একুশ শতকের বৈশ্বিক অর্থনীতি, বিশ্ব রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে যে ভূ-রাজনৈতিক রূপান্তর ঘটছে, তার মূল কেন্দ্রে অবস্থান করছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী ও প্রভাবশালী অনুষঙ্গ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই)।
প্রথাগত ডেটা প্রসেসিং, ভারী শিল্প উৎপাদন ও অফিসিয়ালি নথি ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে উন্নত চিকিৎসা বিজ্ঞান, মহাকাশ গবেষণা, আধুনিক কৃষি, অর্থায়ন ও জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্ব প্রযুক্তির প্রতিটি শাখায় এআই আজ নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য ও কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের মতো উদীয়মান অর্থনৈতিক পরাশক্তিগুলো আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কেন্দ্র করে নিজেদের ভবিষ্যৎ জাতীয় নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক অবস্থানকে শক্তিশালী করছে।
এই অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক ও দ্রুত পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের মতো সম্ভাবনাময় অর্থনীতির জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোনো বিলাসী প্রযুক্তিগত পছন্দ নয়, বরং জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষা, আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকা ও মেধাভিত্তিক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির এক অপরিহার্য চাবিকাঠি। সম্প্রতি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের নেওয়া নানামুখী নীতিগত উদ্যোগ ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সরকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিশ্বমানের দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করছে।
আইসিটি খাতের তরফ থেকে যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে জাতীয় অর্থনৈতিক অগ্রগতির কেন্দ্রে রেখে দেশের তরুণের আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই দেশের তরুণ সমাজ, আইটি পেশাজীবী, ফ্রিল্যান্সার ও গবেষকদের মনে এক নতুন আশার সঞ্চার হয়। তবে আন্তর্জাতিক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এই সম্ভাবনাকে বাস্তব চিত্রে রূপান্তর করতে হলে আমাদের প্রথাগত কাঠামোর বাইরে গিয়ে অত্যন্ত সুচিন্তিত, কৌশলগত ও দ্রুত কার্যকর নীতি গ্রহণ করতে হবে।
বর্তমানে বৈশ্বিক শ্রমবাজার ও বিশ্বব্যাপী ফ্রিল্যান্সিং খাতের সমীকরণ অবিশ্বাস্য গতিতে বদলে যাচ্ছে। বিগত দুই দশক ধরে আমাদের দেশের অদম্য তরুণরা যেসব সাধারণ ডেটা এন্ট্রি, মৌলিক ওয়েব ডিজাইন, কন্টেন্ট রাইটিং কিংবা সাধারণ গ্রাফিক্সের কাজ করে আউটসোর্সিং খাত থেকে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতেন, জেনারেটিভ এআই ও আধুনিক অটোমেশনের দ্রুত বিকাশের ফলে বিশ্বজুড়ে সেসব কাজের ক্ষেত্র আশঙ্কাজনকভাবে সংকুচিত হয়ে আসছে।
বিশ্ববাজার এখন প্রযুক্তি খাতে যে পরিবর্তন দাবি করছে, তা হলো—উচ্চতর দক্ষতার মেধাভিত্তিক মানবসম্পদ। আন্তর্জাতিক বাজারে এখন যারা এআই ইঞ্জিনিয়ারিং, মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদম, ডেটা সায়েন্স, ক্লাউড কম্পিউটিং, সাইবার নিরাপত্তা এবং প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে দক্ষ, তাদের চাহিদা আকাশচুম্বী। যদি আমরা সময়মতো আমাদের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে আধুনিক এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে না পারি, তবে অতীতের অর্জিত আন্তর্জাতিক আউটসোর্সিং বাজার আমরা চিরতরে হারানোর চরম ঝুঁকিতে পড়ব।
এই অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে জাতীয় নীতি-নির্ধারক ও সরকারের সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত জরুরি। দেশ যখন সার্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এক নতুন প্রবৃদ্ধির স্বপ্ন দেখছে, ঠিক তখনই আইসিটি খাতকে প্রথাগত একক-পণ্যনির্ভর ও কায়িক শ্রমনির্ভর অর্থনীতির প্রধান বিকল্প হিসেবে দাঁড় করানোর এক সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে।
গত কয়েক দশক ধরে আমাদের অর্থনীতি মূলত তৈরি পোশাক খাত (আরএমজি) এবং প্রবাসী ভাইবোনদের কষ্টার্জিত রেমিট্যান্সের ওপর ভর করে টিকে রয়েছে। কিন্তু পরিবর্তনশীল বিশ্বে কেবল প্রথাগত খাতের ওপর ভরসা করে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়া সম্ভব নয়। বাংলাদেশে যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় দক্ষ এক বিশাল প্রযুক্তিগত মানবসম্পদ হাব গড়ে তোলা যায়, তবে এটিই হতে পারে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত।
সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত ও দিকনির্দেশনাই পারে আইসিটি খাতের এই সম্ভাবনাকে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘জাতীয় কৌশলগত মিশন’-এ রূপ দিতে। একই সঙ্গে সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট নীতি-নির্ধারকদের কাছে বিনীত পরামর্শ থাকবে—এআই-কেন্দ্রিক বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় জয়ী হতে হলে কেবল প্রশাসনিক ঘোষণা, সেমিনার বা সাময়িক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না।
এর জন্য প্রয়োজন একটি বাস্তবভিত্তিক ও যুগোপযোগী ‘জাতীয় এআই রোডম্যাপ’। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক বাস্তবতার আলোকে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট নীতিগত পদক্ষেপ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রথমত, শিক্ষা ও কারিকুলামের আমূল সংস্কার: আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবি। দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোর কম্পিউটার সায়েন্স ও প্রকৌশল বিভাগের পাঠ্যক্রমকে অবিলম্বে বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী রি-ডিজাইন করতে হবে।
পাশাপাশি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রথাগত তাত্ত্বিক শিক্ষার পরিবর্তে প্র্যাকটিক্যাল কোডিং, অ্যালগরিদম ডিজাইন, ডেটা অ্যানালিটিক্স ও মেশিন লার্নিংয়ের প্রাথমিক ধারণা বাধ্যতামূলক করতে হবে। একই সঙ্গে আইসিটি বিভাগ ও প্রথম সারির সফটওয়্যার শিল্পগুলোর সমন্বয়ে ‘ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া লিংকেজ’ মজবুত করা জরুরি, যাতে শিক্ষার্থীরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করার পরপরই সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে যুক্ত হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, উন্নত কম্পিউটিং ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো স্থাপন: বৈশ্বিক বাজারে এআই ট্রেনিং, ডিপ লার্নিং ও বড় বড় মডেল ডেভেলপমেন্টের জন্য প্রয়োজন হয় বিশাল প্রসেসিং পাওয়ার ও গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট (জিপিইউ) অবকাঠামো, যা ব্যক্তিগতভাবে কেনা কোনো সাধারণ তরুণ, স্টার্টআপ বা গবেষকের পক্ষে অসম্ভব। সরকারি উদ্যোগে হাই-টেক পার্ক ও দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জাতীয় পর্যায়ের ‘এআই এক্সিলেন্স সেন্টার’ ও ‘সুপারকম্পিউটিং ও ক্লাউড ল্যাব’ স্থাপন করতে হবে।
যেখানে দেশের মেধাবী ডেভেলপার ও স্টার্টআপগুলো বিনামূল্যে বা স্বল্প মূল্যে বড় বড় এআই মডেল তৈরির প্রসেসিং ক্ষমতা পাবে। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে অংশীদারিত্ব: বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর (যেমন—মাইক্রোসফট, গুগল, এনভিডিয়া, মেটা, এডব্লিউএস)—এর সঙ্গে সরকারি পর্যায়ে কৌশলগত অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক স্তরের এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্টিফাইড ট্রেনিং প্রোগ্রাম দেশে সরকারি স্কলারশিপে পরিচালনা করা যেতে পারে। যার মাধ্যমে আমাদের ফ্রিল্যান্সার ও তরুণেরা বিশ্বমানের আইটি সার্টিফিকেশন অর্জন করবে এবং বিশ্বজুড়ে রিমোট জবের বাজারে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে। চতুর্থত, অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও সরকারি সেবায় এআই-এর প্রয়োগ: দেশীয় প্রযুক্তির বিকাশ ঘটাতে স্থানীয় বাজারের বিকল্প নেই।
আমাদের ঐতিহ্যবাহী তৈরি পোশাক খাত, কৃষি ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবায় রোগ নির্ণয়, ব্যাংকিং খাতের জটিল ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং সরকারি ই-গভর্ন্যান্স ট্রাফিকে যদি স্থানীয় এআই স্টার্টআপগুলোর উদ্ভাবন ব্যবহার করা যায়, তবে দেশীয় উদ্যোক্তারা প্রাথমিক বাজার পাবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে নতুন উচ্চমাত্রার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। পঞ্চমত, ডেটা নিরাপত্তা ও এআই ইথিক্স নীতিমালা: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুফল নিশ্চিত করতে হলে জাতীয় পর্যায়ে ডেটা প্রাইভেসি ও সাইবার নিরাপত্তা আইন জোরদার করতে হবে।
নাগরিক তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করে কীভাবে উদ্ভাবনী কাজে ডেটা ব্যবহার করা যায়, তার জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ ‘ন্যাশনাল ডেটা গভর্নেন্স পলিসি’ প্রণয়ন করা জরুরি। পরিশেষে বলা যায়, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই গতিশীল যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোনো সাময়িক ফ্যাশন বা বিলাসী উদ্ভাবন নয়, বরং এটি দেশের মেধাভিত্তিক সার্বভৌম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি।
বৈশ্বিক গতিপ্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সুদূরপ্রসারী জাতীয় রূপকল্প, সঠিক বিনিয়োগ এবং কঠোর তদারকি যদি একত্রে কাজ করে, তবে দ্রুততম সময়ে বাংলাদেশ এআই-দক্ষ মানবসম্পদের অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক হাবে পরিণত হতে পারে। তথ্যপ্রযুক্তির বিশ্বমঞ্চে কেবল অনুকরণকারী হিসেবে নয়, বরং উদ্ভাবক ও বিশ্বমানের দক্ষ জাতি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করাই হোক আমাদের আগামী দিনের দৃঢ় অঙ্গীকার।
লেখক: এ এইচ এম ফারুক (A H M Faruk) সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।





















