যশোরে ভুয়া চিকিৎসকদের দৌরাত্ম্য থামছেই না। এর অন্যতম কারণ হিসেবে নামমাত্র শাস্তি ও প্রশাসনিক ছাড়কে দায়ী করছেন সাধারণ মানুষ। তাদের অভিযোগ, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে ধরা পড়ে জেল-জরিমানার মুখোমুখি হলেও কিছুদিন পর আবার চিকিৎসক পরিচয়ে রোগী দেখছেন এসব ভুয়া চিকিৎসক।
এদিকে এসব চিকিৎসকের চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপত্রে ভুগতে হচ্ছে অনেককে। প্রাণহানিও ঘটেছে বলে জানা গেছে। এমন ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি এড়াতে প্রশাসনসহ বাংলাদেশ মেডিকেল ও দন্ত চিকিৎসক পরিষদের (বিএমডিসি) কার্যকর ও দ্রুত পদক্ষেপ চান তারা। জানা গেছে, গত ৫ নভেম্বর যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের সামনের ইসলামী ও প্রিন্স ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অভিযান চালিয়ে নানা অনিয়ম দেখতে পান ভ্রাম্যমাণ আদালত।
প্রিন্স ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ইউনানি চিকিৎসক দিয়ে অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপত্র দেওয়ার সত্যতা পাওয়া যায়। অন্যদিকে ইসলামী ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কোনো বৈধ কাগজপত্র পাওয়া যায়নি। সেখানে রোগী দেখছিলেন হাবিবুর রহমান, যিনি ২০২২ সালে ‘ভুয়া চিকিৎসক’ হিসেবে ভ্রাম্যমাণ আদালত কর্তৃক দণ্ডিত হয়েছিলেন। অনিয়মের কারণে ইসলামী ডায়াগনস্টিক সেন্টার সিলগালা এবং প্রিন্স ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
ওই অভিযানে নেতৃত্ব দেন সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মীম বিনতে মুস্তাফিজ। এ সময় সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার ডা. নবনিতা বণিক, পরিসংখ্যানবিদ শামসুল ফালাক ও পুলিশ সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। সূত্র জানায়, প্রথমে প্রিন্স ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অভিযান চালানো হয়। সেখানে মতিয়ার রহমান নামে এক ব্যক্তি রোগী দেখছিলেন।
ভ্রাম্যমাণ আদালত জানতে পারেন, তিনি এমবিবিএস চিকিৎসক নন, একজন ইউনানি চিকিৎসক। অথচ দীর্ঘদিন ধরে ব্যবস্থাপত্রে অ্যালোপ্যাথিকসহ বিভিন্ন ওষুধ লিখে আসছেন। এ অনিয়মের কারণে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক সেলিম হোসেনকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। শহিদ নামে এক পল্লী চিকিৎসকেরও এই প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যায়। তবে মতিয়ার রহমানের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এরপর ইসলামী ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অভিযান চালিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কোনো বৈধ কাগজপত্র পাওয়া যায়নি। এ সময় আদালত দেখতে পান, হাবিবুর রহমান রোগী দেখছেন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ঘাটতি ও অনিয়মের কারণে প্রতিষ্ঠানটি তাৎক্ষণিক সিলগালা করা হয়। কিন্তু ২০২২ সালে দণ্ডিত হওয়ার পরও আবার রোগী দেখতে শুরু করা হাবিবুরের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
জানা গেছে, ২০২২ সালের ৯ জুন যশোর শহরের ঘোপ নওয়াপাড়া রোডের পিয়ারলেস ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অভিযান চালিয়ে হাবিবুর রহমানকে আটক করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। নামের আগে ডাক্তার লিখে রোগীপ্রতি ৩০০ টাকা ভিজিট নেওয়ার অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। এমবিবিএস বা বিডিএস ডিগ্রি এবং বিএমডিসির নিবন্ধনসংক্রান্ত কাগজপত্র দেখাতে না পারায় তাকে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
কিন্তু সেই দণ্ড থামাতে পারেনি তার প্রতারণা। তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালের ১০ এপ্রিল চৌগাছা উপজেলা শহরের একটি হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে শেখর চন্দ্র দেবনাথকে চ্যালেঞ্জ করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। চিকিৎসক পরিচয় দিলেও তিনি স্বীকৃত চিকিৎসা ডিগ্রির কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। পরে তাকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, জরিমানার পরও তার কার্যক্রম বন্ধ হয়নি।
বর্তমানে যশোর শহরের জেলরোডে উত্তরা হসপিটালের নিচে মানসি ফিজিওথেরাপি সেন্টারে চিকিৎসক পরিচয়ে রোগী দেখছেন তিনি। মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সালেমীর হোসেন চৌধুরীর সহকারী হিসেবে কাজ করতেন সাইফুল ইসলাম। অভিযোগ রয়েছে, সেই পরিচয়কে পুঁজি করে শহরের আরএন রোডের ‘মেডিনোভা ব্রেন ও মনোরোগ সেন্টারে’ রোগী দেখছেন তিনি। প্রতিষ্ঠানের রিসিপশনের সামনে এখনো অধ্যাপক ডা. সালেমীর হোসেন চৌধুরীর প্যাড রাখা রয়েছে, যা ব্যবহার করে রোগীদের বিভ্রান্ত করা ও সিরিয়াল সংগ্রহের অভিযোগ রয়েছে।
তার বিরুদ্ধে ‘এফআরএইচএস (ইন্ডিয়া)’ ডিগ্রি ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। বর্তমানে তিনি ডিএমএফ (ঢাকা) ও ‘ডব্লিউপিএসি (সাইকিয়াট্রি)’ পরিচয় ব্যবহার করছেন। এসব ডিগ্রির স্বীকৃতি ও বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর চৌগাছার আদর্শ মেডিকেল হলে অভিযান চালিয়ে আব্দুল আলিম (৫০) নামে এক ব্যক্তিকে চিকিৎসক পরিচয়ে রোগী দেখার সময় আটক করা হয়।
বিএমডিসির অনুমোদিত নিবন্ধনপত্র দেখাতে না পারায় তাকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এর আগে ২৩ জুলাই চৌগাছার রায়হান হোমিও হলে অভিযান চালিয়ে জহির রায়হান (৩৭) নামে আরেক ব্যক্তিকে এক হাজার টাকা জরিমানা ও ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। গত ৩ ফেব্রুয়ারি কেশবপুরের কপোতাক্ষ সার্জিক্যাল ক্লিনিকে রোগীর অস্ত্রোপচারের সময় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে ধরা পড়েন ফিরোজ কবির।
চিকিৎসা ডিগ্রি না থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসক পরিচয়ে অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসাসেবা দেওয়ার অভিযোগে তাকে দুই মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এরপরও তার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ঝিকরগাছার ফেমাস মেডিকেল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিকে শরিফ উদ্দিন নামে এক ব্যক্তির চিকিৎসক পরিচয়ে রোগী দেখা ও সিজার করার অভিযোগ রয়েছে। গত ১৬ সেপ্টেম্বর তিনি অস্ত্রোপচারকালে মারা যান শিহরদাহ সরদারপাড়া গ্রামের ইয়ানুর রহমানের স্ত্রী সোহানা বেগম (১৯)।
ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করে। তবে শরিফ উদ্দিনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। বাঘারপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স রোডের শুভদ্রা মেডিকেল হলে প্রভাত কুমার সমাদ্দার নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে চিকিৎসক পরিচয়ে পাইলসের অস্ত্রোপচার করার অভিযোগ রয়েছে। গত ১৬ অক্টোবর চৌগাছার কাবিলপুর গ্রামের সেলিনা বেগমের অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসার নামে ১০ হাজার টাকা নেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
ওই চিকিৎসার পর তার শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতি ঘটে। এরপরও প্রভাত কুমার সমাদ্দার চিকিৎসার নামে প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এ ছাড়া যশোর সদর উপজেলার হৈবতপুর ইউনিয়নের সাতমাইল-বারীনগর বাজারের শাহবাজপুর রোডে ‘বারীনগর ডেন্টাল’ নামে প্রতিষ্ঠানে শাহ আলম ওরফে বাবলু এবং শাহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে দাঁত তোলা, বাঁধানো, ওয়াশ, পুটিং, ক্যাপ ও রুট ক্যানেলসহ বিভিন্ন দন্ত চিকিৎসাসেবা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
তারা বিশেষজ্ঞ দন্তচিকিৎসক নন বলে জানা গেছে। সম্পর্কে চাচা-ভাইপো এই দুজন দীর্ঘদিন ধরে এসব অপচিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ। জানা গেছে, তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে পত্রিকায় খবর প্রকাশ হলেও সিভিল সার্জন কার্যালয় কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। আব্দুর রহমান নামে আরেক ব্যক্তির বিরুদ্ধেও বিভিন্ন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসক পরিচয়ে রোগী দেখার অভিযোগ রয়েছে।
তিনি মেডিসিন, শিশু, সার্জারি ও গাইনি বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দাবি করে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা দিচ্ছেন বলে জানা গেছে। সূত্র জানায়, আব্দুর রহমান মূলত মণিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট। ভুয়া চিকিৎসকদের দৌরাত্ম্য বাড়ার পেছনে বিএমডিসির নির্দেশনা বাস্তবায়নে ঘাটতিকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। চিকিৎসকদের ব্যবস্থাপত্র, ভিজিটিং কার্ড, নামফলক ও সাইনবোর্ডে বিএমডিসির নিবন্ধন নম্বর উল্লেখের নির্দেশনা রয়েছে।
এ বিষয়ে ২০১৮ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বিজ্ঞপ্তিও জারি করে বিএমডিসি। কিন্তু যশোরের অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে দায়িত্ব পালনকারী চিকিৎসকদের ব্যবস্থাপত্র, ভিজিটিং কার্ড কিংবা সাইনবোর্ডে নিবন্ধন নম্বর উল্লেখ না থাকার অভিযোগ রয়েছে। ফলে প্রকৃত ও ভুয়া চিকিৎসক শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে সাধারণ রোগীদের জন্য।
এসব বিষয়ে যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা বলেন, হাবিবুর রহমান ও মতিয়ার রহমানকে সতর্ক করা হয়েছে। পুনরায় প্রতারণায় জড়ালে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভুয়া চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে। তিনি আরও বলেন, চিকিৎসকদের ব্যবস্থাপত্র, সাইনবোর্ড ও ভিজিটিং কার্ডে বিএমডিসির নিবন্ধন নম্বর উল্লেখের সরকারি নির্দেশনা রয়েছে। অধিকাংশ চিকিৎসক তা মানছেন না, বিষয়টি তার জানা।
এ বিষয়ে বিএমডিসির নির্দেশনা পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান ডা. মাসুদ রানা।




















