1:30 am, Friday, 6 November 2026

দক্ষ জনশক্তি রপ্তানিই অর্থনৈতিক মুক্তির মহাসড়ক

দক্ষ জনশক্তি রপ্তানিই অর্থনৈতিক মুক্তির মহাসড়ক

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

অর্থনীতি বাঁচাতে চাই সাহসী সিদ্ধান্ত, চাই এক কোটি দক্ষ জনশক্তির বৈশ্বিক কর্মসংস্থান। বাংলাদেশ আজ এক কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ, বেকারত্ব, বিনিয়োগের স্থবিরতা, আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক ঋণের বোঝা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি আমাদের অর্থনীতিকে ক্রমাগত চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।

শুধু অভ্যন্তরীণ শিল্পায়ন, প্রচলিত রপ্তানি কিংবা বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর করে এই সংকট থেকে স্থায়ীভাবে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়। আমাদের প্রয়োজন একটি সাহসী, বাস্তবসম্মত এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা। আমার প্রস্তাব স্পষ্ট : আগামী ১০ বছরে এক কোটি দক্ষ ও প্রশিক্ষিত বাংলাদেশি নাগরিকের বৈধ আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে।

এটি শুধু প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কোনো সাধারণ কর্মসূচি হওয়া উচিত নয়। এটি হতে হবে বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনৈতিক মুক্তির অন্যতম প্রধান কৌশল। আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ আমাদের মানুষ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার জনগণ। আমাদের রয়েছে বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী, শিক্ষিত বেকার, কারিগরি শিক্ষায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যুবক-যুবতী এবং বিভিন্ন পেশায় অভিজ্ঞ জনশক্তি।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই বিপুল জনশক্তিকে আমরা কতটা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী করে তুলতে পেরেছি? বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে বর্তমানে স্বাস্থ্যসেবা, নার্সিং, কেয়ার সার্ভিস, প্রকৌশল, নির্মাণ, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হোটেল-রেস্টুরেন্ট, পরিবহন ও উৎপাদনশিল্পে দক্ষ কর্মীর চাহিদা রয়েছে। যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে দক্ষ জনশক্তির জন্য বৈধ কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে।

আমাদের প্রয়োজন সেই সুযোগগুলো চিহ্নিত করা এবং বাংলাদেশিদের জন্য সেগুলো উন্মুক্ত করা। এক কোটি মানুষ, ৬০ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাবনা! একটি অর্থনৈতিক হিসাব বিবেচনা করা যাক। যদি আগামী ১০ বছরে এক কোটি বাংলাদেশি বৈধভাবে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ পান এবং প্রত্যেকে গড়ে মাসে ৫০০ মার্কিন ডলার দেশে পাঠান, তাহলে সম্ভাব্য রেমিট্যান্সের হিসাব দাঁড়াবে: বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি : ১ কোটি।

প্রত্যেকের গড় মাসিক রেমিট্যান্স : ৫০০ ডলার। মাসিক সম্ভাব্য রেমিট্যান্স : ৫০০ কোটি ডলার। বার্ষিক সম্ভাব্য রেমিট্যান্স : ৬০০০ কোটি ডলার বা ৬০ বিলিয়ন ডলার। এটি একটি সম্ভাবনাভিত্তিক অর্থনৈতিক হিসাব, নিশ্চিত পূর্বাভাস নয়। প্রকৃত রেমিট্যান্স নির্ভর করবে কর্মীদের আয়, জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থানের ধরন এবং দেশে অর্থ পাঠানোর সামর্থ্যরে ওপর।

তবুও এই সম্ভাবনা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা সহজেই অনুধাবন করা যায়। এই অর্থ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে, আমদানি ব্যয় মেটাতে, শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে এবং পরিবারগুলোর আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাহলে কেন আমরা এই সম্ভাবনাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করছি না?

শুধু শ্রমিক নয়, দক্ষ পেশাজীবী পাঠাতে হবে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের বিদেশে কর্মসংস্থানের বড় অংশ নি¤œ ও আধাদক্ষ শ্রমিকনির্ভর। এই বাস্তবতা পরিবর্তন করতে হবে। আমাদের লক্ষ্য হতে হবে: ১. চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও কেয়ার প্রফেশনাল। ২. প্রকৌশলী, ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বার ও নির্মাণ বিশেষজ্ঞ। ৩. আইটি বিশেষজ্ঞ, সফটওয়্যার ডেভেলপার, সাইবার সিকিউরিটি ও ডেটা অ্যানালিস্ট।

৪. পেশাদার শেফ, হোটেল ম্যানেজার ও রেস্টুরেন্ট সুপারভাইজার। ৫. কৃষি, আধুনিক ফার্মিং ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ বিশেষজ্ঞ। ৬. শিল্পকারখানার টেকনিশিয়ান, মেশিন অপারেটর ও কোয়ালিটি কন্ট্রোল বিশেষজ্ঞ। ৭. পরিবহন, লজিস্টিকস ও সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট পেশাজীবী। ৮. হিসাবরক্ষক, আর্থিক বিশ্লেষক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও অন্যান্য পেশাদার কর্মী।

আমাদের তরুণদের শুধু সার্টিফিকেট দিলে হবে না। আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ, ভাষাগত দক্ষতা, পেশাগত স্বীকৃতি এবং বাস্তব কর্ম-অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করতে হবে। গঠন করতে হবে জাতীয় দক্ষ অভিবাসন মিশন সরকারকে একটি শক্তিশালী জাতীয় দক্ষ অভিবাসন মিশন গঠন করতে হবে। প্রয়োজনে বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে।

এই মিশনে থাকবে: প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। বিএমইটি ও কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান। বেসরকারি জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান। আন্তর্জাতিক নিয়োগদাতা ও ব্যাবসায়িক সংগঠন। প্রতি বছর ১০ লাখ মানুষের বৈধ আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করতে হবে।

প্রতিটি জেলার শিক্ষিত বেকার ও দক্ষ জনশক্তির একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডেটাবেজ তৈরি করতে হবে। সেখানে প্রার্থীর যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ, ভাষাগত দক্ষতা ও পেশাগত অভিজ্ঞতার তথ্য থাকবে। দূতাবাসগুলোকে শুধু কূটনীতি নয়, কর্মসংস্থানেও ভূমিকা রাখতে হবে বাংলাদেশের প্রতিটি দূতাবাস ও হাইকমিশনে আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন ডেস্ক চালু করা প্রয়োজন।

তাদের দায়িত্ব হবে সংশ্লিষ্ট দেশের শ্রমবাজার বিশ্লেষণ, নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ, বাণিজ্য সংগঠনের সঙ্গে অংশীদারত্ব এবং বৈধ চাকরির সুযোগ চিহ্নিত করা। বাংলাদেশকে দেশভিত্তিক শ্রমবাজার চুক্তি করতে হবে। যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে দক্ষ জনশক্তি বিনিময়ের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

আমাদের পররাষ্ট্রনীতি আরও বেশি অর্থনৈতিক কূটনীতিনির্ভর হওয়া জরুরি। এক কোটি মানুষের জন্য এক হাজার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র দেশের ৬৪ জেলায় আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে এসব কেন্দ্র পরিচালনা করা সম্ভব। ইংরেজি, জার্মান, জাপানি, কোরিয়ান, আরবি এবং অন্যান্য ভাষার প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

তবে প্রশিক্ষণ হতে হবে সংশ্লিষ্ট দেশের প্রকৃত চাকরির চাহিদাভিত্তিক। বিদেশি নিয়োগদাতাদের সঙ্গে সরাসরি চুক্তির মাধ্যমে প্রশিক্ষণ ও চাকরির সংযোগ তৈরি করতে হবে। আমাদের তরুণদের বিদেশে পাঠানোর আগে নিশ্চিত করতে হবে যে তাদের চাকরির প্রস্তাব, বেতন, কর্মপরিবেশ এবং অভিবাসন অনুমতি বৈধ ও যাচাই করা। বেসরকারি খাকেত সম্পৃক্ত করতে হবে শুধু সরকারি উদ্যোগে এক কোটি মানুষের আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

বেসরকারি জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক নিয়োগ সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং প্রযুক্তিনির্ভর কোম্পানিগুলোকে সম্পৃক্ত করতে হবে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বাংলাদেশের দক্ষ কর্মীদের সঙ্গে বিদেশি নিয়োগদাতাদের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করা যেতে পারে। তবে কোনো অবস্থাতেই বিদেশে চাকরির মিথ্যা আশ্বাস, অতিরিক্ত অর্থ আদায়, মানবপাচার কিংবা প্রতারণার সুযোগ রাখা যাবে না।

অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মীদের অধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। রেমিট্যান্স শুধু ভোগে নয়, বিনিয়োগে ব্যবহার করতে হবে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিরা যে অর্থ দেশে পাঠান, তার বড় অংশ পরিবারের জীবনযাত্রা, শিক্ষা, চিকিৎসা ও আবাসনে ব্যয় হয়। এগুলোও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু পাশাপাশি উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। প্রবাসীদের জন্য আকর্ষণীয় বিনিয়োগ বন্ড, নিরাপদ সঞ্চয় প্রকল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিনিয়োগের সুযোগ এবং দেশে ফিরে ব্যবসা প্রতিষ্ঠার সহায়তা দিতে হবে।

বিদেশফেরত দক্ষ কর্মীদের অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান দেশের শিল্পায়নে কাজে লাগাতে হবে। আমরা চাই, একজন প্রবাসী শুধু অর্থ পাঠাবেন না, তিনি দেশে ফিরে একজন উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী এবং দক্ষতা প্রশিক্ষক হিসেবেও ভূমিকা রাখবেন। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এই বিপ্লব সম্ভব নয় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য, প্রতিশ্রুতি কিংবা সাময়িক অর্থনৈতিক পদক্ষেপ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংকট মোকাবিলা করা যাবে না।

আমাদের প্রয়োজন আগামী ১০ বছরের একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা। প্রতি বছর কতজন দক্ষ মানুষ বিদেশে যাবেন, কতজন প্রশিক্ষণ পাবেন, কতটি আন্তর্জাতিক চুক্তি হবে এবং কী পরিমাণ রেমিট্যান্স অর্জনের লক্ষ্য থাকবে, তা নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে দেশীয় শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান অব্যাহত রাখতে হবে। বিদেশে যাওয়া হবে নাগরিকের স্বেচ্ছায় নেওয়া বৈধ সিদ্ধান্ত, কোনো বাধ্যবাধকতা নয়।

প্রবাসী কর্মীদের নিরাপত্তা, ন্যায্য বেতন, মর্যাদা এবং মানবাধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। শেষ কথা : এক কোটি দক্ষ মানুষই হতে পারে বাংলাদেশের নতুন অর্থনৈতিক শক্তি। আমাদের মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের জনগণ কোনো বোঝা নয়। এই জনগোষ্ঠীই আমাদের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সম্পদ। যদি আমরা তাদের আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতায় গড়ে তুলতে পারি, তাহলে তারাই হতে পারেন দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান শক্তি।

আজ প্রয়োজন একটি জাতীয় ঐকমত্য। সরকার, রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী সমাজ, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আমি বিশ্বাস করি, সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ নেতৃত্ব এবং কার্যকর আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব থাকলে এক কোটি বাংলাদেশির বৈধ ও দক্ষ আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের লক্ষ্য অর্জনে আমরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করতে পারব।

বাংলাদেশের অর্থনীতি বাঁচাতে শুধু ঋণ নয়, চাই উৎপাদনশীল জনশক্তি। শুধু সাহায্য নয়, চাই আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থান। শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, চাই বাস্তবায়ন। আমাদের স্লোগান হোক: এক কোটি দক্ষ মানুষ, এক নতুন বাংলাদেশ। দক্ষতা রপ্তানি করব, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করব, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ব।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

Nagorik Sangram

Popular Post

দক্ষ জনশক্তি রপ্তানিই অর্থনৈতিক মুক্তির মহাসড়ক

দক্ষ জনশক্তি রপ্তানিই অর্থনৈতিক মুক্তির মহাসড়ক

Update Time : 12:49:13 am, Friday, 6 November 2026

অর্থনীতি বাঁচাতে চাই সাহসী সিদ্ধান্ত, চাই এক কোটি দক্ষ জনশক্তির বৈশ্বিক কর্মসংস্থান। বাংলাদেশ আজ এক কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ, বেকারত্ব, বিনিয়োগের স্থবিরতা, আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক ঋণের বোঝা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি আমাদের অর্থনীতিকে ক্রমাগত চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।

শুধু অভ্যন্তরীণ শিল্পায়ন, প্রচলিত রপ্তানি কিংবা বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর করে এই সংকট থেকে স্থায়ীভাবে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়। আমাদের প্রয়োজন একটি সাহসী, বাস্তবসম্মত এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা। আমার প্রস্তাব স্পষ্ট : আগামী ১০ বছরে এক কোটি দক্ষ ও প্রশিক্ষিত বাংলাদেশি নাগরিকের বৈধ আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে।

এটি শুধু প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কোনো সাধারণ কর্মসূচি হওয়া উচিত নয়। এটি হতে হবে বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনৈতিক মুক্তির অন্যতম প্রধান কৌশল। আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ আমাদের মানুষ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার জনগণ। আমাদের রয়েছে বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী, শিক্ষিত বেকার, কারিগরি শিক্ষায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যুবক-যুবতী এবং বিভিন্ন পেশায় অভিজ্ঞ জনশক্তি।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই বিপুল জনশক্তিকে আমরা কতটা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী করে তুলতে পেরেছি? বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে বর্তমানে স্বাস্থ্যসেবা, নার্সিং, কেয়ার সার্ভিস, প্রকৌশল, নির্মাণ, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হোটেল-রেস্টুরেন্ট, পরিবহন ও উৎপাদনশিল্পে দক্ষ কর্মীর চাহিদা রয়েছে। যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে দক্ষ জনশক্তির জন্য বৈধ কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে।

আমাদের প্রয়োজন সেই সুযোগগুলো চিহ্নিত করা এবং বাংলাদেশিদের জন্য সেগুলো উন্মুক্ত করা। এক কোটি মানুষ, ৬০ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাবনা! একটি অর্থনৈতিক হিসাব বিবেচনা করা যাক। যদি আগামী ১০ বছরে এক কোটি বাংলাদেশি বৈধভাবে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ পান এবং প্রত্যেকে গড়ে মাসে ৫০০ মার্কিন ডলার দেশে পাঠান, তাহলে সম্ভাব্য রেমিট্যান্সের হিসাব দাঁড়াবে: বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি : ১ কোটি।

প্রত্যেকের গড় মাসিক রেমিট্যান্স : ৫০০ ডলার। মাসিক সম্ভাব্য রেমিট্যান্স : ৫০০ কোটি ডলার। বার্ষিক সম্ভাব্য রেমিট্যান্স : ৬০০০ কোটি ডলার বা ৬০ বিলিয়ন ডলার। এটি একটি সম্ভাবনাভিত্তিক অর্থনৈতিক হিসাব, নিশ্চিত পূর্বাভাস নয়। প্রকৃত রেমিট্যান্স নির্ভর করবে কর্মীদের আয়, জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থানের ধরন এবং দেশে অর্থ পাঠানোর সামর্থ্যরে ওপর।

তবুও এই সম্ভাবনা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা সহজেই অনুধাবন করা যায়। এই অর্থ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে, আমদানি ব্যয় মেটাতে, শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে এবং পরিবারগুলোর আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাহলে কেন আমরা এই সম্ভাবনাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করছি না?

শুধু শ্রমিক নয়, দক্ষ পেশাজীবী পাঠাতে হবে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের বিদেশে কর্মসংস্থানের বড় অংশ নি¤œ ও আধাদক্ষ শ্রমিকনির্ভর। এই বাস্তবতা পরিবর্তন করতে হবে। আমাদের লক্ষ্য হতে হবে: ১. চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও কেয়ার প্রফেশনাল। ২. প্রকৌশলী, ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বার ও নির্মাণ বিশেষজ্ঞ। ৩. আইটি বিশেষজ্ঞ, সফটওয়্যার ডেভেলপার, সাইবার সিকিউরিটি ও ডেটা অ্যানালিস্ট।

৪. পেশাদার শেফ, হোটেল ম্যানেজার ও রেস্টুরেন্ট সুপারভাইজার। ৫. কৃষি, আধুনিক ফার্মিং ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ বিশেষজ্ঞ। ৬. শিল্পকারখানার টেকনিশিয়ান, মেশিন অপারেটর ও কোয়ালিটি কন্ট্রোল বিশেষজ্ঞ। ৭. পরিবহন, লজিস্টিকস ও সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট পেশাজীবী। ৮. হিসাবরক্ষক, আর্থিক বিশ্লেষক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও অন্যান্য পেশাদার কর্মী।

আমাদের তরুণদের শুধু সার্টিফিকেট দিলে হবে না। আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ, ভাষাগত দক্ষতা, পেশাগত স্বীকৃতি এবং বাস্তব কর্ম-অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করতে হবে। গঠন করতে হবে জাতীয় দক্ষ অভিবাসন মিশন সরকারকে একটি শক্তিশালী জাতীয় দক্ষ অভিবাসন মিশন গঠন করতে হবে। প্রয়োজনে বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে।

এই মিশনে থাকবে: প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। বিএমইটি ও কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান। বেসরকারি জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান। আন্তর্জাতিক নিয়োগদাতা ও ব্যাবসায়িক সংগঠন। প্রতি বছর ১০ লাখ মানুষের বৈধ আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করতে হবে।

প্রতিটি জেলার শিক্ষিত বেকার ও দক্ষ জনশক্তির একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডেটাবেজ তৈরি করতে হবে। সেখানে প্রার্থীর যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ, ভাষাগত দক্ষতা ও পেশাগত অভিজ্ঞতার তথ্য থাকবে। দূতাবাসগুলোকে শুধু কূটনীতি নয়, কর্মসংস্থানেও ভূমিকা রাখতে হবে বাংলাদেশের প্রতিটি দূতাবাস ও হাইকমিশনে আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন ডেস্ক চালু করা প্রয়োজন।

তাদের দায়িত্ব হবে সংশ্লিষ্ট দেশের শ্রমবাজার বিশ্লেষণ, নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ, বাণিজ্য সংগঠনের সঙ্গে অংশীদারত্ব এবং বৈধ চাকরির সুযোগ চিহ্নিত করা। বাংলাদেশকে দেশভিত্তিক শ্রমবাজার চুক্তি করতে হবে। যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে দক্ষ জনশক্তি বিনিময়ের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

আমাদের পররাষ্ট্রনীতি আরও বেশি অর্থনৈতিক কূটনীতিনির্ভর হওয়া জরুরি। এক কোটি মানুষের জন্য এক হাজার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র দেশের ৬৪ জেলায় আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে এসব কেন্দ্র পরিচালনা করা সম্ভব। ইংরেজি, জার্মান, জাপানি, কোরিয়ান, আরবি এবং অন্যান্য ভাষার প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

তবে প্রশিক্ষণ হতে হবে সংশ্লিষ্ট দেশের প্রকৃত চাকরির চাহিদাভিত্তিক। বিদেশি নিয়োগদাতাদের সঙ্গে সরাসরি চুক্তির মাধ্যমে প্রশিক্ষণ ও চাকরির সংযোগ তৈরি করতে হবে। আমাদের তরুণদের বিদেশে পাঠানোর আগে নিশ্চিত করতে হবে যে তাদের চাকরির প্রস্তাব, বেতন, কর্মপরিবেশ এবং অভিবাসন অনুমতি বৈধ ও যাচাই করা। বেসরকারি খাকেত সম্পৃক্ত করতে হবে শুধু সরকারি উদ্যোগে এক কোটি মানুষের আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

বেসরকারি জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক নিয়োগ সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং প্রযুক্তিনির্ভর কোম্পানিগুলোকে সম্পৃক্ত করতে হবে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বাংলাদেশের দক্ষ কর্মীদের সঙ্গে বিদেশি নিয়োগদাতাদের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করা যেতে পারে। তবে কোনো অবস্থাতেই বিদেশে চাকরির মিথ্যা আশ্বাস, অতিরিক্ত অর্থ আদায়, মানবপাচার কিংবা প্রতারণার সুযোগ রাখা যাবে না।

অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মীদের অধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। রেমিট্যান্স শুধু ভোগে নয়, বিনিয়োগে ব্যবহার করতে হবে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিরা যে অর্থ দেশে পাঠান, তার বড় অংশ পরিবারের জীবনযাত্রা, শিক্ষা, চিকিৎসা ও আবাসনে ব্যয় হয়। এগুলোও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু পাশাপাশি উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। প্রবাসীদের জন্য আকর্ষণীয় বিনিয়োগ বন্ড, নিরাপদ সঞ্চয় প্রকল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিনিয়োগের সুযোগ এবং দেশে ফিরে ব্যবসা প্রতিষ্ঠার সহায়তা দিতে হবে।

বিদেশফেরত দক্ষ কর্মীদের অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান দেশের শিল্পায়নে কাজে লাগাতে হবে। আমরা চাই, একজন প্রবাসী শুধু অর্থ পাঠাবেন না, তিনি দেশে ফিরে একজন উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী এবং দক্ষতা প্রশিক্ষক হিসেবেও ভূমিকা রাখবেন। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এই বিপ্লব সম্ভব নয় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য, প্রতিশ্রুতি কিংবা সাময়িক অর্থনৈতিক পদক্ষেপ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংকট মোকাবিলা করা যাবে না।

আমাদের প্রয়োজন আগামী ১০ বছরের একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা। প্রতি বছর কতজন দক্ষ মানুষ বিদেশে যাবেন, কতজন প্রশিক্ষণ পাবেন, কতটি আন্তর্জাতিক চুক্তি হবে এবং কী পরিমাণ রেমিট্যান্স অর্জনের লক্ষ্য থাকবে, তা নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে দেশীয় শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান অব্যাহত রাখতে হবে। বিদেশে যাওয়া হবে নাগরিকের স্বেচ্ছায় নেওয়া বৈধ সিদ্ধান্ত, কোনো বাধ্যবাধকতা নয়।

প্রবাসী কর্মীদের নিরাপত্তা, ন্যায্য বেতন, মর্যাদা এবং মানবাধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। শেষ কথা : এক কোটি দক্ষ মানুষই হতে পারে বাংলাদেশের নতুন অর্থনৈতিক শক্তি। আমাদের মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের জনগণ কোনো বোঝা নয়। এই জনগোষ্ঠীই আমাদের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সম্পদ। যদি আমরা তাদের আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতায় গড়ে তুলতে পারি, তাহলে তারাই হতে পারেন দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান শক্তি।

আজ প্রয়োজন একটি জাতীয় ঐকমত্য। সরকার, রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী সমাজ, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আমি বিশ্বাস করি, সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ নেতৃত্ব এবং কার্যকর আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব থাকলে এক কোটি বাংলাদেশির বৈধ ও দক্ষ আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের লক্ষ্য অর্জনে আমরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করতে পারব।

বাংলাদেশের অর্থনীতি বাঁচাতে শুধু ঋণ নয়, চাই উৎপাদনশীল জনশক্তি। শুধু সাহায্য নয়, চাই আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থান। শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, চাই বাস্তবায়ন। আমাদের স্লোগান হোক: এক কোটি দক্ষ মানুষ, এক নতুন বাংলাদেশ। দক্ষতা রপ্তানি করব, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করব, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ব।