছে ব্যাটারি চার্জিংয়ের ব্যবস্থা। নিয়মিত ব্যাটারি চার্জ করতে হয়। ফলে গাড়ির সংখ্যা যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে চার্জিংয়ের প্রয়োজনীয়তা।
এসব চার্জিং পয়েন্টে প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে। ব্যাটারিরিকশার মোট সংখ্যা এবং চার্জিং পয়েন্টের সুনির্দিষ্ট হিসাব না থাকায় এ খাতে মোট কত বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে, তারও নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নেই। ফলে একদিকে ব্যাটারিরিকশার দ্রুত বিস্তার, অন্যদিকে বিদ্যুৎ ব্যবহারের বাড়তি চাপÑ দুটি বিষয়ই এখন আলোচনার দাবি রাখে।
তবে এই পুরো ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের জায়গাগুলোর একটি হলো ব্যাটারি। এসব যানবাহনে সাধারণত লেড-অ্যাসিড বা সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারি ব্যবহার হয়। একটি ব্যাটারিতে থাকা সিসা ব্যবহারের সময় সরাসরি মানুষের শরীরে প্রবেশ না করলেও ব্যাটারি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, পরিবর্তন করা, মেরামত বা পুরোনো ব্যাটারি যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা না করার সময় সিসাজাত উপাদান পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সিসার দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিয়ানীবাজারের চিকিৎসক ডা. আবু ইসহাক আজাদও এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তার মতে, ব্যাটারির ক্ষতিকর উপাদান কখন মানুষের নাক-মুখ দিয়ে শরীরে প্রবেশ করছে, অনেক সময় তা বোঝার উপায় থাকে না।




















