জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি কেবল ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়, বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য ও জীবন-জীবিকার ক্রমবর্ধমান এক বাস্তব সংকট। এই প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের ৩১তম জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন বা কপ-৩১ আজ থেকে তুরস্কের আনতালিয়ায় শুরু হয়েছে, যা চলবে আগামী ২০ নভেম্বর পর্যন্ত।
সম্মেলনে বিশ্বজুড়ে জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অভিযোজন, ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা এবং অর্থায়নের প্রশ্নই গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর প্রতিবছর বিপুল অর্থনৈতিক ও মানবিক ক্ষতি হচ্ছে। তথ্য বলছে, জলবায়ু-সংবেদনশীল স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ২০.৭ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে।
এ ছাড়া খরা, বন্যা ও প্রচণ্ড তাপপ্রবাহের ঝুঁকিতে রয়েছে বিশ্বের প্রায় ৯ কোটি বাস্তুচ্যুত মানুষ। যাদের বড় অংশ বসবাস করছে বাংলাদেশ ও আফগানিস্তানের মতো দেশে। ইউএনএইচসিআরের তথ্য বলছে, ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলো বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়নের মাত্র প্রায় ১০ শতাংশ পায়। ফলে কপ-৩১ সম্মেলনে শুধু নতুন প্রতিশ্রুতি নয়, ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য পর্যাপ্ত, সহজলভ্য ও কার্যকর জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং প্রতিশ্রুত অর্থ বাস্তবে পৌঁছে দেওয়াই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
এমন পরিস্থিতিতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বছরে ১৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতির হিসাব তুলে ধরে ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার তহবিল (লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড) বাড়ানোর দাবি জানাবে বাংলাদেশ। এমনটা জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু। তিনি রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, কপ সম্মেলনে বাংলাদেশ শুধু নিজের জন্য অর্থ বরাদ্দের দাবি তুলবে না; জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর তহবিল বাড়ানোর বিষয়েও জোর দেবে।
চাহিদা ও সরবরাহ : ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো প্রতিবছর অন্তত ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার সহায়তার দাবি জানিয়ে এলেও উন্নত দেশগুলো ২০৩৫ সালের মধ্যে মাত্র ৩০০ বিলিয়ন ডলার দিতে সম্মত হয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত সামান্য। সঙ্গে রয়েছে তহবিল পিছিয়ে যাওয়ার অভিযোগ। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির রিপোর্ট অনুযায়ী, অভিযোজন বা খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য প্রতিবছর ৩০৫ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হলেও উন্নত দেশগুলো দিচ্ছে তার সামান্য অংশ।
২০২৪ সালে এই হার ছিল মাত্র ২৮ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। এমনকি কপ সম্মেলনে অভিযোজন অর্থায়ন তিনগুণ করার ডেডলাইন ২০৩০ থেকে বাড়িয়ে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হয়। অনুদানের পরিবর্তে ঋণের বোঝা : উন্নত দেশগুলো সরাসরি অনুদান দেওয়ার পরিবর্তে জলবায়ু তহবিলের অর্থ ঋণ হিসেবে দিতে বেশি আগ্রহী। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো দুর্যোগের শিকার হওয়ার পাশাপাশি নতুন করে ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছে, যা অর্থনৈতিক ধীরগতিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বাংলাদেশে প্রভাব : জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বার্ষিক প্রায় ২০ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে দেশ। কপ সম্মেলনের এই আর্থিক ধীরগতির কারণে বাংলাদেশ তার জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (এনএপি) বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সঠিক সময়ে পাচ্ছে না। এ কারণেই বর্তমান কপ-৩১ সম্মেলনে বাংলাদেশ ঋণের বোঝা না বাড়িয়ে অনুদানভিত্তিক জলবায়ু অর্থায়ন এবং তহবিল অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করার জন্য জোরালো দাবি জানাবে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে বাংলাদেশের যে ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে, তা মোকাবিলায় বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানানো হবে। বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য তহবিলের পরিমাণ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা করবে বাংলাদেশ। মিন্টু বলেন, ফান্ডের পরিমাণ যখন বাড়ানো হবে, তখন আমাদের মতো দেশগুলো সেই ফান্ডের জন্য আবেদন করবে এবং সেখান থেকে অর্থ ছাড় করা হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মাকসুদুর রহমান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় এখন প্রতিশ্রুতি নয়, প্রয়োজন কার্যকর অর্থায়ন ও জবাবদিহি। বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে তুলনামূলক কম দায়ী হলেও ক্ষতির বোঝা বহন করছে সবচেয়ে বেশি। অথচ জলবায়ু অর্থায়নের বড় অংশ ঋণনির্ভর হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো নতুন ঋণের চাপে পড়ছে।
কপ-৩১ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধান দাবি হওয়া উচিত লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ডে পর্যাপ্ত অনুদান নিশ্চিত করা; অভিযোজন তহবিল বাড়ানো এবং অর্থ ছাড়ের জটিলতা কমানো। একইসঙ্গে অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, তার স্বচ্ছ জবাবদিহি প্রয়োজন। কারণ জলবায়ু ন্যায়বিচার শুধু অর্থ বরাদ্দের ঘোষণা নয়, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে সময়মতো অর্থ পৌঁছে দেওয়ার নিশ্চয়তা।
এবারের সম্মেলনটির যৌথ নেতৃত্ব বা ‘কো-প্রেসিডেন্সি’ পালন করছে দুই গোলার্ধের দুই দেশ— তুরস্ক ও অস্ট্রেলিয়া। স্বাগতিক দেশ হিসেবে তুরস্ক সামগ্রিক কর্মপরিকল্পনা বা ‘অ্যাকশন এজেন্ডা’ পরিচালনা করছে। কূটনৈতিক ও দর-কষাকষির সভাপতিত্ব করছে অস্ট্রেলিয়া। অস্ট্রেলিয়ার বিশেষ উদ্যোগে জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে নির্মম শিকার প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রগুলোকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়েছে।
প্যারিস জলবায়ু চুক্তি কার্যকর হওয়ার এক দশক পূর্তিতে এবার কাগুজে প্রতিশ্রুতির বদলে সুনির্দিষ্ট ও পরিমাপযোগ্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে গুরুত্ব দেওয়া হবে। তুরস্কের প্রেসিডেন্সি থেকে প্রথমবারের মতো ২০৩৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিক বিদ্যুতায়নের হার ৩৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং ভবন নির্মাণ খাতে জ্বালানি তীব্রতা অন্তত ২৫ শতাংশ কমানোর মতো বাস্তবমুখী প্রস্তাব সামনে আনা হয়েছে।
তবে সম্মেলন শুরুর আগ মুহূর্তে জাতিসংঘ ও বিশ্বখ্যাত গবেষণা সংস্থাগুলোর প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো বিশ্ববাসীর জন্য গভীর আশঙ্কা তৈরি করেছে। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) সর্বশেষ ‘এমিশনস গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৬’ জানিয়েছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিকে প্রাক্-শিল্প যুগের চেয়ে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে ধরে রাখার সুযোগ কার্যত হাতছাড়া হয়ে গেছে।
সাময়িকভাবে হলেও পৃথিবী এই বিপৎসীমা অতিক্রম করতে চলেছে। তথ্যমতে, বর্তমান নীতিমালা অব্যাহত থাকলে এই শতাব্দীর শেষে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। এমনকি দেশগুলো তাদের বর্তমান জলবায়ু প্রতিশ্রুতি শতভাগ বাস্তবায়ন করলেও তাপমাত্রা ২ দশমিক ৬ ডিগ্রিতে পৌঁছাবে। বিজ্ঞানীদের মতে, এ মহাবিপর্যয় ঠেকাতে হলে ২০২৫ সালের তুলনায় ২০৩০ সালের মধ্যে ১৮ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে অন্তত ৪৫ শতাংশ গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমাতেই হবে।
হিমবাহ ধস : উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত গলছে, ফলে হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণ ও ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। ভাটির দেশ হিসেবে এই আকস্মিক বন্যার সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসে লাগে বাংলাদেশের ওপর। হিমবাহের এই অস্বাভাবিক পরিবর্তনের ফলে বর্ষায় ভয়াবহ বন্যা ও নদীভাঙন দেখা দিচ্ছে, আবার শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকায় তীব্র পানি সংকট তৈরি হয়ে কৃষি ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে।
এ ছাড়া সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা আর মাত্র ১ মিটার বাড়লে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ১৭ থেকে ২০ শতাংশ ভূমি স্থায়ীভাবে তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা প্রায় ৩ কোটি মানুষকে জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত করতে পারে। বঙ্গোপসাগরের নোনা পানি উপকূলের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে সুপেয় পানির তীব্র সংকট তৈরিসহ উর্বর ফসলি জমি নষ্ট করছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।
এল নিনোর ঝুঁকি : ইউএনএইচসিআর বলছে, অত্যন্ত শক্তিশালী এল নিনো তৈরি হলে শরণার্থী আশ্রয়দাতা অনেক দেশে জলবায়ুজনিত ঝুঁকি বেড়ে যাবে। ফলে নতুন করে বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পূর্বাভাসমতে, চলতি বছরের শেষ নাগাদ পূর্ব আফ্রিকার সোমালিয়া, কেনিয়া, দক্ষিণ সুদান ও উগান্ডায় ভয়াবহ বন্যার কারণে ৩০ লাখ পর্যন্ত মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে।
অন্যদিকে, সাহেল অঞ্চলে খরা, বন্যা ও সংঘাতের কারণে সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হতে পারে। এশিয়ার কয়েকটি অংশেও খরা, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। দেশের চিত্র তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী : জলবায়ু সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দুই দিনব্যাপী ‘ওয়ার্ল্ড লিডার্স সামিটে’ যোগ দিয়ে তিনি বাংলাদেশের জলবায়ু পরিকল্পনা ও উদ্বেগের বিষয়টি বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরবেন।
বাংলাদেশের জনগণ কোনো অপরাধ না করেও অন্যের নিঃসরণের দায় বহন করছে— এই নৈতিক অবস্থান তুলে ধরে তিনি উন্নত বিশ্বকে নিঃসরণ কমানো এবং ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ তহবিলের অর্থ দ্রুত ছাড় করার জন্য জোর তাগিদ দিতে পারেন। এদিকে সম্মেলনে ঋণের পরিবর্তে অনুদানভিত্তিক জলবায়ু অর্থায়ন এবং প্রধান কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলোর জবাবদিহির দাবি জানাবে বাংলাদেশ।
সম্মেলনে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের সুরক্ষা, জলবায়ু ন্যায়বিচার ও জাতীয় পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অর্থায়ন ও প্রযুক্তি সহায়তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বের বিষয়েও জোর দেওয়া হবে।




















