3:07 am, Saturday, 10 October 2026

চট্টগ্রাম বন্দরে ডিপি ওয়ার্ল্ডের চুক্তি: ব্যবসায়ীদের স্বাগত, শ্রমিকদের অসন্তোষ

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ১৫ বছরের জন্য পরিচালনায় দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখলেও শ্রমিক-কর্মচারীরা এর বিরোধিতা করছেন এবং নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় সরকারের দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ দাবি করেছেন। একই সঙ্গে চুক্তির সুফল পেতে সেবার মান বৃদ্ধি ও মাসুল নিয়ন্ত্রণে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বন্দর ব্যবহারকারী ও অর্থনীতিবিদেরা।

নানা আলোচনা-সমালোচনা ও প্রতিবাদের মধ্যে বৃহস্পতিবার এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি করে সরকার। ২০১৯ সালে দুবাই সরকারের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সইয়ের সাত বছর পর এ চুক্তি হলো। চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ছয় মাসের মধ্যে টার্মিনালটি ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

চুক্তির আওতায় অগ্রিম ফি হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা দেবে প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া প্রথম ১০ বছরে টার্মিনালের আধুনিকায়ন, যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি উন্নয়নে এক হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের অঙ্গীকার করেছে তারা। প্রতি টিইইউ (২০ ফুট দীর্ঘ কনটেইনারের সমতুল্য একক) হ্যান্ডলিংয়ের আয় থেকে ৪০ থেকে ৬৭ শতাংশ বন্দর কর্তৃপক্ষকে দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে টার্মিনালের জমি, অবকাঠামো, মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ থাকবে বন্দর কর্তৃপক্ষের হাতে।

শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের যুগ্ম সমন্বয়ক কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার চুক্তিটিকে দেশের স্বার্থবিরোধী উল্লেখ করে জানান, এর বিরুদ্ধে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। শ্রমিকদের স্বার্থ সুরক্ষায় সরকারের অবস্থানও দ্রুত স্পষ্ট করার দাবি জানান তিনি।

অন্যদিকে, চট্টগ্রাম চেম্বারের পরিচালক নাসির উদ্দীন চৌধুরী বলেন, ‘বন্দর ব্যবহারকারীরা চুক্তিকে স্বাগত জানালেও মাসুল বৃদ্ধি নিয়ে তাদের উদ্বেগ রয়েছে। এ কারণে চুক্তির বিস্তারিত জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত।’

ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, ডিপি ওয়ার্ল্ডের দক্ষ পরিচালনায় কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের গতি বাড়বে। এতে জাহাজের অপেক্ষার সময়, পণ্য খালাসে বিলম্ব, ডেমারেজ মাশুল ও পরিবহন ব্যয় কমতে পারে।

আইবিএফবির সাবেক সভাপতি হুমায়ুন রশিদ বলেন, ‘টার্মিনালের দক্ষতা বাড়লে জাহাজের অপেক্ষার সময় ও পণ্য খালাসে বিলম্ব কমবে। এতে ডেমারেজ মাশুল ও পরিবহন ব্যয় হ্রাসের পাশাপাশি বিশ্ববাণিজ্যে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে।’

তবে অর্থনীতিবিদ এম এম আকাশের মতে, শুধু কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের গতি বাড়লেই কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে না। পরিচালন ব্যয় বেড়ে গেলে তার প্রভাব আমদানি-রপ্তানি ব্যয় ও পণ্যের দামে পড়তে পারে। পাশাপাশি চুক্তি অনুযায়ী ডিপি ওয়ার্ল্ডের বিনিয়োগ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনার ওঠানামার প্রায় ৪৪ শতাংশ হয় এনসিটির মাধ্যমে। ২০০৭ সালে কার্যক্রম শুরু করা এই টার্মিনালটি বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। বিশ্বের ৪০টির বেশি দেশে ৮০টিরও বেশি বন্দর ও টার্মিনাল পরিচালনা করে ডিপি ওয়ার্ল্ড। বাংলাদেশের বে টার্মিনাল, রেলসংযোগ ও মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল উন্নয়নেও আগ্রহ দেখিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

এদিকে, চুক্তি ঘিরে বন্দর এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে পুলিশ। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (বন্দর) মো. আমিরুল ইসলাম এ তথ্য জানিয়েছেন।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

Nagorik Sangram

Popular Post

তুরস্কের ইস্তাম্বুলে ভবন ধসে ৫ জনের মৃত্যু

চট্টগ্রাম বন্দরে ডিপি ওয়ার্ল্ডের চুক্তি: ব্যবসায়ীদের স্বাগত, শ্রমিকদের অসন্তোষ

Update Time : 02:16:23 am, Saturday, 10 October 2026

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ১৫ বছরের জন্য পরিচালনায় দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখলেও শ্রমিক-কর্মচারীরা এর বিরোধিতা করছেন এবং নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় সরকারের দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ দাবি করেছেন। একই সঙ্গে চুক্তির সুফল পেতে সেবার মান বৃদ্ধি ও মাসুল নিয়ন্ত্রণে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বন্দর ব্যবহারকারী ও অর্থনীতিবিদেরা।

নানা আলোচনা-সমালোচনা ও প্রতিবাদের মধ্যে বৃহস্পতিবার এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি করে সরকার। ২০১৯ সালে দুবাই সরকারের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সইয়ের সাত বছর পর এ চুক্তি হলো। চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ছয় মাসের মধ্যে টার্মিনালটি ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

চুক্তির আওতায় অগ্রিম ফি হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা দেবে প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া প্রথম ১০ বছরে টার্মিনালের আধুনিকায়ন, যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি উন্নয়নে এক হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের অঙ্গীকার করেছে তারা। প্রতি টিইইউ (২০ ফুট দীর্ঘ কনটেইনারের সমতুল্য একক) হ্যান্ডলিংয়ের আয় থেকে ৪০ থেকে ৬৭ শতাংশ বন্দর কর্তৃপক্ষকে দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে টার্মিনালের জমি, অবকাঠামো, মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ থাকবে বন্দর কর্তৃপক্ষের হাতে।

শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের যুগ্ম সমন্বয়ক কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার চুক্তিটিকে দেশের স্বার্থবিরোধী উল্লেখ করে জানান, এর বিরুদ্ধে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। শ্রমিকদের স্বার্থ সুরক্ষায় সরকারের অবস্থানও দ্রুত স্পষ্ট করার দাবি জানান তিনি।

অন্যদিকে, চট্টগ্রাম চেম্বারের পরিচালক নাসির উদ্দীন চৌধুরী বলেন, ‘বন্দর ব্যবহারকারীরা চুক্তিকে স্বাগত জানালেও মাসুল বৃদ্ধি নিয়ে তাদের উদ্বেগ রয়েছে। এ কারণে চুক্তির বিস্তারিত জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত।’

ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, ডিপি ওয়ার্ল্ডের দক্ষ পরিচালনায় কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের গতি বাড়বে। এতে জাহাজের অপেক্ষার সময়, পণ্য খালাসে বিলম্ব, ডেমারেজ মাশুল ও পরিবহন ব্যয় কমতে পারে।

আইবিএফবির সাবেক সভাপতি হুমায়ুন রশিদ বলেন, ‘টার্মিনালের দক্ষতা বাড়লে জাহাজের অপেক্ষার সময় ও পণ্য খালাসে বিলম্ব কমবে। এতে ডেমারেজ মাশুল ও পরিবহন ব্যয় হ্রাসের পাশাপাশি বিশ্ববাণিজ্যে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে।’

তবে অর্থনীতিবিদ এম এম আকাশের মতে, শুধু কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের গতি বাড়লেই কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে না। পরিচালন ব্যয় বেড়ে গেলে তার প্রভাব আমদানি-রপ্তানি ব্যয় ও পণ্যের দামে পড়তে পারে। পাশাপাশি চুক্তি অনুযায়ী ডিপি ওয়ার্ল্ডের বিনিয়োগ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনার ওঠানামার প্রায় ৪৪ শতাংশ হয় এনসিটির মাধ্যমে। ২০০৭ সালে কার্যক্রম শুরু করা এই টার্মিনালটি বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। বিশ্বের ৪০টির বেশি দেশে ৮০টিরও বেশি বন্দর ও টার্মিনাল পরিচালনা করে ডিপি ওয়ার্ল্ড। বাংলাদেশের বে টার্মিনাল, রেলসংযোগ ও মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল উন্নয়নেও আগ্রহ দেখিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

এদিকে, চুক্তি ঘিরে বন্দর এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে পুলিশ। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (বন্দর) মো. আমিরুল ইসলাম এ তথ্য জানিয়েছেন।