মধ্যপ্রাচ্য সংকটে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের অস্থিরতা এবং উচ্চমূল্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির কারণে বাড়ছে সরকারের ব্যয়। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই বিদ্যুৎ ও এলএনজি খাতে বরাদ্দের প্রায় ৪৫ শতাংশ ছাড় করতে হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে জ্বালানি খাতের অর্থসংকট মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতা বাড়াতে চায় সরকার। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে নতুন করে ৪৫০ কোটি ডলার বা ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করছে বাংলাদেশ। থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভার ফাঁকে গতকাল সোমবার বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ কথা জানান।
তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে অংশীদারত্ব কাঠামো চুক্তির প্রক্রিয়া চলছে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে সহযোগিতার ক্ষেত্র ও অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হবে। পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকের চলমান সহায়তাও অব্যাহত রয়েছে। অর্থমন্ত্রী বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নীতি ও কর্মসূচি বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিচ্ছে।
নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের কিছু ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফের সঙ্গে মতপার্থক্য থাকতে পারে। তবে সরকারের নিজস্ব অগ্রাধিকার বিবেচনায় নিয়ে পর্যায়ক্রমে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ব্যাংককে সোমবার থেকে শুরু হওয়া সপ্তাহব্যাপী বার্ষিক সভায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ও অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকেরা অংশ নিচ্ছেন।
এতে বাংলাদেশের অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ, জ্বালানি খাতে বাড়তি ব্যয়, ব্যাংক খাতের সংস্কার, নতুন ঋণ কর্মসূচি ও বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সংস্কারে ঐকমত্য, বিনিয়োগে জোর : অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, কর আদায় বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকারের সংস্কার পরিকল্পনার সঙ্গে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের নীতিগত ঐকমত্য তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল তিতুমীর।
সোমবার ব্যাংককে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনে সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশল রয়েছে। আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় কর আদায় বাড়ানো, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ এবং শিল্পায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি— এসব ক্ষেত্রে সরকারের পরিকল্পনার সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগীদের প্রস্তাবের মিল রয়েছে।
তবে শুধু আন্তর্জাতিক সংস্থার পরামর্শ অনুসরণ করলেই সংস্কার কার্যকর হবে না বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, সরকারের নিজস্ব অগ্রাধিকার, রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও বাস্তবায়নের সক্ষমতা থাকতে হবে। সংস্কারের মালিকানা সরকারের হাতে থাকলে এবং জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটলে উদ্যোগগুলো টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কাটানো অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ বলে উল্লেখ করেন রাশেদ আল তিতুমীর।
তিনি জানান, আগের সরকারের সময়কার অনিয়ম ও ঋণসংক্রান্ত বিশৃঙ্খলার প্রভাব কাটিয়ে আর্থিক খাতে আস্থা ফেরানো প্রয়োজন। এ জন্য পুনঃঅর্থায়নের পাশাপাশি ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থা আইএফসিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তিতুমীর বলেন, ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে না পারলে বিনিয়োগ বাড়ানো ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি কঠিন হবে।
একই সঙ্গে অতীতে কর অব্যাহতি ও করসংক্রান্ত অনিয়মের কারণে রাজস্ব আদায় কমেছে। কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা এবং কর আদায়ের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এতে উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নের সুযোগ বাড়বে। পরিবার কার্ড, বন্ধ কারখানায় অর্থায়ন : নিম্ন আয়ের মানুষের সহায়তায় পরিবার কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
রাশেদ আল তিতুমীর বলেন, আগের সরকারের সময় দারিদ্র্য বেড়েছে বলে বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও উল্লেখ রয়েছে। স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন অনুযায়ী, এ ধরনের কর্মসূচির মাধ্যমে পাঁচ বছরে দারিদ্র্যের হার প্রায় পাঁচ শতাংশ কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং অবকাঠামো উন্নয়নেও অর্থায়ন প্রয়োজন।
অন্যদিকে বন্ধ কলকারখানা চালু করা ও নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে সাত শতাংশ ঋণাত্মক সুদে অর্থায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান উপদেষ্টা। তবে এ অর্থায়নের আওতা, শর্ত ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানাননি তিনি। দেশে শিক্ষিত ও তরুণ বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে অনেক কারখানা বন্ধ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, উৎপাদন বাড়ানো, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
প্রবাসী শ্রমিক, তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তা এবং আনুষ্ঠানিক খাতে নারীর অংশগ্রহণ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ভবিষ্যতেও উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণে গুরুত্ব দিতে হবে। থাইল্যান্ডের সঙ্গে বিনিয়োগ সম্ভাবনা : থাইল্যান্ডের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতেও উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার।
থাই চেম্বারের সঙ্গে বৈঠকে কৃষিজাত পণ্য, ফল, দুগ্ধজাত পণ্য এবং হালাল খাদ্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আম, কাঁঠাল ও লিচুর মতো মৌসুমি ফলের পর্যাপ্ত হিমাগার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা গড়ে তোলা গেলে অপচয় কমবে, কৃষকেরা ন্যায্য দাম পাবেন এবং রপ্তানির সুযোগ বাড়বে বলে মনে করেন উপদেষ্টা। বাংলাদেশের লক্ষ্য শুধু থাইল্যান্ডের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো নয়; দুই দেশের উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার মধ্যে সংযোগ তৈরি করে সামগ্রিক বাণিজ্য বাড়ানো।
এ জন্য যৌথ উৎপাদন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দর ও থাইল্যান্ডের রেনং বন্দরের মধ্যে সামুদ্রিক যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (আরসিইপি) কাঠামোর সুবিধা কাজে লাগিয়ে বৃহত্তর আঞ্চলিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ানোর সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
কৃষি, কৃষিজাত পণ্য, সামুদ্রিক যোগাযোগ ও বঙ্গোপসাগরের মৎস্যসম্পদ আহরণেও সহযোগিতা বাড়ানোর আগ্রহ রয়েছে থাইল্যান্ডের। বহুমুখী উৎস থেকে বিনিয়োগ ও অর্থায়ন সংগ্রহের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে রাশেদ আল তিতুমীর বলেন, চীনের বিনিয়োগ শুরু হয়েছে। জাপানের টয়োটা ও মারুবেনি করপোরেশনের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিনিধিদলও বাংলাদেশ সফর করেছে।
এ ছাড়া সিলিকন ভ্যালিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান প্লাগ অ্যান্ড প্লে এবং প্রযুক্তি খাতের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ রয়েছে। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) ও ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ছে বলেও জানান তিনি। এডিবি ইতোমধ্যে পাঁচ বিলিয়ন ডলারের সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের গতি নির্ভর করবে প্রকল্প প্রস্তুতি, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, নীতির ধারাবাহিকতা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর।
বিশ্বব্যাংকের নতুন উদ্যোগ ‘ফিলানথ্রপি হাব’ : এদিকে উন্নয়ন প্রকল্পে দাতব্য তহবিল, বেসরকারি বিনিয়োগ, বিশেষজ্ঞ জ্ঞান ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্ক কাজে লাগাতে ‘ফিলানথ্রপি হাব’ নামে নতুন প্ল্যাটফর্ম চালু করেছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ। সোমবার ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সভার মধ্যে প্রথম বিশ্বব্যাংক গ্রুপ ফিলানথ্রপি ফোরামে প্ল্যাটফর্মটি চালু করা হয়।
এতে দাতব্য ফাউন্ডেশন, পারিবারিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সংস্থা ও অংশীদার সংগঠনের দুই শতাধিক প্রতিনিধি অংশ নেন। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান জ্ঞান কর্মকর্তা পাসকাল ডোনোহু বলেন, উন্নয়নের চাহিদা বাড়লেও সম্পদের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে দাতব্য সংস্থা ও অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ।
ফিলানথ্রপি হাব বিভিন্ন ধারণা, সম্পদ ও অংশীদারকে যুক্ত করে উদ্ভাবনী সমাধান বৃহত্তর পরিসরে বাস্তবায়নে সহায়তা করবে। ফোরামের ফাঁকে এশিয়ান ভেঞ্চার ফিলানথ্রপি নেটওয়ার্ক (এভিপিএন) ও টেমাসেক ট্রাস্টের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করেছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ। এভিপিএন ‘হেলথ ওয়ার্কস’ কর্মসূচিতে কারিগরি সহায়তার জন্য বিশেষ তহবিলের ঘোষণা দিয়েছে।
কর্মসূচিটির লক্ষ্য ১৫০ কোটি মানুষকে মানসম্মত ও সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনা। অন্যদিকে টেমাসেক ট্রাস্ট দাতব্য পুঁজি সংগ্রহ, অংশীদারদের যুক্ত করা ও উদ্ভাবনী অর্থায়নের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাবে। এর মাধ্যমে কৃষি, স্বাস্থ্য ও পানি খাতে বিশ্বব্যাংকের অ্যাগ্রিকানেক্ট, হেলথ ওয়ার্কস ও ওয়াটার ফরওয়ার্ড কর্মসূচির জন্য কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
ফোরামটি যৌথভাবে আয়োজন করে এভিপিএন, ইনস্টিটিউট অব ফিলানথ্রপি, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্ক এবং টেমাসেক ট্রাস্টের ফিলানথ্রপি এশিয়া অ্যালায়েন্স।





















