2:17 pm, Friday, 6 November 2026

রাড্ডায় তাণ্ডবের ঘটনায় পদ হারালেন এমপি মিষ্টি, কী বার্তা দিচ্ছে সরকার?

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র… যেখানে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সেবা পাচ্ছেন নিম্ন আয়ের মানুষ ও শিশুরা। হঠাৎ মধ্যরাতে সেখানে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট এবং বুলডোজার দিয়ে ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা। রাজধানীর মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রাতের অন্ধকারে চালানো এই তাণ্ডবের পরপরই দেশজুড়ে শুরু হয় তীব্র সমালোচনা। আর এর নেপথ্যে উঠে আসে স্থানীয় রাজনীতি ও বিএনপি’র কয়েকজন নেতাকর্মীর নাম। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে পদত্যাগ করতে হয়েছে দলটির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে। বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে একজন সংসদ সদস্যের পদত্যাগের ঘটনা একেবারে বিরল না হলেও কালেভদ্রেই দেখা যায়।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, রাড্ডার ঘটনায় কেন এতটা কঠোর অবস্থানে গেল সরকার? এমপি মিষ্টির পদত্যাগের মাধ্যমে সরকার কি কোনো বার্তা দিতে চাইছে? যদি তাই হয়, তবে কি সেই বার্তা? চলুন আলোচনার গভীরে যাওয়া যাক।

প্রথমেই চোখ রাখা যাক রাড্ডার স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলার ঘটনায়। গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাত ১২টা। প্রায় দুই শতাধিক ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র ও ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে ঢুকে পড়ে মিরপুর ১ নম্বরের রাড্ডা সেন্টারে। সিকিউরিটি গার্ডদের জিম্মি করে লুট করা হয় মূল্যবান চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ ও নগদ টাকা। এরপর ভারী যন্ত্র দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় একটি পাকা ও তিনটি আধা পাকা ভবন।

উচ্ছেদ শেষেই সেখানে টাঙিয়ে দেওয়া হয় ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর সাইনবোর্ড। কিন্তু এই সমিতির পেছনে কাদের হাত ছিল? অনুসন্ধান বলছে, ২০০৬ সালে এটি নিবন্ধনের সময় তৎকালীন ওয়ার্ড কমিশনার হিসেবে এর নেপথ্যে ছিলেন সদ্য এমপি পদ ছেড়ে দেওয়া ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি নিজেই। এমনকি এই সমিতির নামে রাড্ডা সেন্টারের জমি বরাদ্দের আবেদনেও তাঁর স্বাক্ষর ছিল।

যদিও পরবর্তীতে এমপি মিষ্টি এই ঘটনার সাথে নিজের কোনো সম্পৃক্ততা স্বীকার করেননি এবং সমিতিতে তাঁর বর্তমান পদ থাকার কথাও অস্বীকার করেছেন। কিন্তু সরকারের গোপন তদন্ত ও অনুসন্ধানে রাড্ডায় হামলার ঘটনায় তাঁর ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের নাম উঠে আসে।

দল ও সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি

রাড্ডার স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলার ঘটনা প্রকাশের পর থেকেই কঠোর অবস্থান নেয় সরকার ও বিএনপি’র হাইকমান্ড। প্রধানমন্ত্রী নিজে দুই দিন ধরে এই ঘটনার সমস্ত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টারা পরিষ্কার বার্তা দেন—অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক বা যে দলেরই হোক, কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।

এই ঘটনার রেশ ধরে ইতিমধ্যেই শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) প্রত্যাহার করা হয়েছে। ঘটনার পরপরই ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে এবং দলীয় পদ থেকে একযোগে ১৪ জনকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এর পরপরই সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগের চূড়ান্ত নির্দেশনা আসে প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে।

রাড্ডার স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটি ভেঙে গুড়িয়ে দেওয়া হলেও এর কার্যক্রম থেমে থাকেনি। এত বড় তাণ্ডবের পরও ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই সীমিত পরিসরে সেবা প্রদান অব্যাহত আছে।

বর্তমানে সরকারি উদ্যোগে ও স্থানীয় সহায়তায় দ্রুতগতিতে চলছে পুনর্নির্মাণ কাজ। ইতোমধ্যেই বারান্দা ও দেয়ালের নতুন গাঁথুনি দেওয়া হয়েছে, বিদ্যুৎ সংযোগ ফিরিয়ে আনা হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, খুব দ্রুতই পুরোপুরি চালু হবে ১৯৭৪ সাল থেকে সেবা দিয়ে আসা এই প্রতিষ্ঠানটি।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশে বেশ কয়েকটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। এই প্রেক্ষাপটে রাড্ডা সেন্টারে হামলার ঘটনা এবং তার প্রেক্ষিতে দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে একজন সংসদ সদস্যের পদত্যাগ আমাদের রাজনীতি ও শাসন ব্যবস্থায় একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়।

দলীয় পরিচয়ের আড়ালে দখলদারি, কিংবা সরকারি বা জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে কেউ পার পাবে না—সরকার ও দলীয় প্রধানের এমন অবস্থান এখন স্পষ্ট। সার্বিকভাবে জনগণের সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অপরাধীদের দলমত নির্বিশেষে আইনের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

Nagorik Sangram

Popular Post

অধ্যক্ষ মেহেরুন্নেছার পদত্যাগের দাবিতে মধ্যরাতে সড়কে হোম ইকোনমিক্স কলেজের শিক্ষার্থীরা

রাড্ডায় তাণ্ডবের ঘটনায় পদ হারালেন এমপি মিষ্টি, কী বার্তা দিচ্ছে সরকার?

Update Time : 12:04:13 am, Friday, 2 October 2026

একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র… যেখানে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সেবা পাচ্ছেন নিম্ন আয়ের মানুষ ও শিশুরা। হঠাৎ মধ্যরাতে সেখানে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট এবং বুলডোজার দিয়ে ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা। রাজধানীর মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রাতের অন্ধকারে চালানো এই তাণ্ডবের পরপরই দেশজুড়ে শুরু হয় তীব্র সমালোচনা। আর এর নেপথ্যে উঠে আসে স্থানীয় রাজনীতি ও বিএনপি’র কয়েকজন নেতাকর্মীর নাম। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে পদত্যাগ করতে হয়েছে দলটির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে। বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে একজন সংসদ সদস্যের পদত্যাগের ঘটনা একেবারে বিরল না হলেও কালেভদ্রেই দেখা যায়।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, রাড্ডার ঘটনায় কেন এতটা কঠোর অবস্থানে গেল সরকার? এমপি মিষ্টির পদত্যাগের মাধ্যমে সরকার কি কোনো বার্তা দিতে চাইছে? যদি তাই হয়, তবে কি সেই বার্তা? চলুন আলোচনার গভীরে যাওয়া যাক।

প্রথমেই চোখ রাখা যাক রাড্ডার স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলার ঘটনায়। গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাত ১২টা। প্রায় দুই শতাধিক ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র ও ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে ঢুকে পড়ে মিরপুর ১ নম্বরের রাড্ডা সেন্টারে। সিকিউরিটি গার্ডদের জিম্মি করে লুট করা হয় মূল্যবান চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ ও নগদ টাকা। এরপর ভারী যন্ত্র দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় একটি পাকা ও তিনটি আধা পাকা ভবন।

উচ্ছেদ শেষেই সেখানে টাঙিয়ে দেওয়া হয় ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর সাইনবোর্ড। কিন্তু এই সমিতির পেছনে কাদের হাত ছিল? অনুসন্ধান বলছে, ২০০৬ সালে এটি নিবন্ধনের সময় তৎকালীন ওয়ার্ড কমিশনার হিসেবে এর নেপথ্যে ছিলেন সদ্য এমপি পদ ছেড়ে দেওয়া ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি নিজেই। এমনকি এই সমিতির নামে রাড্ডা সেন্টারের জমি বরাদ্দের আবেদনেও তাঁর স্বাক্ষর ছিল।

যদিও পরবর্তীতে এমপি মিষ্টি এই ঘটনার সাথে নিজের কোনো সম্পৃক্ততা স্বীকার করেননি এবং সমিতিতে তাঁর বর্তমান পদ থাকার কথাও অস্বীকার করেছেন। কিন্তু সরকারের গোপন তদন্ত ও অনুসন্ধানে রাড্ডায় হামলার ঘটনায় তাঁর ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের নাম উঠে আসে।

দল ও সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি

রাড্ডার স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলার ঘটনা প্রকাশের পর থেকেই কঠোর অবস্থান নেয় সরকার ও বিএনপি’র হাইকমান্ড। প্রধানমন্ত্রী নিজে দুই দিন ধরে এই ঘটনার সমস্ত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টারা পরিষ্কার বার্তা দেন—অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক বা যে দলেরই হোক, কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।

এই ঘটনার রেশ ধরে ইতিমধ্যেই শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) প্রত্যাহার করা হয়েছে। ঘটনার পরপরই ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে এবং দলীয় পদ থেকে একযোগে ১৪ জনকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এর পরপরই সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগের চূড়ান্ত নির্দেশনা আসে প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে।

রাড্ডার স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটি ভেঙে গুড়িয়ে দেওয়া হলেও এর কার্যক্রম থেমে থাকেনি। এত বড় তাণ্ডবের পরও ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই সীমিত পরিসরে সেবা প্রদান অব্যাহত আছে।

বর্তমানে সরকারি উদ্যোগে ও স্থানীয় সহায়তায় দ্রুতগতিতে চলছে পুনর্নির্মাণ কাজ। ইতোমধ্যেই বারান্দা ও দেয়ালের নতুন গাঁথুনি দেওয়া হয়েছে, বিদ্যুৎ সংযোগ ফিরিয়ে আনা হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, খুব দ্রুতই পুরোপুরি চালু হবে ১৯৭৪ সাল থেকে সেবা দিয়ে আসা এই প্রতিষ্ঠানটি।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশে বেশ কয়েকটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। এই প্রেক্ষাপটে রাড্ডা সেন্টারে হামলার ঘটনা এবং তার প্রেক্ষিতে দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে একজন সংসদ সদস্যের পদত্যাগ আমাদের রাজনীতি ও শাসন ব্যবস্থায় একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়।

দলীয় পরিচয়ের আড়ালে দখলদারি, কিংবা সরকারি বা জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে কেউ পার পাবে না—সরকার ও দলীয় প্রধানের এমন অবস্থান এখন স্পষ্ট। সার্বিকভাবে জনগণের সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অপরাধীদের দলমত নির্বিশেষে আইনের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।