5:57 pm, Friday, 6 November 2026

লালমনিরহাটে তিস্তার চরে আগাম ভুট্টা চাষে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন নারীদের

লালমনিরহাটে তিস্তার চরে আগাম ভুট্টা চাষে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন নারীদের

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

লালমনিরহাটের তিস্তার চরাঞ্চলে শুরু হয়েছে আগাম ভুট্টা চাষ। চরের বিস্তীর্ণ জমিতে চলছে বীজ রোপণের কাজ। পুরুষদের পাশাপাশি এসব কাজে অংশ নিচ্ছেন নারীরাও। দিনভর মাঠে কাজ করে দৈনিক ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা মজুরি পাচ্ছেন তারা।

নিজেদের শ্রমে উপার্জিত এই অর্থ দিয়ে সংসারের খরচে সহযোগিতা করার পাশাপাশি সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয়ও বহন করছেন অনেকে। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সকালে জেলার হাতীবান্ধার পারুলিয়া তিস্তার চরাঞ্চলে গিয়ে দেখা যায়, চলছে আগাম ভুট্টা চাষের ব্যস্ততা। আর এই কর্মব্যস্ততার মধ্যেই কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করে নিজেদের স্বাবলম্বী করে তুলছেন চরাঞ্চলের নারীরা।

সরেজমিনে দেখা যায়, তিস্তার বুকে জেগে ওঠা বিস্তীর্ণ চর। কোথাও সদ্য প্রস্তুত করা জমি, কোথাও চলছে আগাম ভুট্টার বীজ রোপণ। পুরুষদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মাঠে নেমেছেন নারীরাও। কারও হাতে বীজ, কেউ ব্যস্ত সারি ধরে বীজ রোপণে। পুরুষ শ্রমিকদের পাশাপাশি পাঁচ-ছয়জনের ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে কাজ করছেন নারীরাও। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত চলে তাদের কর্মব্যস্ততা।

তিস্তার চরাঞ্চলের মানুষের জীবিকার অন্যতম প্রধান অবলম্বন কৃষি। মৌসুমভিত্তিক ফসলের ওপর নির্ভর করেই চলে এখানকার অসংখ্য পরিবারের জীবন-জীবিকা। আগাম ভুট্টা চাষ শুরু হওয়ায় কৃষিজমিতে কর্মচাঞ্চল্য ফেরার পাশাপাশি নারী-পুরুষ উভয়ের কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে নারীদের জন্য কৃষিশ্রম হয়ে উঠেছে বাড়তি আয়ের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

এমনই এক নারী শ্রমিক পারুল বেগম। তিনি উপজেলার পাটিকাপাড়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ পারুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা। ভুট্টার বীজ রোপণ করে প্রতিদিন ৪০০ টাকা মজুরি পান তিনি। নিজের উপার্জিত অর্থ দিয়ে সংসারের খরচে সহযোগিতা করার পাশাপাশি সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয়ও বহন করছেন। পারুল বেগম বলেন, ‘প্রতিদিন ভুট্টার বীজ রোপণ করে ৪০০ টাকা পাই।

এই টাকা দিয়ে সংসারের খরচ চালানোর পাশাপাশি ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে পারছি। নিজের আয় থাকায় সংসারেও কিছুটা স্বস্তি এসেছে। ’ একই এলাকার রমিছা বেগম বলেন, ‘সংসারে অভাব-অনটন লেগেই থাকে। শুধু স্বামীর আয়ে সব খরচ চালানো কঠিন। তাই নিজেরাও মাঠে কাজ করতে নেমেছি। এতে সংসারের আর্থিক চাপ কিছুটা কমছে। সহর উদ্দিন সরকার সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের নারী শিক্ষিকা গুলনাহার বেগম বলেন, ‘নারীরা এখন আর ঘরের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ নেই।

পরিবার, সমাজ ও অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তিস্তার চরাঞ্চলের নারীরা কৃষিকাজ করে সংসারের হাল ধরছেন, সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগাচ্ছেন। নারীদের এই পরিশ্রম, সাহস ও আত্মনির্ভরশীলতা সত্যিই প্রশংসনীয়। যথাযথ সুযোগ ও সম্মান পেলে নারীরা নিজেদের যোগ্যতা দিয়ে পরিবার ও সমাজকে আরও এগিয়ে নিতে পারবেন। ’ হাতীবান্ধা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হারুন মিয়া বলেন, ‘চলতি মৌসুমে উপজেলার তিস্তার চরাঞ্চলে ২ হাজার ২৯০ হেক্টর জমিতে ভুট্টা চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

ইতোমধ্যে বিভিন্ন চরে আগাম ভুট্টা চাষ শুরু হয়েছে। এতে পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজের সুযোগ পাচ্ছেন। তাদের এই অংশগ্রহণ সংসারে বাড়তি আয়ের পাশাপাশি নারীদের স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করছে। ’ তিস্তার চরে এখন শুধু ভুট্টার বীজই বুনছেন না নারীরা, বুনছেন নিজেদের স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্নও। তাদের শ্রমে যেমন সমৃদ্ধ হচ্ছে কৃষি, তেমনি বদলে যাচ্ছে অনেক পরিবারের অর্থনৈতিক বাস্তবতা।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

Nagorik Sangram

Popular Post

লালমনিরহাটে তিস্তার চরে আগাম ভুট্টা চাষে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন নারীদের

লালমনিরহাটে তিস্তার চরে আগাম ভুট্টা চাষে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন নারীদের

Update Time : 05:51:42 pm, Friday, 6 November 2026

লালমনিরহাটের তিস্তার চরাঞ্চলে শুরু হয়েছে আগাম ভুট্টা চাষ। চরের বিস্তীর্ণ জমিতে চলছে বীজ রোপণের কাজ। পুরুষদের পাশাপাশি এসব কাজে অংশ নিচ্ছেন নারীরাও। দিনভর মাঠে কাজ করে দৈনিক ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা মজুরি পাচ্ছেন তারা।

নিজেদের শ্রমে উপার্জিত এই অর্থ দিয়ে সংসারের খরচে সহযোগিতা করার পাশাপাশি সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয়ও বহন করছেন অনেকে। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সকালে জেলার হাতীবান্ধার পারুলিয়া তিস্তার চরাঞ্চলে গিয়ে দেখা যায়, চলছে আগাম ভুট্টা চাষের ব্যস্ততা। আর এই কর্মব্যস্ততার মধ্যেই কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করে নিজেদের স্বাবলম্বী করে তুলছেন চরাঞ্চলের নারীরা।

সরেজমিনে দেখা যায়, তিস্তার বুকে জেগে ওঠা বিস্তীর্ণ চর। কোথাও সদ্য প্রস্তুত করা জমি, কোথাও চলছে আগাম ভুট্টার বীজ রোপণ। পুরুষদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মাঠে নেমেছেন নারীরাও। কারও হাতে বীজ, কেউ ব্যস্ত সারি ধরে বীজ রোপণে। পুরুষ শ্রমিকদের পাশাপাশি পাঁচ-ছয়জনের ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে কাজ করছেন নারীরাও। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত চলে তাদের কর্মব্যস্ততা।

তিস্তার চরাঞ্চলের মানুষের জীবিকার অন্যতম প্রধান অবলম্বন কৃষি। মৌসুমভিত্তিক ফসলের ওপর নির্ভর করেই চলে এখানকার অসংখ্য পরিবারের জীবন-জীবিকা। আগাম ভুট্টা চাষ শুরু হওয়ায় কৃষিজমিতে কর্মচাঞ্চল্য ফেরার পাশাপাশি নারী-পুরুষ উভয়ের কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে নারীদের জন্য কৃষিশ্রম হয়ে উঠেছে বাড়তি আয়ের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

এমনই এক নারী শ্রমিক পারুল বেগম। তিনি উপজেলার পাটিকাপাড়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ পারুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা। ভুট্টার বীজ রোপণ করে প্রতিদিন ৪০০ টাকা মজুরি পান তিনি। নিজের উপার্জিত অর্থ দিয়ে সংসারের খরচে সহযোগিতা করার পাশাপাশি সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয়ও বহন করছেন। পারুল বেগম বলেন, ‘প্রতিদিন ভুট্টার বীজ রোপণ করে ৪০০ টাকা পাই।

এই টাকা দিয়ে সংসারের খরচ চালানোর পাশাপাশি ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে পারছি। নিজের আয় থাকায় সংসারেও কিছুটা স্বস্তি এসেছে। ’ একই এলাকার রমিছা বেগম বলেন, ‘সংসারে অভাব-অনটন লেগেই থাকে। শুধু স্বামীর আয়ে সব খরচ চালানো কঠিন। তাই নিজেরাও মাঠে কাজ করতে নেমেছি। এতে সংসারের আর্থিক চাপ কিছুটা কমছে। সহর উদ্দিন সরকার সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের নারী শিক্ষিকা গুলনাহার বেগম বলেন, ‘নারীরা এখন আর ঘরের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ নেই।

পরিবার, সমাজ ও অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তিস্তার চরাঞ্চলের নারীরা কৃষিকাজ করে সংসারের হাল ধরছেন, সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগাচ্ছেন। নারীদের এই পরিশ্রম, সাহস ও আত্মনির্ভরশীলতা সত্যিই প্রশংসনীয়। যথাযথ সুযোগ ও সম্মান পেলে নারীরা নিজেদের যোগ্যতা দিয়ে পরিবার ও সমাজকে আরও এগিয়ে নিতে পারবেন। ’ হাতীবান্ধা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হারুন মিয়া বলেন, ‘চলতি মৌসুমে উপজেলার তিস্তার চরাঞ্চলে ২ হাজার ২৯০ হেক্টর জমিতে ভুট্টা চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

ইতোমধ্যে বিভিন্ন চরে আগাম ভুট্টা চাষ শুরু হয়েছে। এতে পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজের সুযোগ পাচ্ছেন। তাদের এই অংশগ্রহণ সংসারে বাড়তি আয়ের পাশাপাশি নারীদের স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করছে। ’ তিস্তার চরে এখন শুধু ভুট্টার বীজই বুনছেন না নারীরা, বুনছেন নিজেদের স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্নও। তাদের শ্রমে যেমন সমৃদ্ধ হচ্ছে কৃষি, তেমনি বদলে যাচ্ছে অনেক পরিবারের অর্থনৈতিক বাস্তবতা।