11:27 am, Saturday, 7 November 2026

আমার চোখে সিপাহি-জনতার বিপ্লব

আমার চোখে সিপাহি-জনতার বিপ্লব

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

ইতিহাসের কিছুদিন শুধু ক্যালেন্ডারের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না; সেগুলো মানুষের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে মিশে যায়। সময়ের ব্যবধানে অনেক কিছু ভুলে যাওয়া যায়, কিন্তু কিছু দৃশ্য, কিছু অনুভূতি, কিছু মুহূর্ত কখনোই বিস্মৃত হওয়া সম্ভব নয়।

১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের ঘটনাবলি আমার জীবনের তেমনই এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। তখন আমি ঢাকা কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র। জীবনের একেবারে তরুণ সময়। চোখে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন, মনে ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যাশা। কিন্তু দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তখন এমন এক অস্থির ও অনিশ্চিত পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, একজন সাধারণ ছাত্র হয়েও ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে নিজেকে আবিষ্কার করেছিলাম।

৩ নভেম্বর : রাজনৈতিক অস্থিরতার সূচনা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকা-ের পর বাংলাদেশ গভীর রাজনৈতিক সংকটে পড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয়। একই রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়।

দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছিল। নানা খবর, গুজব, অনিশ্চয়তা এবং উদ্বেগ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। তখন আমি ঢাকার তাঁতীবাজারে আমার এক আত্মীয়ের বাসায় থাকতাম। এলাকাটি ছিল হিন্দু অধ্যুষিত। ৬ নভেম্বর মধ্যরাত থেকে নানা খবর শুনতে পেলামÑ এলাকায় দাঙ্গা বা সংঘর্ষের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। সারারাত নির্ঘুম কাটালাম।

খুব ভোরে গায়ে চাদর জড়িয়ে, আত্মরক্ষার জন্য হাতে একটি লোহার রড নিয়ে বাসা থেকে বের হলাম। তাঁতীবাজারের রাস্তায় বের হয়ে এলাকার হিন্দু ভাইদের আমাদের দিকে আড়চোখে তাকাতে দেখলাম। সেই দৃষ্টি আমার মনে আরও ভয় সৃষ্টি করেছিল। তখন আমার একটাই চিন্তাÑ যেভাবেই হোক মূল সড়কে পৌঁছাতে হবে। আমার লক্ষ্য ছিল বাবুপুরা পুলিশ ফাঁড়ি। মনে হয়েছিল, সেখানে পৌঁছাতে পারলেই মূল সড়কে ওঠা যাবে এবং হয়তো নিরাপদ বোধ করব।

একজন কলেজপড়ুয়া তরুণের জীবনে এমন সকাল আসতে পারে, তা কখনো কল্পনাও করিনি। মূল সড়কে এক অভাবনীয় দৃশ্য। বাবুপুরা পুলিশ ফাঁড়ির দিকে এগিয়ে মূল সড়কে পৌঁছানোর পর যে দৃশ্য দেখলাম, তা আমার কল্পনারও বাইরে। ট্যাংকের ওপর ছাত্র-জনতাকে দেখে আমিও উঠে পড়লাম। সেই মুহূর্তে আমার মনে যে অনুভূতি হয়েছিল, তা আজও ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। মনে হয়েছিল, দেশ যেন নতুন করে স্বাধীন হলো!

মানুষের মুখে মুখে ধ্বনিত হচ্ছিলÑ ‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই! সেই স্লোগানের মধ্যে যেন মানুষের ঐক্য, প্রত্যাশা ও নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন খুঁজে পেয়েছিলাম। জিয়াউর রহমানকে ঘিরে সেই সময়ের আবেগ সেদিনের সিপাহি-জনতার মধ্যে জেনারেল জিয়াউর রহমানকে ঘিরে এক বিশেষ আবেগ ও প্রত্যাশা অনুভব করেছিলাম। আমার নিজের তরুণ মনে তখন ধারণা জন্মেছিলÑ জিয়াউর রহমানই হয়তো দেশের নেতৃত্ব দেবেন এবং দেশের মানুষ ও বাংলাদেশের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করবেন।

তাকে কেন্দ্র করে মানুষের যে উচ্ছ্বাস ও প্রত্যাশা দেখেছিলাম, তা আমার স্মৃতিতে আজও অমলিন। পুরান ঢাকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা কলেজ : উত্তাল জনতার নগরী- সেদিন পুরান ঢাকার পরিবেশ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। একদিকে মানুষের উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে রাজনৈতিক পরিবর্তনকে ঘিরে উচ্ছ্বাস ও জনতার সক্রিয় উপস্থিতি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার চিত্র ছিল একই রকম। ছাত্রদের মধ্যে নতুন আবেগ, নতুন প্রত্যাশা এবং রাজনৈতিক ঘটনাবলিকে ঘিরে প্রবল উত্তেজনা। ঢাকা কলেজের সামনে মিরপুর রোডে এসে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হলো। আমরা একত্রিত হলাম। চারদিকে তখন এক নতুন আবেগের পরিবেশ। বন্ধুদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে সেই দিনের দৃশ্য দেখছিলাম। সেদিনের সমগ্র ঢাকা নগরীর চিত্র সেদিনের ঢাকা ছিল যেন এক বিশাল রাজনৈতিক মঞ্চ।

পুরান ঢাকা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ থেকে শহরের বিভিন্ন সড়কÑ সব জায়গায় মানুষের উপস্থিতি ও ঘটনাবলির ভিন্ন ভিন্ন চিত্র ছিল শিহরণ জাগানোর মতো। সংসদ ভবন এলাকার কাছাকাছি এসে জানতে পারলাম ৭ নভেম্বর সকালে সংসদ ভবনের কাছে (শেরেবাংলা নগর ও তৎকালীন ১০ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ক্যাম্পের প্রাঙ্গণে) পাল্টা অভ্যুত্থানে নিহত হন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বীর সেনানি ও উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তারা।

একদিকে মানুষের উচ্ছ্বাস, রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রত্যাশা ও নতুন আবেগ; অন্যদিকে মৃত্যু, সহিংসতা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার নির্মম বাস্তবতা। সেদিন উপলব্ধি করেছিলাম, ইতিহাসের কোনো মুহূর্তই একমাত্রিক নয়। একই সময়ে মানুষের আনন্দ, আশা, ভয়, শোক ও অনিশ্চয়তা পাশাপাশি অবস্থান করতে পারে। ক্যান্টনমেন্ট এলাকার চিত্র ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় মানুষের যে উচ্ছ্বাস ও জনসমাগম দেখেছিলাম, ক্যান্টনমেন্ট এলাকার পরিস্থিতি ছিল তার থেকে ভিন্ন।

সেখানে পরিবেশের মধ্যে ছিল অন্য ধরনের সামরিক বাস্তবতা, নিয়ন্ত্রণ ও সতর্কতা। শহরের জনতার আবেগ এবং ক্যান্টনমেন্টের পরিস্থিতির মধ্যে যে পার্থক্য ছিল, তা আমার কাছে বিশেষভাবে লক্ষণীয় মনে হয়েছিল। একই শহর, একই দিন, অথচ বিভিন্ন এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিÑএ যেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। গোটা ঢাকা শহরজুড়ে ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব অধ্যায়।

সেদিন ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় যে দৃশ্য দেখেছি, তা আজও আমার স্মৃতিতে জীবন্ত। তখন বুঝতে পারিনি, ইতিহাসের এত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়ের প্রত্যক্ষ সাক্ষী হয়ে যাচ্ছি। আজ এত বছর পর জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ফিরে দেখা ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর আমার কাছে শুধু একটি রাজনৈতিক তারিখ নয়। এটি আমার ছাত্রজীবনের এক আবেগময়, উত্তাল ও স্মরণীয় দিন।

ইতিহাসের রাজনৈতিক মূল্যায়ন নিয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীর স্মৃতি ইতিহাসের একটি মূল্যবান অংশ। আমি কোনো ইতিহাসবিদ নই। আমি সেই সময়ের একজন তরুণ ছাত্র, যিনি তাঁতীবাজারের নির্ঘুম রাত, ভোরের আতঙ্ক, পুরান ঢাকার পরিস্থিতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তাল পরিবেশ, ঢাকা কলেজের সামনে বন্ধুদের সঙ্গে নতুন আবেগ এবং সংসদ ভবন ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকার ভিন্ন বাস্তবতা নিজের চোখে দেখেছি।

আজ প্রায় অর্ধশতাব্দী পর সেই স্মৃতি লিখে রাখার চেষ্টা করছি। ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় লেখা থাকে না; ইতিহাস বেঁচে থাকে মানুষের চোখে দেখা ঘটনা, অনুভূতি এবং স্মৃতির মধ্যে। ৭ নভেম্বর ১৯৭৫Ñআমার জীবনের এমন একটি দিন, যার স্মৃতি কখনো মুছে যাওয়ার নয়।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

Nagorik Sangram

Popular Post

আমার চোখে সিপাহি-জনতার বিপ্লব

Update Time : 10:57:52 am, Saturday, 7 November 2026

ইতিহাসের কিছুদিন শুধু ক্যালেন্ডারের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না; সেগুলো মানুষের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে মিশে যায়। সময়ের ব্যবধানে অনেক কিছু ভুলে যাওয়া যায়, কিন্তু কিছু দৃশ্য, কিছু অনুভূতি, কিছু মুহূর্ত কখনোই বিস্মৃত হওয়া সম্ভব নয়।

১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের ঘটনাবলি আমার জীবনের তেমনই এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। তখন আমি ঢাকা কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র। জীবনের একেবারে তরুণ সময়। চোখে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন, মনে ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যাশা। কিন্তু দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তখন এমন এক অস্থির ও অনিশ্চিত পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, একজন সাধারণ ছাত্র হয়েও ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে নিজেকে আবিষ্কার করেছিলাম।

৩ নভেম্বর : রাজনৈতিক অস্থিরতার সূচনা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকা-ের পর বাংলাদেশ গভীর রাজনৈতিক সংকটে পড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয়। একই রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়।

দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছিল। নানা খবর, গুজব, অনিশ্চয়তা এবং উদ্বেগ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। তখন আমি ঢাকার তাঁতীবাজারে আমার এক আত্মীয়ের বাসায় থাকতাম। এলাকাটি ছিল হিন্দু অধ্যুষিত। ৬ নভেম্বর মধ্যরাত থেকে নানা খবর শুনতে পেলামÑ এলাকায় দাঙ্গা বা সংঘর্ষের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। সারারাত নির্ঘুম কাটালাম।

খুব ভোরে গায়ে চাদর জড়িয়ে, আত্মরক্ষার জন্য হাতে একটি লোহার রড নিয়ে বাসা থেকে বের হলাম। তাঁতীবাজারের রাস্তায় বের হয়ে এলাকার হিন্দু ভাইদের আমাদের দিকে আড়চোখে তাকাতে দেখলাম। সেই দৃষ্টি আমার মনে আরও ভয় সৃষ্টি করেছিল। তখন আমার একটাই চিন্তাÑ যেভাবেই হোক মূল সড়কে পৌঁছাতে হবে। আমার লক্ষ্য ছিল বাবুপুরা পুলিশ ফাঁড়ি। মনে হয়েছিল, সেখানে পৌঁছাতে পারলেই মূল সড়কে ওঠা যাবে এবং হয়তো নিরাপদ বোধ করব।

একজন কলেজপড়ুয়া তরুণের জীবনে এমন সকাল আসতে পারে, তা কখনো কল্পনাও করিনি। মূল সড়কে এক অভাবনীয় দৃশ্য। বাবুপুরা পুলিশ ফাঁড়ির দিকে এগিয়ে মূল সড়কে পৌঁছানোর পর যে দৃশ্য দেখলাম, তা আমার কল্পনারও বাইরে। ট্যাংকের ওপর ছাত্র-জনতাকে দেখে আমিও উঠে পড়লাম। সেই মুহূর্তে আমার মনে যে অনুভূতি হয়েছিল, তা আজও ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। মনে হয়েছিল, দেশ যেন নতুন করে স্বাধীন হলো!

মানুষের মুখে মুখে ধ্বনিত হচ্ছিলÑ ‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই! সেই স্লোগানের মধ্যে যেন মানুষের ঐক্য, প্রত্যাশা ও নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন খুঁজে পেয়েছিলাম। জিয়াউর রহমানকে ঘিরে সেই সময়ের আবেগ সেদিনের সিপাহি-জনতার মধ্যে জেনারেল জিয়াউর রহমানকে ঘিরে এক বিশেষ আবেগ ও প্রত্যাশা অনুভব করেছিলাম। আমার নিজের তরুণ মনে তখন ধারণা জন্মেছিলÑ জিয়াউর রহমানই হয়তো দেশের নেতৃত্ব দেবেন এবং দেশের মানুষ ও বাংলাদেশের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করবেন।

তাকে কেন্দ্র করে মানুষের যে উচ্ছ্বাস ও প্রত্যাশা দেখেছিলাম, তা আমার স্মৃতিতে আজও অমলিন। পুরান ঢাকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা কলেজ : উত্তাল জনতার নগরী- সেদিন পুরান ঢাকার পরিবেশ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। একদিকে মানুষের উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে রাজনৈতিক পরিবর্তনকে ঘিরে উচ্ছ্বাস ও জনতার সক্রিয় উপস্থিতি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার চিত্র ছিল একই রকম। ছাত্রদের মধ্যে নতুন আবেগ, নতুন প্রত্যাশা এবং রাজনৈতিক ঘটনাবলিকে ঘিরে প্রবল উত্তেজনা। ঢাকা কলেজের সামনে মিরপুর রোডে এসে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হলো। আমরা একত্রিত হলাম। চারদিকে তখন এক নতুন আবেগের পরিবেশ। বন্ধুদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে সেই দিনের দৃশ্য দেখছিলাম। সেদিনের সমগ্র ঢাকা নগরীর চিত্র সেদিনের ঢাকা ছিল যেন এক বিশাল রাজনৈতিক মঞ্চ।

পুরান ঢাকা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ থেকে শহরের বিভিন্ন সড়কÑ সব জায়গায় মানুষের উপস্থিতি ও ঘটনাবলির ভিন্ন ভিন্ন চিত্র ছিল শিহরণ জাগানোর মতো। সংসদ ভবন এলাকার কাছাকাছি এসে জানতে পারলাম ৭ নভেম্বর সকালে সংসদ ভবনের কাছে (শেরেবাংলা নগর ও তৎকালীন ১০ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ক্যাম্পের প্রাঙ্গণে) পাল্টা অভ্যুত্থানে নিহত হন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বীর সেনানি ও উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তারা।

একদিকে মানুষের উচ্ছ্বাস, রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রত্যাশা ও নতুন আবেগ; অন্যদিকে মৃত্যু, সহিংসতা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার নির্মম বাস্তবতা। সেদিন উপলব্ধি করেছিলাম, ইতিহাসের কোনো মুহূর্তই একমাত্রিক নয়। একই সময়ে মানুষের আনন্দ, আশা, ভয়, শোক ও অনিশ্চয়তা পাশাপাশি অবস্থান করতে পারে। ক্যান্টনমেন্ট এলাকার চিত্র ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় মানুষের যে উচ্ছ্বাস ও জনসমাগম দেখেছিলাম, ক্যান্টনমেন্ট এলাকার পরিস্থিতি ছিল তার থেকে ভিন্ন।

সেখানে পরিবেশের মধ্যে ছিল অন্য ধরনের সামরিক বাস্তবতা, নিয়ন্ত্রণ ও সতর্কতা। শহরের জনতার আবেগ এবং ক্যান্টনমেন্টের পরিস্থিতির মধ্যে যে পার্থক্য ছিল, তা আমার কাছে বিশেষভাবে লক্ষণীয় মনে হয়েছিল। একই শহর, একই দিন, অথচ বিভিন্ন এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিÑএ যেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। গোটা ঢাকা শহরজুড়ে ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব অধ্যায়।

সেদিন ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় যে দৃশ্য দেখেছি, তা আজও আমার স্মৃতিতে জীবন্ত। তখন বুঝতে পারিনি, ইতিহাসের এত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়ের প্রত্যক্ষ সাক্ষী হয়ে যাচ্ছি। আজ এত বছর পর জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ফিরে দেখা ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর আমার কাছে শুধু একটি রাজনৈতিক তারিখ নয়। এটি আমার ছাত্রজীবনের এক আবেগময়, উত্তাল ও স্মরণীয় দিন।

ইতিহাসের রাজনৈতিক মূল্যায়ন নিয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীর স্মৃতি ইতিহাসের একটি মূল্যবান অংশ। আমি কোনো ইতিহাসবিদ নই। আমি সেই সময়ের একজন তরুণ ছাত্র, যিনি তাঁতীবাজারের নির্ঘুম রাত, ভোরের আতঙ্ক, পুরান ঢাকার পরিস্থিতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তাল পরিবেশ, ঢাকা কলেজের সামনে বন্ধুদের সঙ্গে নতুন আবেগ এবং সংসদ ভবন ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকার ভিন্ন বাস্তবতা নিজের চোখে দেখেছি।

আজ প্রায় অর্ধশতাব্দী পর সেই স্মৃতি লিখে রাখার চেষ্টা করছি। ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় লেখা থাকে না; ইতিহাস বেঁচে থাকে মানুষের চোখে দেখা ঘটনা, অনুভূতি এবং স্মৃতির মধ্যে। ৭ নভেম্বর ১৯৭৫Ñআমার জীবনের এমন একটি দিন, যার স্মৃতি কখনো মুছে যাওয়ার নয়।