4:18 am, Tuesday, 13 October 2026

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রথম সফল ফিশন বিক্রিয়া শুরু

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

রিঅ্যাক্টরে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত উপায়ে পরমাণুর বিভাজন বা ফিশন বিক্রিয়া সফলভাবে শুরু হওয়ার মধ্য দিয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ঐতিহাসিক অগ্রযাত্রায় পা দিয়েছে। দীর্ঘ অপেক্ষা, কারিগরি জটিলতা ও নিরাপত্তা পরীক্ষা পেরিয়ে প্রথম ইউনিটে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক শৃঙ্খল বিক্রিয়া বা ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’র ধাপ পার করেছে কেন্দ্রটি।

গত ৮ অক্টোবর বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বায়েরা) অনুমোদন পাওয়ার পর গতকাল রোববার প্রথম ইউনিটের রিঅ্যাক্টরে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত উপায়ে পরমাণুর বিভাজন বা ফিশন বিক্রিয়া সফলভাবে শুরু হয়। বিক্রিয়া শুরুর ফলে রাশিয়ার ভিভিইআর-১২০০ চুল্লি থেকে তাপ উৎপাদন হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে দেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে আরও এক ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ।

আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারে সক্ষম এলিট দেশগুলোর আন্তর্জাতিক ক্লাবে যুক্ত হলো বাংলাদেশ। আর দুই ধাপ বিক্রিয়া সম্পন্ন হলেই উৎপাদনে যেতে প্রস্তুত হবে ইউনিটটি। সব ঠিক থাকলে আগামী ডিসেম্বরের শুরুতেই জাতীয় গ্রিডে ৩শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ হবে কেন্দ্রটি থেকে। আর পূর্ণ সক্ষমতায় এটি উৎপাদন শুরু করতে পারবে ২০২৭ সালে।

গতকাল কেন্দ্রটি সফলভাবে পারমাণবিক বিজ্ঞানের জটিলতম মাইলফলক এই ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’ অর্জন করে। এর জন্য রাশিয়ার অত্যাধুনিক তৃতীয় প্রজন্মের প্লাস (জেনারেশন-৩) ভিভিইআর-১২০০ রিঅ্যাক্টরে ইউরেনিয়াম-২৩৫ এর নিউক্লিয়াসকে নিউট্রন কণা দ্বারা আঘাত করে শৃঙ্খল বিক্রিয়া সক্রিয় করা হয়। প্রাথমিক নিরাপত্তা প্রটোকল হিসেবে বর্তমানে রিঅ্যাক্টরটিকে তার মোট তাপীয় সক্ষমতার মাত্র ১ শতাংশেরও কম শক্তিতে পরিচালনা করে বিভিন্ন সেন্সর ও কুলিং সিস্টেমের কার্যকারিতা নিবিড়ভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।

প্রকল্পের প্রকৌশলী ও রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি করপোরেশন রোসাটমের বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, বিক্রিয়া শুরুর পরবর্তী ৩০ থেকে ৪০ দিন চুল্লির অভ্যন্তরীণ কন্ট্রোল রড, প্রেসার ভেসেল, কুল্যান্ট প্রবাহ ও রেডিয়েশন শিল্ডিং-সংক্রান্ত নিরাপত্তা প্যারামিটারগুলো সার্বক্ষণিকভাবে মনিটরিং করা হবে। সব ধরনের কারিগরি পরীক্ষা নিখুঁতভাবে সম্পন্ন হলে এবং বায়রার পরবর্তী ছাড়পত্র পাওয়া সাপেক্ষে আগামী নভেম্বর মাসের শেষ কিংবা ডিসেম্বরের শুরুতেই জাতীয় সঞ্চালন গ্রিডে রূপপুরের প্রথম ইউনিটের পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহ (ট্রায়াল রান) শুরু হবে।

প্রাথমিক ট্রায়াল রান পর্যায়ে গ্রিডে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপর টানা সাত থেকে আট মাস বিভিন্ন স্তরের লোড ক্যাপাসিটি, থার্মাল স্ট্যাবিলিটি ও নিরাপত্তা সক্ষমতা যাচাই শেষে ২০২৭ সালের মাঝামাঝি বা শেষ নাগাদ ইউনিটটি তার পূর্ণ সক্ষমতার ১,২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বাণিজ্যিক ভিত্তিতে জাতীয় গ্রিডে সঞ্চালন করা হবে।

গুরুত্বপূর্ণ এই কার্যক্রমে নেতৃত্ব দেওয়া রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকল্প পরিচালক ড. মো. কবির হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, প্রকৌশলগত প্রক্রিয়া অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত ফিশন বিক্রিয়ার মাধ্যমে নির্গত তীব্র তাপশক্তি ব্যবহার করে চুল্লির বিশেষ সার্কিটের পানিকে উচ্চ চাপযুক্ত বাষ্পে রূপান্তর করা হবে। এই বাষ্পীয় গতিশক্তি টারবাইনের ঘূর্ণন ঘটিয়ে মূল জেনারেটরের মাধ্যমে মেকানিক্যাল শক্তিকে উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুতে রূপান্তর করবে।

কেন্দ্রের সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে পাওয়ার স্টার্ট-আপ প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে সম্পন্ন হবে। যার অধীনে রিঅ্যাক্টরের তাপ উৎপাদন ক্ষমতা প্রথমে ধীরে ধীরে বাড়িয়ে ৩৭ শতাংশে উন্নীত করা হবে এবং পরবর্তীতে গ্রিড সিনক্রোনাইজেশনের প্রাথমিক ধাপে ৩ শতাংশ থেকে শুরু করে ২০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত লোড ক্যাপাসিটিতে বিদ্যুৎ তৈরি করা হবে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর অনুমোদন পেতে বিলম্বের অন্যতম কারণ ছিল স্বয়ংক্রিয় চাপ প্রশমন নিরাপত্তা ভালভের কারিগরি জটিলতা। কমিশনিং পরীক্ষার সময় ভালভগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে সমস্যা দেখা দেওয়ায় নির্ধারিত সময়ে পরবর্তী পর্যায়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। পরে রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ দল এসে প্রয়োজনীয় কারিগরি ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

ধারাবাহিক পরীক্ষার পর ভালভগুলো সফলভাবে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের পথ তৈরি হয়। ৮ অক্টোবর বায়েরা প্রথম ইউনিটের জন্য বি-২ পর্যায়ের অনুমোদন দেয়। ফলে চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু এবং তাপ উৎপাদনের পর্যায়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ।

এ পর্যায়ে চুল্লির ভেতরে এমন একটি নিয়ন্ত্রিত শৃঙ্খল বিক্রিয়া প্রতিষ্ঠা করা হয়, যা থেকে প্রয়োজনীয় তাপ উৎপাদন করা সম্ভব। তবে এ অনুমোদন পাওয়া বা বিকিরণ শুরু হওয়া আর জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা এক বিষয় নয়। চুল্লির কার্যক্রম, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও উৎপাদনক্ষমতা ধাপে ধাপে যাচাই করে পরবর্তী অনুমোদন নিতে হবে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও অনুমোদন সম্পন্ন হলে ডিসেম্বরের শুরুর দিকে প্রথম ইউনিট থেকে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে।

তবে এই সময়সূচি এখনো শর্তসাপেক্ষ। বায়েরা জানিয়েছে, গ্রিডে বিদ্যুৎ সংযুক্ত করার আগে আরও দুটি অনুমোদন প্রয়োজন। বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই পর্যায়ে চুল্লির ক্ষমতা একবারে বাড়ানো হবে না। বরং নিয়ন্ত্রিতভাবে ক্ষমতা বাড়িয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে পরীক্ষা চালানো হবে। একই সঙ্গে চুল্লির তাপমাত্রা, চাপ, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ পরামিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে।

এ প্রক্রিয়ায় সফলভাবে এগোতে পারলে ধীরে ধীরে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে। তবে প্রথমবারের মতো পারমাণবিক বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও গ্রিডের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রূপপুর প্রকল্পে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের সহযোগিতায় দুটি ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তির ইউনিট নির্মাণ করা হচ্ছে।

প্রতিটি ইউনিটের পরিকল্পিত স্থাপিত সক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট চালু হলে কেন্দ্রটির মোট স্থাপিত উৎপাদনক্ষমতা হবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। ভিভিইআর-১২০০ হলো চাপযুক্ত পানিভিত্তিক পারমাণবিক চুল্লি প্রযুক্তি। এতে পারমাণবিক জ্বালানির বিভাজন থেকে উৎপন্ন তাপ ব্যবহার করে পানি উত্তপ্ত করা হয়। সেই তাপে বাষ্প তৈরি হয়, যা টারবাইন ঘুরিয়ে জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে।

অর্থাৎ, চুল্লিতে পারমাণবিক বিক্রিয়া থেকে তাপ উৎপন্ন হলেও সেই তাপকে সরাসরি বিদ্যুতে রূপান্তর করা হয় না। তাপ থেকে বাষ্প, বাষ্প থেকে টারবাইনের ঘূর্ণন এবং টারবাইন থেকে জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন— এভাবেই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। প্রথম ইউনিটের জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম শুরু হয়েছিল ২০২৬ সালের ২৮ এপ্রিল। এরপর কমিশনিং পরীক্ষা ও নিরাপত্তা যাচাইয়ের বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে ইউনিটটিতে এখন নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হয়েছে।

তবে রূপপুরের প্রথম ইউনিটের প্রাথমিক উৎপাদন শুরু হওয়া এবং পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছানো— দুটি আলাদা লক্ষ্য উল্লেখ করে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, প্রথমে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনা থাকলেও চুল্লির উৎপাদনক্ষমতা পর্যায়ক্রমে বাড়াতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় নিরাপত্তা পরীক্ষা, কারিগরি মূল্যায়ন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

দুটি ইউনিট চালু হলে জাতীয় গ্রিডে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা তৈরি হবে। তবে পুরো সক্ষমতা অর্জনের সময়সূচি নির্ভর করবে কমিশনিংয়ের অগ্রগতি, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট অনুমোদনের ওপর। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা, তেল এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। এ অবস্থায় পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলে উৎপাদনের উৎসে বৈচিত্র্য আসবে।

বিশেষ করে দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হলে দেশের বিদ্যুৎব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ হবে বলে মন্তব্য করেন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম। রূপালী বাংলাদেশকে তিনি বলেন, রূপপুরের সাফল্য শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কেন্দ্রটির নিরাপদ পরিচালনা, দক্ষ জনবল, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, পারমাণবিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হবে।

সব মিলিয়ে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে বি-২ অনুমোদন বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের একটি ঐতিহাসিক অগ্রগতি। ডিসেম্বরের মধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার প্রত্যাশা পূরণ হলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ইতিহাসে সূচিত হবে নতুন অধ্যায়। আর পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনের লক্ষ্য বাস্তবায়িত হলে রূপপুর হয়ে উঠবে বাংলাদেশের বিদ্যুৎব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

তবে সেই অর্জনের চূড়ান্ত শর্ত— নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্যতা ও প্রতিটি ধাপে কারিগরি মান বজায় রাখা বলেও মন্তব্য করেন তিনি। রূপপুরে পৌঁছেছে প্রথম ইউনিটের দ্বিতীয় দফার বাড়তি ইউরেনিয়াম : পাবনার রূপপুরে পৌঁছেছে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের দ্বিতীয় দফার বাড়তি পারমাণবিক জ্বালানি (ইউরেনিয়াম)। গতকাল রোববার সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ইউরেনিয়ামের এই চালান প্রকল্প এলাকায় নেওয়া হয়।

এর আগে গত শনিবার রাতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের জন্য দ্বিতীয় দফার বাড়তি পারমাণবিক জ্বালানিবাহী রুশ কার্গোটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায়। তারও আগে গত ২ অক্টোবর দেশে পৌঁছায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের জন্য জ্বালানিবাহী বিমান। রাশিয়া থেকে রওনা হওয়ার পর ইউরেনিয়ামবাহী বিমানটি ভারত হয়ে ওই দিন রাত সাড়ে ১১টার দিকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায়।

এ নিয়ে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের জন্য দুই দফায় মোট ৪৮ বান্ডেল বাড়তি জ্বালানি আনা হয়েছে। এর আগে গত বৃহস্পতিবার দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ বায়েরা। এরপর রোববার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রথমবারের মতো সফল পারমাণবিক বিক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।

বিষয়টি নিশ্চিত করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব আনোয়ার হোসেন জানান, বিকেল ৩টা ৩৪ মিনিটে বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক বিক্রিয়া ঘটানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত সব প্যারামিটার চাহিদা অনুযায়ী মাত্রায় আছে। বিকিরণের মাত্রা নিয়ে ভয়ের কিছু নেই। এই কেন্দ্রের চুল্লির মডেল তৃতীয় প্রজন্মের ভিভিইআর ১২০০ মডেলের, যেখানে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানিয়েছেন, আগামী নভেম্বরের শেষ দিকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছেন তারা।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

Nagorik Sangram

Popular Post

সরকারি নির্দেশনার পর সাজেক পর্যটনকেন্দ্র ছাড়ছেন পর্যটকেরা

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রথম সফল ফিশন বিক্রিয়া শুরু

Update Time : 12:58:50 am, Monday, 12 October 2026

রিঅ্যাক্টরে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত উপায়ে পরমাণুর বিভাজন বা ফিশন বিক্রিয়া সফলভাবে শুরু হওয়ার মধ্য দিয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ঐতিহাসিক অগ্রযাত্রায় পা দিয়েছে। দীর্ঘ অপেক্ষা, কারিগরি জটিলতা ও নিরাপত্তা পরীক্ষা পেরিয়ে প্রথম ইউনিটে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক শৃঙ্খল বিক্রিয়া বা ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’র ধাপ পার করেছে কেন্দ্রটি।

গত ৮ অক্টোবর বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বায়েরা) অনুমোদন পাওয়ার পর গতকাল রোববার প্রথম ইউনিটের রিঅ্যাক্টরে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত উপায়ে পরমাণুর বিভাজন বা ফিশন বিক্রিয়া সফলভাবে শুরু হয়। বিক্রিয়া শুরুর ফলে রাশিয়ার ভিভিইআর-১২০০ চুল্লি থেকে তাপ উৎপাদন হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে দেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে আরও এক ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ।

আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারে সক্ষম এলিট দেশগুলোর আন্তর্জাতিক ক্লাবে যুক্ত হলো বাংলাদেশ। আর দুই ধাপ বিক্রিয়া সম্পন্ন হলেই উৎপাদনে যেতে প্রস্তুত হবে ইউনিটটি। সব ঠিক থাকলে আগামী ডিসেম্বরের শুরুতেই জাতীয় গ্রিডে ৩শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ হবে কেন্দ্রটি থেকে। আর পূর্ণ সক্ষমতায় এটি উৎপাদন শুরু করতে পারবে ২০২৭ সালে।

গতকাল কেন্দ্রটি সফলভাবে পারমাণবিক বিজ্ঞানের জটিলতম মাইলফলক এই ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’ অর্জন করে। এর জন্য রাশিয়ার অত্যাধুনিক তৃতীয় প্রজন্মের প্লাস (জেনারেশন-৩) ভিভিইআর-১২০০ রিঅ্যাক্টরে ইউরেনিয়াম-২৩৫ এর নিউক্লিয়াসকে নিউট্রন কণা দ্বারা আঘাত করে শৃঙ্খল বিক্রিয়া সক্রিয় করা হয়। প্রাথমিক নিরাপত্তা প্রটোকল হিসেবে বর্তমানে রিঅ্যাক্টরটিকে তার মোট তাপীয় সক্ষমতার মাত্র ১ শতাংশেরও কম শক্তিতে পরিচালনা করে বিভিন্ন সেন্সর ও কুলিং সিস্টেমের কার্যকারিতা নিবিড়ভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।

প্রকল্পের প্রকৌশলী ও রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি করপোরেশন রোসাটমের বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, বিক্রিয়া শুরুর পরবর্তী ৩০ থেকে ৪০ দিন চুল্লির অভ্যন্তরীণ কন্ট্রোল রড, প্রেসার ভেসেল, কুল্যান্ট প্রবাহ ও রেডিয়েশন শিল্ডিং-সংক্রান্ত নিরাপত্তা প্যারামিটারগুলো সার্বক্ষণিকভাবে মনিটরিং করা হবে। সব ধরনের কারিগরি পরীক্ষা নিখুঁতভাবে সম্পন্ন হলে এবং বায়রার পরবর্তী ছাড়পত্র পাওয়া সাপেক্ষে আগামী নভেম্বর মাসের শেষ কিংবা ডিসেম্বরের শুরুতেই জাতীয় সঞ্চালন গ্রিডে রূপপুরের প্রথম ইউনিটের পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহ (ট্রায়াল রান) শুরু হবে।

প্রাথমিক ট্রায়াল রান পর্যায়ে গ্রিডে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপর টানা সাত থেকে আট মাস বিভিন্ন স্তরের লোড ক্যাপাসিটি, থার্মাল স্ট্যাবিলিটি ও নিরাপত্তা সক্ষমতা যাচাই শেষে ২০২৭ সালের মাঝামাঝি বা শেষ নাগাদ ইউনিটটি তার পূর্ণ সক্ষমতার ১,২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বাণিজ্যিক ভিত্তিতে জাতীয় গ্রিডে সঞ্চালন করা হবে।

গুরুত্বপূর্ণ এই কার্যক্রমে নেতৃত্ব দেওয়া রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকল্প পরিচালক ড. মো. কবির হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, প্রকৌশলগত প্রক্রিয়া অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত ফিশন বিক্রিয়ার মাধ্যমে নির্গত তীব্র তাপশক্তি ব্যবহার করে চুল্লির বিশেষ সার্কিটের পানিকে উচ্চ চাপযুক্ত বাষ্পে রূপান্তর করা হবে। এই বাষ্পীয় গতিশক্তি টারবাইনের ঘূর্ণন ঘটিয়ে মূল জেনারেটরের মাধ্যমে মেকানিক্যাল শক্তিকে উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুতে রূপান্তর করবে।

কেন্দ্রের সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে পাওয়ার স্টার্ট-আপ প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে সম্পন্ন হবে। যার অধীনে রিঅ্যাক্টরের তাপ উৎপাদন ক্ষমতা প্রথমে ধীরে ধীরে বাড়িয়ে ৩৭ শতাংশে উন্নীত করা হবে এবং পরবর্তীতে গ্রিড সিনক্রোনাইজেশনের প্রাথমিক ধাপে ৩ শতাংশ থেকে শুরু করে ২০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত লোড ক্যাপাসিটিতে বিদ্যুৎ তৈরি করা হবে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর অনুমোদন পেতে বিলম্বের অন্যতম কারণ ছিল স্বয়ংক্রিয় চাপ প্রশমন নিরাপত্তা ভালভের কারিগরি জটিলতা। কমিশনিং পরীক্ষার সময় ভালভগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে সমস্যা দেখা দেওয়ায় নির্ধারিত সময়ে পরবর্তী পর্যায়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। পরে রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ দল এসে প্রয়োজনীয় কারিগরি ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

ধারাবাহিক পরীক্ষার পর ভালভগুলো সফলভাবে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের পথ তৈরি হয়। ৮ অক্টোবর বায়েরা প্রথম ইউনিটের জন্য বি-২ পর্যায়ের অনুমোদন দেয়। ফলে চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু এবং তাপ উৎপাদনের পর্যায়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ।

এ পর্যায়ে চুল্লির ভেতরে এমন একটি নিয়ন্ত্রিত শৃঙ্খল বিক্রিয়া প্রতিষ্ঠা করা হয়, যা থেকে প্রয়োজনীয় তাপ উৎপাদন করা সম্ভব। তবে এ অনুমোদন পাওয়া বা বিকিরণ শুরু হওয়া আর জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা এক বিষয় নয়। চুল্লির কার্যক্রম, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও উৎপাদনক্ষমতা ধাপে ধাপে যাচাই করে পরবর্তী অনুমোদন নিতে হবে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও অনুমোদন সম্পন্ন হলে ডিসেম্বরের শুরুর দিকে প্রথম ইউনিট থেকে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে।

তবে এই সময়সূচি এখনো শর্তসাপেক্ষ। বায়েরা জানিয়েছে, গ্রিডে বিদ্যুৎ সংযুক্ত করার আগে আরও দুটি অনুমোদন প্রয়োজন। বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই পর্যায়ে চুল্লির ক্ষমতা একবারে বাড়ানো হবে না। বরং নিয়ন্ত্রিতভাবে ক্ষমতা বাড়িয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে পরীক্ষা চালানো হবে। একই সঙ্গে চুল্লির তাপমাত্রা, চাপ, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ পরামিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে।

এ প্রক্রিয়ায় সফলভাবে এগোতে পারলে ধীরে ধীরে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে। তবে প্রথমবারের মতো পারমাণবিক বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও গ্রিডের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রূপপুর প্রকল্পে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের সহযোগিতায় দুটি ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তির ইউনিট নির্মাণ করা হচ্ছে।

প্রতিটি ইউনিটের পরিকল্পিত স্থাপিত সক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট চালু হলে কেন্দ্রটির মোট স্থাপিত উৎপাদনক্ষমতা হবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। ভিভিইআর-১২০০ হলো চাপযুক্ত পানিভিত্তিক পারমাণবিক চুল্লি প্রযুক্তি। এতে পারমাণবিক জ্বালানির বিভাজন থেকে উৎপন্ন তাপ ব্যবহার করে পানি উত্তপ্ত করা হয়। সেই তাপে বাষ্প তৈরি হয়, যা টারবাইন ঘুরিয়ে জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে।

অর্থাৎ, চুল্লিতে পারমাণবিক বিক্রিয়া থেকে তাপ উৎপন্ন হলেও সেই তাপকে সরাসরি বিদ্যুতে রূপান্তর করা হয় না। তাপ থেকে বাষ্প, বাষ্প থেকে টারবাইনের ঘূর্ণন এবং টারবাইন থেকে জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন— এভাবেই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। প্রথম ইউনিটের জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম শুরু হয়েছিল ২০২৬ সালের ২৮ এপ্রিল। এরপর কমিশনিং পরীক্ষা ও নিরাপত্তা যাচাইয়ের বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে ইউনিটটিতে এখন নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হয়েছে।

তবে রূপপুরের প্রথম ইউনিটের প্রাথমিক উৎপাদন শুরু হওয়া এবং পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছানো— দুটি আলাদা লক্ষ্য উল্লেখ করে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, প্রথমে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনা থাকলেও চুল্লির উৎপাদনক্ষমতা পর্যায়ক্রমে বাড়াতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় নিরাপত্তা পরীক্ষা, কারিগরি মূল্যায়ন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

দুটি ইউনিট চালু হলে জাতীয় গ্রিডে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা তৈরি হবে। তবে পুরো সক্ষমতা অর্জনের সময়সূচি নির্ভর করবে কমিশনিংয়ের অগ্রগতি, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট অনুমোদনের ওপর। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা, তেল এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। এ অবস্থায় পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলে উৎপাদনের উৎসে বৈচিত্র্য আসবে।

বিশেষ করে দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হলে দেশের বিদ্যুৎব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ হবে বলে মন্তব্য করেন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম। রূপালী বাংলাদেশকে তিনি বলেন, রূপপুরের সাফল্য শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কেন্দ্রটির নিরাপদ পরিচালনা, দক্ষ জনবল, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, পারমাণবিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হবে।

সব মিলিয়ে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে বি-২ অনুমোদন বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের একটি ঐতিহাসিক অগ্রগতি। ডিসেম্বরের মধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার প্রত্যাশা পূরণ হলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ইতিহাসে সূচিত হবে নতুন অধ্যায়। আর পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনের লক্ষ্য বাস্তবায়িত হলে রূপপুর হয়ে উঠবে বাংলাদেশের বিদ্যুৎব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

তবে সেই অর্জনের চূড়ান্ত শর্ত— নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্যতা ও প্রতিটি ধাপে কারিগরি মান বজায় রাখা বলেও মন্তব্য করেন তিনি। রূপপুরে পৌঁছেছে প্রথম ইউনিটের দ্বিতীয় দফার বাড়তি ইউরেনিয়াম : পাবনার রূপপুরে পৌঁছেছে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের দ্বিতীয় দফার বাড়তি পারমাণবিক জ্বালানি (ইউরেনিয়াম)। গতকাল রোববার সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ইউরেনিয়ামের এই চালান প্রকল্প এলাকায় নেওয়া হয়।

এর আগে গত শনিবার রাতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের জন্য দ্বিতীয় দফার বাড়তি পারমাণবিক জ্বালানিবাহী রুশ কার্গোটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায়। তারও আগে গত ২ অক্টোবর দেশে পৌঁছায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের জন্য জ্বালানিবাহী বিমান। রাশিয়া থেকে রওনা হওয়ার পর ইউরেনিয়ামবাহী বিমানটি ভারত হয়ে ওই দিন রাত সাড়ে ১১টার দিকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায়।

এ নিয়ে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের জন্য দুই দফায় মোট ৪৮ বান্ডেল বাড়তি জ্বালানি আনা হয়েছে। এর আগে গত বৃহস্পতিবার দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ বায়েরা। এরপর রোববার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রথমবারের মতো সফল পারমাণবিক বিক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।

বিষয়টি নিশ্চিত করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব আনোয়ার হোসেন জানান, বিকেল ৩টা ৩৪ মিনিটে বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক বিক্রিয়া ঘটানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত সব প্যারামিটার চাহিদা অনুযায়ী মাত্রায় আছে। বিকিরণের মাত্রা নিয়ে ভয়ের কিছু নেই। এই কেন্দ্রের চুল্লির মডেল তৃতীয় প্রজন্মের ভিভিইআর ১২০০ মডেলের, যেখানে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানিয়েছেন, আগামী নভেম্বরের শেষ দিকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছেন তারা।