11:54 pm, Sunday, 23 August 2026

মধ্যনগরের শতবর্ষী ভাসমান নৌকার হাট: হাওরবাসীর জীবনের প্রতিচ্ছবি

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

বর্ষা এলেই সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বাড়ে নৌকার কদর। ছয় মাস জলপথে চলাচল, মাছ ধরা, নিত্যপণ্য পরিবহন কিংবা বিয়ের শোভাযাত্রা—হাওরবাসীর প্রাত্যহিক জীবনের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ নৌকা।

আর এই নৌকার কেনাবেচাকে ঘিরেই মধ্যনগর উপজেলায় গড়ে উঠেছে শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী নৌকার হাট, স্থানীয়দের কাছে যা ‘নাও মহাল’ নামে পরিচিত। স্থানীয় প্রবীণদের মতে, এই হাটের ইতিহাস প্রায় এক শতাব্দীর পুরোনো। ১৯২০-এর দশকে গৌরীপুরের জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় মধ্যনগরে একটি দিঘি খনন করালে এর পাশেই গড়ে ওঠে স্থায়ী বাজার ও নৌকার হাট।

সেই থেকে আজও স্বমহিমায় টিকে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী ‘নাও মহাল’। শুধু মধ্যনগর নয়, পার্শ্ববর্তী তাহিরপুর, ধর্মপাশা এবং নেত্রকোনার কলমাকান্দা ও বারহাট্টা উপজেলা থেকেও ক্রেতা-বিক্রেতারা এই হাটে আসেন। বর্ষাকালে প্রতি শনিবার মধ্যনগর বাজারের কাচারীঘাট-সংলগ্ন গোরাডোবা হাওরে বসে এই ভাসমান নৌকার হাট। সকাল থেকেই হাওরের পানিতে সারিবদ্ধভাবে বাঁধা থাকে বিভিন্ন আকৃতির নৌকা।

ক্রেতা-বিক্রেতাদের দরদাম, হাঁকডাক আর নৌকার সারিতে পুরো হাটজুড়ে সৃষ্টি হয় উৎসবের আমেজ। বিকেল পর্যন্ত চলে নৌকার কেনাবেচা। হাটে খিলুয়া, কুশি, সরঙ্গা, চাচতলী, চডানাউ ও বারকিসহ নানা ধরনের নৌকা পাওয়া যায়। মেহগনি, কড়ই ও চাম্বল কাঠ দিয়ে তৈরি এসব নৌকা আকার ও নকশাভেদে ৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। স্থানীয় প্রবীণ নৌকা কারিগর অনিল চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, কাঠ, পেরেকসহ নৌকা তৈরির সব ধরনের উপকরণের দাম আগের তুলনায় বেড়েছে।

তারপরও বাপ-দাদার পেশা ও ঐতিহ্য ধরে রাখতে প্রতি মৌসুমেই আমরা নতুন নৌকা তৈরি করি। মধ্যনগরের এই ঐতিহ্যবাহী হাটে চাহিদা ভালো থাকায় ন্যায্য মূল্য পাই। তা দিয়ে সারা বছর সংসার চলে। ইজারাদারদের ভাষ্য, শত বছরের পুরোনো এই হাটে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এসে নৌকা কেনাবেচা করেন। এর মাধ্যমে সরকার প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্বও পেয়ে থাকে।

তবে স্থানস্বল্পতার কারণে নৌকা রাখা ও বাঁধার ক্ষেত্রে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। তারা জানান, নৌকার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা তৈরি এবং ঘাটের পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলে ভবিষ্যতে এই হাট থেকে রাজস্ব আদায় আরও বাড়ানো সম্ভব। পাশের কলমাকান্দা উপজেলার পাঁচগাঁও থেকে আসা নৌকা ক্রেতা আবুল হোসেন মিয়া বলেন, হাওরাঞ্চলে বর্ষাকালে যাতায়াত কিংবা পণ্য পরিবহনের জন্য নৌকার কোনো বিকল্প নেই।

মধ্যনগরের নাও মহালে এসে একসঙ্গে বিভিন্ন কাঠ ও নকশার নৌকা দেখে দরদাম করে কেনার সুযোগ পাওয়া যায়। হাটের পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি দূর থেকে আসা ক্রেতা-বিক্রেতাদের জন্য নির্দিষ্ট বিশ্রামস্থল বা শেডের ব্যবস্থা করা হলে আমাদের জন্য আরও সুবিধা হতো। মধ্যনগর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জনি রায় বলেন, বর্ষার টইটম্বুর পানিতে হাওরের বুকজুড়ে যখন ঢেউ খেলে যায়, তখন এই ভাসমান নাও মহালে আবর্তিত হয় জীবনের ভিন্ন এক গল্প।

এটি কেবল এক পণ্যের কেনাবেচার স্থান নয়; বরং হাওরবাসীর সংস্কৃতি, সংগ্রাম ও টিকে থাকার লড়াইয়ের এক অনন্য স্মারক। তিনি আরও বলেন, হাটের সার্বিক নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও ঐতিহ্য রক্ষায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে। শতবর্ষী এই ‘নাও মহাল’ তাই শুধু নৌকা কেনাবেচার জায়গা নয়; এটি হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

বর্ষা এলেই পানির বুকে ভেসে ওঠা এই হাট হয়ে ওঠে হাওরবাসীর জীবন ও জীবিকার অনন্য এক মিলনস্থল।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

Nagorik Sangram

Popular Post

সাভারে লিফটের ফাঁকা জায়গা দিয়ে পড়ে নারী শ্রমিকের মৃত্যু

মধ্যনগরের শতবর্ষী ভাসমান নৌকার হাট: হাওরবাসীর জীবনের প্রতিচ্ছবি

Update Time : 09:45:19 pm, Sunday, 23 August 2026

বর্ষা এলেই সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বাড়ে নৌকার কদর। ছয় মাস জলপথে চলাচল, মাছ ধরা, নিত্যপণ্য পরিবহন কিংবা বিয়ের শোভাযাত্রা—হাওরবাসীর প্রাত্যহিক জীবনের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ নৌকা।

আর এই নৌকার কেনাবেচাকে ঘিরেই মধ্যনগর উপজেলায় গড়ে উঠেছে শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী নৌকার হাট, স্থানীয়দের কাছে যা ‘নাও মহাল’ নামে পরিচিত। স্থানীয় প্রবীণদের মতে, এই হাটের ইতিহাস প্রায় এক শতাব্দীর পুরোনো। ১৯২০-এর দশকে গৌরীপুরের জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় মধ্যনগরে একটি দিঘি খনন করালে এর পাশেই গড়ে ওঠে স্থায়ী বাজার ও নৌকার হাট।

সেই থেকে আজও স্বমহিমায় টিকে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী ‘নাও মহাল’। শুধু মধ্যনগর নয়, পার্শ্ববর্তী তাহিরপুর, ধর্মপাশা এবং নেত্রকোনার কলমাকান্দা ও বারহাট্টা উপজেলা থেকেও ক্রেতা-বিক্রেতারা এই হাটে আসেন। বর্ষাকালে প্রতি শনিবার মধ্যনগর বাজারের কাচারীঘাট-সংলগ্ন গোরাডোবা হাওরে বসে এই ভাসমান নৌকার হাট। সকাল থেকেই হাওরের পানিতে সারিবদ্ধভাবে বাঁধা থাকে বিভিন্ন আকৃতির নৌকা।

ক্রেতা-বিক্রেতাদের দরদাম, হাঁকডাক আর নৌকার সারিতে পুরো হাটজুড়ে সৃষ্টি হয় উৎসবের আমেজ। বিকেল পর্যন্ত চলে নৌকার কেনাবেচা। হাটে খিলুয়া, কুশি, সরঙ্গা, চাচতলী, চডানাউ ও বারকিসহ নানা ধরনের নৌকা পাওয়া যায়। মেহগনি, কড়ই ও চাম্বল কাঠ দিয়ে তৈরি এসব নৌকা আকার ও নকশাভেদে ৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। স্থানীয় প্রবীণ নৌকা কারিগর অনিল চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, কাঠ, পেরেকসহ নৌকা তৈরির সব ধরনের উপকরণের দাম আগের তুলনায় বেড়েছে।

তারপরও বাপ-দাদার পেশা ও ঐতিহ্য ধরে রাখতে প্রতি মৌসুমেই আমরা নতুন নৌকা তৈরি করি। মধ্যনগরের এই ঐতিহ্যবাহী হাটে চাহিদা ভালো থাকায় ন্যায্য মূল্য পাই। তা দিয়ে সারা বছর সংসার চলে। ইজারাদারদের ভাষ্য, শত বছরের পুরোনো এই হাটে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এসে নৌকা কেনাবেচা করেন। এর মাধ্যমে সরকার প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্বও পেয়ে থাকে।

তবে স্থানস্বল্পতার কারণে নৌকা রাখা ও বাঁধার ক্ষেত্রে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। তারা জানান, নৌকার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা তৈরি এবং ঘাটের পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলে ভবিষ্যতে এই হাট থেকে রাজস্ব আদায় আরও বাড়ানো সম্ভব। পাশের কলমাকান্দা উপজেলার পাঁচগাঁও থেকে আসা নৌকা ক্রেতা আবুল হোসেন মিয়া বলেন, হাওরাঞ্চলে বর্ষাকালে যাতায়াত কিংবা পণ্য পরিবহনের জন্য নৌকার কোনো বিকল্প নেই।

মধ্যনগরের নাও মহালে এসে একসঙ্গে বিভিন্ন কাঠ ও নকশার নৌকা দেখে দরদাম করে কেনার সুযোগ পাওয়া যায়। হাটের পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি দূর থেকে আসা ক্রেতা-বিক্রেতাদের জন্য নির্দিষ্ট বিশ্রামস্থল বা শেডের ব্যবস্থা করা হলে আমাদের জন্য আরও সুবিধা হতো। মধ্যনগর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জনি রায় বলেন, বর্ষার টইটম্বুর পানিতে হাওরের বুকজুড়ে যখন ঢেউ খেলে যায়, তখন এই ভাসমান নাও মহালে আবর্তিত হয় জীবনের ভিন্ন এক গল্প।

এটি কেবল এক পণ্যের কেনাবেচার স্থান নয়; বরং হাওরবাসীর সংস্কৃতি, সংগ্রাম ও টিকে থাকার লড়াইয়ের এক অনন্য স্মারক। তিনি আরও বলেন, হাটের সার্বিক নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও ঐতিহ্য রক্ষায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে। শতবর্ষী এই ‘নাও মহাল’ তাই শুধু নৌকা কেনাবেচার জায়গা নয়; এটি হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

বর্ষা এলেই পানির বুকে ভেসে ওঠা এই হাট হয়ে ওঠে হাওরবাসীর জীবন ও জীবিকার অনন্য এক মিলনস্থল।