8:51 am, Friday, 6 November 2026

পানির সংকটে ২ হাজার টাকায় পুকুর ভাড়া নিয়ে পাট জাগ দিচ্ছেন বাগাতিপাড়ার কৃষকরা

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের অভাবে নাটোরের বাগাতিপাড়ায় দেখা দিয়েছে তীব্র পানি সংকট। এর ফলে পাট জাগ দেওয়া নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। উপজেলার খাল-বিল ও নিচু জমিতে প্রয়োজনীয় পানি না থাকায় অনেক চাষি সময়মতো পাট কাটতে ও জাগ দিতে পারছেন না।

বাধ্য হয়ে কেউ পুকুর ভাড়া নিচ্ছেন, আবার কেউ নিচু জমিতে সেচ দিয়ে কৃত্রিমভাবে পানি জমিয়ে পাট জাগ দিচ্ছেন। এতে পাট উৎপাদনের পর জাগ দেওয়ার জন্য কৃষকদের বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে। স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি বিঘা পাট জাগ দিতে পানির জন্য প্রায় ২ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। কৃষকরা জানান, এ বছর পাটের ফলন ভালো হয়েছে এবং বাজারে দামও তুলনামূলক ভালো।

এতে তারা সন্তুষ্ট হলেও জাগ দেওয়ার পানির সংকটের কারণে অতিরিক্ত খরচ হওয়ায় প্রত্যাশিত লাভ কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন। স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নদীসংলগ্ন এলাকার চাষিরা তুলনামূলকভাবে পাট জাগ দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা সুবিধায় রয়েছেন। তারা নদীতে পাট জাগ দিতে পারছেন। ফলে তাদের মূলত পরিবহণ খরচই হচ্ছে। তবে এ বছর নদীতে পানি কিছুটা দেরিতে আসায় তাদেরও পাট জাগ দিতে বিলম্ব হয়েছে।

অন্যদিকে নদী থেকে দূরের এলাকার কৃষকদের ভরসা করতে হচ্ছে পুকুর ও নিচু জমির ওপর। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে বাগাতিপাড়ায় ৩ হাজার ৯৩১ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। এ বছর পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ হাজার ৮১৫ হেক্টর। গত মৌসুমে ২ হাজার ৭২০ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছিল। সে হিসাবে গত বছরের তুলনায় এবার ১ হাজার ২১১ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ বেড়েছে।

প্রতি বিঘায় গড়ে ৮ থেকে ১০ মণ পাট উৎপাদন হয়। প্রতি বিঘায় পাট চাষে খরচ হয় প্রায় ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা। উপজেলার সদর ইউনিয়নের ঠেঙ্গামারা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, রেললাইনের পাশের একটি নিচু জমিতে কোমর সমান পানি জমিয়ে পাট জাগ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। জমির মালিক রাকিবুল ইসলাম চেরু নিজের দুই বিঘা জমিতে শ্যালো মেশিনের মাধ্যমে পানি তুলে জমিয়েছেন।

পরে কৃষকদের সঙ্গে বিঘাপ্রতি ২ হাজার টাকা চুক্তিতে সেখানে পাট জাগ দেওয়ার সুযোগ দিয়েছেন তিনি। রাকিবুল ইসলাম চেরু বলেন, জমিতে স্বাভাবিকভাবে পানি থাকার কথা থাকলেও বৃষ্টি না হওয়ায় পানি জমেনি। বাধ্য হয়ে শ্যালো মেশিন দিয়ে পানি দিতে হয়েছে। এতে তাঁর প্রায় ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। বর্তমানে তার জমিতে প্রায় ৩০ জন কৃষক পাট জাগ দিচ্ছেন।

তিনি আরও বলেন, বৃষ্টির পানিতে পাট জাগ দেওয়া সম্ভব হলে বিঘাপ্রতি খরচ হতো মাত্র ১ থেকে দেড় হাজার টাকা। কিন্তু পানি সংকটের কারণে বাড়তি খরচ করে পাট জাগ দিতে হচ্ছে। স্থানীয়রা জানান, স্বাভাবিক সময়ে বর্ষার পানিতে খাল-বিল ও নিচু জমি ভরে থাকায় পাট জাগ দেওয়া সহজ হয়। কিন্তু এবার পানি সংকটের কারণে পুকুর ভাড়া করে পাট জাগ দিতে হচ্ছে।

এতে একদিকে কৃষকের বাড়তি খরচ হচ্ছে, অন্যদিকে পুকুরের মাছের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়ছে। কেউ কেউ পাট জাগ দেওয়ার আগে পুকুরের মাছ বিক্রি করে দিচ্ছেন। উপজেলার মালঞ্চি বাজারের পাট ব্যবসায়ী সোহেল রানা জানান, এ বছর পাটের ফলন ভালো হয়েছে এবং কৃষকরা বাজারে তুলনামূলক ভালো দামও পাচ্ছেন। প্রথম দিকে তারা প্রতি মণ পাট ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ২০০ টাকা দরে কিনলেও বর্তমানে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৬০০ টাকা মণ দরে পাট কিনছেন।

বাগাতিপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ ডা. ভবসিন্ধু রায় বলেন, এ বছর তুলনামূলক কম বৃষ্টিপাত হওয়ায় অনেক এলাকায় পাট জাগ দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পানির কিছুটা সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে কৃষকরা বিকল্প হিসেবে পুকুর ও নিচু জমিতে পানি সংগ্রহ করে পাট জাগ দিচ্ছেন। তিনি বলেন, বর্তমানে উপজেলায় পাট কাটা প্রায় শেষের দিকে। এ বিষয়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছে কৃষি বিভাগ।

এ বছর উপজেলায় পাটের আবাদ ভালো হয়েছে এবং বাজারে পাটের দামও তুলনামূলক ভালো থাকায় কৃষকরা ভালো দাম পাচ্ছেন।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

Nagorik Sangram

Popular Post

টেকনাফে মানবপাচারকারীদের সঙ্গে গোলাগুলিতে সেনাসদস্য নিহত

পানির সংকটে ২ হাজার টাকায় পুকুর ভাড়া নিয়ে পাট জাগ দিচ্ছেন বাগাতিপাড়ার কৃষকরা

Update Time : 02:36:45 pm, Thursday, 20 August 2026

পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের অভাবে নাটোরের বাগাতিপাড়ায় দেখা দিয়েছে তীব্র পানি সংকট। এর ফলে পাট জাগ দেওয়া নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। উপজেলার খাল-বিল ও নিচু জমিতে প্রয়োজনীয় পানি না থাকায় অনেক চাষি সময়মতো পাট কাটতে ও জাগ দিতে পারছেন না।

বাধ্য হয়ে কেউ পুকুর ভাড়া নিচ্ছেন, আবার কেউ নিচু জমিতে সেচ দিয়ে কৃত্রিমভাবে পানি জমিয়ে পাট জাগ দিচ্ছেন। এতে পাট উৎপাদনের পর জাগ দেওয়ার জন্য কৃষকদের বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে। স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি বিঘা পাট জাগ দিতে পানির জন্য প্রায় ২ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। কৃষকরা জানান, এ বছর পাটের ফলন ভালো হয়েছে এবং বাজারে দামও তুলনামূলক ভালো।

এতে তারা সন্তুষ্ট হলেও জাগ দেওয়ার পানির সংকটের কারণে অতিরিক্ত খরচ হওয়ায় প্রত্যাশিত লাভ কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন। স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নদীসংলগ্ন এলাকার চাষিরা তুলনামূলকভাবে পাট জাগ দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা সুবিধায় রয়েছেন। তারা নদীতে পাট জাগ দিতে পারছেন। ফলে তাদের মূলত পরিবহণ খরচই হচ্ছে। তবে এ বছর নদীতে পানি কিছুটা দেরিতে আসায় তাদেরও পাট জাগ দিতে বিলম্ব হয়েছে।

অন্যদিকে নদী থেকে দূরের এলাকার কৃষকদের ভরসা করতে হচ্ছে পুকুর ও নিচু জমির ওপর। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে বাগাতিপাড়ায় ৩ হাজার ৯৩১ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। এ বছর পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ হাজার ৮১৫ হেক্টর। গত মৌসুমে ২ হাজার ৭২০ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছিল। সে হিসাবে গত বছরের তুলনায় এবার ১ হাজার ২১১ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ বেড়েছে।

প্রতি বিঘায় গড়ে ৮ থেকে ১০ মণ পাট উৎপাদন হয়। প্রতি বিঘায় পাট চাষে খরচ হয় প্রায় ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা। উপজেলার সদর ইউনিয়নের ঠেঙ্গামারা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, রেললাইনের পাশের একটি নিচু জমিতে কোমর সমান পানি জমিয়ে পাট জাগ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। জমির মালিক রাকিবুল ইসলাম চেরু নিজের দুই বিঘা জমিতে শ্যালো মেশিনের মাধ্যমে পানি তুলে জমিয়েছেন।

পরে কৃষকদের সঙ্গে বিঘাপ্রতি ২ হাজার টাকা চুক্তিতে সেখানে পাট জাগ দেওয়ার সুযোগ দিয়েছেন তিনি। রাকিবুল ইসলাম চেরু বলেন, জমিতে স্বাভাবিকভাবে পানি থাকার কথা থাকলেও বৃষ্টি না হওয়ায় পানি জমেনি। বাধ্য হয়ে শ্যালো মেশিন দিয়ে পানি দিতে হয়েছে। এতে তাঁর প্রায় ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। বর্তমানে তার জমিতে প্রায় ৩০ জন কৃষক পাট জাগ দিচ্ছেন।

তিনি আরও বলেন, বৃষ্টির পানিতে পাট জাগ দেওয়া সম্ভব হলে বিঘাপ্রতি খরচ হতো মাত্র ১ থেকে দেড় হাজার টাকা। কিন্তু পানি সংকটের কারণে বাড়তি খরচ করে পাট জাগ দিতে হচ্ছে। স্থানীয়রা জানান, স্বাভাবিক সময়ে বর্ষার পানিতে খাল-বিল ও নিচু জমি ভরে থাকায় পাট জাগ দেওয়া সহজ হয়। কিন্তু এবার পানি সংকটের কারণে পুকুর ভাড়া করে পাট জাগ দিতে হচ্ছে।

এতে একদিকে কৃষকের বাড়তি খরচ হচ্ছে, অন্যদিকে পুকুরের মাছের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়ছে। কেউ কেউ পাট জাগ দেওয়ার আগে পুকুরের মাছ বিক্রি করে দিচ্ছেন। উপজেলার মালঞ্চি বাজারের পাট ব্যবসায়ী সোহেল রানা জানান, এ বছর পাটের ফলন ভালো হয়েছে এবং কৃষকরা বাজারে তুলনামূলক ভালো দামও পাচ্ছেন। প্রথম দিকে তারা প্রতি মণ পাট ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ২০০ টাকা দরে কিনলেও বর্তমানে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৬০০ টাকা মণ দরে পাট কিনছেন।

বাগাতিপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ ডা. ভবসিন্ধু রায় বলেন, এ বছর তুলনামূলক কম বৃষ্টিপাত হওয়ায় অনেক এলাকায় পাট জাগ দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পানির কিছুটা সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে কৃষকরা বিকল্প হিসেবে পুকুর ও নিচু জমিতে পানি সংগ্রহ করে পাট জাগ দিচ্ছেন। তিনি বলেন, বর্তমানে উপজেলায় পাট কাটা প্রায় শেষের দিকে। এ বিষয়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছে কৃষি বিভাগ।

এ বছর উপজেলায় পাটের আবাদ ভালো হয়েছে এবং বাজারে পাটের দামও তুলনামূলক ভালো থাকায় কৃষকরা ভালো দাম পাচ্ছেন।