ইতিহাসের কিছু অনন্য ব্যক্তিত্বকে কেবল তাঁদের সমসাময়িক রাজনৈতিক, সামাজিক বা ধর্মীয় গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে মূল্যায়ন করা যায় না। তাঁদের চিন্তা, নেতৃত্ব ও কর্মের পরিধি পরবর্তী বহু শতাব্দীর সমাজ ও সভ্যতার ওপর এতটাই গভীর প্রভাব বিস্তার করে যে, তাঁদের জীবন নিজেই ইতিহাসের একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় হয়ে ওঠে।
ইসলামের নবী মুহাম্মদ সা. তেমনই এক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব। সপ্তম শতকের আরব উপদ্বীপে তাঁর আবির্ভাব একটি ধর্মীয় আন্দোলনের সূচনা করেছিল, যা অল্প সময়ের মধ্যে একটি নতুন সামাজিক ও রাজনৈতিক সম্প্রদায় গড়ে তোলে এবং পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে বিশাল এক সভ্যতার ভিত্তি স্থাপন করে। মুহাম্মদ সা. এর আবির্ভাবের সময় আরব উপদ্বীপ ছিল কোনো একক রাষ্ট্রের অধীন নয়।
বিভিন্ন গোত্র ও গোত্রজোট ছিল রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের প্রধান কাঠামো। মক্কা ছিল কুরাইশদের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও ধর্মীয় কেন্দ্র। কাবাকে কেন্দ্র করে আরবের বিভিন্ন গোত্রের ধর্মীয় যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল এবং মক্কার বাণিজ্যিক গুরুত্বও ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছিল। আরব সমাজে লিখিত রাষ্ট্রীয় আইন বা কেন্দ্রীভূত প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছিল না, বরং গোত্রীয় রীতি, সম্মান, আনুগত্য এবং পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ছিল সামাজিক সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
এই সমাজকে ইসলামী উৎসে ‘জাহেলিয়াত’ বলা হয়েছে। ‘জাহেলিয়াত’ শব্দটি শুধু অশিক্ষা বোঝায় না, বরং এমন এক নৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থাকে নির্দেশ করে, যেখানে আল্লাহর একত্ববাদ ও নবুয়তের নির্দেশনা থেকে বিচ্যুতি এবং গোত্রীয় অহংকার ও সামাজিক অনাচার প্রবল ছিল। একই সঙ্গে এটিও মনে রাখা জরুরি যে, ইসলাম-পূর্ব আরব সমাজকে সম্পূর্ণ অন্ধকার ও মূল্যবোধহীন সমাজ হিসেবে উপস্থাপন করা ইতিহাসের দিক থেকে অতিসরলীকরণ হবে।
সেখানে কবিতা, বাগ্মিতা, বাণিজ্য, আতিথেয়তা, সাহসিকতা, বংশপরম্পরার জ্ঞান এবং কিছু নৈতিক গুণের শক্তিশালী ঐতিহ্যও ছিল। ইসলামের আবির্ভাব সেই বিদ্যমান সাংস্কৃতিক বাস্তবতার মধ্যেই একটি নতুন ধর্মীয় ও নৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করে। তবে সামাজিক বৈষম্য ছিল বাস্তব। গোত্রীয় পরিচয় মানুষের সামাজিক মর্যাদা নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখত। প্রতিশোধের সংস্কৃতি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত সৃষ্টি করত।
দাসপ্রথা প্রচলিত ছিল। নারীর অবস্থানও সর্বত্র সমান ছিল না। কুরআন বিশেষভাবে এতিম, দরিদ্র, নারী এবং কন্যাশিশুর অধিকার নিয়ে কথা বলেছে। কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দেওয়ার প্রথার উল্লেখ কুরআনে এসেছে; সূরা আত-তাকভীরে বলা হয়েছে, জীবন্ত কবর দেওয়া কন্যাশিশুকে জিজ্ঞেস করা হবে, ‘কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল? ‘ এই প্রেক্ষাপটেই মক্কার বনি হাশিম বংশে আনুমানিক ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদ সা. এর জন্ম।
তাঁর পিতা আবদুল্লাহ তাঁর জন্মের আগেই ইন্তেকাল করেন এবং শৈশবে তিনি মা আমিনাকেও হারান। এরপর দাদা আবদুল মুত্তালিব এবং পরে চাচা আবু তালিব তাঁর লালন-পালনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আরবের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী শৈশবের একটি সময় তিনি মরু অঞ্চলের বেদুইন পরিবেশে অতিবাহিত করেন। এই অভিজ্ঞতা তাঁর ভাষা, জীবনযাপন ও আরব সমাজ সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ধারণা তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিল বলে ইসলামী ঐতিহ্যে উল্লেখ পাওয়া যায়।
কৈশোর ও যৌবনে তিনি বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত হন। তাঁর সততা ও আমানতদারির কারণে তিনি মক্কাবাসীর কাছে বিশেষ মর্যাদা অর্জন করেন। ইসলামী ঐতিহ্যে তাঁকে ‘আল-আমিন’ নামে অভিহিত করার কথা পাওয়া যায়। তাঁর বয়স যখন পঁচিশের কাছাকাছি, তখন তিনি খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। খাদিজা রা. ছিলেন মক্কার একজন সম্মানিত ও সম্পদশালী ব্যবসায়ী নারী।
তাঁদের দাম্পত্য জীবন নবীজির নবুয়তের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। চল্লিশ বছর বয়সে তাঁর জীবনে আসে ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়। মক্কার নিকটবর্তী হেরা গুহায় তিনি নির্জনে ইবাদত ও চিন্তায় সময় কাটাতেন। ইসলামী ঐতিহ্য অনুযায়ী ৬১০ খ্রিস্টাব্দে সেখানেই তিনি প্রথম ওহি লাভ করেন। ফেরেশতা জিবরাইল আ. তাঁর কাছে প্রথম যে আয়াত নিয়ে আসেন, তার সূচনা হয় ‘ইকরা’ বা ‘পড়ো’ শব্দ দিয়ে।
কুরআনের ভাষায়, ‘পড়ো তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। ‘ (সূরা আল-আলাক, ৯৬:১) এই ওহির মাধ্যমে তাঁর নবুয়তি দায়িত্বের সূচনা হয়। প্রথম পর্যায়ে তাঁর দাওয়াত ছিল তাওহিদ, আখিরাত, নৈতিকতা এবং মানুষের দায়িত্ববোধকে কেন্দ্র করে। তিনি মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান করেন এবং একই সঙ্গে সামাজিক অনাচার, অন্যায়, প্রতারণা, সুদ, এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ, মাপে কম দেওয়া ও দুর্বলদের অধিকার হরণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।
মক্কার প্রভাবশালী নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর বিরোধের মূল কারণগুলোর একটি ছিল এই ধর্মীয় ও সামাজিক পরিবর্তনের আহ্বান। বহুদেববাদী ধর্মীয় কাঠামো, গোত্রীয় মর্যাদা এবং মক্কার প্রচলিত সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে তাঁর দাওয়াতের অনেক দিকের সংঘাত তৈরি হয়। প্রথম দিকে মুসলিমদের সংখ্যা ছিল অল্প। কিন্তু নির্যাতন ও সামাজিক চাপ সত্ত্বেও আন্দোলনটি ক্রমশ বিস্তৃত হতে থাকে।
মক্কি জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল কিছু মুসলিমের আবিসিনিয়ায় হিজরত। নাজ্জাশির শাসনাধীন খ্রিস্টান আবিসিনিয়ায় তাঁরা আশ্রয় নেন। এটি ইসলামের ইতিহাসে প্রথম দিকের আন্তর্জাতিক যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। পরিস্থিতি ক্রমশ কঠিন হয়ে ওঠে। মুসলিমদের ওপর সামাজিক ও অর্থনৈতিক বয়কট আরোপ করা হয়। নবী সা. এর নিকটজনদের মধ্যেও একে একে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মৃত্যু ঘটে।
খাদিজা রা. ও আবু তালিবের মৃত্যু তাঁর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। এরপর মদিনার ইয়াসরিব থেকে আগত কিছু মানুষের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ তৈরি হয়। আকাবার অঙ্গীকারের মাধ্যমে মদিনায় ইসলামের জন্য নতুন সামাজিক ভিত্তি তৈরি হতে থাকে। অবশেষে ৬২২ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত হয় হিজরত। মক্কা থেকে মদিনায় এই স্থানান্তর ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটি।
পরবর্তীকালে দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব রা. এর সময় হিজরতকে ইসলামী হিজরি বর্ষপঞ্জির সূচনাবিন্দু হিসেবে গ্রহণ করা হয়। মদিনায় গিয়ে মুহাম্মদ সা. এর নেতৃত্বে একটি নতুন সমাজের ভিত্তি স্থাপিত হয়। মক্কার মুহাজির ও মদিনার আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়। মদিনায় বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে সম্পর্ক নির্ধারণের জন্য যে চুক্তির কথা ইসলামী ঐতিহাসিক উৎসগুলোতে পাওয়া যায়, সেটি ‘মদিনার সনদ’ নামে পরিচিত।
এর মাধ্যমে বিভিন্ন গোষ্ঠীর পারস্পরিক দায়িত্ব ও রাজনৈতিক সম্পর্কের একটি কাঠামো প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছিল। এখানেই মুহাম্মদ সা. এর নেতৃত্বের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়। মক্কায় তিনি ছিলেন মূলত ধর্মীয় ও নৈতিক সংস্কারের আহ্বানকারী, মদিনায় তিনি একই সঙ্গে একটি সম্প্রদায়ের ধর্মীয় নেতা, রাজনৈতিক নেতৃত্বের কেন্দ্র এবং বিচারব্যবস্থার প্রধান হয়ে ওঠেন।
ফলে তাঁর মদিনার জীবন ইসলামের ধর্মীয় ইতিহাসের পাশাপাশি রাষ্ট্র ও সমাজের ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মদিনা পর্বে মুসলিমদের সঙ্গে মক্কার কুরাইশদের সংঘর্ষ কয়েকটি বড় যুদ্ধে রূপ নেয়। বদর, উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধ ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘটনা। এসব সংঘর্ষ শুধু সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল না, এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল মদিনার নতুন রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব, মক্কার সঙ্গে সম্পর্ক এবং আরব উপদ্বীপের ক্ষমতার ভারসাম্য।
৬২৮ খ্রিস্টাব্দে হুদায়বিয়ার সন্ধি ইসলামের ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করে। প্রথম দৃষ্টিতে মুসলিমদের জন্য কিছু শর্ত কঠিন মনে হলেও পরবর্তী পরিস্থিতিতে এই সন্ধি মুসলিমদের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান শক্তিশালী করতে সহায়তা করে। অল্প সময়ের মধ্যেই আরবের বিভিন্ন গোত্রের সঙ্গে মুসলিমদের যোগাযোগ ও সম্পর্ক বিস্তৃত হয়। এরপর ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে ঘটে মক্কা বিজয়।
দীর্ঘ সংঘাতের পর মুসলিমরা তুলনামূলকভাবে বড় শক্তি হিসেবে মক্কায় প্রবেশ করে। কাবাকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠিত মূর্তিপূজার কাঠামো বিলুপ্ত করা হয় এবং কাবাকে এক আল্লাহর ইবাদতের কেন্দ্র হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়। মক্কা বিজয় আরবের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা করে এবং অল্প সময়ের মধ্যে আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন গোত্র ইসলামের সঙ্গে রাজনৈতিক ও ধর্মীয়ভাবে যুক্ত হতে শুরু করে।
মক্কা বিজয়ের আরেকটি ঐতিহাসিক দিক ছিল ক্ষমার প্রশ্ন। দীর্ঘদিনের সংঘাতের পর বিজয়ী পক্ষ প্রতিপক্ষের ওপর কী ধরনের আচরণ করবে এই প্রশ্নটি ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। নবী সা. এর নেতৃত্বে মক্কা বিজয়ের পর ব্যাপক প্রতিশোধপরায়ণতার পরিবর্তে ক্ষমা ও সাধারণ নিরাপত্তার নীতি গুরুত্ব পায়। এই ঘটনাটি তাঁর রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও নৈতিক দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে ইসলামী ঐতিহ্যে সংরক্ষিত হয়েছে।
তাঁর সামাজিক সংস্কারের ক্ষেত্রটিও ছিল ব্যাপক। কুরআন সম্পদের ন্যায়সংগত বণ্টন, এতিমের অধিকার, নারীর উত্তরাধিকার, দরিদ্রের প্রতি দায়িত্ব এবং দাসমুক্তির বিভিন্ন পথের কথা বলেছে। উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে কুরআনের বিধান আরবের প্রচলিত ব্যবস্থায় নারীদের জন্য নতুন আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। নারীর মর্যাদা সম্পর্কে কুরআন ঘোষণা করেছে, ‘হে মানুষ, আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হও।
তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মর্যাদাবান সে-ই, যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান। ‘ (সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১৩) এই আয়াত আরবের গোত্রভিত্তিক শ্রেষ্ঠত্ববোধের বিপরীতে একটি বৃহত্তর মানবিক পরিচয় প্রতিষ্ঠা করে। বংশ ও গোত্র পরিচয়কে অস্বীকার করা হয়নি; বরং তা শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি নয় বলে স্পষ্ট করা হয়েছে। নবী সা. এর বিদায় হজও এই সামাজিক দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ।
৬৩২ খ্রিস্টাব্দে বিদায় হজের ভাষণে তিনি মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের মর্যাদা সম্পর্কে সতর্ক করেন। সহিহ মুসলিমে তাঁর বক্তব্যের একটি বর্ণনায় এসেছে, তিনি মুসলিমদের পরস্পরের ভাই হিসেবে উল্লেখ করে একে অপরের ওপর জুলুম না করার শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর বিদায় ভাষণের বিভিন্ন বর্ণনায় জাহেলিয়াতের রক্তের প্রতিশোধ ও সুদের প্রথা বাতিল করার ঘোষণা পাওয়া যায়।
এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল জ্ঞান ও শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব। প্রথম ওহির ‘পড়ো’ আহ্বান থেকে শুরু করে কুরআনের বহু আয়াতে জ্ঞান, চিন্তা ও পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাসুল সা. এর পর সাহাবিদের মাধ্যমে কুরআন, হাদিস, ফিকহ ও ইতিহাস সংরক্ষণের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়, তা পরবর্তী ইসলামী জ্ঞান-ঐতিহ্যের ভিত্তি তৈরি করে।
মুহাম্মদ সা. এর ইন্তেকালের পর তাঁর প্রতিষ্ঠিত সমাজ থেমে থাকেনি। খোলাফায়ে রাশেদিনের সময় আরব উপদ্বীপের বাইরে ইসলামের রাজনৈতিক বিস্তার শুরু হয়। পরবর্তী উমাইয়া ও আব্বাসীয় যুগে মুসলিম সাম্রাজ্য বিস্তৃত হয় এবং বিভিন্ন সভ্যতার জ্ঞান মুসলিম জ্ঞানচর্চার সঙ্গে যুক্ত হয়। বাগদাদ, দামেস্ক, কায়রো, কুরতুবা, নিশাপুর, সমরকন্দ ও বুখারার মতো নগরগুলো পরবর্তী সময়ে জ্ঞান ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
এই দীর্ঘ ঐতিহ্যের বীজ নিহিত ছিল মদিনার সেই প্রথম সমাজে যেখানে কুরআন ছিল নৈতিক নির্দেশনার প্রধান উৎস এবং মুহাম্মদ সা. এর জীবন ছিল তার বাস্তব প্রয়োগের অন্যতম প্রধান উদাহরণ। তাঁর চরিত্র সম্পর্কে কুরআনের মূল্যায়ন অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত, কিন্তু গভীর। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী। ‘ (সূরা আল-কলম, ৬৮:৪) আর আয়েশা রা. কে যখন রাসুল সা. এর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় তিনি বলেন, ‘তাঁর চরিত্র ছিল কুরআন।
‘ এই বক্তব্য তাঁর জীবন বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ চাবিকাঠি। কুরআনের নৈতিক শিক্ষা তাঁর ব্যক্তিজীবনে কীভাবে বাস্তব রূপ পেয়েছিল তাঁর সীরাত তারই একটি জীবন্ত ব্যাখ্যা। তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সমাজে শুধু ধর্মীয় আচার নয়, সামাজিক ন্যায়, পারস্পরিক অধিকার, আমানত, সত্যবাদিতা ও দায়িত্বশীলতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। সহিহ বুখারিতে তাঁর একটি বক্তব্য এসেছে, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।
‘ এই নীতিই ইসলামী সামাজিক দর্শনে নেতৃত্বকে ক্ষমতার বদলে আমানতে পরিণত করে। মুহাম্মদ সা. এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব এখানেই যে, তাঁর জীবনকে শুধু একটি ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে দেখলে তাঁর প্রভাবের পূর্ণতা বোঝা যায় না। তিনি একই সঙ্গে একটি নতুন ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রচারক, একটি নতুন সম্প্রদায়ের নির্মাতা, একটি রাজনৈতিক সমাজের নেতা, একটি নৈতিক সংস্কারের প্রবক্তা এবং একটি দীর্ঘস্থায়ী জ্ঞান-ঐতিহ্যের সূচনাকারী।
তাঁর জীবনের মাত্র তেইশ বছরের নবুয়তি পর্বে মক্কার একটি ক্ষুদ্র ধর্মীয় আন্দোলন মদিনায় একটি সংগঠিত সমাজে পরিণত হয় এবং তাঁর ইন্তেকালের সময় আরব উপদ্বীপের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বাস্তবতা আমূল পরিবর্তিত হয়ে যায়। পরবর্তী শতাব্দীতে সেই পরিবর্তন আরবের সীমানা ছাড়িয়ে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। তবে তাঁর ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারকে কেবল ভূখণ্ডের বিস্তার দিয়ে পরিমাপ করা যথেষ্ট নয়।
তাঁর সবচেয়ে স্থায়ী প্রভাব নিহিত রয়েছে সেই নৈতিক কাঠামোয়, যা সত্য, আমানত, ন্যায়, দয়া, আত্মসংযম, জ্ঞানচর্চা ও মানুষের অধিকারের ওপর প্রতিষ্ঠিত। আজকের পৃথিবী সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাষ্ট্রব্যবস্থা বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, অর্থনীতি বদলেছে, যোগাযোগের ধরন বদলেছে। কিন্তু মানুষের মৌলিক নৈতিক প্রশ্নগুলো বদলায়নি। ক্ষমতার ব্যবহার কীভাবে হবে, দুর্বলের অধিকার কীভাবে রক্ষা হবে, সম্পদের প্রতি মানুষের দায়িত্ব কী, ধর্মীয় ও সামাজিক ভিন্নতার মধ্যে সহাবস্থান কীভাবে সম্ভব এসব প্রশ্ন আজও প্রাসঙ্গিক।
এই জায়গায় মুহাম্মদ সা. এর ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার নতুন করে আলোচনার দাবি রাখে। তাঁর জীবনকে শুধু আবেগের দৃষ্টিতে নয়, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, নৈতিক দর্শন ও সভ্যতার বিবর্তনের দৃষ্টিতেও পাঠ করা প্রয়োজন। কারণ মরুর সেই সমাজে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল, তার প্রভাব কেবল সপ্তম শতকের আরবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। কুরআন ও সুন্নাহকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ধর্মীয় ও বৌদ্ধিক ঐতিহ্য পরবর্তী দেড় সহস্রাব্দ ধরে মুসলিম বিশ্বের চিন্তা, আইন, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক জীবনের ওপর গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে।
সুতরাং মুহাম্মদ সা. এর আবির্ভাব ইসলামের ইতিহাসের সূচনামাত্র নয়, এটি বিশ্ব ইতিহাসেরও এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। জাহেলিয়াতের গোত্রভিত্তিক সমাজ থেকে একটি নৈতিক ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উত্থান, মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত, মদিনার সামাজিক-রাজনৈতিক কাঠামো, মক্কা বিজয় এবং পরবর্তী ইসলামী সভ্যতার বিকাশ সবকিছুর কেন্দ্রে রয়েছে তাঁর তেইশ বছরের নবুয়তি জীবন।
ইতিহাসের বিচারে তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো কোনো একটি যুদ্ধের বিজয় কিংবা কোনো একটি রাজনৈতিক সাফল্য নয়। বরং তা হলো একটি বিচ্ছিন্ন সমাজকে একটি নৈতিক আদর্শের অধীনে সংগঠিত করা এবং এমন একটি ঐতিহ্য রেখে যাওয়া, যা তাঁর ইন্তেকালের বহু শতাব্দী পরও কোটি কোটি মানুষের ধর্মীয়, নৈতিক ও সামাজিক জীবনকে প্রভাবিত করছে। এই কারণেই মুহাম্মদ সা. এর জীবন শুধু অতীতের স্মৃতি নয়,এটি একটি চলমান ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার।

















