4:48 am, Monday, 5 October 2026

মাছশূন্য তিস্তায় জেলেদের জীবনে হতাশা ও দীর্ঘশ্বাস

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের পাড়ামৌলা এলাকার জেলে আব্দুল জলিল আর দশজন জেলের মতোই মাছ ধরার আশায় এখন আর তিস্তায় যান না। তিনি ভালো করেই জানেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা জাল ফেলে এবারও হয়তো খালি হাতেই ফিরতে হবে।

কিন্তু মাছের আয়ে সংসার না চলায় তিনি এখন বাধ্য হয়ে কখনো অন্যের জমিতে কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন, আবার কখনো জীবিকার টানে পাড়ি জমান ঢাকায়। শুধু আব্দুল জলিল একা নন, তিস্তাপারের শত শত জেলের জীবনের গল্প প্রায় একই রকম। নদীতে মাছের আকাল দেখা দেওয়ায় তাদের প্রতিদিনের আয় তলানিতে ঠেকেছে। পরিবারের নিত্যদিনের খরচ মেটাতে কেউ দিনমজুরের কাজ নিচ্ছেন, কেউ ইটভাটার শ্রমিক হয়েছেন, কেউ চালাচ্ছেন অটোরিকশা, আবার কেউ অন্যের পুকুরে মাছ ধরার কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন।

নদীর এই দুর্দিন তাদের দীর্ঘদিনের পৈতৃক পেশা ছাড়তে বাধ্য করছে। উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, রাজারহাটের তিস্তা তীরবর্তী তিনটি ইউনিয়নেই চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে ৬৮৬ নিবন্ধিত জেলে পরিবার। এর মধ্যে বিদ্যানন্দ ইউনিয়নে ১৭৫, ঘড়িয়ালডাঙ্গায় ৩৮০ ও নাজিমখান ইউনিয়নে ১৩১টি নিবন্ধিত জেলে পরিবার রয়েছে। তবে উপজেলাজুড়ে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ১ হাজার ৭৬৭।

জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৫-২০ বছর আগেও তিস্তায় দেশি কার্প জাতের রুই, কাতলা, মৃগেল, বড় আকৃতির বোয়াল, টেংরা, আড়, গোঁস, শোল, গজার, পাবদা, চিংড়ি, চাঁদা, পুঁটি, মলা, ঢেঁকি, তাকি, ডারকিনা, চিতল প্রভৃতি নানা প্রজাতির দেশীয় মাছে ভরপুর থাকত নদী। কিন্তু বর্তমানে নদীর তলদেশে অতিরিক্ত বালু ও পলি জমে চর জেগে ওঠায় নাব্য মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে।

শুষ্ক মৌসুমে নদী শুকিয়ে যাওয়ায় মাছের প্রজনন ও বিচরণের ক্ষেত্রগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। এ কারণে এখন মাছ নেই বললেই চলে। কষ্টের কথা তুলে ধরে জেলে আব্দুল জলিল বলেন, ‘আগে নদীডা আমাগো পেটের ভাত জোগাইত। সারা দিন জাল বাইয়া যা মাছ পাইতাম, তা দিয়া সংসারডা ভালোই চলত। অহন নদী শুকাইয়া বালুচর অইয়া গেছে, জালে আর আগের মতো মাছ ওঠে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা জাল ফেইলা খালি হাতে ফেরা লাগে।

পেটের দায়ে অহন নদীর কাজ ছাইড়া অন্যের জমিতে কাম করা লাগে, নাইলে ঢাকায় গিয়া দিনমজুরের কাজ করতে হয়। ’ আরেক জেলে বিজয় রায় বলেন, ‘বাপ-দাদার আমল থেইক্যা আমরা এই মাছ ধরাই পেশা হিসেবে নিয়া আসছিলাম। কিন্তু এহন তিস্তায় মাছ পাওয়াই দায়। নদীতে পানি নাই, স্রোত নাই, সব জায়গায় চর পইড়া গেছে। সংসার চালামু কেমনে? বাধ্য হইয়া কেউ রিকশা চালায়, কেউ ইটভাটায় কাম করে।

আমাগো এই দুর্দিনের কথা কেউ দেখে না। ’ তিস্তার মাছের বৈচিত্র্য ও সংকট নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নদীদূষণ, নাব্য সংকট, স্রোত কমে যাওয়া এবং নির্বিচারে মাছ শিকারের কারণে জলজ পরিবেশ ধ্বংসের মুখে পড়েছে। এ ছাড়া কৃষিতে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার, ইটভাটার ধোঁয়া আর বালু-পাথর উত্তোলনে মাছের আশ্রয় ভেঙে পড়ছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনিয়মিত বৃষ্টি ও হঠাৎ বন্যায় প্রজনন বারবার ব্যর্থ হচ্ছে।

গবেষকদের মতে, তিস্তা নদী একসময় মাছের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল ও প্রজননক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত থাকলেও বর্তমানে প্রবাহ কমে যাওয়ায় সেই স্বাভাবিক পরিবেশ আর নেই। এ বিষয়ে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা এমদাদুল হক বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও নদীর নাব্য কমে যাওয়ায় মাছের প্রজননের অনুকূল পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। যার সরাসরি বিরূপ প্রভাব পড়ছে জেলে সম্প্রদায়ের জীবন-জীবিকায়।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম আকন্দ জানান, শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পর্যাপ্ত প্রবাহ ছাড়া কোনো উদ্যোগ সফল হবে না। তিস্তা নদীকে নদীর মতো চলতে দিতে হবে। তবে তিস্তা নদীতে মাছ ফিরিয়ে আনতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে কিছু প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। সেগুলো পর্যালোচনা চলছে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

Nagorik Sangram

Popular Post

সোনারগাঁর কাঁচপুরে জলাবদ্ধতায় চরম দুর্ভোগে হাজারো পরিবার

মাছশূন্য তিস্তায় জেলেদের জীবনে হতাশা ও দীর্ঘশ্বাস

Update Time : 02:51:36 am, Monday, 5 October 2026

কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের পাড়ামৌলা এলাকার জেলে আব্দুল জলিল আর দশজন জেলের মতোই মাছ ধরার আশায় এখন আর তিস্তায় যান না। তিনি ভালো করেই জানেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা জাল ফেলে এবারও হয়তো খালি হাতেই ফিরতে হবে।

কিন্তু মাছের আয়ে সংসার না চলায় তিনি এখন বাধ্য হয়ে কখনো অন্যের জমিতে কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন, আবার কখনো জীবিকার টানে পাড়ি জমান ঢাকায়। শুধু আব্দুল জলিল একা নন, তিস্তাপারের শত শত জেলের জীবনের গল্প প্রায় একই রকম। নদীতে মাছের আকাল দেখা দেওয়ায় তাদের প্রতিদিনের আয় তলানিতে ঠেকেছে। পরিবারের নিত্যদিনের খরচ মেটাতে কেউ দিনমজুরের কাজ নিচ্ছেন, কেউ ইটভাটার শ্রমিক হয়েছেন, কেউ চালাচ্ছেন অটোরিকশা, আবার কেউ অন্যের পুকুরে মাছ ধরার কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন।

নদীর এই দুর্দিন তাদের দীর্ঘদিনের পৈতৃক পেশা ছাড়তে বাধ্য করছে। উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, রাজারহাটের তিস্তা তীরবর্তী তিনটি ইউনিয়নেই চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে ৬৮৬ নিবন্ধিত জেলে পরিবার। এর মধ্যে বিদ্যানন্দ ইউনিয়নে ১৭৫, ঘড়িয়ালডাঙ্গায় ৩৮০ ও নাজিমখান ইউনিয়নে ১৩১টি নিবন্ধিত জেলে পরিবার রয়েছে। তবে উপজেলাজুড়ে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ১ হাজার ৭৬৭।

জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৫-২০ বছর আগেও তিস্তায় দেশি কার্প জাতের রুই, কাতলা, মৃগেল, বড় আকৃতির বোয়াল, টেংরা, আড়, গোঁস, শোল, গজার, পাবদা, চিংড়ি, চাঁদা, পুঁটি, মলা, ঢেঁকি, তাকি, ডারকিনা, চিতল প্রভৃতি নানা প্রজাতির দেশীয় মাছে ভরপুর থাকত নদী। কিন্তু বর্তমানে নদীর তলদেশে অতিরিক্ত বালু ও পলি জমে চর জেগে ওঠায় নাব্য মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে।

শুষ্ক মৌসুমে নদী শুকিয়ে যাওয়ায় মাছের প্রজনন ও বিচরণের ক্ষেত্রগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। এ কারণে এখন মাছ নেই বললেই চলে। কষ্টের কথা তুলে ধরে জেলে আব্দুল জলিল বলেন, ‘আগে নদীডা আমাগো পেটের ভাত জোগাইত। সারা দিন জাল বাইয়া যা মাছ পাইতাম, তা দিয়া সংসারডা ভালোই চলত। অহন নদী শুকাইয়া বালুচর অইয়া গেছে, জালে আর আগের মতো মাছ ওঠে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা জাল ফেইলা খালি হাতে ফেরা লাগে।

পেটের দায়ে অহন নদীর কাজ ছাইড়া অন্যের জমিতে কাম করা লাগে, নাইলে ঢাকায় গিয়া দিনমজুরের কাজ করতে হয়। ’ আরেক জেলে বিজয় রায় বলেন, ‘বাপ-দাদার আমল থেইক্যা আমরা এই মাছ ধরাই পেশা হিসেবে নিয়া আসছিলাম। কিন্তু এহন তিস্তায় মাছ পাওয়াই দায়। নদীতে পানি নাই, স্রোত নাই, সব জায়গায় চর পইড়া গেছে। সংসার চালামু কেমনে? বাধ্য হইয়া কেউ রিকশা চালায়, কেউ ইটভাটায় কাম করে।

আমাগো এই দুর্দিনের কথা কেউ দেখে না। ’ তিস্তার মাছের বৈচিত্র্য ও সংকট নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নদীদূষণ, নাব্য সংকট, স্রোত কমে যাওয়া এবং নির্বিচারে মাছ শিকারের কারণে জলজ পরিবেশ ধ্বংসের মুখে পড়েছে। এ ছাড়া কৃষিতে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার, ইটভাটার ধোঁয়া আর বালু-পাথর উত্তোলনে মাছের আশ্রয় ভেঙে পড়ছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনিয়মিত বৃষ্টি ও হঠাৎ বন্যায় প্রজনন বারবার ব্যর্থ হচ্ছে।

গবেষকদের মতে, তিস্তা নদী একসময় মাছের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল ও প্রজননক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত থাকলেও বর্তমানে প্রবাহ কমে যাওয়ায় সেই স্বাভাবিক পরিবেশ আর নেই। এ বিষয়ে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা এমদাদুল হক বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও নদীর নাব্য কমে যাওয়ায় মাছের প্রজননের অনুকূল পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। যার সরাসরি বিরূপ প্রভাব পড়ছে জেলে সম্প্রদায়ের জীবন-জীবিকায়।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম আকন্দ জানান, শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পর্যাপ্ত প্রবাহ ছাড়া কোনো উদ্যোগ সফল হবে না। তিস্তা নদীকে নদীর মতো চলতে দিতে হবে। তবে তিস্তা নদীতে মাছ ফিরিয়ে আনতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে কিছু প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। সেগুলো পর্যালোচনা চলছে।