নার্সিং কেবল পেশা নয়, মানবসেবার এক অনন্য ব্রত। তবে এই মহৎ কাজের আড়ালেও লুকিয়ে আছে নানা চ্যালেঞ্জ ও কাঠামোগত সংগ্রাম। চট্টগ্রাম নার্সিং কলেজের শিক্ষার্থী জাহানারা ফেরদৌস মীম নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে তুলে ধরেছেন নার্সিং শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা, ক্লিনিক্যাল বাস্তবতা, বিদ্যমান সংকট ও উত্তরণের উপায়।
তার এই ভাবনাগুলো গ্রন্থনা করেছেন আশিক বিন আলম সোহাগ নার্সিংকে পড়াশোনার বিষয় হিসেবে বেছে নেওয়ার পেছনে আপনার মূল অনুপ্রেরণা বা কারণ কী ছিল? শুরুতে নার্সিং পড়ার কোনো পরিকল্পনাই ছিল না; আমি মেডিকেল ভর্তিচ্ছু ছিলাম। সরকারি মেডিকেলে সুযোগ না পেয়ে মায়ের পরামর্শেই নার্সিংয়ের প্রস্তুতি নিই। তবে এই পেশায় আসার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলাম আরও আগেÑ একজন নার্সের কাছ থেকেই।
আমি তখন খুব ছোট। প্রসবব্যথায় কাতর মাকে হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। একজন ধাত্রী চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়ার পর এক ‘নার্স নানু’কে খবর দেওয়া হয়। তিনি এসে মাত্র তিন-চার মিনিটের মধ্যে আমার ভাইকে পৃথিবীর আলো দেখান। সেদিন দুটি জীবন বেঁচে গিয়েছিল, সেই সঙ্গে আমাদের পুরো পরিবারও। মা তখন থেকেই তাকে গভীর শ্রদ্ধা করতেন এবং চাইতেন, আমিও যেন মানুষের সেবা করতে পারি।
মেডিকেলে সুযোগ না পাওয়ার পর মানসিকভাবে বেশ ভেঙে পড়েছিলাম, কারণ আমাদের সমাজে অনেক সময় জীবনের চেয়েও ফলাফলকে বড় করে দেখা হয়। তবে এখন আর কোনো আফসোস নেই। আমি আমার পেশাকে ভালোবাসি এবং সম্মান করি। বর্তমানে বাংলাদেশে নার্সিং শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা ও পরিবেশকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? শুধু নার্সিং পড়ার সুযোগ থাকলেই হবে না; শিক্ষার মানকেও আরও যুগোপযোগী ও উন্নত করা প্রয়োজন।
দেশে বর্তমানে ব্যাঙের ছাতার মতো একের পর এক বেসরকারি নার্সিং কলেজ গড়ে উঠছে। প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়লেও উদ্বেগজনকভাবে অনেক জায়গায় শিক্ষার মান, অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা এবং পর্যাপ্ত শিখন-শিক্ষণ উপকরণের ঘাটতি রয়ে গেছে। ফলে মানসম্পন্ন শিক্ষা ও ব্যাবহারিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে, যা ভবিষ্যৎ নার্সদের দক্ষতা ও পেশাগত মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
আমাদের দেশের বিপুলসংখ্যক জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে উপযুক্ত নার্সিং শিক্ষায় দক্ষ করে বিদেশে পাঠানো গেলে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। তাই দেশে মানসম্পন্ন ও আধুনিক নার্সিং শিক্ষার সুযোগ আরও বাড়ানো উচিত। নার্সিং পড়ার সময় একজন শিক্ষার্থীকে একাডেমিক, ক্লিনিক্যাল, নাকি সামাজিকÑ কোন দৃষ্টিভঙ্গির চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি সবচেয়ে বেশি হতে হয়?
নার্সিং পড়ার সময় একজন শিক্ষার্থীকে একাডেমিক চাপ ও ক্লিনিক্যাল ডিউটির পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি ভ্রান্ত সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কবলে পড়তে হয়। নার্সিং শিক্ষার্থী ও নার্সদের নিয়ে সমাজে প্রচলিত নেতিবাচক ধারণা এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। একসময় ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল যে নার্সিংয়ে পড়লে মেয়েদের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ধারণা কিছুটা পাল্টালেও এর সম্পূর্ণ অবসান এখনো ঘটেনি।
এ ছাড়া অনেকের মধ্যেই একটি অসত্য ধারণা রয়েছে যে নার্সদের ব্যবহার খারাপ; যা সম্পূর্ণ অন্যায্য এবং সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। অন্যদিকে, সদ্য নার্সিংয়ে ভর্তি হওয়া একজন শিক্ষার্থীকে হঠাৎ করে বাংলামাধ্যম থেকে সম্পূর্ণ ইংরেজি মাধ্যমে পড়ার ভীতি, ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিস, অ্যাসাইনমেন্টসহ নানা রকম পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়। এর পাশাপাশি নানা রকম দৃষ্টিকটু কথা এবং কখনো কখনো রোগীর স্বজনদের খারাপ ব্যবহার তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়।
তবে অনেক সময় নার্সদের সেবায় সন্তুষ্ট হয়ে মানুষ প্রশংসাও করেন, যা তাদের আত্মবিশ্বাসী করে এবং কাজের প্রতি আরও আন্তরিক হতে উদ্বুদ্ধ করে। আপনার প্রতিষ্ঠানে ব্যাবহারিক প্রশিক্ষণের ল্যাব ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধায় কোনো ঘাটতি আছে কি? আমি চট্টগ্রাম নার্সিং কলেজে চতুর্থ বর্ষে অধ্যয়নরত। আমাদের প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় ল্যাব ও সরঞ্জাম থাকলেও এগুলোর আরও আধুনিকায়ন প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।
আমাদের শিক্ষকেরা একই সঙ্গে ক্লাস, কলেজের বিভিন্ন কাজ এবং হাসপাতালের চাপ সামলে ল্যাবে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না। তাই ল্যাবের সরঞ্জামগুলোর যথাযথ ব্যবহার শেখানোর জন্য আরও প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি মানসম্পন্ন ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিস নিশ্চিত করতে অভিজ্ঞ প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে কাজ শেখার সুযোগ বাড়াতে হবে এবং আধুনিক যন্ত্রপাতির প্রসার ঘটাতে হবে।
হাসপাতালে ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতা কেমন এবং সেখানে হাতে-কলমে কাজ শেখার পর্যাপ্ত সুযোগ থাকে কি? হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ নিয়ে আমার মিশ্র অভিজ্ঞতা রয়েছে। তবে সত্যি বলতে, ভালো অভিজ্ঞতার চেয়ে কষ্টের অভিজ্ঞতাই বেশি। সরকারি হাসপাতাল হওয়ায় সব সময় রোগীর প্রচুর চাপ থাকে। এত রোগী সামলানোর পাশাপাশি স্বজনদের বিভিন্ন অভিযোগ ও সমালোচনাও শুনতে হয়।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো, একই জায়গায় অনেক নার্সিং শিক্ষার্থী একসঙ্গে ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসে আসেন। জায়গা ও সুযোগ সীমিত হওয়ায় সবার জন্য পর্যাপ্তভাবে হাতে-কলমে শেখার সুযোগ থাকে না। অনেক সময় আমরা শুধু দেখেই সময় পার করি, নিজেরা কাজ করার সুযোগ কম পাই। এর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যেও আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি দেখা যায়। দীর্ঘ আট ঘণ্টা ডিউটি করার বিপরীতে পারিশ্রমিক খুব কম থাকায় স্বাভাবিকভাবেই অনেকের কাজের প্রতি আগ্রহ কমে যায়।
সব মিলিয়ে ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও, বর্তমান পরিবেশে এটি শিক্ষণীয় হওয়ার পাশাপাশি মানসিক ও শারীরিকভাবে বেশ কষ্টকর হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের নার্সিং শিক্ষাব্যবস্থায় অবকাঠামো, কারিকুলাম বা প্রশিক্ষণের মতো কোন জায়গাগুলোয় সবচেয়ে বেশি ঘাটতি রয়েছে বলে আপনি মনে করেন? আমার দৃষ্টিতে বাংলাদেশের নার্সিং শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো কাঠামোগত সমস্যা।
নার্সিংয়ে বিএসসি, ডিপ্লোমা ইন নার্সিং ও ডিপ্লোমা ইন মিডওয়াইফারিÑ এই তিনটি ধারা রয়েছে। বিএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা কঠিন প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ভর্তি হন এবং চার বছরের পড়াশোনার সঙ্গে ছয় মাসের ইন্টার্নশিপ সম্পন্ন করেন। কিন্তু বিসিএসে তাদের জন্য নার্সিং-সংশ্লিষ্ট কোনো বিশেষ ক্যাডার নেই; সাধারণ ক্যাডারেই প্রতিযোগিতা করতে হয়।
সরকারি চাকরিতেও যোগ্যতা ও শিক্ষাগত পার্থক্য অনুযায়ী যথাযথ ক্যারিয়ার কাঠামো ও স্বীকৃতির ঘাটতি রয়েছে। অন্যদিকে, ডিপ্লোমা শিক্ষার্থীরা তিন বছর পড়াশোনা করেও অনেক ক্ষেত্রে ডিগ্রি-সমমান স্বীকৃতির জটিলতায় পড়েন; বিশেষ করে বিদেশে উচ্চশিক্ষা বা চাকরির ক্ষেত্রে। তাই নার্সিং পেশার উন্নয়নে শুধু জনবল বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; বরং পুরো শিক্ষাব্যবস্থা, স্বীকৃতি, ক্যারিয়ার কাঠামো ও সুযোগ-সুবিধাকে যুগোপযোগীভাবে ঢেলে সাজানো জরুরি।
দেশের নার্সিং শিক্ষাব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানের করতে কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন? নার্সিং শিক্ষাব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানের করতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। প্রথমেই শিক্ষকদের দেশ-বিদেশে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও কোর্স করার সুযোগ দিতে হবে। এতে তারা নতুন জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করে শিক্ষার্থীদের আরও ভালোভাবে শেখাতে পারবেন।
পাশাপাশি উন্নত দেশের নার্সিং কারিকুলাম পর্যালোচনা করে বাংলাদেশের প্রয়োজন ও বাস্তবতার সঙ্গে মিল রেখে যুগোপযোগী কারিকুলাম তৈরি করতে হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য আধুনিক ল্যাব, পর্যাপ্ত ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিস ও হাতে-কলমে শেখার সুযোগ বাড়াতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি করাও অত্যাবশ্যক। নার্সিং পেশায় সফল হতে একাডেমিক জ্ঞানের পাশাপাশি আর কী কী দক্ষতা থাকা অপরিহার্য?
নার্সিং পেশায় ভালো করতে হলে একজন শিক্ষার্থীকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি ব্যাবহারিক বা বাস্তবভিত্তিক জ্ঞান অর্জন করতে হবে। কারণ, এটি ছাড়া একজন নার্সের ‘ক্রিটিক্যাল থিংকিং পাওয়ার’ বা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা গড়ে ওঠে না। পাশাপাশি উন্নত যোগাযোগ দক্ষতা বা ‘কমিউনিকেশন স্কিল’ থাকাও সমান জরুরি।
যারা ভবিষ্যতে নার্সিং পেশায় আসতে চান, তাদের উদ্দেশে আপনার পরামর্শ কী? যারা নার্সিং পড়ার কথা ভাবছ, তাদের বলবÑ শুধু চাকরির আশায় নয়, মানবসেবার মানসিকতা নিয়ে এই মহৎ পেশায় এসো। বিদেশে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলে নার্সিং খুব ভালো একটি পছন্দ হতে পারে। তবে পরিবারের চাপ বা অন্যের কথায় নয়, পেশার ভালো-মন্দ জেনে একান্তই নিজের সিদ্ধান্তে এখানে আসবে।
পরিশেষে এটাই বলব, একজন রোগীর সুস্থতার পেছনে তোমার সেবা ও যতেœর অবদান থাকবে, তার মুখের দোয়াই হবে তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তিÑ এর চেয়ে গর্বের ও আনন্দের আর কিছুই হতে পারে না।




















