ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ কিংবা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম—সবখানেই সাংবাদিকতা ছিল সাহসী এক প্রহরীর নাম। কিন্তু আজ সেই প্রহরীর ঘরেই যেন আগুন লেগেছে।
সমাজের যে আয়না মানুষের সামনে সত্যের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরার কথা, সেই আয়নাতেই আজ জমেছে অসততা, অপেশাদারত্ব ও কদর্য স্বার্থপরতার ঘন কাদা। আজকের বাস্তবতা এমন এক ভয়াবহ অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে ‘সাংবাদিক’ পরিচয়টি আর কেবল একটি পেশাগত পরিচয় নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি হয়ে উঠেছে ক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যম, ভয় দেখানোর অস্ত্র কিংবা অপরাধ আড়াল করার এক নিরাপদ ছাতা।
চিকিৎসক হতে যেমন ডিগ্রি লাগে, আইনজীবী হতে যেমন সনদ লাগে, রাষ্ট্রীয় চাকরিতে যেমন নিয়োগকাঠামো রয়েছে, সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে তেমন কোনো কার্যকর ও কঠোর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা আজও গড়ে ওঠেনি। ফলে যে কেউ একটি কার্ড, একটি অনলাইন পোর্টাল কিংবা একটি ইউটিউব চ্যানেল খুলেই নিজেকে ‘সাংবাদিক’ দাবি করতে পারছে। এ পেশায় কে প্রকৃত সংবাদকর্মী আর কে কেবল সুযোগসন্ধানী, তা বোঝা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
এই শূন্যতার সুযোগে হাজার হাজার মানুষ নিজেদের সাংবাদিক পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করছে। অনেকের কোনো সংবাদমাধ্যমে ন্যূনতম নিয়মিত কাজের অভিজ্ঞতাও নেই, অথচ তারা পরিচয়পত্র ব্যবহার করছে, সামাজিক প্রভাব বিস্তার করছে এবং প্রশাসনিক সুবিধা আদায় করছে। পান দোকানদার থেকে শুরু করে সুইপার, ড্রাইভার, হেলপার, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি থেকে শুরু করে নানা পেশার মানুষ সুবিধা লাভের আশায় মুহূর্তে একটা প্রেস কার্ড নিয়ে সাংবাদিক বনে যাচ্ছে।
এতে সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার হচ্ছেন প্রকৃত সাংবাদিকেরা। যারা বছরের পর বছর মাঠে ঘাম ঝরিয়ে সত্য অনুসন্ধান করেছেন, ক্ষমতার রোষানলে পড়েছেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন, তাদের অবস্থানও আজ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে ভয়াবহ হলো, সাংবাদিকতার পবিত্র পরিচয়কে ব্যবহার করে অপরাধীরা নিজেদের রক্ষা করছে। এই প্রবণতা সমাজে দুটি ভয়ংকর বার্তা দিচ্ছেÑ প্রথমত, সাংবাদিকতা আর সম্মানের পেশা নয়; দ্বিতীয়ত, এটি ব্যবহার করে আইনকে পাশ কাটানো সম্ভব।
যখন একটি পেশার পরিচয় অপরাধের নিরাপদ বর্মে পরিণত হয়, তখন সেই পেশার নৈতিক ভিত্তি ভয়াবহভাবে ধসে পড়ে। অশিক্ষিত ও কুশিক্ষিতদের আগ্রাসনে জ্ঞানচর্চার অবমাননা চলছে প্রতিনিয়ত। সাংবাদিকতার মোড়কে প্রাতিষ্ঠানিক চাঁদাবাজির বিস্তার লাভ করেছে গোটা দেশে। একসময় সাংবাদিকেরা ছিলেন সমাজের নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর। কিন্তু আজ এক শ্রেণির অসাধু ব্যক্তি সাংবাদিকতার কার্ড ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকেই জিম্মি করছে।
গ্রামগঞ্জ থেকে শুরু করে শহরের অলিগলি পর্যন্ত একটি ভয়ংকর সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যারা মানুষের ভুলভ্রান্তি খুঁজে বেড়ায় কেবল অর্থ আদায়ের উদ্দেশ্যে। কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ছোটখাটো ত্রুটি, কোনো সরকারি কর্মচারীর প্রশাসনিক দুর্বলতা কিংবা কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সংকট সবকিছুই এখন ‘নিউজ করে দেব’ হুমকির মাধ্যমে অর্থ আদায়ের উপকরণে পরিণত হয়েছে।
এতে সাংবাদিকতার সামাজিক ভূমিকা ধ্বংস হচ্ছে। কারণ মানুষ এখন অনেক ক্ষেত্রে সংবাদকর্মীকে দেখলে তথ্যদাতা নয়; বরং ভয় ও ঝামেলার উৎস হিসেবে ভাবতে শুরু করেছে। এই চাঁদাবাজির সংস্কৃতি সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে প্রকৃত সাংবাদিকদের। কারণ একজন সৎ সাংবাদিক যখন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করতে যান, তখন অনেকেই তাকে একই চোখে দেখেন। ফলে সংবাদ সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়ে, মানুষের আস্থা কমে যায় এবং পুরো পেশাটিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে।
আজ সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো মুষ্টিমেয় কিছু অপরাধপ্রবণ ও অসাধু মানুষের দায়ভার বহন করতে হচ্ছে প্রকৃত সাংবাদিকদের। একজন পেশাদার সংবাদকর্মী যখন মাঠে কাজ করতে যান, তখন তাকেও অনেক সময় সন্দেহের চোখে দেখা হয়। অনেকেই মনে করেন, হয়তো তিনিও কোনো উদ্দেশ্যে এসেছেন। এই সামাজিক অবিশ্বাস একজন সাংবাদিকের কাজকে কঠিন করে তোলে। কারণ সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো মানুষের আস্থা।
মানুষ যদি সংবাদকর্মীর ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে, তবে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা দুর্বল হয়ে পড়ে। তথ্য সংগ্রহ কঠিন হয়ে যায়, সত্য উন্মোচনের পথ সংকুচিত হয়। এ ছাড়া এই পরিস্থিতি তরুণ মেধাবীদেরও সাংবাদিকতা পেশা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। যারা একসময় আদর্শবাদ নিয়ে সাংবাদিকতায় আসতে চাইত, তারা এখন এই পেশাকে অনিশ্চিত ও অসম্মানজনক ভাবতে শুরু করেছে।
দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের গণতন্ত্র ও জবাবদিহির জন্য ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হতে পারে। আইনি শিথিলতা ও নামসর্বস্ব পোর্টালের ভয়াবহ বিস্তার দিন দিন বেড়েই চলেছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির সহজলভ্যতা যেমন নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে, তেমনি নিয়ন্ত্রণহীনতা ভয়াবহ বিশৃঙ্খলাও সৃষ্টি করেছে। বর্তমানে হাজার হাজার অনলাইন নিউজ পোর্টাল গড়ে উঠেছে, যাদের অধিকাংশের কোনো কার্যকর সম্পাদকীয় কাঠামো, নৈতিক নীতিমালা কিংবা পেশাগত মানদ- নেই।
যে কেউ একটি ওয়েবসাইট খুলে নিজেকে সম্পাদক বা সাংবাদিক ঘোষণা করতে পারছে। অনেক ক্ষেত্রে অফিস নেই, সংবাদকর্মী নেই, এমনকি কোনো নির্ভরযোগ্য পাঠকগোষ্ঠীও নেই, তবু তারা সাংবাদিক পরিচয়ে সক্রিয়। এই অবস্থা সাংবাদিকতার বাজারকে ভয়াবহভাবে দূষিত করছে। রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর দুর্বলতা এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। কার্যকর নিবন্ধনব্যবস্থা, নিরীক্ষা কিংবা জবাবদিহি না থাকায় অপেশাদার ও অসাধু লোকেরা অবাধে এই পেশায় প্রবেশ করছে।
ফলে প্রকৃত সংবাদমাধ্যমগুলোও একই প্রশ্নবিদ্ধ পরিবেশে পড়ে যাচ্ছে। অপরাধ জগতের নতুন অভয়ারণ্য হিসেবে সাংবাদিক পরিচয় ভয়াবহ রূপ পেয়েছে। বর্তমানে উদ্বেগজনকভাবে দেখা যাচ্ছে, অপরাধ জগতের অনেক ব্যক্তি নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করছে। মাদক ব্যবসা, চোরাচালান, অবৈধ দখলদারত্ব কিংবা ভূমিদস্যুতা করছে। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এসব লোক বড় বড় ব্যানার, অবৈধ অনলাইন টিভি কিংবা ইউটিউব প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে সেখানে নিজেদের লোক নিয়োগ দিচ্ছে।
এতে প্রকৃত সংবাদকর্মীরা কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন এবং অপরাধীরা সংবাদমাধ্যমের আড়ালে নিজেদের অন্ধকার সাম্রাজ্য বিস্তার করছে। এটি কেবল সাংবাদিকতার সংকট নয়; বরং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি। সাংবাদিকতায় প্রশিক্ষণ ও পেশাগত নৈতিকতার ভয়াবহ অনুপস্থিতি। সাংবাদিকতা একটি বিশেষায়িত বিদ্যা। এখানে তথ্য যাচাই, বস্তুনিষ্ঠতা, ভাষাশৈলী, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় অনেক তথাকথিত সাংবাদিক সংবাদ লেখার মৌলিক কাঠামো সম্পর্কেও অজ্ঞ। সংবাদের পাঁচটি ড এবং একটি ঐ-কি, কেন, কোথায়, কখন, কে এবং কীভাবেÑ এই মৌলিক কাঠামো না জেনেই অনেকে সংবাদ প্রকাশ করছে। ফলে তথ্য বিভ্রান্তিকর হচ্ছে, গুজব ছড়াচ্ছে এবং জনমনে ভুল ধারণা তৈরি হচ্ছে। সবচেয়ে বড় সংকট হলো নৈতিকতার অবক্ষয়। সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি হলো সত্য ও নিরপেক্ষতা।
কিন্তু অনেকেই এখন সংবাদকে ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করছে। ফলে পেশাগত আদর্শ ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। সাংবাদিকদের সমাজের দর্পণ বলা হয়। কিন্তু সেই দর্পণ যদি নিজেই কাদামাখা হয়, তবে সমাজ সেখানে নিজের সঠিক প্রতিচ্ছবি দেখতে পাবে কীভাবে? আজ সাধারণ মানুষ ক্রমেই সংবাদমাধ্যমের ওপর আস্থা হারাচ্ছে। মানুষ যখন দেখে সাংবাদিক পরিচয়ে একদল লোক চাঁদাবাজি, অপপ্রচার ও অনৈতিক কর্মকা-ে জড়িত, তখন তারা পুরো গণমাধ্যমব্যবস্থাকেই সন্দেহের চোখে দেখে।
এতে গুজব ও অপতথ্যের বিস্তার আরও সহজ হয়। কারণ মানুষ যখন মূলধারার সংবাদে আস্থা হারায়, তখন তারা যাচাইহীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এই আস্থাহীনতা গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। একটি রাষ্ট্রে স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য গণমাধ্যম দুর্বল হয়ে পড়লে জবাবদিহি কমে যায়, গুজব বাড়ে এবং সমাজে বিভাজন গভীর হয়। ফলে সাংবাদিকতার সংকট শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সংকটে রূপ নেয়।
এ অবস্থায় রাষ্ট্রের কী করা উচিত? সাংবাদিকতার এই ভয়াবহ অবক্ষয় রোধ করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন একটি শক্তিশালী ও স্বচ্ছ জাতীয় নিবন্ধনব্যবস্থা। তথ্য মন্ত্রণালয়, প্রেস কাউন্সিল ও সাংবাদিক সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেইস তৈরি করতে হবে, যেখানে প্রকৃত সাংবাদিকদের পরিচয়, কর্মস্থল, অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা সংরক্ষিত থাকবে। সাংবাদিক পরিচয়ে অপরাধ, চাঁদাবাজি কিংবা অপপ্রচার রোধে দ্রুত বিচারভিত্তিক বিশেষ আইনি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
একই সঙ্গে অনলাইন পোর্টালের নিবন্ধন ও তদারকি কঠোর করতে হবে, যেন যে কেউ ইচ্ছামতো পোর্টাল খুলে সমাজে বিভ্রান্তি ছড়াতে না পারে। পাশাপাশি সাংবাদিকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, নৈতিকতা শিক্ষা এবং পেশাগত মানোন্নয়নের উদ্যোগও জরুরি। মূলধারার সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে আরও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, যাতে অপেশাদার ও অপরাধীরা এই পেশার আড়ালে আশ্রয় নিতে না পারে।
দিনশেষে সমাজ তার বিবেককে খুঁজে পায় সংবাদপত্রের পাতায়। সেই বিবেক যদি নীতিহীনতা, অশিক্ষা ও অপরাধের দখলে চলে যায়, তবে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎও অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে। সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়; এটি সভ্য সমাজের নৈতিক শিরদাঁড়া। সেই শিরদাঁড়ায় যদি পচন ধরে, তবে গণতন্ত্রও ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। ‘আগাছা যখন ধানখেত গ্রাস করে, তখন অন্নের সংকট অনিবার্য হয়ে ওঠে।
’ আজ সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও সেই আগাছার বিস্তার ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এই আগাছা উপড়ে ফেলতে হবে রাষ্ট্রকে, সমাজকে এবং প্রকৃত সাংবাদিকদের সম্মিলিত প্রয়াসে। সময় এসেছে কলমকে আবারও সত্যের পক্ষে দাঁড় করানোর। সময় এসেছে সাংবাদিকতার পবিত্রতাকে ফিরিয়ে আনার। কারণ, সমাজের দর্পণ যদি স্বচ্ছ না থাকে, তবে জাতিও একদিন নিজের মুখ চিনতে ভুলে যাবে।




















