হুমায়ূন আহমেদের বিখ্যাত ‘নিমফুল’ নাটকের সেই মর্মান্তিক দৃশ্যটি হয়তো অনেকের স্মৃতিতে আজও অম্লান হয়ে আছে। নাটকের প্রধান চরিত্র মতির অপরাধÑ সে ছিল এক দরিদ্র চোর। চুরির দায়ে গ্রামবাসীর তথাকথিত বিচারে সিদ্ধান্ত হয়, খেজুর কাঁটা দিয়ে তার দুটি চোখ ফুটিয়ে অন্ধ করে দেওয়া হবে।
এই অমানবিক ও নৃশংস বিচার দেখতে উৎসুক জনতার ভিড় জমে। চোখ তুলে নেওয়ার সেই চরম মুহূর্তে ভীতসন্ত্রস্ত মতি তার অবুঝ ছোট ছেলেকে সান্ত¡না দিতে নানা কথা বলছিল। ছেলে যখন কেঁদে উঠে প্রশ্ন করে, ‘বাবা, ওরা কি সত্যি তোমার চোখ গাইল্যা দিব? ’ তখন মতি উত্তর দেয়, ‘আরে না রে পাগলা! মানুষের চোখ কি অত সহজ জিনিস যে কেউ চাইলেই গাইল্যা দিতে পারে?
এইডা তো আর আলু-পটোল না! ’ নাটকের সেই দরিদ্র চোর মতির দৃষ্টিতে যে অঙ্গটি অন্তত আলু-পটোল বা সস্তা কোনো সামগ্রী ছিল না, আমাদের এই ঘুনেধরা সমাজকাঠামো এবং এর কর্তাব্যক্তিদের কাছে আজ সাধারণ মানুষের জীবন, মানবাধিকার ও শরীর সেই আলু-পটোলের চেয়েও সস্তা ও গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্র ও সমাজের এই নৈতিক অবক্ষয় আজ এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে আইনের শাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে জনতাই বিচারকের আসনে বসে যাচ্ছে, আর সেই তথাকথিত বিচারের হাঁড়িকাঠে বলি হচ্ছে রক্তমাংসের মানুষ।
সম্প্রতি দেশের দক্ষিণাঞ্চলের একটি স্থানীয় বাজারে ঘটে যাওয়া হৃদয়বিদারক ঘটনাটি আমাদের এই সামাজিক অবক্ষয় ও বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে আবারও নগ্নভাবে উন্মোচিত করেছে। গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, রাতে সিঁদ কেটে চুরি করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়া এক ব্যক্তিকে তথাকথিত ‘বিচারক’ জনতা নির্মম নির্যাতন করে বেঁধে রাখে একটি কাঠের খাম্বার সঙ্গে।
পরদিন সকালে খবর পেয়ে দুর্ঘটনাস্থলে ছুটে আসে একটি আট-নয় বছরের শিশুকন্যা। উৎসুক ও হিংস্র মানুষের ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে গিয়ে সে দেখে, তার বাবা কাঠের খুঁটিতে বাঁধা অবস্থায় মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ছে। সারারাত অমানুষিক নির্যাতনের পর না-খেয়ে প্রায় আধমরা, শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। দৃশ্যটি দেখে খানিকক্ষণ অবুঝের মতো হু হু করে কেঁদেছে মেয়েটি।
এরপর নিজের পরনের ফ্রকের কোনা দিয়ে পরম মমতায় মুছে দিয়েছে বাবার শরীর থেকে গড়িয়ে পড়া রক্ত আর ঘামের দাগ। এরপরই সেই শিশুমনে জেগে ওঠে পৃথিবীর আদিমতম ও মৌলিক চিন্তাÑ ক্ষুধা! অবুঝ মেয়েটির মনে হয়েছে, বাবাকে তো বাঁচতে হবে, বাবার নিশ্চয়ই ভীষণ ক্ষুধা পেয়েছে! পাশের এক দোকান থেকে নিজের সাধ্যমতো এক টুকরো পাউরুটি, একটু পানি আর এক কাপ গরম চা কিনে আনে সে।
ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায় চারপাশের হিংস্র মানুষের রক্তচক্ষু। অবুঝ মেয়েটি চায়ে পাউরুটি ভিজিয়ে পরম যতেœ বাবার মুখে তুলে দেয়। ওই একটি মুহূর্তেই উধাও হয়ে যায় ক্ষুব্ধ জনতার হুংকার। তথাকথিত বিচারকেরাই তখন গলার সুর বদলে বলতে শুরু করে, ‘খা রে, তোর মেয়েটা দিচ্ছে, খা! আর তোরে কেউ মারতে আসবে না। ’ পরে জানা যায়, ঘটনাটির প্রেক্ষাপট আরও জটিল।
লোকটি স্রেফ কোনো পেশাদার অপরাধী ছিলেন না; তার বৃদ্ধ বাবা মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়ার পর চিকিৎসার খরচ জোগাতে গিয়ে পরিবারটি সর্বস্ব হারিয়ে পথে বসেছিল। চরম পারিবারিক বিপর্যয় ও মানসিক হতাশায় একপর্যায়ে তিনি পথভ্রষ্ট হয়ে পড়েছিলেন। এই ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধের গল্প নয়; এটি একই সঙ্গে আমাদের সমাজমানসের দুটি বিপরীত মেরুকে স্পষ্ট করে তোলেÑ একদিকে আইনি শাসনের অবক্ষয় ও জনপরিসরের হিংস্রতা, অন্যদিকে কন্যাশিশুর অপরিসীম মমতা ও শাশ্বত পারিবারিক মনস্তত্ত্ব।
প্রতি বছর অক্টোবর মাসের ১১ তারিখে ‘বিশ্ব কন্যাশিশু দিবস’ বা ‘আন্তর্জাতিক কন্যা দিবস’ আসে রঙিন স্লোগান আর আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে। কিন্তু দিবসের বর্ণিল আলোর সীমানা ছাড়ায়ে বাইরের বাস্তব সমাজের দৃশ্যপট বড়ই বিষাদময়। সামাজিক নিরাপত্তা ও আইনি সুরক্ষার অভাবে কন্যাশিশুরা আজ ঘরে-বাইরে প্রতিনিয়ত সহিংসতার মুখোমুখি হচ্ছে।
গণমাধ্যমে প্রায়ই শিরোনাম হয় কন্যাশিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন, ধর্ষণ ও নির্মম হত্যাকা-ের খবর। যে দেশে গড়ে প্রতিদিন বহু কন্যাশিশু চরম নিপীড়নের শিকার হয়, সেখানে কেবল এক দিনের আনুষ্ঠানিক উদযাপনে তাদের অধিকার বা সম্মান প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। একদিকে বিচারহীনতার সংস্কৃতি, যেখানে ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনি দিয়ে মানুষকে পঙ্গু বা হত্যা করাকে একপ্রকার স্বাভাবিক বিষয় বানিয়ে ফেলা হচ্ছে; অন্যদিকে কন্যাশিশুদের প্রতি অবহেলা ও সহিংসতাÑ এই দুইয়ের সমন্বয়ে গঠিত সমাজ কখনো মানবিক বা সভ্য হয়ে উঠতে পারে না।
যখন কোনো সমাজে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া অভ্যাসে পরিণত হয়, তখন তার সবচেয়ে বড় শিকার হয় শিশু, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য রাষ্ট্র ও সমাজকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যে কাজগুলো করতে হবে বলে মনে করি, তা হলো- প্রথমেই আইনের শাসন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা জরুরি। তথাকথিত ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে।
অপরাধী যে-ই হোক, তাকে দেশের প্রচলিত আইনের আওতায় এনে সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে হবে। এরপর, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন ও কন্যাশিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। কন্যাশিশুর সুরক্ষা কেবল আইনের বইয়ে ছেপে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না, পরিবার ও সামাজিক স্তরে তাদের প্রতি সম্মান ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। শিশুকন্যাটি যেভাবে হিংস্রতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পিতাকে পাউরুটি ও চা খাইয়ে দিয়েছিল, সেই মমত্ববোধ ও করুণাটুকুই হওয়া উচিত আমাদের সমাজের নৈতিক ভিত্তি।
আমরা চাই, প্রতিটি কন্যাশিশু মানবিক মর্যাদা নিয়ে, পূর্ণ নিরাপত্তায় মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকুক। তাদের শৈশব ও স্মৃতিজুড়ে থাকুক বাবা-মা ও আপনজনদের অমলিন ভালোবাসা। কোলজুড়ে থাকুক আগামীর সুস্থ ও নিরাপদ জীবন, আর স্বপ্নজুড়ে থাকুক এই পৃথিবীকে অনিন্দ্যসুন্দর ও সৃষ্টিশীলরূপে সাজিয়ে তোলার অফুরন্ত অনুপ্রেরণা। বিচারহীনতা ও হিংস্রতার তিমিরে কন্যাশিশুর এই অকৃত্রিম মানবতাই যেন আমাদের সমাজের অন্ধকার দূর করার আলোকবর্তিকা হয়ে ওঠে।





















