12:30 pm, Friday, 9 October 2026

দ্বিগুণ হলো খড়ের দাম, চরম চিন্তায় রংপুর অঞ্চলের গরু খামারিরা

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

খড়ের দাম দ্বিগুণ বেড়ে যাওয়ায় চিন্তিত হয়ে পড়েছেন রংপুর অঞ্চলের গরু পালনকারী চাষিরা। বিশেষ করে নদীতীরবর্তী গ্রাম ও চরাঞ্চলের চাষিরা হতাশ হয়ে পড়েছেন। আমন ধান কাটার পর কৃষকেরা নতুন খড় পাবেন।

তখন খড়ের দাম কমবে। এজন্য আরও এক মাস অপেক্ষা করতে হবে। বর্তমানে নদীতীরবর্তী গ্রাম ও চরাঞ্চলের কোনো জমিই পরিত্যক্ত রাখা হচ্ছে না। সব জমিতেই সারা বছর কোনো না কোনো ফসল চাষ করা হচ্ছে। এ কারণে আগের মতো ঘাসের জমি পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে কৃষকদের গরু পালন করতে খড় ও নানা ধরনের গোখাদ্যের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কৃষকেরা জানান, বাজারে খৈল, ভুসিসহ নানা ধরনের গোখাদ্যের দামও অনেক বেড়েছে।

এ কারণে খড়ের দামও বেড়েছে। গত বছর এই সময়ে প্রতি কেজি খড় কিনেছিলেন ১০-১২ টাকা দরে। বর্তমানে প্রতি কেজি খড় কিনতে হচ্ছে ২০-২৫ টাকা দরে। এক মাস আগেও প্রতি কেজি খড় কিনেছেন ১৫-১৮ টাকা দরে। প্রতিনিয়ত খড়ের দাম বাড়ছে। প্রতিদিন একটি গরুর জন্য ৩-৫ কেজি খড় লাগে। খড় গরুর উৎকৃষ্ট খাবার। এ ছাড়া দুধেল গাভির জন্য খড় অত্যাবশ্যক। দুধেল গাভিকে খড় খাওয়ালে দুধের উৎপাদন বাড়ে।

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার ভাদাই উত্তরপাড়া এলাকার কৃষক আসাদ মিয়া বলেন, তার ৭টি গরু রয়েছে। এসব গরুকে খাওয়ানোর জন্য জানুয়ারি মাসে তিনি প্রায় ১০ হাজার কেজি খড় মজুত করেছিলেন। খড়ের মজুত শেষ হওয়ায় তাকে এখন খড় কিনতে হচ্ছে। বাজারে খড়ের দাম বেশি হওয়ায় তাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বাজারে অন্যান্য গোখাদ্যের দামও অনেক বেড়ে গেছে। বেশি দামে গোখাদ্য কিনে গরু পালন করা কষ্টকর হয়ে পড়েছে।

খড় গরুর উৎকৃষ্ট খাবার। বাজারে খড়ের দাম বেড়ে যাওয়ায় গরু পালনে তাদের বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে। লালমনিরহাট সদর উপজেলার তিস্তা নদীর বুকে জেগে ওঠা চর কালমাটির কৃষক বেলাল হোসেন বলেন, বাজারে গোখাদ্য, বিশেষ করে খড়ের দাম দ্বিগুণ হওয়ায় গত সপ্তাহে তার ৮টি গরুর মধ্যে ৩টি বিক্রি করেছেন। এলাকায় গোখাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। আমন ধান কাটার পর পর্যাপ্ত পরিমাণে খড়ের সরবরাহ পাওয়া যাবে।

এজন্য আরও এক মাস অপেক্ষা করতে হবে। এখন গরু পালন কেনা গোখাদ্যের ওপর নির্ভর করছে। এতে গরু পালনের খরচও বেড়েছে। হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী হাটের খড় ব্যবসায়ী আমিনুর রহমান বলেন, ধান কাটার মৌসুমে তারা বিভিন্ন স্থানে কৃষকদের কাছ থেকে প্রতি কেজি খড় ৮-১০ টাকা দরে কিনে মজুত করেন। পরে তা বাজারে বিক্রি করেন। খড় পরিবহনের খরচও বেড়েছে।

এ বছর খড়ের মজুত কমেছে, কিন্তু বাজারে খড়ের চাহিদা অনেক বেড়েছে। তারা প্রতি কেজি খড় ২০-২৫ টাকা দরে বিক্রি করছেন। খড়ের চেয়ে বাজারে অন্যান্য গোখাদ্যের দাম আরও বেশি। খড় গরুর উৎকৃষ্ট খাবার। বিশেষ করে দুধেল গাভির জন্য খড়ের প্রয়োজন বেশি। তিনি জানান, আমন ধান কাটার পর খড়ের সরবরাহ বাড়বে এবং দামও কমবে। তবে এ বছর প্রতি কেজি খড়ের দাম ১৫ টাকার নিচে নামার সম্ভাবনা নেই।

কালীগঞ্জের কাকিনার খড় ব্যবসায়ী আশরাফ আলী বলেন, গরুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় খড়ের চাহিদাও বেড়েছে। আগের তুলনায় খড় বিক্রি বেড়েছে। তারা বিভিন্ন স্থান থেকে কৃষকদের কাছ থেকে খড় কিনে সামান্য লাভে বিক্রি করেন। তবে অনেক খড় ব্যবসায়ী ধান কাটার মৌসুমে কম দামে খড় কিনে মজুত করেন এবং পরে বেশি দামে বিক্রি করেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, প্রতি শতাংশ জমি থেকে ১০-১২ কেজি খড় পাওয়া যায়।

প্রতিবছর রংপুর অঞ্চলের ৫ জেলায় প্রায় ৩৫-৪০ লাখ মেট্রিক টন খড় উৎপন্ন হয়। কৃষকেরা জমিতে উৎপাদিত খড়ের কিছু অংশ গরুকে খাওয়ানোর জন্য বাড়িতে মজুত করে রাখেন। বাড়তি খড় বিক্রি করে দেন। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, রংপুর অঞ্চলের ৫ জেলায় প্রায় ৪২ লাখ গরু রয়েছে। ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলা, গঙ্গাধর, দুধকুমার, জিনজিরামসহ বিভিন্ন নদ-নদীর ৮০০টি চরে রয়েছে ১৫-১৬ লাখ গরু।

চরাঞ্চলে গরু পালন চরের মানুষের আয়ের প্রধান উৎস। রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক ড. আবু বকর সাইফুল ইসলাম জানান, বর্তমানে কৃষকেরা ধানের চেয়ে খড়কে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তারা ধান কাটার মৌসুমে খড় মজুত করে রাখেন। মজুত শেষ হয়ে গেলে তাদের বাজার থেকে খড় কিনতে হয়। যেসব গরু পালনকারী পরিবারের চাষাবাদের জমি নেই, তাদের সারা বছরই গোখাদ্য কিনতে হয়।

তিনি বলেন, আগে কৃষকেরা জমি ফেলে রাখতেন। কিন্তু এখন তারা সব সময় ফসল চাষ করেন। এ কারণে আগের মতো ঘাসের জমি চোখে পড়ে না। গরু পালন এখন কেনা গোখাদ্যের ওপর নির্ভর করছে। রংপুর বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আব্দুল হাই সরকার জানান, আগের চেয়ে গরু পালন বেড়েছে। গোখাদ্য কিনে গরু পালন করেও কৃষকেরা লাভবান হচ্ছেন। তবে সম্প্রতি খড়ের দাম বেড়ে যাওয়ায় তারা হতাশ হয়ে পড়েছেন।

খড়ের দাম সাময়িকভাবে বেড়েছে। আমন ধান কাটার পর খড়ের দাম কমে যাবে। তিনি বলেন, এখন শহরের অনেক পরিবার গরু পালন করছে। তাদের সারা বছরই কেনা গোখাদ্যের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। তবে গ্রামের কৃষকেরা বছরের অনেক সময় প্রাকৃতিক ঘাস সংগ্রহ করে গরুকে খাওয়াতে পারছেন।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

Nagorik Sangram

Popular Post

রাজধানীর ভাটারায় বহুতল ভবন থেকে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর মৃত্যু

দ্বিগুণ হলো খড়ের দাম, চরম চিন্তায় রংপুর অঞ্চলের গরু খামারিরা

Update Time : 11:21:12 am, Friday, 9 October 2026

খড়ের দাম দ্বিগুণ বেড়ে যাওয়ায় চিন্তিত হয়ে পড়েছেন রংপুর অঞ্চলের গরু পালনকারী চাষিরা। বিশেষ করে নদীতীরবর্তী গ্রাম ও চরাঞ্চলের চাষিরা হতাশ হয়ে পড়েছেন। আমন ধান কাটার পর কৃষকেরা নতুন খড় পাবেন।

তখন খড়ের দাম কমবে। এজন্য আরও এক মাস অপেক্ষা করতে হবে। বর্তমানে নদীতীরবর্তী গ্রাম ও চরাঞ্চলের কোনো জমিই পরিত্যক্ত রাখা হচ্ছে না। সব জমিতেই সারা বছর কোনো না কোনো ফসল চাষ করা হচ্ছে। এ কারণে আগের মতো ঘাসের জমি পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে কৃষকদের গরু পালন করতে খড় ও নানা ধরনের গোখাদ্যের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কৃষকেরা জানান, বাজারে খৈল, ভুসিসহ নানা ধরনের গোখাদ্যের দামও অনেক বেড়েছে।

এ কারণে খড়ের দামও বেড়েছে। গত বছর এই সময়ে প্রতি কেজি খড় কিনেছিলেন ১০-১২ টাকা দরে। বর্তমানে প্রতি কেজি খড় কিনতে হচ্ছে ২০-২৫ টাকা দরে। এক মাস আগেও প্রতি কেজি খড় কিনেছেন ১৫-১৮ টাকা দরে। প্রতিনিয়ত খড়ের দাম বাড়ছে। প্রতিদিন একটি গরুর জন্য ৩-৫ কেজি খড় লাগে। খড় গরুর উৎকৃষ্ট খাবার। এ ছাড়া দুধেল গাভির জন্য খড় অত্যাবশ্যক। দুধেল গাভিকে খড় খাওয়ালে দুধের উৎপাদন বাড়ে।

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার ভাদাই উত্তরপাড়া এলাকার কৃষক আসাদ মিয়া বলেন, তার ৭টি গরু রয়েছে। এসব গরুকে খাওয়ানোর জন্য জানুয়ারি মাসে তিনি প্রায় ১০ হাজার কেজি খড় মজুত করেছিলেন। খড়ের মজুত শেষ হওয়ায় তাকে এখন খড় কিনতে হচ্ছে। বাজারে খড়ের দাম বেশি হওয়ায় তাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বাজারে অন্যান্য গোখাদ্যের দামও অনেক বেড়ে গেছে। বেশি দামে গোখাদ্য কিনে গরু পালন করা কষ্টকর হয়ে পড়েছে।

খড় গরুর উৎকৃষ্ট খাবার। বাজারে খড়ের দাম বেড়ে যাওয়ায় গরু পালনে তাদের বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে। লালমনিরহাট সদর উপজেলার তিস্তা নদীর বুকে জেগে ওঠা চর কালমাটির কৃষক বেলাল হোসেন বলেন, বাজারে গোখাদ্য, বিশেষ করে খড়ের দাম দ্বিগুণ হওয়ায় গত সপ্তাহে তার ৮টি গরুর মধ্যে ৩টি বিক্রি করেছেন। এলাকায় গোখাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। আমন ধান কাটার পর পর্যাপ্ত পরিমাণে খড়ের সরবরাহ পাওয়া যাবে।

এজন্য আরও এক মাস অপেক্ষা করতে হবে। এখন গরু পালন কেনা গোখাদ্যের ওপর নির্ভর করছে। এতে গরু পালনের খরচও বেড়েছে। হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী হাটের খড় ব্যবসায়ী আমিনুর রহমান বলেন, ধান কাটার মৌসুমে তারা বিভিন্ন স্থানে কৃষকদের কাছ থেকে প্রতি কেজি খড় ৮-১০ টাকা দরে কিনে মজুত করেন। পরে তা বাজারে বিক্রি করেন। খড় পরিবহনের খরচও বেড়েছে।

এ বছর খড়ের মজুত কমেছে, কিন্তু বাজারে খড়ের চাহিদা অনেক বেড়েছে। তারা প্রতি কেজি খড় ২০-২৫ টাকা দরে বিক্রি করছেন। খড়ের চেয়ে বাজারে অন্যান্য গোখাদ্যের দাম আরও বেশি। খড় গরুর উৎকৃষ্ট খাবার। বিশেষ করে দুধেল গাভির জন্য খড়ের প্রয়োজন বেশি। তিনি জানান, আমন ধান কাটার পর খড়ের সরবরাহ বাড়বে এবং দামও কমবে। তবে এ বছর প্রতি কেজি খড়ের দাম ১৫ টাকার নিচে নামার সম্ভাবনা নেই।

কালীগঞ্জের কাকিনার খড় ব্যবসায়ী আশরাফ আলী বলেন, গরুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় খড়ের চাহিদাও বেড়েছে। আগের তুলনায় খড় বিক্রি বেড়েছে। তারা বিভিন্ন স্থান থেকে কৃষকদের কাছ থেকে খড় কিনে সামান্য লাভে বিক্রি করেন। তবে অনেক খড় ব্যবসায়ী ধান কাটার মৌসুমে কম দামে খড় কিনে মজুত করেন এবং পরে বেশি দামে বিক্রি করেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, প্রতি শতাংশ জমি থেকে ১০-১২ কেজি খড় পাওয়া যায়।

প্রতিবছর রংপুর অঞ্চলের ৫ জেলায় প্রায় ৩৫-৪০ লাখ মেট্রিক টন খড় উৎপন্ন হয়। কৃষকেরা জমিতে উৎপাদিত খড়ের কিছু অংশ গরুকে খাওয়ানোর জন্য বাড়িতে মজুত করে রাখেন। বাড়তি খড় বিক্রি করে দেন। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, রংপুর অঞ্চলের ৫ জেলায় প্রায় ৪২ লাখ গরু রয়েছে। ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলা, গঙ্গাধর, দুধকুমার, জিনজিরামসহ বিভিন্ন নদ-নদীর ৮০০টি চরে রয়েছে ১৫-১৬ লাখ গরু।

চরাঞ্চলে গরু পালন চরের মানুষের আয়ের প্রধান উৎস। রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক ড. আবু বকর সাইফুল ইসলাম জানান, বর্তমানে কৃষকেরা ধানের চেয়ে খড়কে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তারা ধান কাটার মৌসুমে খড় মজুত করে রাখেন। মজুত শেষ হয়ে গেলে তাদের বাজার থেকে খড় কিনতে হয়। যেসব গরু পালনকারী পরিবারের চাষাবাদের জমি নেই, তাদের সারা বছরই গোখাদ্য কিনতে হয়।

তিনি বলেন, আগে কৃষকেরা জমি ফেলে রাখতেন। কিন্তু এখন তারা সব সময় ফসল চাষ করেন। এ কারণে আগের মতো ঘাসের জমি চোখে পড়ে না। গরু পালন এখন কেনা গোখাদ্যের ওপর নির্ভর করছে। রংপুর বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আব্দুল হাই সরকার জানান, আগের চেয়ে গরু পালন বেড়েছে। গোখাদ্য কিনে গরু পালন করেও কৃষকেরা লাভবান হচ্ছেন। তবে সম্প্রতি খড়ের দাম বেড়ে যাওয়ায় তারা হতাশ হয়ে পড়েছেন।

খড়ের দাম সাময়িকভাবে বেড়েছে। আমন ধান কাটার পর খড়ের দাম কমে যাবে। তিনি বলেন, এখন শহরের অনেক পরিবার গরু পালন করছে। তাদের সারা বছরই কেনা গোখাদ্যের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। তবে গ্রামের কৃষকেরা বছরের অনেক সময় প্রাকৃতিক ঘাস সংগ্রহ করে গরুকে খাওয়াতে পারছেন।