2:27 am, Saturday, 10 October 2026

চট্টগ্রাম উত্তর বনবিভাগে বদলি বাণিজ্যের অডিও ফাঁস

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

আমি সবার চেয়ে কম দিয়েছি। অপর প্রান্ত থেকে জানতে চাওয়া হয়, কত দিয়েছ? জবাবে বলা হয়, মাত্র ৪ লাখ। এরপর কথোপকথনে উঠে আসে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য।

‘শফিকুল স্যার তো অবসরের আগেই টাকা পাহাড় বানাইছে, কীভাবে নিল এই টাকা? এমন প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘স্যারের ক্যাশিয়ার আছে না। ’ ‘কেডা? ’ উত্তরে বলেন, ‘শহর রেঞ্জে বসায় দিছে ওনারে। ’ চট্টগ্রাম উত্তর বনবিভাগের বদলি বাণিজ্য নিয়ে একটি অডিও রেকর্ডে এমন কথোপকথন বলতে শোনা যায়। ঘুষ দিয়ে বদলি হওয়া এক ব্যক্তির।

অডিওটি উত্তর বনবিভাগের শোভনছড়ি বিট থেকে ফৌজদারহাট চেকস্টেশন কাম বিটে বদলি হওয়া এক বনপ্রহরী ও এক কর্মকর্তার। বন কর্মকর্তা নিজেই নিশ্চিত করেছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অডিওতে কথোপকথনকারী দুই জনের মধ্যে একজন হলেন বনপ্রহরী রাজু আহমেদ। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৫ সালের আগস্টে শোভনছড়ি বিটে বদলি হওয়ার পর এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তিনি ফৌজদারহাট চেকস্টেশন কাম বিটে বদলি হয়ে আসে রাজু আহমেদ।

অডিওতে খোদ রাজু আহমেদ এই বদলির পেছনে ৪ লাখ টাকা ঘুষ দেওয়ার কথা অকপটে বলতে শোনা যায়। চট্টগ্রাম উত্তর বনবিভাগের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি চেকস্টেশনের মধ্যে একটি ফৌজদারহাট চেকস্টেশন। এসব চেকস্টেশন দিয়ে কাঠসহ বিভিন্ন বনজ সম্পদ পরিবহনের সময় প্রতি গাড়ীতে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই। যার কারণে চেকস্টেশন গুলোতে বড় অংকের বদলি বানিজ্য হয়।

চট্টগ্রাম উত্তর বনবিভাগে বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ নতুন নয় বলে জানান বন বিভাগের বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী। তারা জানান, ডিএফও বদল হলেও গুরুত্বপূর্ণ রেঞ্জ, বিট ও চেকস্টেশনে পদায়ন নিয়ে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ পুরাতন নিয়মেই আছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি পদে বদলি পেতে পদ ও কর্মস্থলভেদে চার লাখ থেকে দশ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়।

বিশেষ করে চেকস্টেশনগুলোতে এই ঘুষের পরিমাণ ভিআইপি রেঞ্জের তুলনায় অনেক বেশি বলে নিশ্চিত করেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন রেঞ্জার, ডেপুটি রেঞ্জার ও বনপ্রহরীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গুরুত্বপূর্ণ রেঞ্জে বদলির ক্ষেত্রে ৫ থেকে ১৫ লাখ টাকা। চেকস্টেশনগুলোর ক্ষেত্রে অঙ্ক আরও বেশি। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শহর রেঞ্জে ১০ থেকে ২০ লাখ, করেরহাট, হাজারীখীল, হাটহাজারী ও নারায়ণহাট রেঞ্জে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিয়ে বদলি নিতে হয়।

একইভাবে ধুমঘাট চেকস্টেশনে ৩০ থেকে ৪০ লাখ, ফৌজদারহাটে ২০ থেকে ৩০ লাখ, করেরহাটে ১৫ থেকে ২০ লাখ এবং নারায়ণহাট চেকস্টেশনে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেন হয়। উত্তর বনবিভাগের কর্মকর্তা কর্মচারীরা জানান, বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) শফিকুল ইসলাম অবসরে যাওয়ার আগে বিভিন্ন রেঞ্জ, বিট ও চেকস্টেশনে কর্মকর্তা ও বনপ্রহরী বদলির আদেশ দেন।

এসব বদলিকে ঘিরেই ঘুষ বানিজ্য হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বদলি আদেশের তারিখ নিয়ে জন্ম দিয়েছে বির্তক। তেমনই একটি বদলি আদেশের কপিও হাতে এসেছে। সেখানে দেখা যায়, দুই রেঞ্জারকে বদলি আদেশের গোল সিলে অবসরে ঠিক তিনদিন আগের তারিখ দেওয়া হয়েছে। ডিএফও শফিকুল ইসলামের স্বাক্ষরের নিচে এক মাস আগে ৩ মে উল্লেখ করা হয়েছে।

অডিও রেকর্ডের সূত্র ধরে উত্তর বনবিভাগের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানান গেছে, ঘুষের মাধ্যমে বর্তমান ধুমঘাট চেকস্টেশন কর্মকর্তা, ফৌজদারহাট চেকস্টেশন কর্মকর্তা, হাটহাজারী রেঞ্জ কর্মকর্তা এবং ফৌজদারহাট বিট কাম চেকস্টেশনের বনপ্রহরী রাজু আহমেদসহ বিভিন্ন রেঞ্জ, বিট চেকস্টেশন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি করা হয়েছে। কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ পদে যাওয়ার ক্ষেত্রে টাকা ছাড়া সুযোগ পাওয়া কঠিন।

তবে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে রাজি হয়নি তিনজন বর্তমান রেঞ্জ কর্মকর্তা ও একজন চেকস্টেশন কর্মকর্তা। ধুমঘাট চেকস্টেশনের সাবেক এক কর্মকর্তা বলেন, এক বছরের জন্য আমি ৪০ লাখ টাকা দিয়েছিলাম। অন্যরা এক বছরে টাকা তুলতে পারলেও আমি পারিনি। পরে চট্টগ্রাম শহর রেঞ্জে চলে গিয়েছিলাম। তিনি আরও বলেন, বনবিভাগে টাকা ছাড়া বদলি হয় না। কিন্তু মুখে নীতি ও বনরক্ষক হলেও বন বিভাগ টাকা ছড়াতে হয়।

শহর রেঞ্জের সাবেক কর্মকর্তার জানান,তাকে শহর রেঞ্জে বসতে ১০ লাখ টাকা দিতে হয়েছে। ঘুষ ছাড়া বনবিভাগের কোনো চেয়ারে বসতে পারা যায় না। টাকা দিলে লাভজনক চেয়ারে বসা সহজ। প্রকাশিত অডিও রেকর্ডের বিষয়ে বনপ্রহরী রাজু আহমেদ বলেন, আমি অসুস্থ। আমার পরিবার আছে। আমি ছোট পোস্টে চাকরি করি। সবকিছু আপনার বিবেকের ওপর ছেড়ে দিলাম। আপনার কাছে যেহেতু রেকর্ড আছে আর কিছু বলার নেই।

ফৌজদারহাট বিট কাম চেকস্টেশন কর্মকর্তা আশরাফুল আলম বলেন, যার রেকর্ড প্রকাশ হয়েছে, সেই ভালো বলতে পারবে সবকিছু। এ বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে পারব না। বন বিভাগের কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা কর্মচারী আক্ষেপের সুরে বলেন, নিচ থেকে ওপর পর্যন্ত সবাই জানে ঘুষ বাণিজ্যের কথা। বনবিভাগ ঘুষ খায় না এমন কেউ নেই। দুদকও এসেছে, তবুও সবকিছু চলছে স্বাভাবিক নিয়মে।

প্রমাণের পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় বদলি বাণিজ্য দিন দিন ক্যানসারে পরিণত হয়েছে। স্রোতের সাথে গা ভাসিয়ে চলছি আমরা। বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ ও ভুক্তভোগীর অডিও রেকর্ডের বিষয়ে সাবেক ডিএফও শফিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে প্রথমে তিনি নিজের পরিচয় দিলেও পরে সংবাদকর্মী পরিচয় জানার পর নিজেকে ‘মাসুদ’ পরিচয় দিয়ে বলেন, শফিকুল ইসলাম বাইরে গেছে।

তিনি জানান, অবসরে আসার পরে এগুলো কেন ঘাটাঘাটি করছেন? এগুলো অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম উত্তর বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) আবু নাসের মোহসিন হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে বদলি, পদায়ন ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগসহ একাধিক প্রশ্ন পাঠানো হয়। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বাপার সদস্য মেহেদী হাসান রানা বলেন, প্রকাশিত অডিও রেকর্ডের মাধ্যমে উত্তর বনবিভাগে বদলি বাণিজ্যের বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে গেছে। এখন দেখার বিষয় কতৃপক্ষ কি পদক্ষেপ নেন। নাকি বিগত সময়ের মত ধামাচাপা দেন। চট্টগ্রাম বন সংরক্ষক (সিএফ) মিহির কুমার দে জানান, যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি অবসরে আছেন। বদলি বাণিজ্যের ঘটনাটি তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে বন বিভাগের বদলি বাণিজ্য নিয়ে গত ২৫ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চট্টগ্রাম বন সংরক্ষকের কার্যালয়ে অভিযান পরিচালনা করেন। তৎকালীন সিএফ মোল্যা রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে ১০ কোটি টাকা বদলি বানিজ্যে অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন দুদক।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

Nagorik Sangram

Popular Post

চট্টগ্রাম বন্দরে ডিপি ওয়ার্ল্ডের চুক্তি: ব্যবসায়ীদের স্বাগত, শ্রমিকদের অসন্তোষ

চট্টগ্রাম উত্তর বনবিভাগে বদলি বাণিজ্যের অডিও ফাঁস

Update Time : 01:37:41 am, Saturday, 10 October 2026

আমি সবার চেয়ে কম দিয়েছি। অপর প্রান্ত থেকে জানতে চাওয়া হয়, কত দিয়েছ? জবাবে বলা হয়, মাত্র ৪ লাখ। এরপর কথোপকথনে উঠে আসে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য।

‘শফিকুল স্যার তো অবসরের আগেই টাকা পাহাড় বানাইছে, কীভাবে নিল এই টাকা? এমন প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘স্যারের ক্যাশিয়ার আছে না। ’ ‘কেডা? ’ উত্তরে বলেন, ‘শহর রেঞ্জে বসায় দিছে ওনারে। ’ চট্টগ্রাম উত্তর বনবিভাগের বদলি বাণিজ্য নিয়ে একটি অডিও রেকর্ডে এমন কথোপকথন বলতে শোনা যায়। ঘুষ দিয়ে বদলি হওয়া এক ব্যক্তির।

অডিওটি উত্তর বনবিভাগের শোভনছড়ি বিট থেকে ফৌজদারহাট চেকস্টেশন কাম বিটে বদলি হওয়া এক বনপ্রহরী ও এক কর্মকর্তার। বন কর্মকর্তা নিজেই নিশ্চিত করেছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অডিওতে কথোপকথনকারী দুই জনের মধ্যে একজন হলেন বনপ্রহরী রাজু আহমেদ। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৫ সালের আগস্টে শোভনছড়ি বিটে বদলি হওয়ার পর এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তিনি ফৌজদারহাট চেকস্টেশন কাম বিটে বদলি হয়ে আসে রাজু আহমেদ।

অডিওতে খোদ রাজু আহমেদ এই বদলির পেছনে ৪ লাখ টাকা ঘুষ দেওয়ার কথা অকপটে বলতে শোনা যায়। চট্টগ্রাম উত্তর বনবিভাগের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি চেকস্টেশনের মধ্যে একটি ফৌজদারহাট চেকস্টেশন। এসব চেকস্টেশন দিয়ে কাঠসহ বিভিন্ন বনজ সম্পদ পরিবহনের সময় প্রতি গাড়ীতে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই। যার কারণে চেকস্টেশন গুলোতে বড় অংকের বদলি বানিজ্য হয়।

চট্টগ্রাম উত্তর বনবিভাগে বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ নতুন নয় বলে জানান বন বিভাগের বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী। তারা জানান, ডিএফও বদল হলেও গুরুত্বপূর্ণ রেঞ্জ, বিট ও চেকস্টেশনে পদায়ন নিয়ে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ পুরাতন নিয়মেই আছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি পদে বদলি পেতে পদ ও কর্মস্থলভেদে চার লাখ থেকে দশ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়।

বিশেষ করে চেকস্টেশনগুলোতে এই ঘুষের পরিমাণ ভিআইপি রেঞ্জের তুলনায় অনেক বেশি বলে নিশ্চিত করেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন রেঞ্জার, ডেপুটি রেঞ্জার ও বনপ্রহরীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গুরুত্বপূর্ণ রেঞ্জে বদলির ক্ষেত্রে ৫ থেকে ১৫ লাখ টাকা। চেকস্টেশনগুলোর ক্ষেত্রে অঙ্ক আরও বেশি। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শহর রেঞ্জে ১০ থেকে ২০ লাখ, করেরহাট, হাজারীখীল, হাটহাজারী ও নারায়ণহাট রেঞ্জে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিয়ে বদলি নিতে হয়।

একইভাবে ধুমঘাট চেকস্টেশনে ৩০ থেকে ৪০ লাখ, ফৌজদারহাটে ২০ থেকে ৩০ লাখ, করেরহাটে ১৫ থেকে ২০ লাখ এবং নারায়ণহাট চেকস্টেশনে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেন হয়। উত্তর বনবিভাগের কর্মকর্তা কর্মচারীরা জানান, বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) শফিকুল ইসলাম অবসরে যাওয়ার আগে বিভিন্ন রেঞ্জ, বিট ও চেকস্টেশনে কর্মকর্তা ও বনপ্রহরী বদলির আদেশ দেন।

এসব বদলিকে ঘিরেই ঘুষ বানিজ্য হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বদলি আদেশের তারিখ নিয়ে জন্ম দিয়েছে বির্তক। তেমনই একটি বদলি আদেশের কপিও হাতে এসেছে। সেখানে দেখা যায়, দুই রেঞ্জারকে বদলি আদেশের গোল সিলে অবসরে ঠিক তিনদিন আগের তারিখ দেওয়া হয়েছে। ডিএফও শফিকুল ইসলামের স্বাক্ষরের নিচে এক মাস আগে ৩ মে উল্লেখ করা হয়েছে।

অডিও রেকর্ডের সূত্র ধরে উত্তর বনবিভাগের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানান গেছে, ঘুষের মাধ্যমে বর্তমান ধুমঘাট চেকস্টেশন কর্মকর্তা, ফৌজদারহাট চেকস্টেশন কর্মকর্তা, হাটহাজারী রেঞ্জ কর্মকর্তা এবং ফৌজদারহাট বিট কাম চেকস্টেশনের বনপ্রহরী রাজু আহমেদসহ বিভিন্ন রেঞ্জ, বিট চেকস্টেশন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি করা হয়েছে। কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ পদে যাওয়ার ক্ষেত্রে টাকা ছাড়া সুযোগ পাওয়া কঠিন।

তবে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে রাজি হয়নি তিনজন বর্তমান রেঞ্জ কর্মকর্তা ও একজন চেকস্টেশন কর্মকর্তা। ধুমঘাট চেকস্টেশনের সাবেক এক কর্মকর্তা বলেন, এক বছরের জন্য আমি ৪০ লাখ টাকা দিয়েছিলাম। অন্যরা এক বছরে টাকা তুলতে পারলেও আমি পারিনি। পরে চট্টগ্রাম শহর রেঞ্জে চলে গিয়েছিলাম। তিনি আরও বলেন, বনবিভাগে টাকা ছাড়া বদলি হয় না। কিন্তু মুখে নীতি ও বনরক্ষক হলেও বন বিভাগ টাকা ছড়াতে হয়।

শহর রেঞ্জের সাবেক কর্মকর্তার জানান,তাকে শহর রেঞ্জে বসতে ১০ লাখ টাকা দিতে হয়েছে। ঘুষ ছাড়া বনবিভাগের কোনো চেয়ারে বসতে পারা যায় না। টাকা দিলে লাভজনক চেয়ারে বসা সহজ। প্রকাশিত অডিও রেকর্ডের বিষয়ে বনপ্রহরী রাজু আহমেদ বলেন, আমি অসুস্থ। আমার পরিবার আছে। আমি ছোট পোস্টে চাকরি করি। সবকিছু আপনার বিবেকের ওপর ছেড়ে দিলাম। আপনার কাছে যেহেতু রেকর্ড আছে আর কিছু বলার নেই।

ফৌজদারহাট বিট কাম চেকস্টেশন কর্মকর্তা আশরাফুল আলম বলেন, যার রেকর্ড প্রকাশ হয়েছে, সেই ভালো বলতে পারবে সবকিছু। এ বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে পারব না। বন বিভাগের কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা কর্মচারী আক্ষেপের সুরে বলেন, নিচ থেকে ওপর পর্যন্ত সবাই জানে ঘুষ বাণিজ্যের কথা। বনবিভাগ ঘুষ খায় না এমন কেউ নেই। দুদকও এসেছে, তবুও সবকিছু চলছে স্বাভাবিক নিয়মে।

প্রমাণের পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় বদলি বাণিজ্য দিন দিন ক্যানসারে পরিণত হয়েছে। স্রোতের সাথে গা ভাসিয়ে চলছি আমরা। বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ ও ভুক্তভোগীর অডিও রেকর্ডের বিষয়ে সাবেক ডিএফও শফিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে প্রথমে তিনি নিজের পরিচয় দিলেও পরে সংবাদকর্মী পরিচয় জানার পর নিজেকে ‘মাসুদ’ পরিচয় দিয়ে বলেন, শফিকুল ইসলাম বাইরে গেছে।

তিনি জানান, অবসরে আসার পরে এগুলো কেন ঘাটাঘাটি করছেন? এগুলো অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম উত্তর বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) আবু নাসের মোহসিন হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে বদলি, পদায়ন ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগসহ একাধিক প্রশ্ন পাঠানো হয়। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বাপার সদস্য মেহেদী হাসান রানা বলেন, প্রকাশিত অডিও রেকর্ডের মাধ্যমে উত্তর বনবিভাগে বদলি বাণিজ্যের বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে গেছে। এখন দেখার বিষয় কতৃপক্ষ কি পদক্ষেপ নেন। নাকি বিগত সময়ের মত ধামাচাপা দেন। চট্টগ্রাম বন সংরক্ষক (সিএফ) মিহির কুমার দে জানান, যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি অবসরে আছেন। বদলি বাণিজ্যের ঘটনাটি তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে বন বিভাগের বদলি বাণিজ্য নিয়ে গত ২৫ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চট্টগ্রাম বন সংরক্ষকের কার্যালয়ে অভিযান পরিচালনা করেন। তৎকালীন সিএফ মোল্যা রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে ১০ কোটি টাকা বদলি বানিজ্যে অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন দুদক।