2:21 pm, Friday, 6 November 2026

গ্যাংয়ের কাছে মিলল ভয়ংকর ক্রেডিট কার্ড সদৃশ আগ্নেয়াস্ত্র কার্ডগান

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

কার্ডগান একধরনের ক্ষুদ্র আগ্নেয়াস্ত্র। দেখতে অনেকটা ক্রেডিট কার্ডের মতো। প্রথম দেখায় এটাকে অস্ত্র বলে মনে হয় না। কিন্তু এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে গুলি ছোড়ার ব্যবস্থা। অস্ত্রটি ভাঁজ করলে কার্ডের মতো হয়ে যায়।

সাধারণ তল্লাশিতে চোখ এড়িয়ে যায়। এই ভয়ংকর আগ্নেয়াস্ত্র এখন রাজধানী ও আশপাশের এলাকার গ্যাংয়ের হাতে। র‌্যাবের অভিযানে কিশোর গ্যাং লিডার অ্যালেক্স ইমন হত্যা মামলার এক আসামির কাছ থেকে অত্যাধুনিক এই কার্ডগান উদ্ধারের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ভাবিয়ে তুলেছে বিষয়টি। অস্ত্রটি এমন ‘সিক্রেট’ যে, এর অধিকাংশ বহনকারী কিংবা ব্যবহারকারী সন্দেহের বাইরেই থেকে যায়।

খালি চোখে দেখে এসব অস্ত্র জব্দ করা কঠিন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, যেহেতু র‌্যাবের অভিযানে একটি কার্ডগান উদ্ধার হয়েছে, তাই অপরাধীদের হাতে এই আগ্নেয়াস্ত্র ছড়িয়ে থাকা অমূলক নয়। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এতে শুধু অপরাধীদের অস্ত্র ব্যবহারের ধরন বদলের ইঙ্গিতই মিলছে না, সামনে আসছে আরো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

এই অস্ত্র দেশে আসছে কীভাবে? কারা সরবরাহ করছে? অপরাধীদের হাতে পৌঁছে দিচ্ছে কারা? জানা গেছে, কিশোর গ্যাং লিডার অ্যালেক্স ইমন হত্যায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করতে গিয়ে কেরাণীগঞ্জের শাক্তা ইউনিয়নের কোলচর এলাকায় গত ১৪ আগস্ট অভিযান চালায় র‌্যাব ২-এর একটি দল। সেখানে হৃদয় নামে এক তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় একটি কার্ডগান ও এক রাউন্ড গুলি।

একই অভিযানে আরও একাধিক আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো অস্ত্র জব্দ করে র‌্যাব। অভিযানে নেতৃত্বধানকারী কর্মকর্তা এএসপি হাসান মুহতারিম জানান, অস্ত্রটির বৈশিষ্ট্য বিস্ময়কর। ভাঁজ করা অবস্থায় এটি দেখতে অনেকটা ক্রেডিট বা বিজনেস কার্ডের মতো। ফলে মানিব্যাগে রাখা কোনো কার্ডের সঙ্গে সেটিকে আলাদা করা কঠিন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উদ্ধারকৃত অস্ত্রটি মার্কিন অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেইল ব্লেজার ফায়ার আর্মসের তৈরি লাইফ কার্ড মডেলের বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এটি একনলা এবং একবার গুলি ছোড়ার উপযোগী পয়েন্ট টু-টু এলআর ক্যালিবারের আগ্নেয়াস্ত্র। ক্রেডিট বা বিজনেস কার্ডের মতো দেখতে অস্ত্রটি সংকর ধাতু ও অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি এবং তুলনামূলকভাবে হালকা। এর গ্রিপের ভেতরে অতিরিক্ত চারটি গুলি রাখার জায়গা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট একজন র‌্যাব কর্মকর্তা জানান, উদ্ধার করার পর অস্ত্রটি নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদেরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয়েছে।

দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর অস্ত্রটি খুলে এর ভেতরে তাজা গুলি পাওয়া যায়। ওই কর্মকর্তার ভাষ্য, বাইরে থেকে দেখলে এটিকে অস্ত্র বলে সন্দেহ করার সুযোগ খুবই কম। ফলে কার্ডগানের উপস্থিতি সাধারণ তল্লাশিব্যবস্থার জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। এ ধরনের আরও অস্ত্র কারো কাছে রয়েছে কি না, তা জানতে গোয়েন্দা অনুসন্ধান অব্যাহত আছে। এ ছাড়া এই অস্ত্র বাংলাদেশে কীভাবে এলো, কে বা কারা সরবরাহ করেছে এবং এর সঙ্গে কোনো চোরাচালান নেটওয়ার্ক জড়িত কি না- এসব বিষয় খতিয়ে দেখছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, অস্ত্রকে অন্য কোনো সাধারণ পণ্যের আকার দেওয়ার ঘটনা বিশ্বে নতুন নয়। বিভিন্ন দেশে কলম, লাইটার, ছাতা, বেল্টসহ বিভিন্ন সামগ্রীর আদলে তৈরি অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে। বাংলাদেশে পেনগান এসবের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণগুলোর একটি। কলমের আদলে তৈরি ছোট আগ্নেয়াস্ত্র ইতোপূর্বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরে এসেছে।

তবে কেরাণীগঞ্জে উদ্ধার হওয়া কার্ড পিস্তল বা কার্ডগান নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরির কারণ এর আকার। তিনি বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ নিয়ে এত দিন আলোচনায় ছিল ছুরি, চাপাতি, ককটেল কিংবা দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র। এখন যদি সহজে লুকিয়ে রাখা যায় এমন ক্ষুদ্র আগ্নেয়াস্ত্রও তাদের হাতে পৌঁছাতে শুরু করে, তাহলে বিষয়টি শুধু অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

এসব অস্ত্র কোথা থেকে আসছে, কারা সরবরাহ করছে, অপরাধী চক্র এসব অস্ত্র সংগ্রহে নতুন কোনো নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে কি না- এসব বিষয় খতিয়ে দেখতে হবে। এ ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের হাতে বিদেশি অস্ত্র পৌঁছানোর পেছনে স্থানীয় অপরাধী চক্র, অস্ত্র ব্যবসায়ী কিংবা বড় কোনো সরবরাহ নেটওয়ার্কের ভূমিকা আছে কি না, তা-ও তদন্তের আওতায় আনার বিকল্প নেই।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, অপরাধীরা যখন অস্ত্র লুকাতে পোশাক, ব্যাগ কিংবা শরীরের বিভিন্ন অংশ ব্যবহার করে, তখন প্রশিক্ষিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের তল্লাশিতে তা শনাক্তের সুযোগ থাকে। কিন্তু অস্ত্রের আকৃতি যদি সাধারণ কার্ড, কলম কিংবা অন্য কোনো দৈনন্দিন ব্যবহার্য সামগ্রীর মতো হয়, তখন প্রচলিত তল্লাশিব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।

অনুসন্ধানী সূত্রে জানা গেছে, মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্প হয়ে বিভিন্ন গ্যাংয়ের হাতে গেছে কার্ডগান। জেনেভা ক্যাম্পের মাদক ডিলার ও মাফিয়াদের সঙ্গে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ আরও একটি বিশেষ দেশের মাফিয়াদের যোগাযোগ রয়েছে। তাদের মাধ্যমেই এই বিশেষ আগ্নেয়াস্ত্র এনে গ্যাংস্টারদের হাতে তুলে দেওয়া হতে পারে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, শুধু অস্ত্র উদ্ধার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; এসব অস্ত্রের উৎস, সরবরাহকারী, ক্রেতা ও ব্যবহারকারীদের নেটওয়ার্ক শনাক্ত করতে হবে।

বিশেষ করে কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে অস্ত্র ব্যবসার যোগসূত্র থাকলে সেটি ভেঙে দেওয়াই হতে পারে কার্যকর প্রতিরোধের পথ। তারা বলছেন, উৎসের সন্ধানই এখন তদন্তের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। র‌্যাব কর্মকর্তা মেজর এম মুবীন রহমান তাপস বলেন, অস্ত্রটির উৎস এবং বাংলাদেশে এর সরবরাহ নেটওয়ার্ক শনাক্তে তদন্ত চলছে। গত ৩ এপ্রিল পুরান ঢাকার নয়াবাজার এলাকায় যুবদল নেতা রাসেলকে গুলি করার ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে পেনগানের সন্ধান পায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

ঘটনায় জড়িত সন্দেহে সায়মন ও সোহেল ওরফে কাল্লুকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে কাল্লুর কাছ থেকে উদ্ধার হয় কলমসদৃশ একটি অস্ত্র। অস্ত্রটি একটি সিগারেটের প্যাকেটের মধ্যে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। বাইরে থেকে দেখতে এটি সাধারণ স্টিলের কলমের মতো। ডিবির ভাষ্য, ঢাকায় এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের তথ্য আগে তাদের কাছে ছিল না। অর্থাৎ, অস্ত্রটি শুধু ছোট নয়, এর নকশার মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে গোপনীয়তা।

পেনগান ও কার্ডগানের মধ্যে প্রযুক্তিগত পার্থক্য থাকলেও অপরাধের দৃষ্টিকোণ থেকে দুটির উদ্দেশ্যে একটি বড় মিল রয়েছে- অস্ত্রকে সাধারণ ব্যবহার্য সামগ্রীর আড়ালে লুকানো। একটি কলমের ছদ্মবেশ নেয়, অন্যটি কার্ডের। অর্থাৎ, অস্ত্রটি দৃশ্যমান না রেখেই বহন করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এ কারণেই দুটি ঘটনা পাশাপাশি রেখে দেখছেন আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকেরা।

তাদের আশঙ্কা, অপরাধী চক্রের হাতে এমন অস্ত্র পৌঁছালে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, অপহরণ কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধে ভয় দেখানোর মতো অপরাধে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে এ ধরনের ক্ষুদ্র অস্ত্র। কার্ডগান কী, দেখতে কেমন পুরোপুরি ভাঁজ করে রাখলে কার্ডগান মাত্র আধা ইঞ্চি মোটা হয় এবং ওজন হয় ১৫০ থেকে ২০০ গ্রামের মতো।

সাধারণত এটির দৈর্ঘ্য ৩.৩ ইঞ্চি এবং চওড়ায় ২.১ ইঞ্চি। এতে পয়েন্ট টু-টু এলআর বা পয়েন্ট টু-টু ডব্লিউএমআর মাপের ছোট গুলি ব্যবহার করা হয়। অস্ত্রটিতে একবারে একটি গুলি ভরা যায়। তবে এর হ্যান্ডেলের ভেতরে বাড়তি তিনটি গুলি রাখা যায়। এতে সাধারণ পিস্তলের মতো কোনো চিহ্ন থাকে না। ব্যারেলের ওপরের সোজা খাঁজ দেখে নিশানা করতে হয় ব্যবহারকারীকে।

প্রথমে পাশের একটি ছোট লক চাপ দিয়ে হ্যান্ডেলটি খুলে পিস্তলের শেপ আনতে হয়। এরপর ওপরের লক সরিয়ে ব্যারেলটি তুলে ভেতরে গুলি ভরে পেছনের ছোট হ্যামারটি টেনে লক করতে হয়। এসব কাজ শেষে ট্রিগার চাপলেই গুলি বের হয়। গুলি করার পর খালি খোসাটি পিস্তল থেকে টেনে বের করতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রে এটিকে সাধারণ পিস্তল ধরা হয়, কারণ এটি বন্ধ বা ভাঁজ করা অবস্থায় ফায়ার করা যায় না।

এটি খুলতে ও গুলি ভরতে সময় লাগে এবং মাত্র একটি গুলি করা যায়। তাই আত্মরক্ষার চেয়ে শখ বা সংগ্রহের জন্যই মানুষ এটি বেশি কেনেন।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

Nagorik Sangram

Popular Post

অধ্যক্ষ মেহেরুন্নেছার পদত্যাগের দাবিতে মধ্যরাতে সড়কে হোম ইকোনমিক্স কলেজের শিক্ষার্থীরা

গ্যাংয়ের কাছে মিলল ভয়ংকর ক্রেডিট কার্ড সদৃশ আগ্নেয়াস্ত্র কার্ডগান

Update Time : 10:27:35 pm, Saturday, 22 August 2026

কার্ডগান একধরনের ক্ষুদ্র আগ্নেয়াস্ত্র। দেখতে অনেকটা ক্রেডিট কার্ডের মতো। প্রথম দেখায় এটাকে অস্ত্র বলে মনে হয় না। কিন্তু এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে গুলি ছোড়ার ব্যবস্থা। অস্ত্রটি ভাঁজ করলে কার্ডের মতো হয়ে যায়।

সাধারণ তল্লাশিতে চোখ এড়িয়ে যায়। এই ভয়ংকর আগ্নেয়াস্ত্র এখন রাজধানী ও আশপাশের এলাকার গ্যাংয়ের হাতে। র‌্যাবের অভিযানে কিশোর গ্যাং লিডার অ্যালেক্স ইমন হত্যা মামলার এক আসামির কাছ থেকে অত্যাধুনিক এই কার্ডগান উদ্ধারের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ভাবিয়ে তুলেছে বিষয়টি। অস্ত্রটি এমন ‘সিক্রেট’ যে, এর অধিকাংশ বহনকারী কিংবা ব্যবহারকারী সন্দেহের বাইরেই থেকে যায়।

খালি চোখে দেখে এসব অস্ত্র জব্দ করা কঠিন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, যেহেতু র‌্যাবের অভিযানে একটি কার্ডগান উদ্ধার হয়েছে, তাই অপরাধীদের হাতে এই আগ্নেয়াস্ত্র ছড়িয়ে থাকা অমূলক নয়। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এতে শুধু অপরাধীদের অস্ত্র ব্যবহারের ধরন বদলের ইঙ্গিতই মিলছে না, সামনে আসছে আরো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

এই অস্ত্র দেশে আসছে কীভাবে? কারা সরবরাহ করছে? অপরাধীদের হাতে পৌঁছে দিচ্ছে কারা? জানা গেছে, কিশোর গ্যাং লিডার অ্যালেক্স ইমন হত্যায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করতে গিয়ে কেরাণীগঞ্জের শাক্তা ইউনিয়নের কোলচর এলাকায় গত ১৪ আগস্ট অভিযান চালায় র‌্যাব ২-এর একটি দল। সেখানে হৃদয় নামে এক তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় একটি কার্ডগান ও এক রাউন্ড গুলি।

একই অভিযানে আরও একাধিক আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো অস্ত্র জব্দ করে র‌্যাব। অভিযানে নেতৃত্বধানকারী কর্মকর্তা এএসপি হাসান মুহতারিম জানান, অস্ত্রটির বৈশিষ্ট্য বিস্ময়কর। ভাঁজ করা অবস্থায় এটি দেখতে অনেকটা ক্রেডিট বা বিজনেস কার্ডের মতো। ফলে মানিব্যাগে রাখা কোনো কার্ডের সঙ্গে সেটিকে আলাদা করা কঠিন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উদ্ধারকৃত অস্ত্রটি মার্কিন অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেইল ব্লেজার ফায়ার আর্মসের তৈরি লাইফ কার্ড মডেলের বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এটি একনলা এবং একবার গুলি ছোড়ার উপযোগী পয়েন্ট টু-টু এলআর ক্যালিবারের আগ্নেয়াস্ত্র। ক্রেডিট বা বিজনেস কার্ডের মতো দেখতে অস্ত্রটি সংকর ধাতু ও অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি এবং তুলনামূলকভাবে হালকা। এর গ্রিপের ভেতরে অতিরিক্ত চারটি গুলি রাখার জায়গা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট একজন র‌্যাব কর্মকর্তা জানান, উদ্ধার করার পর অস্ত্রটি নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদেরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয়েছে।

দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর অস্ত্রটি খুলে এর ভেতরে তাজা গুলি পাওয়া যায়। ওই কর্মকর্তার ভাষ্য, বাইরে থেকে দেখলে এটিকে অস্ত্র বলে সন্দেহ করার সুযোগ খুবই কম। ফলে কার্ডগানের উপস্থিতি সাধারণ তল্লাশিব্যবস্থার জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। এ ধরনের আরও অস্ত্র কারো কাছে রয়েছে কি না, তা জানতে গোয়েন্দা অনুসন্ধান অব্যাহত আছে। এ ছাড়া এই অস্ত্র বাংলাদেশে কীভাবে এলো, কে বা কারা সরবরাহ করেছে এবং এর সঙ্গে কোনো চোরাচালান নেটওয়ার্ক জড়িত কি না- এসব বিষয় খতিয়ে দেখছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, অস্ত্রকে অন্য কোনো সাধারণ পণ্যের আকার দেওয়ার ঘটনা বিশ্বে নতুন নয়। বিভিন্ন দেশে কলম, লাইটার, ছাতা, বেল্টসহ বিভিন্ন সামগ্রীর আদলে তৈরি অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে। বাংলাদেশে পেনগান এসবের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণগুলোর একটি। কলমের আদলে তৈরি ছোট আগ্নেয়াস্ত্র ইতোপূর্বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরে এসেছে।

তবে কেরাণীগঞ্জে উদ্ধার হওয়া কার্ড পিস্তল বা কার্ডগান নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরির কারণ এর আকার। তিনি বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ নিয়ে এত দিন আলোচনায় ছিল ছুরি, চাপাতি, ককটেল কিংবা দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র। এখন যদি সহজে লুকিয়ে রাখা যায় এমন ক্ষুদ্র আগ্নেয়াস্ত্রও তাদের হাতে পৌঁছাতে শুরু করে, তাহলে বিষয়টি শুধু অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

এসব অস্ত্র কোথা থেকে আসছে, কারা সরবরাহ করছে, অপরাধী চক্র এসব অস্ত্র সংগ্রহে নতুন কোনো নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে কি না- এসব বিষয় খতিয়ে দেখতে হবে। এ ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের হাতে বিদেশি অস্ত্র পৌঁছানোর পেছনে স্থানীয় অপরাধী চক্র, অস্ত্র ব্যবসায়ী কিংবা বড় কোনো সরবরাহ নেটওয়ার্কের ভূমিকা আছে কি না, তা-ও তদন্তের আওতায় আনার বিকল্প নেই।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, অপরাধীরা যখন অস্ত্র লুকাতে পোশাক, ব্যাগ কিংবা শরীরের বিভিন্ন অংশ ব্যবহার করে, তখন প্রশিক্ষিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের তল্লাশিতে তা শনাক্তের সুযোগ থাকে। কিন্তু অস্ত্রের আকৃতি যদি সাধারণ কার্ড, কলম কিংবা অন্য কোনো দৈনন্দিন ব্যবহার্য সামগ্রীর মতো হয়, তখন প্রচলিত তল্লাশিব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।

অনুসন্ধানী সূত্রে জানা গেছে, মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্প হয়ে বিভিন্ন গ্যাংয়ের হাতে গেছে কার্ডগান। জেনেভা ক্যাম্পের মাদক ডিলার ও মাফিয়াদের সঙ্গে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ আরও একটি বিশেষ দেশের মাফিয়াদের যোগাযোগ রয়েছে। তাদের মাধ্যমেই এই বিশেষ আগ্নেয়াস্ত্র এনে গ্যাংস্টারদের হাতে তুলে দেওয়া হতে পারে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, শুধু অস্ত্র উদ্ধার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; এসব অস্ত্রের উৎস, সরবরাহকারী, ক্রেতা ও ব্যবহারকারীদের নেটওয়ার্ক শনাক্ত করতে হবে।

বিশেষ করে কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে অস্ত্র ব্যবসার যোগসূত্র থাকলে সেটি ভেঙে দেওয়াই হতে পারে কার্যকর প্রতিরোধের পথ। তারা বলছেন, উৎসের সন্ধানই এখন তদন্তের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। র‌্যাব কর্মকর্তা মেজর এম মুবীন রহমান তাপস বলেন, অস্ত্রটির উৎস এবং বাংলাদেশে এর সরবরাহ নেটওয়ার্ক শনাক্তে তদন্ত চলছে। গত ৩ এপ্রিল পুরান ঢাকার নয়াবাজার এলাকায় যুবদল নেতা রাসেলকে গুলি করার ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে পেনগানের সন্ধান পায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

ঘটনায় জড়িত সন্দেহে সায়মন ও সোহেল ওরফে কাল্লুকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে কাল্লুর কাছ থেকে উদ্ধার হয় কলমসদৃশ একটি অস্ত্র। অস্ত্রটি একটি সিগারেটের প্যাকেটের মধ্যে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। বাইরে থেকে দেখতে এটি সাধারণ স্টিলের কলমের মতো। ডিবির ভাষ্য, ঢাকায় এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের তথ্য আগে তাদের কাছে ছিল না। অর্থাৎ, অস্ত্রটি শুধু ছোট নয়, এর নকশার মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে গোপনীয়তা।

পেনগান ও কার্ডগানের মধ্যে প্রযুক্তিগত পার্থক্য থাকলেও অপরাধের দৃষ্টিকোণ থেকে দুটির উদ্দেশ্যে একটি বড় মিল রয়েছে- অস্ত্রকে সাধারণ ব্যবহার্য সামগ্রীর আড়ালে লুকানো। একটি কলমের ছদ্মবেশ নেয়, অন্যটি কার্ডের। অর্থাৎ, অস্ত্রটি দৃশ্যমান না রেখেই বহন করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এ কারণেই দুটি ঘটনা পাশাপাশি রেখে দেখছেন আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকেরা।

তাদের আশঙ্কা, অপরাধী চক্রের হাতে এমন অস্ত্র পৌঁছালে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, অপহরণ কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধে ভয় দেখানোর মতো অপরাধে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে এ ধরনের ক্ষুদ্র অস্ত্র। কার্ডগান কী, দেখতে কেমন পুরোপুরি ভাঁজ করে রাখলে কার্ডগান মাত্র আধা ইঞ্চি মোটা হয় এবং ওজন হয় ১৫০ থেকে ২০০ গ্রামের মতো।

সাধারণত এটির দৈর্ঘ্য ৩.৩ ইঞ্চি এবং চওড়ায় ২.১ ইঞ্চি। এতে পয়েন্ট টু-টু এলআর বা পয়েন্ট টু-টু ডব্লিউএমআর মাপের ছোট গুলি ব্যবহার করা হয়। অস্ত্রটিতে একবারে একটি গুলি ভরা যায়। তবে এর হ্যান্ডেলের ভেতরে বাড়তি তিনটি গুলি রাখা যায়। এতে সাধারণ পিস্তলের মতো কোনো চিহ্ন থাকে না। ব্যারেলের ওপরের সোজা খাঁজ দেখে নিশানা করতে হয় ব্যবহারকারীকে।

প্রথমে পাশের একটি ছোট লক চাপ দিয়ে হ্যান্ডেলটি খুলে পিস্তলের শেপ আনতে হয়। এরপর ওপরের লক সরিয়ে ব্যারেলটি তুলে ভেতরে গুলি ভরে পেছনের ছোট হ্যামারটি টেনে লক করতে হয়। এসব কাজ শেষে ট্রিগার চাপলেই গুলি বের হয়। গুলি করার পর খালি খোসাটি পিস্তল থেকে টেনে বের করতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রে এটিকে সাধারণ পিস্তল ধরা হয়, কারণ এটি বন্ধ বা ভাঁজ করা অবস্থায় ফায়ার করা যায় না।

এটি খুলতে ও গুলি ভরতে সময় লাগে এবং মাত্র একটি গুলি করা যায়। তাই আত্মরক্ষার চেয়ে শখ বা সংগ্রহের জন্যই মানুষ এটি বেশি কেনেন।