5:35 pm, Friday, 6 November 2026

ঠাকুরগাঁওয়ে দাদন ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্যে দিশেহারা সাধারণ মানুষ

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

ঠাকুরগাঁওয়ে দাদন ব্যবসায়ীদের চড়া সুদের চাপে পড়ে নিঃস্ব হচ্ছেন কৃষকসহ শত শত পরিবার। সুদে-আসলে টাকা পরিশোধ করতে না পেরে অনেকেই ভিটেমাটি ছেড়ে এলাকা থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। আবার অনেকে চেক ডিস-অনার মামলায় জড়িয়ে হন্যে হয়ে ঘুরছেন।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার কচুবাড়ি গ্রামের আকবর আলীর ছেলে শরিফুল ইসলাম একজন কৃষক। কৃষি জমিতে সার, বীজ ও কীটনাশক প্রয়োগ করতে চড়া সুদে টাকা কর্জ নেন ঠাকুরগাঁও শহরের হাজিপাড়া মহল্লার বাসিন্দা জেসমিন আক্তার বিজলী নামে একজন দাদন ব্যবসায়ীর নিকট। তার মতো একই গ্রামের নজরুল ইসলাম, দেলোয়ার হোসেন এবং আব্দুল মান্নানও ধারে কর্জ নেন বিজলীর কাছে।

এছাড়াও সদর উপজেলার আউলিয়াপুর ইউনিয়নের কচুবাড়ি, শাসলা পিয়ালা ও মাদারগঞ্জসহ বিভিন্ন গ্রামের সাধারণ মানুষ ধারে টাকা দেন ওই চক্রের কাছ থেকে। টাকা নেওয়ার সময় জামানত হিসেবে দাদন ব্যবসায়ীদের দিতে হয় ফাঁকা স্ট্যাম্প ও ব্যাংক চেক। নির্ধারিত সময়ে টাকা পরিশোধ করতে না পারলেই শুরু হয় দাদন ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ব। তারা ফাঁকা স্ট্যাম্প ও চেকের পাতায় ইচ্ছামতো টাকার পরিমাণ বসিয়ে নিয়ে দায়ের করে চেক ডিস-অনার মামলা।

মামলার ঝামেলা আর সুদের টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে অনেক পরিবার এখন ঘরবাড়ি ও জমি জমা হারিয়ে সম্পূর্ণ নিঃস্ব। ভুক্তভোগী লোকজন জানান,এক হাজার টাকায় প্রতিমাসে সুদ দিতে হয় ২’শ থেকে আড়াইশ টাকা। আর এই টাকা পরিশোধ দিতে দিতে মূল টাকা পরিশোধ হলেও সুদের টাকা শেষ হয় না। শেষ পর্যন্ত ফাঁকা চেকে কয়েক লাখ টাকা বসিয়ে মামলা দিয়ে হয়রানি করছেন দাদন ব্যবসায়ীরা।

টাকা দিতে দিতে নিজের সর্বস্ব শেষ হলেও সুদের টাকা পরিশোধ করতে না পেরে অনেকে এলাকা ছেড়ে পারিয়ে যাচ্ছেন। তাদের মতে, আর কোনো উপায় নাই, বাড়িঘর ছেড়ে এলাকা ছাড়া হয়েছেন অনেকে। এদিকে শরিফুল ইসলাম নামে ওই ভুক্তভোগী সহ কয়েক জন দাদন ব্যবসায়ী বিজলীর বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ করলেও তারা থানায় হাজির হন না। তারা এতোই শক্তিশালী যে থানা ও লিগ্যাল এইডে উপস্থিত করাতে পারছেন না কেউ।

এই বিষয়ে ২/১ জন সংবাদকর্মী অভিযোগের ভিত্তিতে জেসমিন আক্তার বিজলী নামেও ওই দাদন ব্যবসায়ীর ভাষ্য নিতে তাকে খুঁজতে তার বাসায় গেলে তিনি ফোনে হুমকি দিয়ে বলেন, আমার কাছে দলিল আছে, চেক আছে ,তারা না দিলে আমি কীভাবে পাবো। কোর্টে মামলা আছে, কোর্টের মাধ্যমে যা হবে তাই। এটা নিয়ে সাংবাদিক আমার বাসায় আসতে পারেন না। কারা বলেছে তাদের নাম বলেন, না হলে এই নম্বরটা কোর্টে সো করতে হবে।

ঠাকুরগাঁও জজ আদালতের এপিপি অ্যাডভোকেট মো. রাহাত জামিল বলেন, এ ধরনের আর্থিক লেনদেনগুলো থানা বা ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে সালিশে সমাধান হওয়ার সুযোগ আছে বলে জানালেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবী। তিনি আরও বলেন, কেউ যদি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে একাধিক মিথ্যা মামলা করেন, সে ক্ষেত্রে বিজ্ঞ আদালত বিচারিক প্রক্রিয়ায় সতর্কতার সাথে বিষয়গুলো বিবেচনা করবেন।

এ ব্যপারে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রফিকুল হক বলেন, লিখিত অভিযোগ পেলে অনিয়ম ও প্রতারণার বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ব্যক্তিগত সমঝোতায় লেনদেন হওয়ায় আইনি প্রক্রিয়ায় জটিলতা থাকে। তবে ভুক্তভোগীরা থানা বা আদালতে লিখিত অভিযোগ করলে প্রয়োজনীয় প্রতিকার পাবেন। একই সাথে ফাঁকা স্ট্যাম্প বা ব্যাংকের ব্ল্যাংক চেক দেওয়া ও নেওয়ার ক্ষেত্রে উভয় অপরাধী, সে জন্য সচেতন হতে হবে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

Nagorik Sangram

Popular Post

দেশের সব কারাগারের জন্য ৭ দফা নির্দেশনা জারি

ঠাকুরগাঁওয়ে দাদন ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্যে দিশেহারা সাধারণ মানুষ

Update Time : 10:07:52 am, Wednesday, 26 August 2026

ঠাকুরগাঁওয়ে দাদন ব্যবসায়ীদের চড়া সুদের চাপে পড়ে নিঃস্ব হচ্ছেন কৃষকসহ শত শত পরিবার। সুদে-আসলে টাকা পরিশোধ করতে না পেরে অনেকেই ভিটেমাটি ছেড়ে এলাকা থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। আবার অনেকে চেক ডিস-অনার মামলায় জড়িয়ে হন্যে হয়ে ঘুরছেন।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার কচুবাড়ি গ্রামের আকবর আলীর ছেলে শরিফুল ইসলাম একজন কৃষক। কৃষি জমিতে সার, বীজ ও কীটনাশক প্রয়োগ করতে চড়া সুদে টাকা কর্জ নেন ঠাকুরগাঁও শহরের হাজিপাড়া মহল্লার বাসিন্দা জেসমিন আক্তার বিজলী নামে একজন দাদন ব্যবসায়ীর নিকট। তার মতো একই গ্রামের নজরুল ইসলাম, দেলোয়ার হোসেন এবং আব্দুল মান্নানও ধারে কর্জ নেন বিজলীর কাছে।

এছাড়াও সদর উপজেলার আউলিয়াপুর ইউনিয়নের কচুবাড়ি, শাসলা পিয়ালা ও মাদারগঞ্জসহ বিভিন্ন গ্রামের সাধারণ মানুষ ধারে টাকা দেন ওই চক্রের কাছ থেকে। টাকা নেওয়ার সময় জামানত হিসেবে দাদন ব্যবসায়ীদের দিতে হয় ফাঁকা স্ট্যাম্প ও ব্যাংক চেক। নির্ধারিত সময়ে টাকা পরিশোধ করতে না পারলেই শুরু হয় দাদন ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ব। তারা ফাঁকা স্ট্যাম্প ও চেকের পাতায় ইচ্ছামতো টাকার পরিমাণ বসিয়ে নিয়ে দায়ের করে চেক ডিস-অনার মামলা।

মামলার ঝামেলা আর সুদের টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে অনেক পরিবার এখন ঘরবাড়ি ও জমি জমা হারিয়ে সম্পূর্ণ নিঃস্ব। ভুক্তভোগী লোকজন জানান,এক হাজার টাকায় প্রতিমাসে সুদ দিতে হয় ২’শ থেকে আড়াইশ টাকা। আর এই টাকা পরিশোধ দিতে দিতে মূল টাকা পরিশোধ হলেও সুদের টাকা শেষ হয় না। শেষ পর্যন্ত ফাঁকা চেকে কয়েক লাখ টাকা বসিয়ে মামলা দিয়ে হয়রানি করছেন দাদন ব্যবসায়ীরা।

টাকা দিতে দিতে নিজের সর্বস্ব শেষ হলেও সুদের টাকা পরিশোধ করতে না পেরে অনেকে এলাকা ছেড়ে পারিয়ে যাচ্ছেন। তাদের মতে, আর কোনো উপায় নাই, বাড়িঘর ছেড়ে এলাকা ছাড়া হয়েছেন অনেকে। এদিকে শরিফুল ইসলাম নামে ওই ভুক্তভোগী সহ কয়েক জন দাদন ব্যবসায়ী বিজলীর বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ করলেও তারা থানায় হাজির হন না। তারা এতোই শক্তিশালী যে থানা ও লিগ্যাল এইডে উপস্থিত করাতে পারছেন না কেউ।

এই বিষয়ে ২/১ জন সংবাদকর্মী অভিযোগের ভিত্তিতে জেসমিন আক্তার বিজলী নামেও ওই দাদন ব্যবসায়ীর ভাষ্য নিতে তাকে খুঁজতে তার বাসায় গেলে তিনি ফোনে হুমকি দিয়ে বলেন, আমার কাছে দলিল আছে, চেক আছে ,তারা না দিলে আমি কীভাবে পাবো। কোর্টে মামলা আছে, কোর্টের মাধ্যমে যা হবে তাই। এটা নিয়ে সাংবাদিক আমার বাসায় আসতে পারেন না। কারা বলেছে তাদের নাম বলেন, না হলে এই নম্বরটা কোর্টে সো করতে হবে।

ঠাকুরগাঁও জজ আদালতের এপিপি অ্যাডভোকেট মো. রাহাত জামিল বলেন, এ ধরনের আর্থিক লেনদেনগুলো থানা বা ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে সালিশে সমাধান হওয়ার সুযোগ আছে বলে জানালেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবী। তিনি আরও বলেন, কেউ যদি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে একাধিক মিথ্যা মামলা করেন, সে ক্ষেত্রে বিজ্ঞ আদালত বিচারিক প্রক্রিয়ায় সতর্কতার সাথে বিষয়গুলো বিবেচনা করবেন।

এ ব্যপারে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রফিকুল হক বলেন, লিখিত অভিযোগ পেলে অনিয়ম ও প্রতারণার বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ব্যক্তিগত সমঝোতায় লেনদেন হওয়ায় আইনি প্রক্রিয়ায় জটিলতা থাকে। তবে ভুক্তভোগীরা থানা বা আদালতে লিখিত অভিযোগ করলে প্রয়োজনীয় প্রতিকার পাবেন। একই সাথে ফাঁকা স্ট্যাম্প বা ব্যাংকের ব্ল্যাংক চেক দেওয়া ও নেওয়ার ক্ষেত্রে উভয় অপরাধী, সে জন্য সচেতন হতে হবে।