1:59 am, Tuesday, 13 October 2026

রাজধানীর সড়কে বাড়ছে নিয়ন্ত্রণহীন ব্যাটারিচালিত রিকশার দাপট

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

রাজধানীর সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশার দাপট থামছেই না। পাড়া-মহল্লার অলিগলি ছাড়িয়ে এসব যান চলাচল করছে ব্যস্ত প্রধান সড়কেও। ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য, উল্টোপথে চলাচল, দ্রুতগতিতে লেন পরিবর্তন এবং যেখানে সেখানে যাত্রী ওঠা-নামার কারণে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও যানজট।

‘বাংলার টেসলা’ নামে পরিচিত এসব তিন চাকার বাহন এখন ঢাকার সড়ক ব্যবস্থাপনার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। মিরপুর, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী, খিলক্ষেত, কুড়িল, উত্তরা থেকে পুরান ঢাকা— নগরীর প্রায় সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়েছে ব্যাটারিচালিত রিকশা। এসব যানকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে উৎপাদন কারখানা, মোটর ও ব্যাটারির দোকান, গ্যারেজ এবং চার্জিং পয়েন্টের বিশাল নেটওয়ার্ক।

স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতের সহজ ও তুলনামূলক সাশ্রয়ী মাধ্যম হওয়ায় নগরবাসীর একটি বড় অংশ এসব রিকশার ওপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত চলাচল, কারিগরি ত্রুটি এবং অপরিকল্পিত চার্জিং ব্যবস্থা তৈরি করছে সড়ক নিরাপত্তা ও নগর ব্যবস্থাপনার বহুমুখী সংকট। অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে একের পর এক অভিযানেও থামছে না বেপরোয়া চলাচল। নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে প্রতিদিনই নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে উঠে যাচ্ছে ব্যাটারিচালিত রিকশা।

কোথাও বাস কিংবা অন্য যানবাহনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটছে। কোথাও আবার ইউটার্ন ও সিগন্যালের কাছে এলোমেলোভাবে দাঁড়িয়ে সৃষ্টি করছে যানজট। অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিসুর রহমান বলেছেন, প্রধান সড়কে এসব যান চলাচল বন্ধে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চলছে। তিনি বলেন, প্রধান সড়কে অবৈধ যান চলাচলে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করা হচ্ছে।

এদিকে ব্যাটারিচালিত রিকশার নিবন্ধন, ফিটনেস, চলাচল নিয়ন্ত্রণ, চার্জিং স্টেশন ও গ্যারেজ ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে— এমন কথা সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, ব্যাটারিচালিত রিকশার নিবন্ধন, ফিটনেস, চার্জিং স্টেশন ও গ্যারেজ ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে নীতিগত কাজ এগিয়ে চলছে।

প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা সংশ্লিষ্ট কারিগরি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যানবাহনের নকশা ও কারিগরি মান যাচাই, ট্রাফিক বিভাগের ফিটনেস সনদ এবং সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার মাধ্যমে নিবন্ধনের বিষয় রয়েছে। নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে আগের একাধিক উদ্যোগ এবং অভিযানেও যেখানে এসব বাহনের বিস্তার ঠেকানো যায়নি; এবার নতুন নীতিমালা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, নীতিমালা প্রণয়ন আর মাঠপর্যায়ে তার বাস্তবায়ন এক বিষয় নয়। এর আগে বিভিন্ন সময়ে ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ গ্যারেজ ও চার্জিং পয়েন্টে অভিযান এবং বিকল্প নকশার রিকশা চালুর উদ্যোগ নিলেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান পরিবর্তন হয়নি। ২০২৪ সালের ১৯ নভেম্বর হাইকোর্ট ঢাকার সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বন্ধে তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।

পরে ২৫ নভেম্বর আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত ওই নির্দেশনার ওপর এক মাসের স্থিতাবস্থা দেন। ফলে হাইকোর্টের নির্দেশ তাৎক্ষণিকভাবে পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা হিসেবে কার্যকর হয়নি। এরপরও বিভিন্ন সময়ে প্রধান সড়কে এসব যান চলাচল বন্ধে অভিযান চালানো হয়েছে। কিন্তু একদিকে অভিযান, অন্যদিকে নতুন রিকশা তৈরি ও সড়কে নামানোর প্রবণতা অব্যাহত থাকায় নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি।

সূত্র জানায়, ব্যাটারিচালিত রিকশার বিস্তারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে চার্জিং পয়েন্ট ও গ্যারেজের সংখ্যা। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর ১০টি অপরাধ বিভাগের আটটিতে ৪৮ হাজার ১৩৬টি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট এবং ৯৯২টি গ্যারেজ শনাক্ত করা হয়েছে। এর বিপরীতে অনুমোদিত চার্জিং স্টেশন রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৩০০টি। এই পরিসংখ্যান রাজধানীর ব্যাটারিচালিত রিকশার চার্জিং অবকাঠামোর বড় একটি অংশ অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থায় গড়ে ওঠার চিত্র তুলে ধরে।

এসব স্থাপনার বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। রাজধানীর রূপনগরের রিকশাচালক সাহেব আলী ব্যাপারী জানান, ব্যাটারিচালিত রিকশা চার্জ দিতে তাকে কাছের একটি গ্যারেজে প্রতিদিন ১২০ টাকা দিতে হয়। বড় রিকশার ক্ষেত্রে চার্জের খরচ আরও বেশি। তার ভাষ্য, আগে ওই এলাকায় ১৫ থেকে ২০টি গ্যারেজ ছিল।

এখন প্রায় প্রতিটি গলিতেই গ্যারেজ গড়ে উঠেছে। গ্যারেজের এই বিস্তার শুধু চার্জ দেওয়ার চাহিদার প্রতিফলন নয়, বরং ব্যাটারিচালিত রিকশাকে ঘিরে গড়ে ওঠা বড় অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কেরও ইঙ্গিত। উৎপাদনকারী, মোটর ও ব্যাটারি সরবরাহকারী, মালিক, চালক এবং গ্যারেজ পরিচালনাকারীদের জীবিকা এর সঙ্গে যুক্ত। ফলে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হলে সড়কে অভিযান চালানোর পাশাপাশি এই পুরো ব্যবস্থাকে বিবেচনায় নিতে হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজধানীতে ঠিক কতটি ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করছে, তার নির্ভরযোগ্য ও সমন্বিত সরকারি হিসাব এখনো স্পষ্ট নয়। তবে যাত্রীকল্যাণ সমিতিসহ বিভিন্ন সংগঠনের হিসাবে, এ সংখ্যা ১০ লক্ষাধিক। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, নগরীতে কতটি রিকশা সড়কে চলছে, কতটি গ্যারেজে রয়েছে, কতটি নতুন তৈরি হচ্ছে এবং কতটি মেরামত করে আবার রাস্তায় নামানো হচ্ছে, তার সমন্বিত হিসাব ছাড়া কার্যকর পরিকল্পনা করা কঠিন।

তিনি বলেন, শুধু রিকশা আটক করে সমস্যার সমাধান হবে না। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, মোটর ও ব্যাটারি সরবরাহকারী, মালিক এবং গ্যারেজ পরিচালনাকারীদেরও নিবন্ধনের আওতায় আনতে হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, পূর্ণাঙ্গ তথ্যভাণ্ডার না থাকায় একদিকে যানবাহনের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ যাচ্ছে না। অন্যদিকে অভিযান ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের ফল মূল্যায়নও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

নিবন্ধনের মাধ্যমে প্রতিটি রিকশার মালিকানা, উৎপাদনস্থল, কারিগরি বৈশিষ্ট্য, অনুমোদিত রুট এবং চার্জিং ব্যবস্থার তথ্য সংরক্ষণ করা গেলে তদারকি সহজ হবে। বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. এহসানের নেতৃত্বে গবেষকরা ব্যাটারিচালিত রিকশার বিকল্প নিরাপদ নকশা তৈরিতে কাজ করেছেন। অধ্যাপক এহসান জানান, এসব যান তৈরিতে অভিন্ন মানদণ্ডের অভাব রয়েছে।

বিভিন্ন নকশার রিকশায় দুর্বল ব্রেকব্যবস্থার মতো সমস্যাও দেখা গেছে। তার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, একই নামে পরিচিত হলেও সব ব্যাটারিচালিত রিকশার কাঠামো এক নয়। কোনোটি পুরোনো প্যাডেলচালিত রিকশায় মোটর ও ব্যাটারি যুক্ত করে তৈরি করা হয়েছে। আবার কোনোটি নতুন কাঠামোয় নির্মিত। ফলে যানগুলোর ব্রেক, স্টিয়ারিং, চাকার মান, ব্যাটারির অবস্থান, বৈদ্যুতিক সংযোগ ও বডির ভারসাম্যে পার্থক্য রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণের প্রথম শর্ত হলো পূর্ণাঙ্গ তথ্যভাণ্ডার তৈরি। রাজধানীতে কতটি রিকশা চলছে, কোনটির মালিক কে, কোথায় তৈরি হয়েছে, কোথায় চার্জ হয় এবং কোন রুটে চলাচলের অনুমতি রয়েছে, এসব তথ্য সমন্বিত ব্যবস্থায় সংরক্ষণ করতে হবে। প্রতিটি যান নিবন্ধনের আওতায় এনে কিউআর কোডের মাধ্যমে শনাক্ত করা গেলে মালিকানা যাচাই, অনুমোদিত রুটে চলাচল এবং আইন ভঙ্গের ঘটনায় দায় নির্ধারণ সহজ হতে পারে।

পাশাপাশি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও যন্ত্রাংশ সরবরাহকারীদের নিবন্ধন, কারিগরি মান যাচাই এবং নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। তবে নিবন্ধন করলেই সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। চালকের প্রশিক্ষণ, বয়স ও দক্ষতা যাচাই, নির্ধারিত রুটে চলাচল, গতি নিয়ন্ত্রণ, যাত্রী ওঠা-নামার নির্দিষ্ট স্থান এবং নিরাপদ চার্জিং অবকাঠামো নিশ্চিত করাও জরুরি।

একই সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও সিটি করপোরেশনের মধ্যে সমন্বয় এবং নিয়মিত তদারকি থাকতে হবে। ব্যাটারিচালিত রিকশা এখন রাজধানীর পরিবহন বাস্তবতার অংশ। স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতের সুবিধা এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে এসব যান। পাশাপাশি নগর ব্যবস্থাপনা ও সড়ক নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জও হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে শুধু রিকশার সংখ্যা কমানো কিংবা মাঝে মধ্যে অভিযান চালানো যথেষ্ট নয়।

প্রয়োজন নিরাপদ যানবাহন, দক্ষ চালক, নিয়ন্ত্রিত উৎপাদন, অনুমোদিত চার্জিং ব্যবস্থা এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা। তা না হলে অভিযান চলবে, আটক রিকশা আবার সড়কে ফিরবে, আর নগরবাসীর ভোগান্তিও থেকে যাবে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

Nagorik Sangram

Popular Post

দেশে কমছে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ, কারণ ব্যাখ্যা করলেন বিশ্লেষকরা

রাজধানীর সড়কে বাড়ছে নিয়ন্ত্রণহীন ব্যাটারিচালিত রিকশার দাপট

Update Time : 12:37:00 am, Tuesday, 13 October 2026

রাজধানীর সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশার দাপট থামছেই না। পাড়া-মহল্লার অলিগলি ছাড়িয়ে এসব যান চলাচল করছে ব্যস্ত প্রধান সড়কেও। ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য, উল্টোপথে চলাচল, দ্রুতগতিতে লেন পরিবর্তন এবং যেখানে সেখানে যাত্রী ওঠা-নামার কারণে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও যানজট।

‘বাংলার টেসলা’ নামে পরিচিত এসব তিন চাকার বাহন এখন ঢাকার সড়ক ব্যবস্থাপনার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। মিরপুর, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী, খিলক্ষেত, কুড়িল, উত্তরা থেকে পুরান ঢাকা— নগরীর প্রায় সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়েছে ব্যাটারিচালিত রিকশা। এসব যানকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে উৎপাদন কারখানা, মোটর ও ব্যাটারির দোকান, গ্যারেজ এবং চার্জিং পয়েন্টের বিশাল নেটওয়ার্ক।

স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতের সহজ ও তুলনামূলক সাশ্রয়ী মাধ্যম হওয়ায় নগরবাসীর একটি বড় অংশ এসব রিকশার ওপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত চলাচল, কারিগরি ত্রুটি এবং অপরিকল্পিত চার্জিং ব্যবস্থা তৈরি করছে সড়ক নিরাপত্তা ও নগর ব্যবস্থাপনার বহুমুখী সংকট। অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে একের পর এক অভিযানেও থামছে না বেপরোয়া চলাচল। নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে প্রতিদিনই নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে উঠে যাচ্ছে ব্যাটারিচালিত রিকশা।

কোথাও বাস কিংবা অন্য যানবাহনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটছে। কোথাও আবার ইউটার্ন ও সিগন্যালের কাছে এলোমেলোভাবে দাঁড়িয়ে সৃষ্টি করছে যানজট। অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিসুর রহমান বলেছেন, প্রধান সড়কে এসব যান চলাচল বন্ধে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চলছে। তিনি বলেন, প্রধান সড়কে অবৈধ যান চলাচলে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করা হচ্ছে।

এদিকে ব্যাটারিচালিত রিকশার নিবন্ধন, ফিটনেস, চলাচল নিয়ন্ত্রণ, চার্জিং স্টেশন ও গ্যারেজ ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে— এমন কথা সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, ব্যাটারিচালিত রিকশার নিবন্ধন, ফিটনেস, চার্জিং স্টেশন ও গ্যারেজ ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে নীতিগত কাজ এগিয়ে চলছে।

প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা সংশ্লিষ্ট কারিগরি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যানবাহনের নকশা ও কারিগরি মান যাচাই, ট্রাফিক বিভাগের ফিটনেস সনদ এবং সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার মাধ্যমে নিবন্ধনের বিষয় রয়েছে। নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে আগের একাধিক উদ্যোগ এবং অভিযানেও যেখানে এসব বাহনের বিস্তার ঠেকানো যায়নি; এবার নতুন নীতিমালা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, নীতিমালা প্রণয়ন আর মাঠপর্যায়ে তার বাস্তবায়ন এক বিষয় নয়। এর আগে বিভিন্ন সময়ে ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ গ্যারেজ ও চার্জিং পয়েন্টে অভিযান এবং বিকল্প নকশার রিকশা চালুর উদ্যোগ নিলেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান পরিবর্তন হয়নি। ২০২৪ সালের ১৯ নভেম্বর হাইকোর্ট ঢাকার সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বন্ধে তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।

পরে ২৫ নভেম্বর আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত ওই নির্দেশনার ওপর এক মাসের স্থিতাবস্থা দেন। ফলে হাইকোর্টের নির্দেশ তাৎক্ষণিকভাবে পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা হিসেবে কার্যকর হয়নি। এরপরও বিভিন্ন সময়ে প্রধান সড়কে এসব যান চলাচল বন্ধে অভিযান চালানো হয়েছে। কিন্তু একদিকে অভিযান, অন্যদিকে নতুন রিকশা তৈরি ও সড়কে নামানোর প্রবণতা অব্যাহত থাকায় নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি।

সূত্র জানায়, ব্যাটারিচালিত রিকশার বিস্তারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে চার্জিং পয়েন্ট ও গ্যারেজের সংখ্যা। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর ১০টি অপরাধ বিভাগের আটটিতে ৪৮ হাজার ১৩৬টি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট এবং ৯৯২টি গ্যারেজ শনাক্ত করা হয়েছে। এর বিপরীতে অনুমোদিত চার্জিং স্টেশন রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৩০০টি। এই পরিসংখ্যান রাজধানীর ব্যাটারিচালিত রিকশার চার্জিং অবকাঠামোর বড় একটি অংশ অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থায় গড়ে ওঠার চিত্র তুলে ধরে।

এসব স্থাপনার বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। রাজধানীর রূপনগরের রিকশাচালক সাহেব আলী ব্যাপারী জানান, ব্যাটারিচালিত রিকশা চার্জ দিতে তাকে কাছের একটি গ্যারেজে প্রতিদিন ১২০ টাকা দিতে হয়। বড় রিকশার ক্ষেত্রে চার্জের খরচ আরও বেশি। তার ভাষ্য, আগে ওই এলাকায় ১৫ থেকে ২০টি গ্যারেজ ছিল।

এখন প্রায় প্রতিটি গলিতেই গ্যারেজ গড়ে উঠেছে। গ্যারেজের এই বিস্তার শুধু চার্জ দেওয়ার চাহিদার প্রতিফলন নয়, বরং ব্যাটারিচালিত রিকশাকে ঘিরে গড়ে ওঠা বড় অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কেরও ইঙ্গিত। উৎপাদনকারী, মোটর ও ব্যাটারি সরবরাহকারী, মালিক, চালক এবং গ্যারেজ পরিচালনাকারীদের জীবিকা এর সঙ্গে যুক্ত। ফলে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হলে সড়কে অভিযান চালানোর পাশাপাশি এই পুরো ব্যবস্থাকে বিবেচনায় নিতে হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজধানীতে ঠিক কতটি ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করছে, তার নির্ভরযোগ্য ও সমন্বিত সরকারি হিসাব এখনো স্পষ্ট নয়। তবে যাত্রীকল্যাণ সমিতিসহ বিভিন্ন সংগঠনের হিসাবে, এ সংখ্যা ১০ লক্ষাধিক। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, নগরীতে কতটি রিকশা সড়কে চলছে, কতটি গ্যারেজে রয়েছে, কতটি নতুন তৈরি হচ্ছে এবং কতটি মেরামত করে আবার রাস্তায় নামানো হচ্ছে, তার সমন্বিত হিসাব ছাড়া কার্যকর পরিকল্পনা করা কঠিন।

তিনি বলেন, শুধু রিকশা আটক করে সমস্যার সমাধান হবে না। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, মোটর ও ব্যাটারি সরবরাহকারী, মালিক এবং গ্যারেজ পরিচালনাকারীদেরও নিবন্ধনের আওতায় আনতে হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, পূর্ণাঙ্গ তথ্যভাণ্ডার না থাকায় একদিকে যানবাহনের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ যাচ্ছে না। অন্যদিকে অভিযান ও নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের ফল মূল্যায়নও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

নিবন্ধনের মাধ্যমে প্রতিটি রিকশার মালিকানা, উৎপাদনস্থল, কারিগরি বৈশিষ্ট্য, অনুমোদিত রুট এবং চার্জিং ব্যবস্থার তথ্য সংরক্ষণ করা গেলে তদারকি সহজ হবে। বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. এহসানের নেতৃত্বে গবেষকরা ব্যাটারিচালিত রিকশার বিকল্প নিরাপদ নকশা তৈরিতে কাজ করেছেন। অধ্যাপক এহসান জানান, এসব যান তৈরিতে অভিন্ন মানদণ্ডের অভাব রয়েছে।

বিভিন্ন নকশার রিকশায় দুর্বল ব্রেকব্যবস্থার মতো সমস্যাও দেখা গেছে। তার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, একই নামে পরিচিত হলেও সব ব্যাটারিচালিত রিকশার কাঠামো এক নয়। কোনোটি পুরোনো প্যাডেলচালিত রিকশায় মোটর ও ব্যাটারি যুক্ত করে তৈরি করা হয়েছে। আবার কোনোটি নতুন কাঠামোয় নির্মিত। ফলে যানগুলোর ব্রেক, স্টিয়ারিং, চাকার মান, ব্যাটারির অবস্থান, বৈদ্যুতিক সংযোগ ও বডির ভারসাম্যে পার্থক্য রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণের প্রথম শর্ত হলো পূর্ণাঙ্গ তথ্যভাণ্ডার তৈরি। রাজধানীতে কতটি রিকশা চলছে, কোনটির মালিক কে, কোথায় তৈরি হয়েছে, কোথায় চার্জ হয় এবং কোন রুটে চলাচলের অনুমতি রয়েছে, এসব তথ্য সমন্বিত ব্যবস্থায় সংরক্ষণ করতে হবে। প্রতিটি যান নিবন্ধনের আওতায় এনে কিউআর কোডের মাধ্যমে শনাক্ত করা গেলে মালিকানা যাচাই, অনুমোদিত রুটে চলাচল এবং আইন ভঙ্গের ঘটনায় দায় নির্ধারণ সহজ হতে পারে।

পাশাপাশি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও যন্ত্রাংশ সরবরাহকারীদের নিবন্ধন, কারিগরি মান যাচাই এবং নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। তবে নিবন্ধন করলেই সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। চালকের প্রশিক্ষণ, বয়স ও দক্ষতা যাচাই, নির্ধারিত রুটে চলাচল, গতি নিয়ন্ত্রণ, যাত্রী ওঠা-নামার নির্দিষ্ট স্থান এবং নিরাপদ চার্জিং অবকাঠামো নিশ্চিত করাও জরুরি।

একই সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও সিটি করপোরেশনের মধ্যে সমন্বয় এবং নিয়মিত তদারকি থাকতে হবে। ব্যাটারিচালিত রিকশা এখন রাজধানীর পরিবহন বাস্তবতার অংশ। স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতের সুবিধা এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে এসব যান। পাশাপাশি নগর ব্যবস্থাপনা ও সড়ক নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জও হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে শুধু রিকশার সংখ্যা কমানো কিংবা মাঝে মধ্যে অভিযান চালানো যথেষ্ট নয়।

প্রয়োজন নিরাপদ যানবাহন, দক্ষ চালক, নিয়ন্ত্রিত উৎপাদন, অনুমোদিত চার্জিং ব্যবস্থা এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা। তা না হলে অভিযান চলবে, আটক রিকশা আবার সড়কে ফিরবে, আর নগরবাসীর ভোগান্তিও থেকে যাবে।