4:29 am, Monday, 9 November 2026

বন্ধ ঘরে মিলছে না সাড়া, খোঁজ নেই বাসিন্দার

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

একটি বন্ধ ঘরের দরজায় বারবার কলিংবেল বাজানো এবং ফোনে একের পর এক চেষ্টা করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এমনকি পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দারাও নিশ্চিত করতে পারেননি যে শেষ কবে ওই ঘরের মানুষটিকে বাইরে বের হতে দেখেছেন। এ বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেননি ভবনের নিরাপত্তাকর্মীও।

সন্দেহ হওয়ায় শেষ পর্যন্ত ভাঙা হলো দরজা। ভেতরে পড়ে ছিল এক প্রবীণের নিথর দেহ। কতক্ষণ আগে তার মৃত্যু হয়েছে, তা-ও নিশ্চিত করে বলতে পারেননি কেউ। মৃত্যুর সময় পাশে ছিলেন না সন্তান, নিকটাত্মীয়; এমনকি পাশের ঘরের মানুষও জানতেন না— তিনি অসুস্থ ছিলেন কি না। বাইরে তখন ব্যস্ত শহর। রাস্তায় যানবাহন, ভবনে মানুষের ওঠানামা, লিফটে ভিড়, দোকানে ক্রেতা।

শুধু একটি বন্ধ দরজার ওপারে থেমে গেছে নিজ ঘরে পরবাসের মতো একটি জীবন। এ রকম ঘটনা ঘটছে অহরহই। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দ্রুত বদলে যাওয়া নগরজীবনের নির্মম প্রতিচ্ছবি। মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, বহুতল ভবন বাড়ছে, যোগাযোগ প্রযুক্তি উন্নত হচ্ছে; কিন্তু মানুষের সঙ্গে মানুষের সশরীর যোগাযোগ কি ততটাই বাড়ছে? ঢাকা শহরে একই ভবনে কয়েকশ মানুষ থাকে, একই লিফটে প্রতিদিন দেখা হয়, একই সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা চলে; অথচ পাশের দরজার মানুষটি অসুস্থ কি না, একা কি না, বিপদে পড়েছেন কি না— সেটুকু জানার সময়ও হয় না।

সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, নগরজীবনের এই সংকটকে শুধু ‘একা থাকা’ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে ভুল হবে। এর পেছনে রয়েছে পরিবার কাঠামোর পরিবর্তন, সন্তানদের বিদেশমুখিতা, কর্মব্যস্ততা, আবাসিক জীবনের ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, অর্থনৈতিক চাপ, প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগ এবং প্রতিবেশী-সম্পর্ক ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়া। এখন মানুষ যোগাযোগের দিক থেকে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কাছাকাছি; কিন্তু প্রয়োজনের মুহূর্তে শারীরিকভাবে পাশে থাকার মানুষ কমে যাচ্ছে।

সমাজ বিশ্লেষক অধ্যাপক মাজেদুল হক রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, শহুরে জীবনে ব্যক্তিস্বাধীনতা বেড়েছে, কিন্তু সামাজিক নির্ভরতা কমেছে। আগে একজন মানুষ বিপদে পড়লে পরিবার, আত্মীয় ও প্রতিবেশী— তিনটি স্তর থেকে সহায়তা পেতেন। এখন এই তিনটি স্তর অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে একজন একা থাকা মানুষ শুধু একাই থাকছেন না, তার বিপদের খবর পাওয়ার ব্যবস্থাটিও দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।

এই সংকট সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান প্রবীণদের জীবনে। সন্তান বিদেশে, কেউ অন্য শহরে, কেউ চাকরি বা ব্যবসায় ব্যস্ত, কেউ নিজের সংসারে। অনেক সন্তানের সঙ্গে বাবা-মায়ের প্রতিদিন যোগাযোগ আছে। ভিডিও কল হয়, টাকা পাঠানো হয়, উৎসবে ফোন আসে। কিন্তু অসুস্থতার সময় পাশে বসার মানুষ নেই, হঠাৎ পড়ে গেলে হাসপাতালে নেওয়ার মানুষ নেই, জরুরি সময়ে ওষুধ কিনে দেওয়ার মানুষ নেই।

সম্পর্ক আছে, কিন্তু শারীরিক উপস্থিতি নেই। এ কারণেই অনেক সমাজ বিশ্লেষক এই বাস্তবতাকে বলছেন ‘ডিজিটাল অসহায়ত্ব’। সন্তান স্ক্রিনে আছে, কিন্তু ঘরে নেই। ফোনে খোঁজ আছে, কিন্তু হাত বাড়িয়ে দেওয়ার মানুষ নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. আমানুল্লাহ বলেন, সমাজ বর্তমানে একটি ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও পুঁজিবাদী সংস্কৃতির প্রভাবে প্রথাগত পারিবারিক বন্ধন শিথিল হয়ে পড়েছে। যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক গুণগত সময় কমেছে। এর প্রভাব পড়ছে পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক সংহতি ও মানসিক অবস্থার ওপর। নিঃসঙ্গতা ও একাকিত্বও এর ফলে বাড়ছে। একাকিত্ব শুধু প্রবীণদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

কর্মজীবী নারী-পুরুষ, অবিবাহিত তরুণ-তরুণী, সন্তানহীন দম্পতি, অন্য জেলা থেকে ঢাকায় আসা চাকরিজীবী কিংবা দীর্ঘ সময় একা থাকা মানুষ— বিভিন্ন শ্রেণি ও বয়সের মানুষ এর শিকার। অফিসে সহকর্মী আছে, ফেসবুকে শত শত বন্ধু আছে, ফোনে অসংখ্য নম্বর আছে; কিন্তু গভীর রাতে বিপদে পড়লে কাকে ফোন দেবেন— এ প্রশ্নের উত্তর অনেকের কাছেই নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহফুজা খানম বলেন, শহুরে জীবনে মানুষ একই ছাদের নিচে থেকেও বিচ্ছিন্ন। প্রবীণদের পাশাপাশি তরুণদের মধ্যেও একাকিত্ব বাড়ছে। দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক বিচ্ছিন্নতা মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। তীব্র একাকিত্ব থেকে বিষণ্নতা এবং কিছু ক্ষেত্রে আত্মহননের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে ভার্চুয়াল জগৎ অনেক সময় এই শূন্যতা সাময়িকভাবে ঢেকে রাখছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার মানুষের মধ্যে অন্যের জীবনের সঙ্গে নিজের জীবনের তুলনা অস্থিরতা ও হীনম্মন্যতা তৈরি করতে পারে। ভার্চুয়াল দুনিয়ার লাইক-কমেন্টের পেছনে ছুটতে গিয়ে মানুষ বাস্তব জীবনের গভীর মানবিক সম্পর্ক হারিয়ে ফেলতে পারে।

তখন মানুষের চারপাশে যোগাযোগের শব্দ থাকে, কিন্তু ভেতরে তৈরি হয় গভীর শূন্যতা। এই শূন্যতার আরেকটি বিপজ্জনক দিক হলো প্রতারণা। নিঃসঙ্গ মানুষ কথা বলতে চান, কেউ তার খোঁজ নিক— এই স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষাকে কাজে লাগাতে পারে প্রতারকচক্র। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধুত্ব, পরিচিত সেজে যোগাযোগ, বিনিয়োগের প্রস্তাব, জরুরি সাহায্যের আবেদন কিংবা আবেগের সম্পর্ক তৈরি করে বিশ্বাস অর্জনের পর অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।

ফলে একাকিত্ব শুধু মানসিক সমস্যা নয়, এটি ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ঝুঁকিও তৈরি করছে। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় বসবাসকারী অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ডা. সাদেকুল ইসলাম বলেন, একাকিত্বকে শুধু প্রবীণদের সমস্যা হিসেবে দেখলে হবে না। একই ছাদের নিচে একাধিক মানুষ থাকছেন, কিন্তু প্রত্যেকে নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত। এক ঘর ভাগ করে নেওয়া আর জীবন ভাগ করে নেওয়া এক বিষয় নয়।

তার মতে, মানুষের অবসর, বিনোদন, কেনাকাটা, ব্যাংকিং ও যোগাযোগ— সবকিছুই এখন একটি স্ক্রিনে চলে এসেছে। প্রযুক্তি জীবনকে সহজ করেছে; কিন্তু মানুষের বিকল্প তৈরি করতে পারেনি। একজন ইউটিউবার, ব্লগার বা অনলাইনে পরিচিত মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ থাকলেও তারা বাস্তব জীবনে স্বজনের জায়গা নিতে পারেন না। শান্তিনগর এলাকার বাসিন্দা প্রবীণ শামসুন্নাহার রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, শহর যত বড় হচ্ছে, মানুষের থাকার জায়গা বাড়ছে; কিন্তু সামাজিক পরিসর সংকুচিত হচ্ছে।

এমন একটি নগরজীবন তৈরি হচ্ছে, যেখানে মানুষের থাকার জন্য ঘর থাকবে, কিন্তু বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানোর মতো মানুষ থাকবে না। সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. নেহাল করিমের মতে, সামাজিক সম্পর্ক দুর্বল হওয়ার সঙ্গে পরমতসহিষ্ণুতার ঘাটতি ও পারস্পরিক আস্থার সংকটও যুক্ত হয়েছে। সামাজিক ও রাজনৈতিক জবাবদিহিতার দুর্বলতা এবং আইনগত ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থার সংকট মানুষের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরতার জায়গাকে আরও সংকুচিত করছে।

সমাজ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পরিবারকাঠামো বদলেছে। এখন সামাজিক নিরাপত্তাকাঠামোও বদলাতে হবে। আগে পরিবার যেসব দায়িত্ব পালন করত, এখন তার কিছু অংশ মিলছে কেয়ারগিভার, হাসপাতাল, প্রযুক্তি কিংবা বিভিন্ন বাণিজ্যিক সেবায়। এসব সেবা মানুষের প্রয়োজন মেটাতে পারলেও সম্পর্ক তৈরি করতে পারে না। এ জন্য আবাসিক এলাকায় একা থাকা প্রবীণদের জন্য কমিউনিটিভিত্তিক সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

কারা একা থাকেন, তাদের জরুরি যোগাযোগ নম্বর কী, কাছের আত্মীয় কোথায় থাকেন— এমন একটি নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। স্থানীয় পর্যায়ে স্বেচ্ছাসেবী বা কমিউনিটি কন্ট্যাক্ট পারসন রাখা যেতে পারে। নিয়মিত খোঁজ নেওয়া, জরুরি চিকিৎসা সহায়তা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং ডিজিটাল প্রতারণা সম্পর্কে সচেতনতার ব্যবস্থাও জরুরি। তবে এর শুরু হতে পারে খুব ছোট জায়গা থেকে— প্রতিবেশী থেকে।

পাশের দরজায় একবার কড়া নাড়া, কয়েক মিনিট কথা বলা, দীর্ঘদিন কাউকে না দেখলে খোঁজ নেওয়া কিংবা একা থাকা একজন প্রবীণের জরুরি নম্বরটি সংরক্ষণ করা— এই সামান্য সামাজিক দায়িত্বও অনেকক্ষেত্রেই একটি জীবন বাঁচাতে পারে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

Nagorik Sangram

Popular Post

গোপনে বিয়ে করেছেন নিহা, কাবাঘরে জীবনসঙ্গীকে নিয়ে প্রকাশ করলেন অভিনেত্রী

বন্ধ ঘরে মিলছে না সাড়া, খোঁজ নেই বাসিন্দার

Update Time : 12:32:41 am, Saturday, 19 September 2026

একটি বন্ধ ঘরের দরজায় বারবার কলিংবেল বাজানো এবং ফোনে একের পর এক চেষ্টা করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এমনকি পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দারাও নিশ্চিত করতে পারেননি যে শেষ কবে ওই ঘরের মানুষটিকে বাইরে বের হতে দেখেছেন। এ বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেননি ভবনের নিরাপত্তাকর্মীও।

সন্দেহ হওয়ায় শেষ পর্যন্ত ভাঙা হলো দরজা। ভেতরে পড়ে ছিল এক প্রবীণের নিথর দেহ। কতক্ষণ আগে তার মৃত্যু হয়েছে, তা-ও নিশ্চিত করে বলতে পারেননি কেউ। মৃত্যুর সময় পাশে ছিলেন না সন্তান, নিকটাত্মীয়; এমনকি পাশের ঘরের মানুষও জানতেন না— তিনি অসুস্থ ছিলেন কি না। বাইরে তখন ব্যস্ত শহর। রাস্তায় যানবাহন, ভবনে মানুষের ওঠানামা, লিফটে ভিড়, দোকানে ক্রেতা।

শুধু একটি বন্ধ দরজার ওপারে থেমে গেছে নিজ ঘরে পরবাসের মতো একটি জীবন। এ রকম ঘটনা ঘটছে অহরহই। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দ্রুত বদলে যাওয়া নগরজীবনের নির্মম প্রতিচ্ছবি। মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, বহুতল ভবন বাড়ছে, যোগাযোগ প্রযুক্তি উন্নত হচ্ছে; কিন্তু মানুষের সঙ্গে মানুষের সশরীর যোগাযোগ কি ততটাই বাড়ছে? ঢাকা শহরে একই ভবনে কয়েকশ মানুষ থাকে, একই লিফটে প্রতিদিন দেখা হয়, একই সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা চলে; অথচ পাশের দরজার মানুষটি অসুস্থ কি না, একা কি না, বিপদে পড়েছেন কি না— সেটুকু জানার সময়ও হয় না।

সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, নগরজীবনের এই সংকটকে শুধু ‘একা থাকা’ দিয়ে ব্যাখ্যা করলে ভুল হবে। এর পেছনে রয়েছে পরিবার কাঠামোর পরিবর্তন, সন্তানদের বিদেশমুখিতা, কর্মব্যস্ততা, আবাসিক জীবনের ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, অর্থনৈতিক চাপ, প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগ এবং প্রতিবেশী-সম্পর্ক ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়া। এখন মানুষ যোগাযোগের দিক থেকে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কাছাকাছি; কিন্তু প্রয়োজনের মুহূর্তে শারীরিকভাবে পাশে থাকার মানুষ কমে যাচ্ছে।

সমাজ বিশ্লেষক অধ্যাপক মাজেদুল হক রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, শহুরে জীবনে ব্যক্তিস্বাধীনতা বেড়েছে, কিন্তু সামাজিক নির্ভরতা কমেছে। আগে একজন মানুষ বিপদে পড়লে পরিবার, আত্মীয় ও প্রতিবেশী— তিনটি স্তর থেকে সহায়তা পেতেন। এখন এই তিনটি স্তর অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে একজন একা থাকা মানুষ শুধু একাই থাকছেন না, তার বিপদের খবর পাওয়ার ব্যবস্থাটিও দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।

এই সংকট সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান প্রবীণদের জীবনে। সন্তান বিদেশে, কেউ অন্য শহরে, কেউ চাকরি বা ব্যবসায় ব্যস্ত, কেউ নিজের সংসারে। অনেক সন্তানের সঙ্গে বাবা-মায়ের প্রতিদিন যোগাযোগ আছে। ভিডিও কল হয়, টাকা পাঠানো হয়, উৎসবে ফোন আসে। কিন্তু অসুস্থতার সময় পাশে বসার মানুষ নেই, হঠাৎ পড়ে গেলে হাসপাতালে নেওয়ার মানুষ নেই, জরুরি সময়ে ওষুধ কিনে দেওয়ার মানুষ নেই।

সম্পর্ক আছে, কিন্তু শারীরিক উপস্থিতি নেই। এ কারণেই অনেক সমাজ বিশ্লেষক এই বাস্তবতাকে বলছেন ‘ডিজিটাল অসহায়ত্ব’। সন্তান স্ক্রিনে আছে, কিন্তু ঘরে নেই। ফোনে খোঁজ আছে, কিন্তু হাত বাড়িয়ে দেওয়ার মানুষ নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. আমানুল্লাহ বলেন, সমাজ বর্তমানে একটি ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও পুঁজিবাদী সংস্কৃতির প্রভাবে প্রথাগত পারিবারিক বন্ধন শিথিল হয়ে পড়েছে। যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক গুণগত সময় কমেছে। এর প্রভাব পড়ছে পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক সংহতি ও মানসিক অবস্থার ওপর। নিঃসঙ্গতা ও একাকিত্বও এর ফলে বাড়ছে। একাকিত্ব শুধু প্রবীণদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

কর্মজীবী নারী-পুরুষ, অবিবাহিত তরুণ-তরুণী, সন্তানহীন দম্পতি, অন্য জেলা থেকে ঢাকায় আসা চাকরিজীবী কিংবা দীর্ঘ সময় একা থাকা মানুষ— বিভিন্ন শ্রেণি ও বয়সের মানুষ এর শিকার। অফিসে সহকর্মী আছে, ফেসবুকে শত শত বন্ধু আছে, ফোনে অসংখ্য নম্বর আছে; কিন্তু গভীর রাতে বিপদে পড়লে কাকে ফোন দেবেন— এ প্রশ্নের উত্তর অনেকের কাছেই নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহফুজা খানম বলেন, শহুরে জীবনে মানুষ একই ছাদের নিচে থেকেও বিচ্ছিন্ন। প্রবীণদের পাশাপাশি তরুণদের মধ্যেও একাকিত্ব বাড়ছে। দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক বিচ্ছিন্নতা মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। তীব্র একাকিত্ব থেকে বিষণ্নতা এবং কিছু ক্ষেত্রে আত্মহননের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে ভার্চুয়াল জগৎ অনেক সময় এই শূন্যতা সাময়িকভাবে ঢেকে রাখছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার মানুষের মধ্যে অন্যের জীবনের সঙ্গে নিজের জীবনের তুলনা অস্থিরতা ও হীনম্মন্যতা তৈরি করতে পারে। ভার্চুয়াল দুনিয়ার লাইক-কমেন্টের পেছনে ছুটতে গিয়ে মানুষ বাস্তব জীবনের গভীর মানবিক সম্পর্ক হারিয়ে ফেলতে পারে।

তখন মানুষের চারপাশে যোগাযোগের শব্দ থাকে, কিন্তু ভেতরে তৈরি হয় গভীর শূন্যতা। এই শূন্যতার আরেকটি বিপজ্জনক দিক হলো প্রতারণা। নিঃসঙ্গ মানুষ কথা বলতে চান, কেউ তার খোঁজ নিক— এই স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষাকে কাজে লাগাতে পারে প্রতারকচক্র। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধুত্ব, পরিচিত সেজে যোগাযোগ, বিনিয়োগের প্রস্তাব, জরুরি সাহায্যের আবেদন কিংবা আবেগের সম্পর্ক তৈরি করে বিশ্বাস অর্জনের পর অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।

ফলে একাকিত্ব শুধু মানসিক সমস্যা নয়, এটি ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ঝুঁকিও তৈরি করছে। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় বসবাসকারী অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ডা. সাদেকুল ইসলাম বলেন, একাকিত্বকে শুধু প্রবীণদের সমস্যা হিসেবে দেখলে হবে না। একই ছাদের নিচে একাধিক মানুষ থাকছেন, কিন্তু প্রত্যেকে নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত। এক ঘর ভাগ করে নেওয়া আর জীবন ভাগ করে নেওয়া এক বিষয় নয়।

তার মতে, মানুষের অবসর, বিনোদন, কেনাকাটা, ব্যাংকিং ও যোগাযোগ— সবকিছুই এখন একটি স্ক্রিনে চলে এসেছে। প্রযুক্তি জীবনকে সহজ করেছে; কিন্তু মানুষের বিকল্প তৈরি করতে পারেনি। একজন ইউটিউবার, ব্লগার বা অনলাইনে পরিচিত মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ থাকলেও তারা বাস্তব জীবনে স্বজনের জায়গা নিতে পারেন না। শান্তিনগর এলাকার বাসিন্দা প্রবীণ শামসুন্নাহার রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, শহর যত বড় হচ্ছে, মানুষের থাকার জায়গা বাড়ছে; কিন্তু সামাজিক পরিসর সংকুচিত হচ্ছে।

এমন একটি নগরজীবন তৈরি হচ্ছে, যেখানে মানুষের থাকার জন্য ঘর থাকবে, কিন্তু বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানোর মতো মানুষ থাকবে না। সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. নেহাল করিমের মতে, সামাজিক সম্পর্ক দুর্বল হওয়ার সঙ্গে পরমতসহিষ্ণুতার ঘাটতি ও পারস্পরিক আস্থার সংকটও যুক্ত হয়েছে। সামাজিক ও রাজনৈতিক জবাবদিহিতার দুর্বলতা এবং আইনগত ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থার সংকট মানুষের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরতার জায়গাকে আরও সংকুচিত করছে।

সমাজ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পরিবারকাঠামো বদলেছে। এখন সামাজিক নিরাপত্তাকাঠামোও বদলাতে হবে। আগে পরিবার যেসব দায়িত্ব পালন করত, এখন তার কিছু অংশ মিলছে কেয়ারগিভার, হাসপাতাল, প্রযুক্তি কিংবা বিভিন্ন বাণিজ্যিক সেবায়। এসব সেবা মানুষের প্রয়োজন মেটাতে পারলেও সম্পর্ক তৈরি করতে পারে না। এ জন্য আবাসিক এলাকায় একা থাকা প্রবীণদের জন্য কমিউনিটিভিত্তিক সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

কারা একা থাকেন, তাদের জরুরি যোগাযোগ নম্বর কী, কাছের আত্মীয় কোথায় থাকেন— এমন একটি নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। স্থানীয় পর্যায়ে স্বেচ্ছাসেবী বা কমিউনিটি কন্ট্যাক্ট পারসন রাখা যেতে পারে। নিয়মিত খোঁজ নেওয়া, জরুরি চিকিৎসা সহায়তা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং ডিজিটাল প্রতারণা সম্পর্কে সচেতনতার ব্যবস্থাও জরুরি। তবে এর শুরু হতে পারে খুব ছোট জায়গা থেকে— প্রতিবেশী থেকে।

পাশের দরজায় একবার কড়া নাড়া, কয়েক মিনিট কথা বলা, দীর্ঘদিন কাউকে না দেখলে খোঁজ নেওয়া কিংবা একা থাকা একজন প্রবীণের জরুরি নম্বরটি সংরক্ষণ করা— এই সামান্য সামাজিক দায়িত্বও অনেকক্ষেত্রেই একটি জীবন বাঁচাতে পারে।