সম্প্রতি একটি টেলিভিশন টকশোতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা বলেছেন, বর্তমান বাস্তবতায় পে-স্কেল বাড়ানোর চেয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো বেশি জরুরি।
তার এমন বক্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পে-স্কেল প্রত্যাশীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ তার বক্তব্যের সমালোচনা করে অশালীন ভাষায় মন্তব্যও করেছেন। টকশোতে ড. রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা বলেন, ‘আমাদের সম্ভবত ৩ লাখ কোটি টাকা ঋণ আছে। আপনি যদি আমাকে জিজ্ঞেস করেন, আপনি কি পে-স্কেল বাড়ুক চান? আমি কিন্তু সত্যিকার অর্থে পে-স্কেল বাড়ুক চাই না।
আমি কী চাই জানেন? আমি চাই, আমার বিদ্যুতের বিলটা কমুক। আমি চাই, আমার খাবারের বিলটা কমুক। আমি চাই, আমার গ্যাসের বিলটা কমুক। আমি চাই, আমার ভ্যাট-ট্যাক্সটা কমুক। আমি যে রোড ট্যাক্স দিই, সেটাও কমুক। আমি কিন্তু সেগুলোই চাই। ’ তিনি আরও বলেন, ‘বাস্তবতা হচ্ছে, আমার যে বেতনটা বাড়ানো হবে, সেই বেতন বাড়ানোর নেপথ্যে আরেকটা রাজনীতি কাজ করবে।
সেটা কী? সেটা হচ্ছে ঊর্ধ্বমুখী দাম। এই ঊর্ধ্বমুখী দাম কিন্তু আর নিম্নমুখী হবে না; বরং আরও ঊর্ধ্বমুখী হবে। ’ পে-স্কেল বাড়ানোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। ড. রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা বলেন, ‘আরেকটা বিষয় বলি, ফিসকাল ক্যাপাসিটি আমাদের আসলে আছে কি না, সেটাও আমার একটা প্রশ্ন। আপনি এত টাকা কোথা থেকে দেবেন?
চিন্তা করে দেখেন, আমরা এখন যে বিদ্যুৎ সংকটের কথা বলছি, বিদ্যুৎ খাতে সম্ভবত ৩ লাখ কোটি টাকা ঋণ আছে। এই ঋণের টাকা, এরপর আইএমএফের ঋণের টাকা, ক্যাপাসিটি চার্জের টাকা, আদানির টাকা—এসব দেওয়ার পর আসলে আপনি পে-স্কেল বাড়ালেই কি সমস্যার সমাধান হবে? ’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি অনেস্টলি বলছি, একজন নাগরিক হিসেবে আমার কাছে মনে হয়, এই মুহূর্তে পে-স্কেল বাড়ানোর মতো সক্ষমতা বাংলাদেশের রাষ্ট্রের আছে বলে আমি মনে করি না।
’ তার এই বক্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পে-স্কেল প্রত্যাশীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বিভিন্ন পোস্টের কমেন্ট বক্সে কেউ কেউ অশালীন ভাষায় মন্তব্য করেন। এমনকি ব্যক্তিগত আক্রমণাত্মক বক্তব্যও দেখা গেছে। এরই মধ্যে পে-স্কেল প্রত্যাশী এক ব্যক্তি ফেসবুকে একটি পোস্টে ড. রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধার বক্তব্যের সমালোচনা করেন।
পোস্টে তিনি লেখেন, ‘শুধু ভাইভা দিয়ে চাকরি পেয়ে ১২ বছরে অধ্যাপক হলে! ’ তিনি আরও লেখেন, ‘পরীক্ষা কমিটিতে থেকে আর খাতা দেখে বছরে ৩/৪ লাখ পেলে! সন্ধ্যায় দুই/চারটা ইভিনিং কোর্স চালু করলে! দুই/চারটা প্রাইভেট ভার্সিটিতে ক্লাস নিলে আর মাঝে মাঝে টিভিতে টকশো করলে পে-স্কেল লাগবে কেন? ’ পোস্টে ওই ব্যক্তি আরও মন্তব্য করেন, ‘নিজের সুবিধা ঠিকঠাক হলেই হলো, তখন খুব সুশীল হওয়া যায়, খুব নীতিকথা ড্রপ করা যায়।
’ এ ছাড়াও বিভিন্ন পে-স্কেল প্রত্যাশী গ্রুপে তার বক্তব্য নিয়ে বাজে ভাষায় পোস্ট করতে দেখা গেছে। এসব গ্রুপে একজন পুলিশ কর্মকর্তাকেও অশালীন ভাষায় মন্তব্য করতে দেখা যায়। তাদের বেশির ভাগ মন্তব্যই ছিল ব্যক্তিগত আক্রমণকেন্দ্রিক। পে-স্কেল নিয়ে চলমান বিতর্কে একদিকে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর দাবি, অন্যদিকে রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা ও মূল্যস্ফীতির চাপ—দুই বিষয়ই সামনে এসেছে।
ফলে পে-স্কেল নিয়ে আলোচনা এখন শুধু বেতন বাড়ানোর দাবিতে সীমাবদ্ধ না থেকে জীবনযাত্রার ব্যয়, করব্যবস্থা, সরকারি ব্যয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রশ্নেও গড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—পে-স্কেল প্রত্যাশীরা আসলে কারা, তাদের দাবির যৌক্তিকতা কোথায় এবং রাষ্ট্রের বর্তমান আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে সেই দাবি কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ?
একই সঙ্গে ভিন্নমত প্রকাশের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষার ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।





















