শিবচরে ভুয়া জেলের ছড়াছড়ি: ৬,৫৪২ নিবন্ধিতের অধিকাংশই অন্য পেশার
মাদারীপুর প্রতিনিধি: রবিন চৌধুরী
মাদারীপুরের শিবচর উপজেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৬ হাজার ৫৪২ জন। কিন্তু এর মধ্যে অধিকাংশই ভিন্ন পেশার মানুষ। প্রকৃত জেলেরা নিবন্ধিত না থাকায় তারা সরকারি বিভিন্ন সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। জীবনে কখনো মাছ শিকার করেননি কিংবা যাননি কখনো নদীপাড়ে। প্রধান পেশা ব্যবসা, বাণিজ্য বা কৃষি। কিন্ত তারা নিবন্ধিত জেলে। আছে জেলে কার্ড। কার্ডের কারণে প্রতি বছর জেলে হিসেবে পান খাদ্য সহায়তা।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সুত্রে জানা গেছে, উপজেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৬ হাজার ৫৪২ জন। যার মধ্যে শিবচর পৌরসভা ২৯৯, ইউনিয়ন পর্যায়ে বন্দরখোলা ৬৭২, সন্ন্যাসীরচর ১৭০, বহেরাতলা দক্ষিণ ৩৪৫, চরজানাজাত ৯৫১, কাঁঠালবাড়ি ৪২১, মাদবরের চর ২৮৭, বহেরাতলা উত্তর ৮৯, ভান্ডারীকান্দি ২২০, বাঁশকান্দি ৫৬৪, নিলখী ৪৮৮, শিরুয়াইল ৩৫৩, দত্তপাড়া ৪৩২, কাদিরপুর ২৮৫, কুতুবপুর ১৯৬, পাঁচ্চর ১৫৪, দ্বিতীয়খন্ড ১৬৩, উমেদপুর ১৬৬, ভদ্রাসন ২৭৬ জনকে প্রকৃত জেলে বলে শনাক্ত করে নিবন্ধন এবং পরিচয়পত্র প্রদান করা হয়েছে। প্রতি বছর জুলাই হতে ডিসেম্বর মাসের মধ্যে উপজেলা মৎস্য অফিস জেলেদের তালিকা হালনাগাদ করে। এ সংশ্লিষ্ট উপজেলা পর্যায়ে একটি কমিটিও রয়েছে। তবে উপজেলা মৎস্য অফিস দাবি করেছে, জেলেদের তালিকা করেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। তবে সেই তালিকা হালনাগাদ করা হবে।
চরজানাজাত ও কাঠালবাড়ি ইউনিয়নের পদ্মা পাড়ের জেলেদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, ২ থেকে ৩ পুরুষ ধরে জেলে, নদীতে মাছ শিকার ছাড়া যাদের বাঁচার কোনো উপায় নেই, সেই প্রকৃত জেলেরাই সরকারি তালিকায় নিবন্ধিত হতে পারেননি। নিবন্ধন না থাকায় তারা কোনো খাদ্য সহায়তাও তারা পান না। অথচ জীবনে কখনো মাছ শিকার করেননি, ব্যবসায়ী, কৃষক, শ্রমিক, ভ্যানচালক ও স্বচ্ছল ব্যক্তিরা জেলে কার্ডধারী। জেলেদের তথ্য মতে তালিকায় ভুয়া জেলে রয়েছে কয়েক হাজার, আবার প্রকৃত জেলেও বাদ পড়েছেন কয়েক শত।
সরেজমিন গিয়ে জানা যায়, চরজানাজাত ইউনিয়নের আয়নাল খা, ইলিয়াস বেপারী, বাচ্চু মোড়লসহ বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌরসভায় অসংখ্য নামের এক ব্যক্তিরা তালিকাভূক্ত জেলে। অথচ তারা কেউই পেশাদার মৎস্যজীবী না। একই এলাকার তালিকাভূক্ত জেলে আয়না খা, মালেক ফকিরসহ কয়েকজনের বাড়িতে গেলে দেখা যায় তারা বাড়িতে টুকটাক কৃষি কাজ করেন। তারাও প্রতি বারই চাল পেয়েছেন।
পদ্মা নদীতে মাছ শিকাররত অবস্থায় কথা হয় চরজানাজাত ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের খোকন হাওলাদার ও ৩নং ওয়ার্ডের বজলু খার সঙ্গে। তারা জানান, তাদের কয়েক পুরুষ পদ্মা নদীতে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করে আসলে ও তাদের নিজের অথবা পরিবারের কারোই জেলে কার্ড নেই।কিংবা তারা কোনো সরকারি সহায়তাও পান না। জেলে তালিকায় নাম উঠাতে হলে চেয়ারম্যান- মেম্বারদের কাছের লোক হতে হয়, তা নাহলে জেলে কার্ড মেলে না বলে তারা জানান।
স্থানীয় একাধিক জেলে অভিযোগ করেন, তারা সারা বছর নদীতেই থাকেন। কখন কে তালিকা করে, তা তারা টেরও পান না। তালিকায় নাম উঠাতে তারা তদবীরও করতে পারেন না, তাই তারা জেলে কার্ডের তালিকার বাইরেই থাকেন। ভুয়া জেলেদের কারণে খাদ্য সহায়তা বিতরণের সময় অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন জনপ্রতিনিধিরা। প্রকৃত জেলেরা টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশের সুযোগে ভুয়া জেলেরা তালিকাভূক্ত হয়ে যায়।
জেলেদের তালিকা নিয়ে কথা হয় সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর শিবচর উপজেলার সভাপতি আবুল খায়ের খানের সাথে। তিনি জানান, শিবচর উপজেলার জেলেদের সঠিক কোনো তালিকা অতীতে তৈরি করা হয়নি। অতীতে জনপ্রতিনিধিরা তাদের নিকট আত্মীয় ও নিজেদের লোকদের নিয়ে জেলে তালিকা তৈরি করে। এতে বিভিন্ন পেশার মানুষ, সচ্ছল ব্যক্তিরা জেলে হিসেব অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
শিবচর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সত্যজিৎ মজুমদার বলেন, জেলে তালিকায় যদি কোনো অপ্রকৃত জেলের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে এবং তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে তদন্ত করে সেই নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে। একই সঙ্গে ইলিশ আহরণ ও মৎস্য পেশার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত প্রকৃত জেলেদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। যাচাই-বাছাই শেষে প্রকৃত জেলেদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
এ বিষয়ে শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ.এম. ইবনে মিজান বলেন, জাল যার, তিনিই প্রকৃত জেলে। এর বাইরে অন্য কোনো পেশার ব্যক্তির জেলে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ নেই। মৎস্য বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে তালিকা পুনঃযাচাই করা হবে। প্রকৃত জেলেদের অন্তর্ভুক্ত করা এবং অন্য পেশার কেউ তালিকায় থাকলে তাদের বাদ দেওয়ার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।





















