2:59 am, Sunday, 11 October 2026

দেয়ালজুড়ে গল্প আঁকাই যার নেশা

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, ক্যানভাসে রঙের খেলা, আর এখন বিমানবন্দর, মেট্রোস্টেশন, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দেয়ালে বাংলার প্রকৃতি, মানুষ ও লোকজ ঐতিহ্য তুলে ধরা সব মিলিয়ে শিল্পী রাবেয়া কানিজের পথচলা যেন নিজের স্বপ্নকে রঙে রঙে বাস্তব করে তোলার গল্প।

শিল্পাঙ্গনে যিনি পরিচিত ‘পপি টিকলি’ নামে। তাকে নিয়ে লিখেছেনÑ মিনহাজুর রহমান নয়ন শিল্পের প্রতি ভালোবাসা কখনো কখনো অভাবের মধ্যেই নিজের পথ খুঁজে নেয়। রাবেয়া কানিজের শৈশব তারই উদাহরণ। মাত্র দুই-তিন বছর বয়সে পেনসিল হাতে ছবি আঁকার শুরু। কিন্তু নিজের রং-পেনসিল না থাকায় ইচ্ছা হলেই আঁকার সুযোগ মিলত না। তাই প্রতিবেশীর বাড়িতে গিয়ে ছবি আঁকতেন তিনি।

সেই স্মৃতি আজও অমলিন। সময়ের পরিক্রমায় শৈশবের সেই ভালো লাগা পরিণত হয়েছে পেশায়, আর কাগজের ছোট্ট ছবি থেকে তাঁর শিল্প ছড়িয়ে পড়েছে বিশাল দেয়ালে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় এনটিভির চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় প্রথম হওয়ার ঘটনা তার শিল্পীজীবনের অন্যতম অনুপ্রেরণা। প্রতিযোগিতায় প্রথম হওয়ার আনন্দের চেয়েও বড় ছিল পরিবারের উচ্ছ্বাস। বাবা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের আনন্দ তাকে নতুন করে উৎসাহিত করেছিল।

পপি টিকলির ভাষায়, সেদিনের সেই প্রথম হওয়া তাকে আজকের অবস্থানে আসতে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। ছোটবেলার ছবি আঁকার প্রতি ভালোবাসা তাকে ধীরে ধীরে নিয়ে যায় প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পশিক্ষার পথে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের অঙ্কন ও চিত্রায়ণ বিভাগে পড়াশোনা তার শিল্পীসত্তাকে দেয় নতুন ভিত্তি। আগে নিজের ভালো লাগা থেকেই ছবি আঁকতেন; চারুকলায় এসে উপলব্ধি করেন শিল্পের ব্যাকরণ, নন্দনতত্ত্ব, অনুশীলন ও জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব।

তার মতে, ভালোবাসা একজন মানুষকে শিল্পের পথে নিয়ে যেতে পারে, কিন্তু প্রকৃত শিল্পী হয়ে উঠতে প্রয়োজন যথাযথ শিক্ষা ও নিরবচ্ছিন্ন চর্চা। শিল্পী হয়ে ওঠার এই যাত্রায় ক্যানভাসই ছিল তার প্রধান আশ্রয়। ওয়াটার কালার, পোর্ট্রেট, অ্যাবস্ট্রাক্ট পেইন্টিং ও স্টিল লাইফÑ বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করেছেন তিনি। তবে সময়ের সঙ্গে তার শিল্পচর্চায় যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা।

২০১৮ সাল থেকে ক্যানভাসের পাশাপাশি বড় দেয়ালে ম্যুরাল ও গ্রাফিতি আঁকতে শুরু করেন। এর পেছনে ছিল ছোটবেলা থেকেই বড় পরিসরে ছবি আঁকার আকাক্সক্ষা। দেয়াল তাকে দিয়েছে সেই বিস্তৃত পরিসর, যেখানে রং, রেখা ও অবয়বের মাধ্যমে আরও বড় করে প্রকাশ করা যায় নিজের ভাবনা। ম্যুরাল ও গ্রাফিতি তাকে দিয়েছে আলাদা পরিচিতিও। বর্তমানে পেশাগত জীবনে এই মাধ্যমেই সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন তিনি।

একসময় ওয়াটার কালারে পোর্ট্রেট আঁকা কিংবা অ্যাবস্ট্রাক্ট পেইন্টিংয়ের প্রতি আগ্রহ থাকলেও বাণিজ্যিক কাজের ব্যস্ততায় সেসব চর্চা এখন তুলনামূলক কম। তবে বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করার অভিজ্ঞতা তার শিল্পভাবনাকে বৈচিত্র্যময় করেছে। আর দেয়ালচিত্রের মধ্য দিয়েই মানুষের কাছে পৌঁছেছে তার শিল্পীসত্তার স্বতন্ত্র পরিচয়। পপি টিকলির শিল্পকর্মের অন্যতম বৈশিষ্ট্য বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি ও গ্রামীণ জীবনের উপস্থিতি।

তার রঙের ব্যবহার উজ্জ্বল, প্রাণবন্ত ও বৈচিত্র্যময়। বিশেষ করে ফোক আর্ট এবং রিকশাচিত্রের রং ও শৈলী তাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। গ্রামের বাড়িঘর, মেঠোপথ, প্রকৃতি, শাড়ি পরা নারী, ঢেঁকিতে ধান ভানার দৃশ্যÑ এসব পরিচিত অনুষঙ্গ তার শিল্পে ফিরে ফিরে আসে। তার কাছে এগুলো কেবল ছবি আঁকার উপাদান নয়; বরং বাংলাদেশের জীবনযাপন, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয় তুলে ধরার মাধ্যম।

বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে তার কাজের মধ্যেও এই শিল্পভাবনার প্রতিফলন দেখা যায়। আধুনিক স্থাপনার দেয়ালে লোকজ উপাদান ও গ্রামীণ জীবনের পরিচিত রূপ তুলে ধরে তিনি যেন নাগরিক পরিসরের সঙ্গে বাংলার শিকড়ের একটি সংযোগ তৈরি করতে চান। যে ঐতিহ্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের জীবন ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে, তার নানা অনুষঙ্গকে নতুনভাবে উপস্থাপন করাই তার শিল্পচর্চার গুরুত্বপূর্ণ দিক।

তবে শিল্পের এই পথ সব সময় মসৃণ নয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একজন নারী শিল্পীর বিভিন্ন স্থানে গিয়ে কাজ করা, কাজের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং নানা ধরনের মানুষের সঙ্গে পেশাগত সম্পর্ক বজায় রাখা সহজ নয়। পপি টিকলির কাছে শারীরিক পরিশ্রমের চেয়ে অনেক সময় বেশি কঠিন হয়ে ওঠে ক্লায়েন্টদের সঙ্গে কাজের সমন্বয় ও অর্থনৈতিক লেনদেন। তার মতে, এ দেশে এখনো অনেক মানুষ শিল্পীর শ্রম ও দক্ষতার যথাযথ মূল্য দিতে অভ্যস্ত নন।

ছবি আঁকাকে সহজ কাজ মনে করার প্রবণতা থেকে অনেকেই ভাবেন, চাইলেই একজন শিল্পীকে দিয়ে বিনা পারিশ্রমিকে ছবি আঁকিয়ে নেওয়া সম্ভব। অথচ একটি শিল্পকর্মের পেছনে থাকে দীর্ঘদিনের শিক্ষা, অনুশীলন, সময়, পরিকল্পনা ও সৃজনশীল শ্রম। শিল্পীর সম্মানী নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। শিল্পের যথাযথ মূল্যায়ন না হলে শিল্পীর সৃজনশীলতা ও পেশাগত বিকাশও বাধাগ্রস্ত হয়।

বাণিজ্যিক কাজের ক্ষেত্রে ক্লায়েন্টের পছন্দ ও নিজের শিল্পভাবনার মধ্যে সমন্বয় করাও তার প্রতিদিনের অভিজ্ঞতার অংশ। অনেক সময় দুপক্ষের রুচি ও ভাবনায় পার্থক্য থাকে। তবু কাজের প্রয়োজনে ক্লায়েন্টের পছন্দকে গুরুত্ব দেন তিনি। বিভিন্ন মানুষের ভিন্ন ভিন্ন চাহিদা মেটাতে গিয়ে তার কাজেও বৈচিত্র্য তৈরি হয়। এই বৈচিত্র্যকে তিনি সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখেন না; বরং পেশাগত শিল্পচর্চার একটি স্বাভাবিক অংশ হিসেবে গ্রহণ করেন।

পেশাগত জীবনে নতুন কাজের সুযোগ তৈরিতে বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যমও ভূমিকা রেখেছে। ইন্টেরিয়র ডিজাইনার, শিল্পী, ব্যবসায়ী ও পণ্য সরবরাহকারীদের সংযোগস্থল আইডিবি বাংলাদেশের একটি গ্রুপে নিজের কাজ প্রকাশ করতেন তিনি। সেখান থেকেই পেয়েছেন বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করার সুযোগ। এই প্ল্যাটফর্মের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে পপি টিকলি বলেন, শিল্পকর্ম মানুষের কাছে তুলে ধরা এবং নতুন কাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে এমন যোগাযোগমাধ্যম কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

দলবদ্ধ প্রদর্শনী ‘মৃত্তির মহাকাব্য’সহ বিভিন্ন প্রদর্শনীতে অংশ নিলেও নিজের একক প্রদর্শনী আয়োজনের স্বপ্ন রয়েছে তার। তবে তাড়াহুড়ো করে সেই স্বপ্ন পূরণ করতে চান না। বাণিজ্যিক কাজের ব্যস্ততায় ব্যক্তিগত শিল্পসাধনার জন্য পর্যাপ্ত সময় বের করা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে মনে করেন তিনি। তাই নিজের কাজগুলো আরও গুছিয়ে নেওয়া, নিজস্ব শৈলীকে আরও পরিণত করা এবং স্বতন্ত্র শিল্পভাষা তৈরি করার পরই একক প্রদর্শনীর আয়োজন করতে চান।

সেই প্রদর্শনীতে কী কী থাকছে, তা আপাতত রহস্য হিসেবেই রাখতে চান এই শিল্পী। আগামী দিনের শিল্পচর্চা নিয়ে তার ভাবনায় রয়েছে বাংলাদেশের প্রাণ-প্রকৃতি ও পশুপাখি। তিনি চান, তার শিল্পকর্ম কেবল নান্দনিক আনন্দ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মানুষের কাছে কোনো ইতিবাচক বার্তাও পৌঁছে দিক। প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের সঙ্গে পরিবেশের সম্পর্ক নিয়ে কাজ করার মধ্য দিয়ে সমাজের জন্য অর্থবহ কিছু করতে চান তিনি।

শৈশবে প্রতিবেশীর বাড়িতে গিয়ে ছবি আঁকার যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ তাকে নিয়ে এসেছে বড় বড় দেয়ালে। কিন্তু পপি টিকলির কাছে শিল্পের সার্থকতা শুধু পরিচিতি কিংবা পেশাগত সাফল্যে নয়; বরং নিজের কাজের মধ্য দিয়ে মানুষের ভালোবাসা অর্জনেও। তিনি চান, মানুষ তাকে মনে রাখুক এমন একজন শিল্পী হিসেবে, যিনি রং-তুলির সাহায্যে বাংলার মাটি, মানুষ, প্রকৃতি ও ঐতিহ্যের কথা বলেছেন।

দেয়ালজুড়ে আঁকা তার রঙিন গল্পগুলো তাই কেবল স্থাপনার সৌন্দর্য বাড়ানোর প্রয়াস নয়; বরং শিকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ারও এক সৃজনশীল আহ্বান।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

Nagorik Sangram

Popular Post

দেয়ালজুড়ে গল্প আঁকাই যার নেশা

Update Time : 01:35:19 am, Sunday, 11 October 2026

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, ক্যানভাসে রঙের খেলা, আর এখন বিমানবন্দর, মেট্রোস্টেশন, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দেয়ালে বাংলার প্রকৃতি, মানুষ ও লোকজ ঐতিহ্য তুলে ধরা সব মিলিয়ে শিল্পী রাবেয়া কানিজের পথচলা যেন নিজের স্বপ্নকে রঙে রঙে বাস্তব করে তোলার গল্প।

শিল্পাঙ্গনে যিনি পরিচিত ‘পপি টিকলি’ নামে। তাকে নিয়ে লিখেছেনÑ মিনহাজুর রহমান নয়ন শিল্পের প্রতি ভালোবাসা কখনো কখনো অভাবের মধ্যেই নিজের পথ খুঁজে নেয়। রাবেয়া কানিজের শৈশব তারই উদাহরণ। মাত্র দুই-তিন বছর বয়সে পেনসিল হাতে ছবি আঁকার শুরু। কিন্তু নিজের রং-পেনসিল না থাকায় ইচ্ছা হলেই আঁকার সুযোগ মিলত না। তাই প্রতিবেশীর বাড়িতে গিয়ে ছবি আঁকতেন তিনি।

সেই স্মৃতি আজও অমলিন। সময়ের পরিক্রমায় শৈশবের সেই ভালো লাগা পরিণত হয়েছে পেশায়, আর কাগজের ছোট্ট ছবি থেকে তাঁর শিল্প ছড়িয়ে পড়েছে বিশাল দেয়ালে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় এনটিভির চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় প্রথম হওয়ার ঘটনা তার শিল্পীজীবনের অন্যতম অনুপ্রেরণা। প্রতিযোগিতায় প্রথম হওয়ার আনন্দের চেয়েও বড় ছিল পরিবারের উচ্ছ্বাস। বাবা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের আনন্দ তাকে নতুন করে উৎসাহিত করেছিল।

পপি টিকলির ভাষায়, সেদিনের সেই প্রথম হওয়া তাকে আজকের অবস্থানে আসতে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। ছোটবেলার ছবি আঁকার প্রতি ভালোবাসা তাকে ধীরে ধীরে নিয়ে যায় প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পশিক্ষার পথে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের অঙ্কন ও চিত্রায়ণ বিভাগে পড়াশোনা তার শিল্পীসত্তাকে দেয় নতুন ভিত্তি। আগে নিজের ভালো লাগা থেকেই ছবি আঁকতেন; চারুকলায় এসে উপলব্ধি করেন শিল্পের ব্যাকরণ, নন্দনতত্ত্ব, অনুশীলন ও জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব।

তার মতে, ভালোবাসা একজন মানুষকে শিল্পের পথে নিয়ে যেতে পারে, কিন্তু প্রকৃত শিল্পী হয়ে উঠতে প্রয়োজন যথাযথ শিক্ষা ও নিরবচ্ছিন্ন চর্চা। শিল্পী হয়ে ওঠার এই যাত্রায় ক্যানভাসই ছিল তার প্রধান আশ্রয়। ওয়াটার কালার, পোর্ট্রেট, অ্যাবস্ট্রাক্ট পেইন্টিং ও স্টিল লাইফÑ বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করেছেন তিনি। তবে সময়ের সঙ্গে তার শিল্পচর্চায় যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা।

২০১৮ সাল থেকে ক্যানভাসের পাশাপাশি বড় দেয়ালে ম্যুরাল ও গ্রাফিতি আঁকতে শুরু করেন। এর পেছনে ছিল ছোটবেলা থেকেই বড় পরিসরে ছবি আঁকার আকাক্সক্ষা। দেয়াল তাকে দিয়েছে সেই বিস্তৃত পরিসর, যেখানে রং, রেখা ও অবয়বের মাধ্যমে আরও বড় করে প্রকাশ করা যায় নিজের ভাবনা। ম্যুরাল ও গ্রাফিতি তাকে দিয়েছে আলাদা পরিচিতিও। বর্তমানে পেশাগত জীবনে এই মাধ্যমেই সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন তিনি।

একসময় ওয়াটার কালারে পোর্ট্রেট আঁকা কিংবা অ্যাবস্ট্রাক্ট পেইন্টিংয়ের প্রতি আগ্রহ থাকলেও বাণিজ্যিক কাজের ব্যস্ততায় সেসব চর্চা এখন তুলনামূলক কম। তবে বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করার অভিজ্ঞতা তার শিল্পভাবনাকে বৈচিত্র্যময় করেছে। আর দেয়ালচিত্রের মধ্য দিয়েই মানুষের কাছে পৌঁছেছে তার শিল্পীসত্তার স্বতন্ত্র পরিচয়। পপি টিকলির শিল্পকর্মের অন্যতম বৈশিষ্ট্য বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি ও গ্রামীণ জীবনের উপস্থিতি।

তার রঙের ব্যবহার উজ্জ্বল, প্রাণবন্ত ও বৈচিত্র্যময়। বিশেষ করে ফোক আর্ট এবং রিকশাচিত্রের রং ও শৈলী তাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। গ্রামের বাড়িঘর, মেঠোপথ, প্রকৃতি, শাড়ি পরা নারী, ঢেঁকিতে ধান ভানার দৃশ্যÑ এসব পরিচিত অনুষঙ্গ তার শিল্পে ফিরে ফিরে আসে। তার কাছে এগুলো কেবল ছবি আঁকার উপাদান নয়; বরং বাংলাদেশের জীবনযাপন, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয় তুলে ধরার মাধ্যম।

বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে তার কাজের মধ্যেও এই শিল্পভাবনার প্রতিফলন দেখা যায়। আধুনিক স্থাপনার দেয়ালে লোকজ উপাদান ও গ্রামীণ জীবনের পরিচিত রূপ তুলে ধরে তিনি যেন নাগরিক পরিসরের সঙ্গে বাংলার শিকড়ের একটি সংযোগ তৈরি করতে চান। যে ঐতিহ্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের জীবন ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে, তার নানা অনুষঙ্গকে নতুনভাবে উপস্থাপন করাই তার শিল্পচর্চার গুরুত্বপূর্ণ দিক।

তবে শিল্পের এই পথ সব সময় মসৃণ নয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একজন নারী শিল্পীর বিভিন্ন স্থানে গিয়ে কাজ করা, কাজের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং নানা ধরনের মানুষের সঙ্গে পেশাগত সম্পর্ক বজায় রাখা সহজ নয়। পপি টিকলির কাছে শারীরিক পরিশ্রমের চেয়ে অনেক সময় বেশি কঠিন হয়ে ওঠে ক্লায়েন্টদের সঙ্গে কাজের সমন্বয় ও অর্থনৈতিক লেনদেন। তার মতে, এ দেশে এখনো অনেক মানুষ শিল্পীর শ্রম ও দক্ষতার যথাযথ মূল্য দিতে অভ্যস্ত নন।

ছবি আঁকাকে সহজ কাজ মনে করার প্রবণতা থেকে অনেকেই ভাবেন, চাইলেই একজন শিল্পীকে দিয়ে বিনা পারিশ্রমিকে ছবি আঁকিয়ে নেওয়া সম্ভব। অথচ একটি শিল্পকর্মের পেছনে থাকে দীর্ঘদিনের শিক্ষা, অনুশীলন, সময়, পরিকল্পনা ও সৃজনশীল শ্রম। শিল্পীর সম্মানী নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। শিল্পের যথাযথ মূল্যায়ন না হলে শিল্পীর সৃজনশীলতা ও পেশাগত বিকাশও বাধাগ্রস্ত হয়।

বাণিজ্যিক কাজের ক্ষেত্রে ক্লায়েন্টের পছন্দ ও নিজের শিল্পভাবনার মধ্যে সমন্বয় করাও তার প্রতিদিনের অভিজ্ঞতার অংশ। অনেক সময় দুপক্ষের রুচি ও ভাবনায় পার্থক্য থাকে। তবু কাজের প্রয়োজনে ক্লায়েন্টের পছন্দকে গুরুত্ব দেন তিনি। বিভিন্ন মানুষের ভিন্ন ভিন্ন চাহিদা মেটাতে গিয়ে তার কাজেও বৈচিত্র্য তৈরি হয়। এই বৈচিত্র্যকে তিনি সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখেন না; বরং পেশাগত শিল্পচর্চার একটি স্বাভাবিক অংশ হিসেবে গ্রহণ করেন।

পেশাগত জীবনে নতুন কাজের সুযোগ তৈরিতে বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যমও ভূমিকা রেখেছে। ইন্টেরিয়র ডিজাইনার, শিল্পী, ব্যবসায়ী ও পণ্য সরবরাহকারীদের সংযোগস্থল আইডিবি বাংলাদেশের একটি গ্রুপে নিজের কাজ প্রকাশ করতেন তিনি। সেখান থেকেই পেয়েছেন বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করার সুযোগ। এই প্ল্যাটফর্মের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে পপি টিকলি বলেন, শিল্পকর্ম মানুষের কাছে তুলে ধরা এবং নতুন কাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে এমন যোগাযোগমাধ্যম কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

দলবদ্ধ প্রদর্শনী ‘মৃত্তির মহাকাব্য’সহ বিভিন্ন প্রদর্শনীতে অংশ নিলেও নিজের একক প্রদর্শনী আয়োজনের স্বপ্ন রয়েছে তার। তবে তাড়াহুড়ো করে সেই স্বপ্ন পূরণ করতে চান না। বাণিজ্যিক কাজের ব্যস্ততায় ব্যক্তিগত শিল্পসাধনার জন্য পর্যাপ্ত সময় বের করা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে মনে করেন তিনি। তাই নিজের কাজগুলো আরও গুছিয়ে নেওয়া, নিজস্ব শৈলীকে আরও পরিণত করা এবং স্বতন্ত্র শিল্পভাষা তৈরি করার পরই একক প্রদর্শনীর আয়োজন করতে চান।

সেই প্রদর্শনীতে কী কী থাকছে, তা আপাতত রহস্য হিসেবেই রাখতে চান এই শিল্পী। আগামী দিনের শিল্পচর্চা নিয়ে তার ভাবনায় রয়েছে বাংলাদেশের প্রাণ-প্রকৃতি ও পশুপাখি। তিনি চান, তার শিল্পকর্ম কেবল নান্দনিক আনন্দ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মানুষের কাছে কোনো ইতিবাচক বার্তাও পৌঁছে দিক। প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের সঙ্গে পরিবেশের সম্পর্ক নিয়ে কাজ করার মধ্য দিয়ে সমাজের জন্য অর্থবহ কিছু করতে চান তিনি।

শৈশবে প্রতিবেশীর বাড়িতে গিয়ে ছবি আঁকার যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ তাকে নিয়ে এসেছে বড় বড় দেয়ালে। কিন্তু পপি টিকলির কাছে শিল্পের সার্থকতা শুধু পরিচিতি কিংবা পেশাগত সাফল্যে নয়; বরং নিজের কাজের মধ্য দিয়ে মানুষের ভালোবাসা অর্জনেও। তিনি চান, মানুষ তাকে মনে রাখুক এমন একজন শিল্পী হিসেবে, যিনি রং-তুলির সাহায্যে বাংলার মাটি, মানুষ, প্রকৃতি ও ঐতিহ্যের কথা বলেছেন।

দেয়ালজুড়ে আঁকা তার রঙিন গল্পগুলো তাই কেবল স্থাপনার সৌন্দর্য বাড়ানোর প্রয়াস নয়; বরং শিকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ারও এক সৃজনশীল আহ্বান।