4:25 pm, Monday, 7 September 2026

সম্ভাবনার হাতছানি কালীগঞ্জের দোলনা শিল্পে

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

গাজীপুরের কালীগঞ্জের নাগরী ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রাম ‘দোলনার গ্রাম’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। এখানকার কারিগরেরা বংশপরম্পরায় পাট, রঙিন সুতা, বাঁশ ও লোহা এবং বাশেঁর রিং ব্যবহার করে দৃষ্টিনন্দন বাহারী রংয়ের টেকসই দোলনা তৈরি করে থাকেন। বিশেষ করে এখানকার নারীরা সংসারের কাজের পাশাপাশি দোলনা তৈরি করে নিজেদের ভাগ্য বদল করছেন ও পরিবারে সচ্ছলতা ফিরিয়ে এনেছেন।

দোলনা তৈরির কাজটি কয়েকটি ধাপে হয়ে থাকে। প্রথম ফ্রেম তৈরিতে বাঁশের চাকা বা লোহার রিং দিয়ে দোলনার মূল কাঠামো তৈরি করা হয়। পরে বিভিন্ন রংয়ের সুতা ও পাটের সুতা দিয়ে বুনন করে মূল কাঠামোতে সুতা ও পাটের রশি পেঁচিয়ে বাহারি রঙের নকশার কারুকাজ ফুটিয়ে তোলা হয়। কারিগররা চাক দোলনা, চেয়ার দোলনা, কিংবা চারকোনা আকৃতির বিভিন্ন নকশার দোলনা বুনে থাকেন।

দড়ি বা চেইন সংযুক্ত করে দোলনা ঝুলিয়ে রাখার জন্য মজবুত পাটের দড়ি বা লোহার চেইন তৈরি করে যুক্ত করা হয়। পাট ও সুতার তৈরি দোলনা গুলো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করেছে । ঘরের সৌন্দর্য বাড়াতে দোলনার তুলনা হয় না। দোলনা তৈরি শেষ হওয়া মাত্রই পাইকাররা সরাসরি কারিগরদের বাড়ি থেকে কিনে নিয়ে যান। এমনকি এই এলাকায় তৈরি দোলনা দেশের গন্ডি পেরিয়ে এখন বিদেশের বাজারেও রপ্তানি হচ্ছে।

নাগরী ইউনিয়নের বিরতুল গ্রাম ছাড়িয়ে ধনুন, বাগদী, বিন্দান ও সেনপাড়াসহ পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে এই কুটির শিল্প। প্রায় ৩৫০ টি পরিবারের সহশ্রাধিক নারী-পুরুষ এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। তাদের হাতে তৈরি দোলনা এখন শুধু স্থানীয় বাজারে সীমাবদ্ধ নয়। রাজধানী ঢাকা ছাড়িয়ে পৌঁছে যাচ্ছে চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, নওগা-এমনকি দেশের বাইরেও।

উপজেলার বাগদী এলাকার উদ্যোক্তা আইয়ুব খা বলেন, কাঁচামালের (সুতা, লোহা, রঙ) দাম বেড়ে যাওয়ায় এশিল্পটি বর্তমানে সংকটে রয়েছে। শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে কারীগররা। সরকারী উদ্যোগে যদি সহজ শর্তে ঋণ এবং আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেত তবেই এই পরিবেশবান্ধব পাট ও হস্তশিল্পকে আরোও বড় পরিসরে আন্তর্জাতিক বাজারে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো।

বাগদী গ্রামের আরেক দোলনা তৈরির কারিগর নিলুফা বেগমের চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ থাকলেও কণ্ঠে দৃঢ়তা রয়েছে। তিনি বলেন, একসময় এই গ্রামের নারীরা ছিলেন ঘরবন্দি। পরিবারের অর্থনৈতিক ভার ছিল পুরোপুরি পুরুষদের ওপর। কিন্তু সময়ের পালাবদলে বদলে গেছে সেই চিত্র। এখন ঘরের ভেতরের সেই নারীরাই হয়ে উঠেছেন পরিবারের প্রধান ভরসা। স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, দোলনার ডিজাইন আর রঙে নতুনত্ব আনতে পারলে সময়ের সাথে সাথে দেশের বাজারে এর কদর আরো বৃদ্ধি পাবে।

স্থানীয় প্রশাসন এই কাজের সাথে জড়িতদের আর্থিক সহায়তা করে তাহলে এই কুটির শিল্পটি আরোও প্রসারিত হবে এবং দোলনা তৈরিতে এই অঞ্চলের নারীরা দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারবে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

Nagorik Sangram

Popular Post

মেহেরপুরে বিএনপি কার্যালয়ের পাশে বোমা সদৃশ বস্তুর বিস্ফোরণ, সার্কিট উদ্ধার

সম্ভাবনার হাতছানি কালীগঞ্জের দোলনা শিল্পে

Update Time : 02:02:42 am, Monday, 7 September 2026

গাজীপুরের কালীগঞ্জের নাগরী ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রাম ‘দোলনার গ্রাম’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। এখানকার কারিগরেরা বংশপরম্পরায় পাট, রঙিন সুতা, বাঁশ ও লোহা এবং বাশেঁর রিং ব্যবহার করে দৃষ্টিনন্দন বাহারী রংয়ের টেকসই দোলনা তৈরি করে থাকেন। বিশেষ করে এখানকার নারীরা সংসারের কাজের পাশাপাশি দোলনা তৈরি করে নিজেদের ভাগ্য বদল করছেন ও পরিবারে সচ্ছলতা ফিরিয়ে এনেছেন।

দোলনা তৈরির কাজটি কয়েকটি ধাপে হয়ে থাকে। প্রথম ফ্রেম তৈরিতে বাঁশের চাকা বা লোহার রিং দিয়ে দোলনার মূল কাঠামো তৈরি করা হয়। পরে বিভিন্ন রংয়ের সুতা ও পাটের সুতা দিয়ে বুনন করে মূল কাঠামোতে সুতা ও পাটের রশি পেঁচিয়ে বাহারি রঙের নকশার কারুকাজ ফুটিয়ে তোলা হয়। কারিগররা চাক দোলনা, চেয়ার দোলনা, কিংবা চারকোনা আকৃতির বিভিন্ন নকশার দোলনা বুনে থাকেন।

দড়ি বা চেইন সংযুক্ত করে দোলনা ঝুলিয়ে রাখার জন্য মজবুত পাটের দড়ি বা লোহার চেইন তৈরি করে যুক্ত করা হয়। পাট ও সুতার তৈরি দোলনা গুলো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করেছে । ঘরের সৌন্দর্য বাড়াতে দোলনার তুলনা হয় না। দোলনা তৈরি শেষ হওয়া মাত্রই পাইকাররা সরাসরি কারিগরদের বাড়ি থেকে কিনে নিয়ে যান। এমনকি এই এলাকায় তৈরি দোলনা দেশের গন্ডি পেরিয়ে এখন বিদেশের বাজারেও রপ্তানি হচ্ছে।

নাগরী ইউনিয়নের বিরতুল গ্রাম ছাড়িয়ে ধনুন, বাগদী, বিন্দান ও সেনপাড়াসহ পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে এই কুটির শিল্প। প্রায় ৩৫০ টি পরিবারের সহশ্রাধিক নারী-পুরুষ এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। তাদের হাতে তৈরি দোলনা এখন শুধু স্থানীয় বাজারে সীমাবদ্ধ নয়। রাজধানী ঢাকা ছাড়িয়ে পৌঁছে যাচ্ছে চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, নওগা-এমনকি দেশের বাইরেও।

উপজেলার বাগদী এলাকার উদ্যোক্তা আইয়ুব খা বলেন, কাঁচামালের (সুতা, লোহা, রঙ) দাম বেড়ে যাওয়ায় এশিল্পটি বর্তমানে সংকটে রয়েছে। শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে কারীগররা। সরকারী উদ্যোগে যদি সহজ শর্তে ঋণ এবং আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেত তবেই এই পরিবেশবান্ধব পাট ও হস্তশিল্পকে আরোও বড় পরিসরে আন্তর্জাতিক বাজারে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো।

বাগদী গ্রামের আরেক দোলনা তৈরির কারিগর নিলুফা বেগমের চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ থাকলেও কণ্ঠে দৃঢ়তা রয়েছে। তিনি বলেন, একসময় এই গ্রামের নারীরা ছিলেন ঘরবন্দি। পরিবারের অর্থনৈতিক ভার ছিল পুরোপুরি পুরুষদের ওপর। কিন্তু সময়ের পালাবদলে বদলে গেছে সেই চিত্র। এখন ঘরের ভেতরের সেই নারীরাই হয়ে উঠেছেন পরিবারের প্রধান ভরসা। স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, দোলনার ডিজাইন আর রঙে নতুনত্ব আনতে পারলে সময়ের সাথে সাথে দেশের বাজারে এর কদর আরো বৃদ্ধি পাবে।

স্থানীয় প্রশাসন এই কাজের সাথে জড়িতদের আর্থিক সহায়তা করে তাহলে এই কুটির শিল্পটি আরোও প্রসারিত হবে এবং দোলনা তৈরিতে এই অঞ্চলের নারীরা দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারবে।