যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের দরপতনের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্ববাজারে। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ওয়াল স্ট্রিটে ব্যাপক শেয়ার বিক্রির চাপে এক দিনেই মার্কিন শেয়ারবাজারের বাজারমূল্য প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি (২.৫ ট্রিলিয়ন) ডলার কমেছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিনিয়োগ কমে যাওয়ার আশঙ্কা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্যকে ঘিরে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। মার্কিন বাজারের এই নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে এশিয়ার শেয়ারবাজারেও। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) দিনের লেনদেন শুরু হওয়ার পর দক্ষিণ কোরিয়ার কোস্পি সূচক প্রায় ৯ শতাংশ কমে যায়।
আকস্মিক এই পতন সামাল দিতে ২০ মিনিটের জন্য লেনদেন স্থগিত রাখতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতনির্ভর নাসডাক সূচক ৫ দশমিক ৫২ শতাংশ কমে সংশোধনের পর্যায়ে প্রবেশ করে। গত ৬ অক্টোবরের সর্বোচ্চ রেকর্ড অবস্থান থেকে সূচকটি ১০ শতাংশের বেশি নেমে গেছে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈশ্বিক শুল্ক ঘোষণার পর এটিই নাসডাকের সবচেয়ে বড় এক দিনের পতন।
একই সময়ে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ও ডাও জোনস সূচকও বড় দরপতনের মুখে পড়ে। এর ঠিক আগের দিন, অর্থাৎ বুধবার মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর শেয়ারবাজারে ছিল উল্টো চিত্র। সেদিন ডাও জোনস সূচক ১ হাজার ৫৬৯ পয়েন্ট বেড়েছিল। পাশাপাশি নাসডাকের উত্থান হয়েছিল ১ দশমিক ৪৪ শতাংশ। কিন্তু বৃহস্পতিবারের দরপতনে ডাও জোনস ১ হাজার ৮৩৩ পয়েন্ট হারিয়ে আগের দিনের সব অর্জন হারায়।
বাজারে এই বড় ধসের পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে টেক্সাসের গভর্নর নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জিনা হিনোজোসার জয়কে। এআই প্রযুক্তির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যটিতে গুগল, মেটা, ওরাকল ও ওপেনএআইয়ের মতো বড় প্রতিষ্ঠান বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছে। তবে নির্বাচনি প্রচারণায় হিনোজোসা নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা এবং এ খাতের কিছু কর-সুবিধা বাতিলের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
তার এই অবস্থানের প্রভাবে এআই অবকাঠামো ও চিপ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারে ব্যাপক দরপতন ঘটে। এনভিডিয়ার শেয়ারের দাম কমে ৯ দশমিক ৩ শতাংশ। এতে চলতি বছরের অর্জিত সব মুনাফা হারায় প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া চিপ নির্মাতাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক ১২ দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে, যা প্রায় সাড়ে ছয় বছরের মধ্যে এক দিনে সর্বোচ্চ পতন। এদিকে ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান টেসলার শেয়ারদর কমেছে ১১ শতাংশ এবং স্পেসএক্সের ৯ শতাংশ।
এআই কম্পিউটিং সেবা প্রদানকারী কোরউইভ ও নেবিয়াসের শেয়ারের দামও যথাক্রমে প্রায় ১০ ও ১৫ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে, প্রত্যাশার তুলনায় দুর্বল আয় ও বিক্রির পূর্বাভাস দেওয়ায় কোয়ালকমের শেয়ারদর কমেছে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ। বাজারের অস্থিরতা পরিমাপের সূচক ভিআইএক্স এক দিনেই প্রায় ৭০ শতাংশ বেড়েছে। প্রায় দুই বছরের মধ্যে এটিই সূচকটির সর্বোচ্চ উল্লম্ফন।
এসঅ্যান্ডপি ৫০০-এর ১১টি খাতের প্রতিটিতেই দরপতন হয়েছে। অন্যদিকে, নিরাপদ বিনিয়োগের প্রতি আগ্রহ বাড়ায় ১০ বছর মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের সুদহার কমে দুই মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন ৪ দশমিক ৮৪ শতাংশে নেমে এসেছে। ইয়ারডেনি রিসার্চের প্রেসিডেন্ট এড ইয়ারডেনির মতে, এআই খাতে অতিরিক্ত বিনিয়োগ ও জল্পনা-কল্পনা নিয়ন্ত্রণে আনা প্রয়োজন। তার ভাষায়, এআই খাতের বুদবুদ হঠাৎ ফেটে যাওয়ার চেয়ে ধীরে ধীরে এর চাপ কমে আসা বেশি ভালো।
অন্যদিকে, ট্রুইস্ট অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা কিথ লার্নারের ধারণা, বাজারের এই অস্থিরতা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে পারে। উল্লেখ্য, গত ৬ অক্টোবরের রেকর্ড সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে নাসডাক ও এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক যথাক্রমে প্রায় ১২ ও ৬ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে, গত ৫ আগস্টের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে ডাও জোনস সূচক নেমেছে প্রায় ৫ শতাংশ।
এআই খাতে অতিরিক্ত বিনিয়োগ, নতুন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং চাহিদার তুলনায় বেশি ডেটা সেন্টার নির্মাণের আশঙ্কা প্রযুক্তিনির্ভর শেয়ারবাজারে অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।




















