10:25 pm, Sunday, 23 August 2026

শালিসে গ্রামের বাইরের লোক আনায় ফরিদপুরে এক পরিবারকে সমাজচ্যুত করার অভিযোগ

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় জমি-সংক্রান্ত বিরোধের শালিস বৈঠকে গ্রামের বাইরের লোক আনার অজুহাতে একটি পরিবারকে সমাজচ্যুত (একঘরে) করে রাখার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় সমাজপতিদের বিরুদ্ধে। শুধু একঘরে করাই নয়, ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের স্থানীয় মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায়ের ওপরও দেওয়া হয়েছে নিষেধাজ্ঞা।

আধুনিক ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার যুগে এমন সিদ্ধান্তকে স্পষ্ট মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে অভিহিত করছেন স্থানীয় সচেতন মহল। ঘটনাটি ঘটেছে আলফাডাঙ্গা পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের চর নওয়াপাড়া গ্রামে। ভুক্তভোগী পরিবারটি হলো ওই গ্রামের মৃত আব্দুর রফিক শেখের তিন ছেলে তারেক শেখ, ওবায়দুর শেখ ও খালিদ শেখ। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মৃত আব্দুর রফিক শেখের পরিবারের সঙ্গে প্রতিবেশী ওসমান গণির দীর্ঘদিন ধরে জমিজমা নিয়ে বিরোধ চলছিল।

বিষয়টি নিরসনে গত ২৪ জুলাই গ্রামে এক শালিস বৈঠক বসে। ওই দিন কোনো সুরাহা না হওয়ায় ৩০ জুলাই দ্বিতীয় দফায় শালিসের মাধ্যমে বিরোধটি নিষ্পত্তি করা হয়। তবে এই দুই দিনের শালিসে আব্দুর রফিক শেখের ছেলেরা নিজেদের পক্ষে কথা বলার জন্য গ্রামের বাইরে থেকে কিছু লোক আনেন। গ্রামের শালিস বৈঠকে বহিরাগত লোক আনার বিষয়টিকে কেন্দ্র করে ক্ষুব্ধ হন স্থানীয় মাতুব্বররা।

এর জের ধরে সমাজপতি আবুল সরকার ও তাজ মোহাম্মদের নেতৃত্বে প্রথমে ৩১ জুলাই একটি বৈঠক করা হয়। পরবর্তীতে ২১ আগস্ট সন্ধ্যায় চর নওয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে আবারও সভা ডেকে রফিক শেখের পুরো পরিবারকে সমাজচ্যুত করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন মাতুব্বররা। ওই দিন রাতেই রফিক শেখের ছোট ছেলে খালিদ শেখকে সমাজচ্যুতির সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন আবুল সরকার।

পরদিন ওই সভার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে উপজেলা জুড়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। ভুক্তভোগী খালিদ শেখ বলেন, ‘শালিসে আমরা গ্রামের বাইরে থেকে আমাদের আত্মীয়-স্বজন এনেছি। এই অপরাধে আমাদের পরিবারকে সমাজচ্যুত করা হয়েছে। মাতুব্বররা আমাদের পরিবারের কারও সঙ্গে সমাজের কোনো লোককে কথা বলতে নিষেধ করে দিয়েছে।

গ্রামের কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে আমাদের যাওয়া নিষেধ, এমনকি মসজিদেও যাওয়া নিষেধ। বাধ্য হয়ে আমরা এখন অন্য জায়গায় গিয়ে নামাজ পড়ি। ’ মৃত আব্দুর রফিক শেখের স্ত্রী শিমুল বেগম আকুতি জানিয়ে বলেন, ‘আমাদের সমাজের লোকজন একঘরে করে রাখছে। আমরা কারও সঙ্গে কথাবার্তা বলতে পারছি না। আমার ছেলেরা চরম নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন পার করছে।

’ অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সমাজপতি আবুল সরকার ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘গ্রামের বিষয় নিয়ে শালিস, অথচ তারা কাউকে না জানিয়ে ৩০-৪০ জন বহিরাগত লোক নিয়ে এসেছে। তাই মহল্লার সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাদের সঙ্গে কোনো সামাজিক সম্পর্ক রাখা হবে না। তবে তারা পরে আমার কাছে এসেছিল। আমি বলেছি, গ্রামের মানুষকে ডেকে ভুল স্বীকার করতে।

কিন্তু তারা তা করেনি। ’ এ বিষয়ে পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আজিজুল তালুকদার জানান, ‘দুই দফা জমি মাপার সময় আমি শালিসে ছিলাম। তবে পরে সমাজচ্যুত করার বিষয়ে আমাকে কিছু জানানো হয়নি। ’ বিষয়টিকে বেআইনি আখ্যা দিয়ে আলফাডাঙ্গা পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল হাসান হাসিব বলেন, ‘বর্তমান যুগে এভাবে কাউকে একঘরে করা সম্পূর্ণ মানবাধিকারবিরোধী ও বেআইনি।

বিষয়টি আমি শুনেছি। এলাকার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করব। ’ এ বিষয়ে আলফাডাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) দায়িত্বে থাকা পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ আল-আমিন জানান, ‘ঘটনাটি সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত জানা নেই। ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

দেশের প্রচলিত আইনের বাইরে গিয়ে বিচার করার সুযোগ কারও নেই।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

Nagorik Sangram

Popular Post

আইফোনের কিস্তি নিয়ে বিবাদের জেরে পাহাড় থেকে ঝাঁপ ছেলের, বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ হারালেন মা-বাবাও

শালিসে গ্রামের বাইরের লোক আনায় ফরিদপুরে এক পরিবারকে সমাজচ্যুত করার অভিযোগ

Update Time : 09:20:33 pm, Sunday, 23 August 2026

ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় জমি-সংক্রান্ত বিরোধের শালিস বৈঠকে গ্রামের বাইরের লোক আনার অজুহাতে একটি পরিবারকে সমাজচ্যুত (একঘরে) করে রাখার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় সমাজপতিদের বিরুদ্ধে। শুধু একঘরে করাই নয়, ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের স্থানীয় মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায়ের ওপরও দেওয়া হয়েছে নিষেধাজ্ঞা।

আধুনিক ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার যুগে এমন সিদ্ধান্তকে স্পষ্ট মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে অভিহিত করছেন স্থানীয় সচেতন মহল। ঘটনাটি ঘটেছে আলফাডাঙ্গা পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের চর নওয়াপাড়া গ্রামে। ভুক্তভোগী পরিবারটি হলো ওই গ্রামের মৃত আব্দুর রফিক শেখের তিন ছেলে তারেক শেখ, ওবায়দুর শেখ ও খালিদ শেখ। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মৃত আব্দুর রফিক শেখের পরিবারের সঙ্গে প্রতিবেশী ওসমান গণির দীর্ঘদিন ধরে জমিজমা নিয়ে বিরোধ চলছিল।

বিষয়টি নিরসনে গত ২৪ জুলাই গ্রামে এক শালিস বৈঠক বসে। ওই দিন কোনো সুরাহা না হওয়ায় ৩০ জুলাই দ্বিতীয় দফায় শালিসের মাধ্যমে বিরোধটি নিষ্পত্তি করা হয়। তবে এই দুই দিনের শালিসে আব্দুর রফিক শেখের ছেলেরা নিজেদের পক্ষে কথা বলার জন্য গ্রামের বাইরে থেকে কিছু লোক আনেন। গ্রামের শালিস বৈঠকে বহিরাগত লোক আনার বিষয়টিকে কেন্দ্র করে ক্ষুব্ধ হন স্থানীয় মাতুব্বররা।

এর জের ধরে সমাজপতি আবুল সরকার ও তাজ মোহাম্মদের নেতৃত্বে প্রথমে ৩১ জুলাই একটি বৈঠক করা হয়। পরবর্তীতে ২১ আগস্ট সন্ধ্যায় চর নওয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে আবারও সভা ডেকে রফিক শেখের পুরো পরিবারকে সমাজচ্যুত করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন মাতুব্বররা। ওই দিন রাতেই রফিক শেখের ছোট ছেলে খালিদ শেখকে সমাজচ্যুতির সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন আবুল সরকার।

পরদিন ওই সভার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে উপজেলা জুড়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। ভুক্তভোগী খালিদ শেখ বলেন, ‘শালিসে আমরা গ্রামের বাইরে থেকে আমাদের আত্মীয়-স্বজন এনেছি। এই অপরাধে আমাদের পরিবারকে সমাজচ্যুত করা হয়েছে। মাতুব্বররা আমাদের পরিবারের কারও সঙ্গে সমাজের কোনো লোককে কথা বলতে নিষেধ করে দিয়েছে।

গ্রামের কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে আমাদের যাওয়া নিষেধ, এমনকি মসজিদেও যাওয়া নিষেধ। বাধ্য হয়ে আমরা এখন অন্য জায়গায় গিয়ে নামাজ পড়ি। ’ মৃত আব্দুর রফিক শেখের স্ত্রী শিমুল বেগম আকুতি জানিয়ে বলেন, ‘আমাদের সমাজের লোকজন একঘরে করে রাখছে। আমরা কারও সঙ্গে কথাবার্তা বলতে পারছি না। আমার ছেলেরা চরম নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন পার করছে।

’ অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সমাজপতি আবুল সরকার ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘গ্রামের বিষয় নিয়ে শালিস, অথচ তারা কাউকে না জানিয়ে ৩০-৪০ জন বহিরাগত লোক নিয়ে এসেছে। তাই মহল্লার সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাদের সঙ্গে কোনো সামাজিক সম্পর্ক রাখা হবে না। তবে তারা পরে আমার কাছে এসেছিল। আমি বলেছি, গ্রামের মানুষকে ডেকে ভুল স্বীকার করতে।

কিন্তু তারা তা করেনি। ’ এ বিষয়ে পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আজিজুল তালুকদার জানান, ‘দুই দফা জমি মাপার সময় আমি শালিসে ছিলাম। তবে পরে সমাজচ্যুত করার বিষয়ে আমাকে কিছু জানানো হয়নি। ’ বিষয়টিকে বেআইনি আখ্যা দিয়ে আলফাডাঙ্গা পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল হাসান হাসিব বলেন, ‘বর্তমান যুগে এভাবে কাউকে একঘরে করা সম্পূর্ণ মানবাধিকারবিরোধী ও বেআইনি।

বিষয়টি আমি শুনেছি। এলাকার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করব। ’ এ বিষয়ে আলফাডাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) দায়িত্বে থাকা পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ আল-আমিন জানান, ‘ঘটনাটি সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত জানা নেই। ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

দেশের প্রচলিত আইনের বাইরে গিয়ে বিচার করার সুযোগ কারও নেই।