2:19 pm, Monday, 24 August 2026

কালের বিবর্তনে হারাচ্ছে ঘোড়ার গাড়ি, ৩৫ বছর ধরে পেশা আঁকড়ে আছেন সাত্তার

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

একসময় গ্রামবাংলার পথঘাটে ঘোড়ার গাড়ির চলাচল ছিল নিয়মিত দৃশ্য। বিয়ে, সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা দূরপাল্লার যাতায়াতে এই ঐতিহ্যবাহী বাহনের ব্যাপক চাহিদা ছিল। বিশেষ করে রাজশাহীর গ্রামাঞ্চলে মানুষের যাতায়াতের অন্যতম প্রধান ভরসা ছিল এই ঘোড়ার গাড়ি।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে মানুষের জীবনযাত্রা। অটোরিকশা, সিএনজি, মোটরসাইকেলসহ আধুনিক যানবাহনের দাপটে ঐতিহ্যবাহী ঘোড়ার গাড়ি এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। তবে ঐতিহ্য হারিয়ে গেলেও পেশা ছাড়েননি রাজশাহীর পবা উপজেলার নতুন কসবা গ্রামের আব্দুস সাত্তার। বয়স ৬৫ বছর। জীবনের ৩৫ বছর ধরে ঘোড়ার গাড়ি চালিয়েই সংসারের হাল ধরে আছেন তিনি। একসময় এই পেশা থেকে দিনে এক হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করলেও এখন অনেক দিন ৫০০ টাকাও জোটে না।

সাত্তারের জীবনের সঙ্গে ঘোড়ার গাড়ির সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। তার বাবা জর্জেস আলীও ঘোড়ার গাড়ি চালাতেন। বাবার হাত ধরেই এই পেশায় আসা। একসময় বিয়ের অনুষ্ঠান, সামাজিক আয়োজন ও মানুষের যাতায়াতে ঘোড়ার গাড়ির চাহিদা থাকায় ভালোই আয় করতেন তিনি। কিন্তু আধুনিক যানবাহনের বিস্তারে ধীরে ধীরে কমতে থাকে ঘোড়ার গাড়ির ব্যবহার। আব্দুস সাত্তার বলেন, একসময় দিনে এক হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করেছি।

এখন অনেক দিন ৫০০ টাকাও আয় হয় না। ঘোড়ার গাড়িতে মানুষ আর তেমন ওঠে না। বয়সের ভারে নতুন কোনো পেশায় যুক্ত হওয়াও তার জন্য কঠিন। তাই বাপ-দাদার পেশাকেই আঁকড়ে ধরে আছেন সাত্তার। তিনি বলেন, আমার বাবা জর্জেস আলী ঘোড়ার গাড়ি চালাতেন। এই গাড়ি চালিয়েই আমাদের ভরণপোষণ করেছেন। তাই আমিও এই পেশায় আছি। বাপ-দাদার পেশা বলে এখনো ছাড়িনি। বর্তমানে পদ্মা নদীর পাড়ই সাত্তারের প্রধান কর্মস্থল।

কেউ শখ করে নদীর ধারে ঘুরতে এলে ঘোড়ার গাড়িতে চড়তে চান। সেই আশাতেই প্রতিদিন গাড়ি নিয়ে নদীর পাড়ে বসে থাকেন তিনি। কোনো দিন যাত্রী মেলে, কোনো দিন মেলে না। যেদিন ভাড়া হয়, সেদিনই কিছুটা আয় হয়। সাত্তারের ভাষায়, পদ্মার ধারে কেউ ঘুরতে এলে মাঝে মাঝে ঘোড়ার গাড়িতে ওঠে। এই আশায় নদীর ধারে বসে থাকি। কোনো দিন ভাড়া হয়, কোনো দিন হয় না। পাঁচ সন্তান নিয়ে সাত্তারের সংসার।

এই ঘোড়ার গাড়ি চালিয়েই তিন মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন তিনি। ছেলেদেরও বেশি পড়াশোনা করাতে পারেননি। তারা এখন নিজেদের মতো করে আয়-রোজগার করছেন। কিন্তু নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির সময়ে অল্প আয়ে সংসার চালানো তার জন্য দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। সাত্তার বলেন, ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে তিন মেয়ের বিয়ে দিয়েছি। ছেলেদের বেশি পড়াতে পারিনি। তারা এখন নিজেরাই আয় করে।

আমার সংসার চালাতে অনেক কষ্ট হয়। তারপরও এই পেশা ছাড়িনি। প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা ও আধুনিক পরিবহনব্যবস্থার প্রসারে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার অনেক ঐতিহ্যবাহী পেশা। সেই তালিকায় ঘোড়ার গাড়িও এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। একসময় যে বাহন ছিল মানুষের যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম, এখন তা অনেকের কাছে কেবলই অতীতের স্মৃতি কিংবা বিনোদনের উপকরণ। তবুও আব্দুস সাত্তারের কাছে ঘোড়ার গাড়ি শুধু একটি বাহন নয়।

এটি তার পরিবারের দীর্ঘদিনের জীবিকার অবলম্বন, বাবার রেখে যাওয়া পেশা এবং জীবনের ৩৫ বছরের সঙ্গী। তাই আয় কমে গেলেও ছাড়তে পারেননি এই পেশা। পদ্মার পাড়ে দিনের পর দিন ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করেন সাত্তার। হয়তো কোনো যাত্রী আসবে, কয়েকশ টাকা আয় হবে—এই আশাতেই ঘোরে তার জীবনের চাকা। ঘোড়ার গাড়ির চাকা ধীরে ধীরে ঘোরে, কিন্তু সেই চাকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে একজন মানুষের ৩৫ বছরের সংগ্রাম, স্মৃতি ও বেঁচে থাকার গল্প।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

Nagorik Sangram

Popular Post

সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে: সালেহ শিবলী

কালের বিবর্তনে হারাচ্ছে ঘোড়ার গাড়ি, ৩৫ বছর ধরে পেশা আঁকড়ে আছেন সাত্তার

Update Time : 12:56:19 pm, Monday, 24 August 2026

একসময় গ্রামবাংলার পথঘাটে ঘোড়ার গাড়ির চলাচল ছিল নিয়মিত দৃশ্য। বিয়ে, সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা দূরপাল্লার যাতায়াতে এই ঐতিহ্যবাহী বাহনের ব্যাপক চাহিদা ছিল। বিশেষ করে রাজশাহীর গ্রামাঞ্চলে মানুষের যাতায়াতের অন্যতম প্রধান ভরসা ছিল এই ঘোড়ার গাড়ি।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে মানুষের জীবনযাত্রা। অটোরিকশা, সিএনজি, মোটরসাইকেলসহ আধুনিক যানবাহনের দাপটে ঐতিহ্যবাহী ঘোড়ার গাড়ি এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। তবে ঐতিহ্য হারিয়ে গেলেও পেশা ছাড়েননি রাজশাহীর পবা উপজেলার নতুন কসবা গ্রামের আব্দুস সাত্তার। বয়স ৬৫ বছর। জীবনের ৩৫ বছর ধরে ঘোড়ার গাড়ি চালিয়েই সংসারের হাল ধরে আছেন তিনি। একসময় এই পেশা থেকে দিনে এক হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করলেও এখন অনেক দিন ৫০০ টাকাও জোটে না।

সাত্তারের জীবনের সঙ্গে ঘোড়ার গাড়ির সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। তার বাবা জর্জেস আলীও ঘোড়ার গাড়ি চালাতেন। বাবার হাত ধরেই এই পেশায় আসা। একসময় বিয়ের অনুষ্ঠান, সামাজিক আয়োজন ও মানুষের যাতায়াতে ঘোড়ার গাড়ির চাহিদা থাকায় ভালোই আয় করতেন তিনি। কিন্তু আধুনিক যানবাহনের বিস্তারে ধীরে ধীরে কমতে থাকে ঘোড়ার গাড়ির ব্যবহার। আব্দুস সাত্তার বলেন, একসময় দিনে এক হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করেছি।

এখন অনেক দিন ৫০০ টাকাও আয় হয় না। ঘোড়ার গাড়িতে মানুষ আর তেমন ওঠে না। বয়সের ভারে নতুন কোনো পেশায় যুক্ত হওয়াও তার জন্য কঠিন। তাই বাপ-দাদার পেশাকেই আঁকড়ে ধরে আছেন সাত্তার। তিনি বলেন, আমার বাবা জর্জেস আলী ঘোড়ার গাড়ি চালাতেন। এই গাড়ি চালিয়েই আমাদের ভরণপোষণ করেছেন। তাই আমিও এই পেশায় আছি। বাপ-দাদার পেশা বলে এখনো ছাড়িনি। বর্তমানে পদ্মা নদীর পাড়ই সাত্তারের প্রধান কর্মস্থল।

কেউ শখ করে নদীর ধারে ঘুরতে এলে ঘোড়ার গাড়িতে চড়তে চান। সেই আশাতেই প্রতিদিন গাড়ি নিয়ে নদীর পাড়ে বসে থাকেন তিনি। কোনো দিন যাত্রী মেলে, কোনো দিন মেলে না। যেদিন ভাড়া হয়, সেদিনই কিছুটা আয় হয়। সাত্তারের ভাষায়, পদ্মার ধারে কেউ ঘুরতে এলে মাঝে মাঝে ঘোড়ার গাড়িতে ওঠে। এই আশায় নদীর ধারে বসে থাকি। কোনো দিন ভাড়া হয়, কোনো দিন হয় না। পাঁচ সন্তান নিয়ে সাত্তারের সংসার।

এই ঘোড়ার গাড়ি চালিয়েই তিন মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন তিনি। ছেলেদেরও বেশি পড়াশোনা করাতে পারেননি। তারা এখন নিজেদের মতো করে আয়-রোজগার করছেন। কিন্তু নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির সময়ে অল্প আয়ে সংসার চালানো তার জন্য দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। সাত্তার বলেন, ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে তিন মেয়ের বিয়ে দিয়েছি। ছেলেদের বেশি পড়াতে পারিনি। তারা এখন নিজেরাই আয় করে।

আমার সংসার চালাতে অনেক কষ্ট হয়। তারপরও এই পেশা ছাড়িনি। প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা ও আধুনিক পরিবহনব্যবস্থার প্রসারে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার অনেক ঐতিহ্যবাহী পেশা। সেই তালিকায় ঘোড়ার গাড়িও এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। একসময় যে বাহন ছিল মানুষের যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম, এখন তা অনেকের কাছে কেবলই অতীতের স্মৃতি কিংবা বিনোদনের উপকরণ। তবুও আব্দুস সাত্তারের কাছে ঘোড়ার গাড়ি শুধু একটি বাহন নয়।

এটি তার পরিবারের দীর্ঘদিনের জীবিকার অবলম্বন, বাবার রেখে যাওয়া পেশা এবং জীবনের ৩৫ বছরের সঙ্গী। তাই আয় কমে গেলেও ছাড়তে পারেননি এই পেশা। পদ্মার পাড়ে দিনের পর দিন ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করেন সাত্তার। হয়তো কোনো যাত্রী আসবে, কয়েকশ টাকা আয় হবে—এই আশাতেই ঘোরে তার জীবনের চাকা। ঘোড়ার গাড়ির চাকা ধীরে ধীরে ঘোরে, কিন্তু সেই চাকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে একজন মানুষের ৩৫ বছরের সংগ্রাম, স্মৃতি ও বেঁচে থাকার গল্প।